জিরের দিন শেষ

জিরের দিন শেষ
(স্মৃতিরর পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

জিরের নাম মানুষ ভুলতে শুরু করেছে। বড় কৃমি বা ক্যাচোকৃমিকে বলা হত জির। আগের দিনে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ বিশেষ করে শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগত। ভাত যদিও কিছু যোগার হত কিন্তু প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাবার তারা পেতো না। আমিষের অভাবে তাদের কোয়াসিঅর্কর নামে একটা রোগ হতো। এই রোগে পেটটা মোটা, পাছা চিকন ও মুখ গোলাকার বা ফোলা ফোলা হত। পাকা পায়খানার প্রচলন কম থাকায় এবং যেখানে সেখানে খোলা যায়গায় পায়খানা করাতে মল বাহিত রোগ খুব বেশী হতো। পোলাপানরা আলানে পালানে, মুলাক্ষেতে, পাট ক্ষেতে পায়খানা করতো। এমনো দেখা যেতো মুলা ক্ষেতে বসে পায়খানা করছে এবং বসে বসে মুলা তুলে খাচ্ছে। তাতে কি হচ্ছে? তার আগে যে শিশুটি মুলা ক্ষেতে পায়খানা করেছিল সেই পায়খানায় হয়ত আমাশয়, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, হেপাটাইটিস এ, ইত্যাদি রোগ জীবানু ও কৃমির ডিম মিশ্রিত ছিল। সেইগুলি মুলার গোড়ায় মিশেছিল। মুলার সাথে জীবাণু খেয়ে এই ছেলেটিও আক্রান্ত হল। পলিও রোগের ভাইরাসও পায়খানার সাথে মিশে বের হয়। সেই মল বাহিত পানি বা মিশ্রিত খাবার খেলেও পলিও জীবাণু পেটে যায়। ডাক্তারগণ পলিও টিকা খাওয়ান বাচ্চাদেরকে। এটা আসলে পলিও জীবাণু। কিন্তু এরা শরীরে গিয়ে বিস্তার লাভ করতে পারে না। কিন্তু দেহে পলিওর প্রতিশেধক তৈরি হয় অর্থাৎ ইমুনাইজেশন হয়। গ্রামের শিশুরা পলিও জীবাণুমিশ্রিত খাবার খেয়ে পলিও আক্রান্ত না হয়ে অনেক সময় ইমুউনিটি ডেভেলপ করে। এটাকে বলা হয় হার্ড ইমুউনিটি।

যাহোক, কৃমির কথায় আসি। কৃমিতে আক্রান্ত হলে মানুষ অপুষ্টিতে ভোগে। কৃমি পেট থেকে পুষ্টি খেয়ে নেয়। বর্শির মত হুকওয়ালা ছোট কৃমিকে হুক ওয়ার্ম বলে। এই গুলির বাচ্চা পায়ের আংগুলের চিপা দিয়ে দেহে প্রবেশ করে। কাজেই যারা খালি পায়ে হাটত তাদের বেশী হুক ওয়ার্ম হত। হুক ওয়ার্ম হুক লাগিয়ে ক্ষুদ্রান্ত থেকে রক্ত চুষে খেত। টেপ ওয়ার্ম বা ফিতাক্রিমি ছিল ফিতার মত লম্বা। পরিপাকতন্ত্রে বড় বড় হতে হতে এরা ১৮/১৯ ফুট লম্বা হয়ে যেতো। পেটের সব খাবার খেয়ে ফেলতো। সাদা রংগের ছোট ছোট পিনের মত ছিল পিন ওয়ার্ম বা গুড়াকৃমি। গুড়া কৃমি জাতেই গুড়া। অনেকে মনে করত কৃমির বাচ্চা। এরা পায়খানার রাস্তার একটু উপরেই বাস করত। সন্ধার সময় ঝাকে ঝাকে বের হয়ে পায়খানার রাস্তার চারিদিকে ডিম পেড়ে যেতো। তাতে সেই সময় পায়খানার রাস্তা বিরবির করে বিরক্তির সৃষ্টি হতো। বাচ্চারা ঘুমাতে পারতো না বিতক্তির জন্য। পেটে কৃমি আছে কিনা তা জানার জন্য পায়খানা পরীক্ষা করাত। প্যাথলজিস্ট অথবা টেকনিশিয়ান কৃমির ডিম আছে কিনা তা লিখে দিতেন। গূড়া কৃমি যেহেতু বাহিরে এসে ডিম দেয় তাই পায়খানা পরীক্ষায় গুড়া কৃমির ডিম পাওয়া যেতো না। রুগীরা মন্তব্য করতো “আমি নিজে ধরে এনে দেখেছি। আর ইনি বলেন কৃমি নাই। ” আগের দিনে কেউ কেউ পায়খানা পরীক্ষার রিপোর্ট-এ কিছু না পেলেও লিখে দিতেন হুক ওয়ার্মের ডিম আছে। কারন, হুক ওয়ার্ম কেউ খালি চোখে দেখে না। এমনো শুনেছি একজন চালাকি করে পাহাড়ি লালমাটি দিয়েছিল পায়খানা হিসাবে পরীক্ষা করাতে। সেখানেও নাকি রিপোর্টে লেখা হয়েছিল কৃমির ডিম আছে। জানাজানি হয়ে গেলে রিপোর্টদানকারী বলেছিলেন যে মাটিতেই কৃমির ডিম ছিল।

