জীবনের উদ্যেশ্য

জীবনের উদ্যেশ্য
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কিশোরগঞ্জ যাচ্ছি ময়মনসিংহ থেকে। গাড়ির ছিটে বসলাম। বসে বসে একটা গল্প লিখব। আমার গল্পগুলো এভাবেই লেখা হয়। আজ লিখব জীবনের উদ্যেশ্য নিয়ে। কতজনেরইতো কত রকম জীবনের উদ্যেশ্য থাকে। শিশুদেরকে যখন খেলনা দিয়ে খেলতে সময় জিজ্ঞেস করা হয় “বাবু, তুমি বড় হয়ে কি হবে?” তখন সাধারণত উত্তর আসে “পাইলট হবো।” আসলে সে তখন প্রায়ই বিমান নিয়ে খেলে। তাই, এমন বলে। আমাদের সুমনের ছেলে সিয়ামও এরকম বলতো। টিভি নিউজে একদিন দেখল একটি বিমান বিদ্ধস্ত হবার ভিডিও। এরপরে আর সে পাইলট হতে চায় না। ক্লাশ টেন-এ পড়ার সময় ভালো ক্রিকেটার হওয়ার উদ্যেশ্য নিয়ে ক্রিকেট কোচিং-এ ভর্তি হয়। বড় হয়ে সেনাবাহিনীর অফিসার হবে বলে স্থির করে। কিন্তু রোড এক্সিডেন্ট হয়ে তার ডান হাতের দুইটি হাড়ই ভেংগে খন্ড হয়ে যায়। অপারেশন করে ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু সে ক্রিকেটও খেলতে পারবে না, আর্মিতেও যেতে পারবে না।

