কাক ও চড়ুই

কাক ও চড়ুই

(হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। আমি সেসব হাস্তর বন্ধুদের সহযোগিতায় সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি আমার মতো করে। হাস্তরের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

গেন্দু ও গেন্দুর বউকে বাসর ঘরে রেখে প্রায় সবাই রাতের খাবার খেয়ে শুতে গেলো। বাড়ি ভর্তি নাইয়রি। গেন্দুর মা সবাইকে গোছিয়ে বিভিন্ন ঘরে শোবার ব্যবস্থা করলেন। গেন্দুর বাবা উঠানে টুলে বসে হুকা টানতে টানতে তার নিজের বিয়ের স্মৃতিচারণ, গেন্দুর জন্ম হওয়ার স্মৃতিচারণ এবং আরও বিভিন্ন বিষয়ে স্মৃতিচারণ করতে লাগলেন। পূবের চৌহদ্দির ঘরে সব নাইয়রির শোবার ব্যাবস্থা হলো। বড়রা চৌকির উপর শুইলেন। ছোটরা মেজেতে ঢালাই বিছানায় শুইল। গেন্দুর ছোট বোন ময়ফল, গেন্দুর চাচাতো বোন আম্বাতন, গেন্দুর শ্যালিকা জয়তন নিচের ঢালাই বিছানায় শুলো। গেন্দুর নানীশাশুড়ী শুলো চৌকির উপর। তার সাথে গেন্দুর দাদীও শুলো। ঘরে কুপি বাতি জ্বালানো ছিলো। গেন্দুর নানীশাশুড়ী বললেন “দোয়াতটা নিবাইয়া দেও। দোয়াত জ্বালাইন্যা থাকলে আমার ঘুম আহে না।” ময়ফল কুপিবাতি নিভিয়ে দিল। ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। ময়ফল বললো “নানী, ঘর না আন্ধআইর অইয়া গেল?”

– অইক আন্ধাইর। আমরা ত ঘুমাইয়াই থাকমু।

– নানী, বিয়া বাড়িতে নাইয়রিরা কেউ ঘুমায় না।

– তে কী করে?

– হাস্তর কয়, গীত গায়।

– তে হাস্তর কও।

– নানী, আপ্নেই হাস্তর কইন। আংগ আম্বাতন গীত জানে। অইতি গীত গাবো।

– আমি অনেক হাস্তর জানি। আগে তোমরা হাস্তর কও। তোমগ গুনা হোনার পর আমার হাস্তর হুনামু।

– তে কোনডা কমু?

– কইতে থাহ একটা একটা কইরা।

আম্বাতন বললো “এই ছেড়ি, অস্তে কতা ক। কাক্কু উঠানে বইয়া গুড়্গুড়াই উক্কা খাইতাছে। বকা দিব।”

– অস্তেই কইতাছি। তাইলে আগে আমি কাউয়া আর চড়ুই পক্কির হাস্তর কই। সবাই চুপ কইরা হুনুন।

– এই মশায় ধরতাছে। কাক্কু, আংগ ঘরে একটা বুন্দা ধরাই দিয়া যাইন। মশায় খাইতাছে।

– এক বাইত্যে এক গিরস্তের মেয়ায় বাইরবাড়ির উঠানে ধান নাড়তো কাঠল গাছের ছেয়ায় বইয়া। আতে একটা কোটা নিয়া বইতো কুরকা খেদাবার নিগা। মধ্যে মধ্যে একটা কাউয়া আর একটা চড়ুই আইয়া ধানের মধ্যে ঠোক্কর দিতো। মেয়াডার পৌকের নিগা পরণ পড়তো। তাই ধান হুকান শেষ অইলে এক মোট ধান চড়ুইরে দিল আর এক মোট ধান কাউয়ারে দিয়া ডাহি ভইরা ধান নিয়া বাইত্যে গেলো গা।

– মেয়াডার কি বিয়া অইছাল?