ক্যাচোর মতো দেখতে বড় বড় কৃমি গুলি দেখার মতো ছিল। পায়খানার সাথে মাঝে মাঝে পড়ে যেতো। বলা হত জির পরছে। পাতলা পায়খানা হলে এগুলি পেটে থাকতে পারতো না। পড়ে যেতো। তাই, হাট বাজারের ক্যানভাররা কৃমির বড়ি বিক্রি করতো যেগুলি ছিল আসলে পারগেটিভ জাতীয়। পারগেটিভ হল এমন কিছু যা খেলে প্রচুর পাতলা পায়খানা হয়। তাতে জিরও পড়ে যাত। আমি বড় চওনা, কচুয়া ও ইন্দ্রজানী হাটে গিয়ে ক্যানভাসারের ভিরে গিয়েছি মজার মজার কথা ও গান শুনতে। তারা মজার মজার কথা বলে ও গান গেয়ে মানুষ আকৃষ্ট করে জমায়েত করে কৃমির ঔষধ বিক্রি করত। কচুয়ার নজুমুদ্দি ভাই, মধু ভাই, বড় চওনার আব্বাস ভাই কৃমির বড়ি ক্যানভাস করে বিক্রি করতেন। বর্ষাকালে ফরিদপুর থেকেও কিছু কিছু ক্যানভাসার আসতেন। তারা চ্যালেঞ্জ করে খাওয়াতেন বড়ি। বলতেন “আমার এই বড়ি খেলে এখনই কৃমি পড়বে। ” একজনে খেলেন। কিছুক্ষণ পড়ে বলেন “পায়খানা করুম। ” তাকে নিয়ে যাওয়া হল নাপিত হাটির পশ্চিম পাশের ঝোপে। ফিরে এলো তিনটি জির গজারির শুক্না পাতায় করে। দেখে শত শত লোক কৃমির বড়ি কিনলো। পানি দিয়ে জির পরিস্কার করে ক্যানভাসার কাচের বোতলে রেখে দিলেন দেখায়ে দেখায়ে ক্যানভাস করার জন্যে। আমার এখন সন্দেহ হয় ঐ রুগীটাও ক্যানভাসারের লোক ছিল। পকেটে হয়ত জির নিয়ে দিয়েছিল ঝোপে।

আব্বাস ভাইর চেহারা সুন্দর ছিল। মাথায় বাবড়ি চুল ছিল। চুল দুলিয়ে তিনতারা বাজিয়ে মারফতি গান গেয়ে লোক আকৃষ্ট করতেন। গাইতেন পল্লীগিতির ভাওয়াইয়া সুরে। “নামাজি ভাই” বলে লম্বা টান দিতেন। সেই সুর আমার এখনো কানে বাজে। গানে নামাজ পড়তে বলতেন। কোরানের বিরাশি জাগায় নাকি নামাজের কথা বলা আছে। তার গানের সেই কথা ছিল। গাইতেন “কোরানের বিরাশি জাগায়।” তার পিছনে একটা সাদা মোটা পর্দায় পেটমোটা বাচ্চার ছবি ছিল। ছবির বাচ্চার মুখ দিয়ে ও পায়খানার রাস্তা দিয়ে জির বের হচ্ছিল। সেই ছবি দেখিয়ে আব্বাস ভাই সুর করে গাইতেন “হায়দর আলীর কিরমি হইয়া, পেটটা গেছে বড় হইয়া, সেই কিরমিয়ে উলাগ দিলে হাডুডু খেলায়, গো, সেই কিরমিয়ে উলাগ দিলে হাডুডু খেলায়।। ” সুনে খুব মজা পেতাম। কৃমি মাঝে মাঝে উলাগ দিত পেটে। কেউ কেউ বলত কিরমি বিগার দিছে। পেটে নানা রকম অসস্তি হত, পেট কামড়াতো, বমি বমি ভাব হতো, বমি হতো, বমির সাথে জির পড়ত। অনেক সময় গলা পর্যন্ত এসে জিরে মাথা বের করত। মাথা ধরে টেনে সেই জির বের করা হত। মুখ দিয়ে পানি এলে বলা হত জিরে পানি তুলছে। আনারসের পাতা ছেঁচে রস করে খায়ালে জিরে পানি তোলা বন্ধ হত।