আজ আমি এই গল্পে আরো তিনজনের জীবনের উদ্যেশ্য নিয়ে লিখব। প্রথমেই লিখব মেডিকেলের আমার এক ক্লাশমেটের কথা। তার নাম প্রকাশ করলাম না। প্রকাশ না করাই ভালো। আপনারাও চিনতে পারলে তার নাম প্রকাশ করবেন না। এমবিবিএস ভর্তি মেধাতালিকায় তার নাম আমাদের ক্লাশে দশের ভিতরেই ছিল। মেধাবী ছাত্র হলেও সে তেমন ক্লাসে উপস্থিত থাকতো না। হঠাৎ হঠাৎ ক্লাশে এসে এটেন্ডেন্স দিয়ে যেতো। তাতে পরীক্ষায় ফেল ও অংশগ্রহণ না করার দরুন আমাদের ব্যাচ থেকে পিছিয়ে পড়ে। এমবিবিএস পাস করার ৭ বছর পর আমি আমাদের মেডিকেল কলেজেই প্রভাষক পদে শিক্ষক হয়ে আসি। দেখি সেই বন্ধু ৪র্থ বর্ষে পড়ছে। তার মানে সে এখন আমার ছাত্র। আমাকে পেয়ে সে খুশী। আমাকে তুমি সম্ভোধন না করে “আপনি” বলা শুরু করল। আমিও তাই করলাম। তিনি বললেন “সাদেক ভাই, আপনি আসাতে আমি একটু ভরসা পাচ্ছি।” আমি বললাম “আপনি আমার ছাত্র হওয়াতে আমি বিব্রত। আপনার প্রতি আমার সহানুভূতি থাকবে। আপনি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন।” পরীক্ষা দিলেন। বিভাগীয় প্রধান বুঝতে পেরেছিলেন যে পরীক্ষার খাতা দেখার সময় আমি বন্ধুর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারি। তাই, তিনি আমার কাছ থেকে বন্ধুর খাতাটি নিয়ে ফেল মার্ক দিয়ে দিলেন। পরের বছর আমি এমফিল পড়তে আইপিজিএমআর (পিজি)-তে চলে যাই। আড়াই বছর পর ফিরে এসে দেখি বন্ধু আমার সাব্জেক্ট প্যাথলজি পাস করে ফেলেছেন। আমি বেঁচে গেলাম। তারপর অনেকবার বন্ধুর সাথে আমার দেখা হয়েছেন, কথা হয়েছে্ন, গল্প হয়েছেন আমার চেম্বারে এসেছে্ন।
একবার তিনি এক সন্ধায় মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে আমার চেম্বারে এলেন। বললেন
-সাদেক ভাই, খুশীর সংবাদ আছে। আমি এমবিবিএসপাস করেছি।
-ভর্তি হওয়ার তারিখ থেকে আজ অবদি প্রায় ১৯ বছর। এই ১৯ বছর লাগলো আপনার ডাক্তার হতে। যেটা নাকি ৫ বছরের কোর্স। এতে আপনার অনুভুতি কি? কেনই বা আপনি এমন করলেন?
-সাদেক ভাই, সবারই জীবনের কিছু উদ্যেশ্য থাকে। আমার একটা উদ্যেশ্য ছিল ডাক্তার হওয়ার। দেরীতে হলেও আমি আজ ডাক্তার হলাম। আরেকটা উদ্যাশ্য ছিল ছোট দুই ভাইকে পড়াশুনার খরচ দিয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার। আমি তাদেরকে পড়ার খরচ যোগিয়েছি। তারা দুইজনই বিসিএস করে সরকারি অফিসার হয়েছে। একজন বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার। আরেকজন এগ্রিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেছে । আমার আরেকটা উদ্যেশ্য ছিল টাকা কামাইয়ের। আপনি এত বছরে কি আর কামাইছেন। তারচেয়ে ঢ়েড় বেশী আমি কামিয়েছি।
-কিভাবে কামালেন?
-এমবিবিএস ভর্তি হয়েই ব্যবসায় নেমে পড়ি। ময়মনসিংহ থেকে চাউল কিনে ট্রাকে ট্রাকে চাউল বিক্রি করেছি কুমিল্লা অঞ্চলে। তাতে অনেক লাভ হয়েছে। সেই লাভের টাকা দিয়ে সংসারের খরচ ও ছোট ভাইদের পড়ার খরচ চালিয়েছি। এখন ব্যবসায় আমি বেস অভিজ্ঞ। ডাক্তারদের থেকেও আমি বেশী কামাই করি। আমি এখন কিছু কিছু ডাক্তারি করব। আপনি আমাকে হেল্প করবেন।
সেই বন্ধু সব সময় এপ্রোন গায় রাখতেন রাস্তা ঘাটে। রোগী নিয়ে আমার চেম্বারে আসতেন পরামর্শ নিতে। এই ভাবে তাকে অনেকবছর দেখেছি। আমি যখন দিনাজপুর ছিলাম তখন একজন আমাকে ফোনে বললেন “ডাক্তার অমুক মারা গেছেন।” চিনতে পারলাম না। ময়মনসিংহ ফিরে আসার পর বন্ধুটিকে অনেকদিন দেখিনা বলাতে আমার সহকারী বলল “আপনার বন্ধু তো মারা গেছেন। আপনাকে ফোন করা হয়েছিল দিনাজপুর থাকতে।” এই সেই ডাক্তার যার মৃত্যু সংবাদ শুনে আমি চিনতে পারিনি।
আমাদের এমবিবিএস ব্যাচমেট এ পর্যন্ত আমার জানামতে ৬ জন ইন্তেকাল করেছে। সবাই ৫ জনের নাম বলে। কেউ আমার ১৯ বছরে পাস করা বন্ধুর খোঁজ নেয়নি। কেউ তারে মৃত বন্ধুদের তালিকায় রাখে কি?

এবার গল্প লিখব ক্লাশ টেন-এ পড়ুয়া এক ছাত্রের জীবনের উদ্যেশ্য নিয়ে। আমার গ্রাম এলাকার ১৪টি হাই স্কুল/মাদ্রাসার ২৮ জন ক্লাশ টেন-এ পড়ুয়া মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রথম হওয়া এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলাম
-তোমার জীবনের উদ্যেশ্য কি?
-স্যার, আমি বড় হয়ে হাই স্কুলের বিএসসি টিচার হতে চাই।
-কেন?
-দেশের উন্নতি করতে চাই বিজ্ঞান চর্চা। বিজ্ঞানে ভালো করতে চাই ভালো বিজ্ঞানের শিক্ষক। এই বিজ্ঞান শিক্ষা শুরু হয় হাই স্কুল থেকে। বর্তমানে আমাদের অনেক স্কুলে ভালো বিএসসি টিচার নাই। তাই আমি দেশের কথা চিন্তা করে হাই স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক হতে চাই।
-আসলে তুমি হবে একজন বিজ্ঞানের পিএইচডি। কলেজে গিয়ে দেখবে ভাল এমএসসি টিচার নাই। তাই হতে চাইবে এমএসসি। ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে দেখবে ভালো পিএইচডি টিচার নাই। তাই তুমি হতে চাইবে পিএইচডি। এভাবে তুমি হয়ে যাবে ভালো একজন পিএইচডি টিচার। তোমার উদ্যেশ্য ভালো।

প্রায় ২০ বছর পর সেই ছেলেটি আমার চেম্বারে এসেছিল। জানালো সে এলাকার একটি হাই স্কুলে বিএসসি টিচার হিসাবে আছে। সেই অনুষ্ঠানের আমার ভবিষ্যৎ বাণী স্মরন করে হাসলো।

এবার আমি আমার নিজের ভবিষৎ উদ্যেশ্য নিয়ে কিছু কথা লিখব। আমি শিশুকালে নানা ও দাদার পারিবারিক মক্তবে আরবি পড়া শিখি। একটু বড় হয়ে হুজুরদের সাথে মিলাদ ও ওয়াজ মাহফিলে যেতাম। বেহেস্ত ও দোজখ সম্বন্ধে ধারণা অর্জন করি। তাতে শিক্ষাগুরু ছমির মাওলানা, কদ্দুস ক্কারী সাহেব ও চাচা শামসুদ্দিন তালুকদারের মতো একজন ধর্মভীরু মানুষ হতে মনস্থির করি যাতে পরকালে বেহেস্তবাসী হতে পারি। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় প্রাইমারি স্কুলের টিচার হতে মনস্থির করি। প্রাইমারি স্কুলের টিচার আমার চাচা সোলায়মান তালুকদার, রশিদ তালুকদার ও নুরুল ইসলাম তালুকদারের সুখী জীবন আমাকে আকৃষ্ট করে। হাই স্কুলে পড়ার সময় মনস্থির করি হাই স্কুল টিচার হতে। হাই স্কুল টিচার মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাই ও হাফিজ উদ্দিন দুলাভাইর সৌখিন জীবন যাপন আমার ভালো লাগতো। কলেজে পড়ার সময় আমি ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখি। এলাকার তিন জন স্বনামধন্য ডাক্তার ডাঃ শামসুল হক, ডাঃ (ব্রিগেডিয়ার) আব্দুল খালেক ও ডাঃ মোশারফ হোসেন তখন মেডিকেল কলেজে পড়তেন। ওনাদের মেধাবী ছাত্র হিসাবে বেশ সুনাম ছিল। ওনাদের প্রশংসা শুনে আমি মেডিকেলে পড়তে অনুপ্রাণিত হই। মা সেই সময় প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। আমি খুব পড়ার চাপে ছিলাম। মাকে তেমন সময় দিতে পারিনি। ডাক্তার হয়ে মায়ের চিকিৎসা করব মনস্থির করেছিলাম। একবার মাকে দেখানোর জন্য টাংগাইলের নামকরা ডাক্তার এইচ আর খান স্যারের কাছে গেলাম। মা কানে কম শুনতেন। তাই আমি এক টুকরা কাগজে মার অসুখের বিবরণ লিখে স্যারের কাছে দিয়েছিলাম। স্যার পড়ে মন্তব্য করেছিলেন “তুমি ডাক্তার না হয়েও যেভাবে রোগের হিস্ট্রি লিখেছ তাতে মনে হচ্ছে তুমি ডাক্তার হলে ভালো ডাক্তার হতে পারবে।” এই উক্তি শুনে আমি আরো অনুপ্রাণিত হই ডাক্তার হতে। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালীন আমার মা ইন্তেকাল করেন। আমি আমার জীবনের উদ্যেশ্য ঠিক রেখেছিলাম। আল্লাহ্ আমার উদ্যেশ্য কবুল করেছেন।
কিশোরগঞ্জ পৌছে গেছি বাকীটুকু ফেরার সময় লিখবো।