গরীবের ভরসা ছিল একমাত্র কৃমির বড়ি নামে পারগেটিভ। ফার্মেসীতে বিভিন্ন নামে কৃমির দামী ট্যাবলেট ছিল। সেগুলি খেলে তেমন সমস্যা হত না। কিন্তু পারগেটিভ বড়ি খেলে পাতলা পায়খানা হয়ে জান বেরিয়ে যেতো। তাই ডান্ডা দিন দেখে জিরের বড়ি খেত। শুনেছি ভেন্নাপাতা বেটে কৃমির বড়ি বানানো হত। ভেন্নাপাতা বাটা পারগেটিভের কাজ করে।

আমি যখন ডাক্তার হয়ে ১৯৮৫ সনে ইন্টার্নি করি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তখন ইন্টেস্টিনাল অবস্ট্রাকশন বা নাড় বন্ধ হওয়া এক বাচ্চা রুগী পেয়েছিলাম। আমার বস ছিলেন তৎকালিন সার্জারির রেজিস্ট্রার ডাঃ কাজল কান্তি চৌধুরী। তিনি অপারেশন করছিলেন। আমি এসিস্ট করছিলাম। পেটের চামড়া কাটার পরপরই ফটাস করে গ্যাস ভর্তি নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে পড়ল। সিস্টার একটা বড় বোল দিলেন। নাড়িভুঁড়ি বোলে নামিয়ে রাখা হলো। মনে হলো নাড়িভর্তি গ্যাস। কাজলদা ছুড়ি দিয়ে নাড়ি ফুটা করার সাথে সাথে ফোস গ্যাস বের হতে থাকলো। মুখে আমাদের মাস্ক বাধা ছিল। মাস্কে লেগেছিল কি না মনে নেই। আমার সব কথা মনে থাকে না। হায়রে দুর্ঘন্ধ! মুখ সরিয়ে নিলাম। গ্যাস বের হওয়া শেষ হলে নাড়ির ভিতর মাছের শব্দের মত কপ কপ করতে লাগলো। বিশ্মিত হলাম। কাজল দা ছিদ্র দিয়ে হাত দিলেন। মৃদু হাসলেন। একটা বোল চাইলেন। সিস্টার বোল নিয়ে দাড়ালেন। কাজল দা নাড়ির ভিতর থেকে মুঠি ভরে জির ধরে এনে বোলে রাখছিলেন পচা পায়খানা সহ। বোলে এসে বাইম মাছের মতো জির কিলবিল করতে লাগলো। মুহুর্তে বোল ভরে গেল জিরে। দাদা বললেন “এতগুলি এস্কারিস লুম্রিকইডিস আগে দেখিনি। এই কৃমিগুলি দলা পাকিয়ে ইন্টেস্টাইন অবস্ট্রাকশন করেছে। পরিস্কার করে রাখুন। মাইক্রোবায়োলজি মিউজিয়ামে রাখা যাবে।” অপারেশন শেষে আমি দেখলাম জিরগুলি পরিস্কার করে বোলে রাখা আছে। কিলবিল করা অবস্থায় ছেলের বাবা-মাকে দেখালে অজ্ঞান হয়ে পড়তো।

আমি ১৯৯৫ সনে প্যাথলজিস্ট হয়ে একটা ল্যাবে প্রক্সি দিতে গিয়েছিলাম। সেদিন সেই ল্যাবে ৩৩টি স্টুল (মল) সেম্পল পরীক্ষা করতে হয়েছিল। বেশীভাগ স্টুলেই কৃমির ডিম ছিল। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের চেষ্টায় মাস ইরাডিকেশন প্রগ্রাম নিয়ে সব বাচ্চাদেরকে কৃমিনাশক ঔষধ খাইয়ে এবং পাকা পায়খানা করার ব্যপার রেডিও টেলিভিশনে ব্যাপক প্রচার করার কারনে কৃমিদের বংশ বিনাশ হয়ে পড়েছে। দেশে কৃমি নাই বললেই চলে। যা আছে সেগুলি গুড়াকৃমি। প্যাথলজিস্টগন এখন তেমন স্টুল সেম্পল পান না। নানারকম ভেজাল খেয়ে ক্যান্সার বেড়ে গেছে। তাই ক্যান্সারের সেম্পল পাওয়া যায় বেশী বেশী। জিরের দিন এখন শেষ।


তারিখ : ৮/৬/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