ফেরার পথে লিখছিঃ
মেডিকেলে পড়ার সময় মনস্থির করেছিলাম সার্জারি বিশেষজ্ঞ হবো । আমি দেখেছি মেডিসিন দিয়ে অনেক রোগী ঠিক মতো চিকিৎসা হয় না । কিন্তু অপারেশন করে দিলে ঐ রোগ আর থাকে না । তাই এমন সিন্ধ্যান্ত নিয়েছিলাম । ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং-এর ১২ মাসের মধ্যে ৬ মাসই সার্জারিতে ট্রেইনিং করলাম । যখন প্রফেসর সেলিম স্যারের অপারেশনে এসিস্ট করতাম আমি বারবার ধীরগতি হয়ে পরতাম । তাই তিনি আমাকে তিরস্কার করে বলতেন “তোমাকে দিয়ে অপারেশন করানো ঠিক হবে না।” আমি সিদ্ধান্ত পাল্টাই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হবো । পাস করে সরকারি চাকরি করেছি উপজেলা লেভেলে। উপজেলায় থেকে কয়েকবার এফসিপিএস মেডিসিন এডমিশন টেস্ট দিয়ে ব্যর্থ হলাম । প্রাইভেট প্র্যাক্টিস নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লাম । উপজেলার জ্বালা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ১৯৯২ সনে প্রভাষক (প্যাথলজি) রিক্রুটমেন্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্রভাষক হই। এটা আমার স্বপ্ন ছিল না। মেডিকেল কলেজের শিক্ষক প্রফেসর ডাঃ মীর্জা হামিদুল হক ও প্রফেসর ডাঃ জামশেদ হায়দার সিদ্দিকী স্যারের সান্নিধ্যে এসে প্যাথলজিতে শিক্ষক হিসাবে ক্যারিয়ার করার স্বপ্ন দেখি। দেড় বছর প্যাথলজির লেকচারার হিসাবে চাকরি করে প্রথম বারেই এম ফিল প্যাথলজি এডমিশন টেস্টের রিটেন পরীক্ষায় উত্তীর্ন হই । ভাইবায় প্রফেসর কে এম নজরুল ইসলাম স্যার জিজ্ঞেস করলেন “তুমি অন্য সাবজেক্ট বাদ দিয়ে প্যাথলজিতে আসতে চাও কেনো?” আমি উত্তর দিলাম “আমি একজন শান্ত স্বভাবের ছেলে। রোগীদের হই চই আমার তেমন সয্য হয় না। তাই আমি নিরিবিলিতে বসে কাজ করতে চাই । প্যাথলজিতে ক্যারিয়ার করতে পারলে ল্যাবে বসে অনেক গবেষণা মূলক কাজ করতে পারবো ।” স্যার চমকে গিয়ে বললেন “হই চই ! হোয়াট ইজ হই চই?” ভেবাচেগা খেয়ে আমার মুখ কালো হয়ে গেলো। ভাবলাম আমি এটা কি করলাম? সর্বনাশ করে ফেলেছি । প্রফেসর মহ সিন স্যার পাশেই বসা ছিলেন সোফাতে । আমার বিপদ দেখে তিনি বলে ঊঠলেন “এই ছেলেই পারবে । ও ঠিকই বলেছে, স্যার।” এরপর সব এক্সামিরগণ আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন । আমি ভালই পারলাম । সবার মুখ উজ্জল মনে হলো । পরেরদিন রেজাল্ট পেলাম এডমিশন টেস্টে সরকারি ক্যান্ডিডেটদের মধ্যে ২য় স্থান আমার । স্বপ্ন পুরণের জন্য আমি তখনকার সবচেয়ে বড় ডিগ্রীএমফিল অর্জন করি ১৯৯৫ সনে।

সেই থেকে অদ্যাবধি প্যাথলজি বিভাগের শিক্ষক হিসাবে কর্মরত আছি। আমার স্ত্রী ফিরোজা আক্তার স্বপ্নার স্বপ্ন ছিল তার স্বামী একজন পিএইচডি হবে। তাই আমি ২০০৮ সনে চেষ্টা করে জাপানের রনপাকু স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পাই। কিন্তু আল্লাহ তা চাননি। ডাক বিভাগ ভুল করে আমার ডকুমেন্টগুলি অষ্ট্রেলিয়ার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়। জাপান থেকে আমার কাছে ঘন ঘন ফোন আসতে থাকে ডকুমেন্ট পাঠানোর জন্য। অবশেষে অস্ট্রেলিয়া থেকে ডকুমেন্টগুলি পাঠানো হয় জাপানে। ততদিনে পিএইচডি ভর্তির তারিখ শেষ হয়ে গেছে। প্রফেসর সরি বলে জানিয়ে দিলেন আবার প্রেয়ার দেয়ার জন্য। আমি আর চেষ্টা করিনি।

অনেককিছুই করেছি। আবার অনেক কিছুই করা হয় নাই সংসারে সময় দিতে গিয়ে। বড় মেয়ে সাবরীন ইসলাম মুনা কম্পিউটার সাইন্সে বিএসসি এবং এমবিএ পাস করে আমাকে সন্তুষ্ট করেছে। একজন ভালো মনের মেয়ে হয়েছে। স্বামীর সাথে ঢাকায় থাকলেও প্রতিদিন মেসেঞ্জারে ভিডিও কল দেয়। ওর ছেলের বয়স এখন চার প্লাস। আমার বন্ধু। মেয়েজামাই শাহরিয়ার সাজ্জাদ অস্ট্রেলিয়া থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পিএই ডি করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্ব সফটওয়্যার প্রতিযোগীতায় সে প্রথম হয়েছিল। ইংল্যান্ড থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ এমএসসি করেছে। বর্তমানে এআইইউবি-এর সহকারী অধ্যাপক। আমার স্বপ্ন ছিল আমার বংশধর কেউ একজন ডাক্তার হউক। ছোট মেয়ে মেয়ে মার্জীয়া ইসলাম দীনা ডাক্তার হয়েছে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ থেকে। সেও একজন ভালো মনের মেয়ে।

অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আমাকে পরিশ্রম করতে হয়েছে অনেক। আল্লাহ্ আমাকে অনেক ধন সম্পদ দিয়েছেন। সুখ দিয়েছেন প্রচুর। তবে সৎ পথে থাকতে গিয়ে বন্ধুরা কোন কোন ব্যপারে আমাকে বোকা মনে করেন। আমি তা মনে করি না। এই লাইনে আমি বিজয়ী।

আমি চিকিৎসা পেশার প্যাথলজি প্রাক্টিস করি। শত শত রোগীর বায়োপ্সি পরীক্ষা করে ক্যান্সারসহ নানা রোগ নির্ণয় করি। কাজেই এই পেশায় আমি তৃপ্ত। ১৯৯২ সন থেকে আমি সরকারী মেডিকেল কলেজের শিক্ষক। এর ১৪ বছর ছিলাম আমার বিদ্যাপীঠ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। হাজার হাজার ডাক্তার আমার ছাত্র ছিল। শত শত ছাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হয়েছে। খোজ খবর নেয় তারা। এক ছাত্রতো একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী। আরেক ছাত্র আমাদের দেশেরই মন্ত্রী । সংসদ সদস্যও আছে কেউ কেউ।
চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি আল্লাহ্ আমাকে কয়েকটি বিষয়ে এক্সপার্ট করেছেন। আমি একজন স্বশিক্ষিত কম্পিউটার প্রোগ্রামার। আমার বানানো সফটওয়্যার শত জনের বেশী লোকে ব্যবহার করে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করার ব্যপারেও আমি দক্ষ। তবে এগুলি আমার সখ। পেশা নয়। বর্তমানে তিনটি মেডিকেল জার্নাল এডিট করি । এটা আমার বাড়তি কাজ।

চাকরির বয়স ফুরিয়ে আসছে। কর্ম ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। বাকী জীবনের জন্য কিছু কিছু উদ্যেশ্য আছে। বাড়িতে গোরস্থানে আমি শেষ সয্যা নিতে চাই। সাথে একটি মসজিদ। এই মসজিদটা পাকা বিল্ডিং হিসাবে দেখতে চাই। টাকার কোন সমস্যা নাই। বুদ্ধিমান লোকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় জায়গা নির্ধারণ ও কমিটি গঠন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। হয়তো দেখা যাবে আমার সেই বাকী জীবনের উদ্যেশ্য পুরণ হলো না। আল্লাহ চাইলে সব হবে।
শম্ভুগঞ্জ এসে গেছি শেষ করলাম লেখা। ধন্যবাদ।
২৭/১০/২০১৮ খ্রি.

পুনশচঃ
গত ২০১৯ সনের ডিসেম্বর মাসে আমাদের এম বি বিএস ব্যাচের ৪০ বর্ষ পুর্তি উপলক্ষে স্মরণিকা প্রস্তুত করার সময় বন্ধুরা ফেইসবুকে যোগাযোগ করে মৃত বন্ধুদের নামের তালিকা প্রস্তুত করে । আমি জানালাম “আমাদের এক বন্ধু অমুক এমবিবিএস পাস করতে ১৯ বছর লাগিয়েছিলেন । তিনি মারা গেছেন তা কি তোমরা কেউ জানো?” সবাই ইন্না লিল্লাহি …. পড়ে বন্ধুর জন্য দোয়া করতে লাগলো। এমন সময় এক ক্লিনিকের ম্যানেজার এলেন আমার রোগী হয়ে । পরিচয় দিলেন আমি অমুক ক্লিকের ম্যানেজার । আমি জিজ্ঞেস করলাম
-আপনাদের ক্লিনিকে অমুক ডাক্তারের খবর কি?
-উনি তো মারা গেছেন।
-শিউর?
-শিউর। শিউর মানে, উনিতো আমার সামনেই মারা গেছেন ।
-তিনি আমার ক্লাসমেট ছিলেন । তিনি ১৯ বছরে এমবিবিএস পাস করেছেন । আহ হা রে!

কনফার্ম হবার পর মৃত্যু সংবাদটা আবার প্রচার করলাম ফেইসবুকের বুন্ধুদের গ্রুপে । সবাই তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করা শুরু করলো। আমিও করলাম । এর মধ্যে এক বন্ধু কমেন্ট করলো “যার কথা তোমরা মৃত বলছো সে মরে নি । সে বেঁচে আছে। আজও আমার সাথে কথা বলেছে। ভালো আছে । এই তার মোবাইল নাম্বার …….।“ আমার শরীর ঘামা শুরু হলো । তাইলে ম্যানেজার কার কথা বললো । আমি মৃত বন্ধুর নাম্বারে ফোন করলাম । আমার কৃত কর্মের জন্য দুঃখ্য প্রকাশ করে মাফ চাইলাম । তিনি বললেন
-আসলে আমি ঐ ক্লিনিকে আগে কাজ করতাম । আমি চলে আসার পর আমার নামের নামেই আরেক ডাক্তার কাজ করে ধীর্ঘদিন। সে মারা গেছে।
-ম্যানেজার যে বললেন “তিনি পাশ করতে অনেক বছর লাগিয়েছিলেন।”
-ঠিকই আছে । ঐ ডাক্তারও আমার মতো অনেক দিন পর পাস করেছে। নামও একই । তবে সে আমার জুনিয়র ।
-কিন্তু, মৃত্যুর সময় আমি দিনাজপুর ছিলাম । হাসপাতাল থেকে আমার কাছে ফোন আসে “আপনাদের ডাঃ অমুক মারা গেছে।”
-ঠিকই। সংবাদটা আসলে আপনাকে দিতে বলেনি । বলেছিলেন “ডাঃ সাদেককে ফোন করে জানিয়ে দাও যে ডাঃ অমুক মারা গেছে। ডাঃ সাদেক হলো ঐ মৃত ডাক্তারের বন্ধু। আপনি না। যিনি ফোন করেছেন তিনি কল লিস্ট থেকে সাদেক বের করে ফোন করেছেন। আপনি না। আমিও না।”

তারপর ঘটনার বিস্তারিত বন্ধুদের জানিয়ে দিলাম । বন্ধুরা বললো “আমরা তার জন্য সবাই অগ্রিম দোয়া করে ফেলেছি । কাজে লাগতে পারে।”

গল্পের আগের অংশে লিখার সময় আমার মেয়ে-জামাই এআইইউবি-এর টিচার ছিলো। সে এখন মিরপুরের এমআইএসটি-র এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর।

আমার জীবনের আরেকটা উদ্দেশ্য ছিলো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যথলজি বিভাগের প্রধান হওয়া । আমি ২০১৯ সনের নভেম্বর থেকে ২০২০ সনের ১৩ই এপ্রিল চাকরির শেষ পর্যন্ত বিভাগীয় প্রধান ছিলাম । তাই, আমার সরকারি চাকরি শেষ জীবনটা মধুর ছিলো । আল্লাহ রহম করেছেন । যে টুকু আমি পাই নি বলে আপনারা আমার জন্য আফসোস করেন সে টুকু পাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই । আল্লাহ আমার ক্ষমতা সীমিত করে রেখেছেন । যা ছিলো আমার ভালোর জনই ।
২৯/৫/২০২০ খ্রি.

2 Replies to “জীবনের উদ্যেশ্য”

  1. I am really impressed with your writing skills as well as with the layout on your weblog. Is this a paid theme or did you customize it yourself? Anyway keep up the excellent quality writing, it抯 rare to see a great blog like this one today..

  2. I found your blog site on google and verify a few of your early posts. Proceed to maintain up the superb operate. I simply extra up your RSS feed to my MSN News Reader. In search of ahead to studying more from you afterward!?

Leave a Reply

Your email address will not be published.