– অই ছেড়ি, মেয়াডার বিয়া অইছাল কিনা গেডা দিয়া তর দরকার কী। ভেদা পেঁচাল না পাইরা হাস্তর হোন।

– কাউয়া আর চড়ুইয়ে যার যার ধান হে হে খাইতে নাগলো। চড়ুই ঠোঁট দিয়া ধানের তুষ ছিলাইয়া ছিলাইয়া চাইল বাইর কইরা খায়। আর কাউয়ায় না ছিলাইয়াই ঠোকরাইয়া ঠোকরাইয়া মুখ ভইরা আমান আমান ধান খায়। চড়ই আর কাউয়ার মধ্যে দোস্তালি ভাব আছিলো।

– অই ছেড়ি, কাউয়া অইল কত বড়, আর চড়ুই অইল কত ছোট। এত ছোট বড় পৌকের নগে কোন্দিন দোস্তালি অয়?

– এই ছেড়ি, ঠেটামি না কইরা হাস্তর হোন। খাওনের সময় কাউয়ায় চালাকি কইরা কইল, আহ আমরা পাল্লা ধরি। যে আগে খাওন শেষ করব হে জিতপ। তুমি যদি জিত আমার শইলের গোসত ঠোকরাইয়া খাবা, আর আমি জিতলে তোমার শইলের গোসত ঠোকরাইয়া খামু। চড়ুই সহজেই রাজি অইয়া গেল। কাক তাত্তারি ঠোকরাইয়া ঠোকরাইয়া সব ধান খাইয়া শেষ কইরা ফালাইল। চুড়ুই অতখোনে মাত্র কয়েকটা ধান খাইল ছিলাইয়া ছিলাইয়া। কাউয়ায় কইল, দোস্ত, তুমি ঠইকা গেছ। আমি অহন তোমার গোসত খামু।

চড়ুই, চইমকা গিয়া কইল, আমি ত মনে করছিলাম, আমরা মসকরা কইরা কইছি ! আর, আমি যে ছোট, তুমি ঠোকর দিলে তো আমি মইরাই যামুগা। কাউয়ার কতা একটাই, সে বাজিতে জিতছে, তাই শর্ত মতে তারে এহন চড়ুইয়ের গোসত খাইতে দিতেই অবো।

শেষমেশ কোন কতাতেই কাউয়াকে বারন না করতে পাইরা, চড়ুই কইল – আইচ্ছা, বাজিতে যখন আইরা গেছি, তোমার শর্ত মতই অবো।

 

তুমি আমার গোসত খাবা। তয়, আমার একটা অনুরোধ আছে। হেইডা অইল – ঐ ঠোঁট দিয়া তুমি কত ময়লা পঁচা ধচা জিনিস খাও। আমার গোসত খাওনের আগে, দয়া কইরা তোমার ঐ নোংরা ঠোঁট গাংগের পানি দিয়া ধুইয়া পরিস্কার কইরা আহ।

চড়ুই এঁর অনুরোধ হুইন্যা কাউয়া বিরাট খুশী। হে এই অনুরোধ রাখতে রাজী অইয়া গাংগের পাড়ে গিয়া, গাংগেরে কইল –

গাং ভাই, গাং ভাই,

দিবা পানি, ধোব ঠোঁট,

তেসে খামু চড়ুইর গোসত।

গাং কাউয়ার কতা হুইন্যা কইল, তোর এই নোংরা ঠোঁট আমার পরিস্কার টুলটুলা পানিতে ডুবাইলে, আমার পানি নোংরা হইয়া যাব। তুই কুমারের কাছ থিগা একটা ঘটি নিয়া আয়। ঘটিতে পানি ভইরা, পাড়ে বইয়া ঠোঁট ধুইয়া নিস।

কাউয়া হেসুম উড়ান দিয়া কুমারের বাড়ি গিয়া, কুমারকে কইল-

কুমার ভাই, কুমার ভাই,

দিবা ঘটি, ভরব জল, ধোব ঠোঁট,

তেসে খামু চড়ুইর গোসত।

কুমারের কাছে বানানো ঘটি ছিল না। তাই, কাউয়ারে মাটি নিয়া আইতে কইল। হেই মাটি দিয়া হে ঘটি বানাইয়া দিব।

মাটি খোঁদার জন্যে ধারআলা কিছু না পাইয়া, মাঠে এক মোইষ দেইখা ভাবল, মোইষের শিং অইলে মাটি খুঁদতে সুবিধা অব। তাই, মোইষের কাছে গিয়া কইল –

মইষ ভাই, মইষ ভাই,

দিবা শিংগা, খুঁদমু মাটি, বানামু ঘটি,

ভরব জল, ধোব ঠোঁট,

তেসে খামু চড়ুইর গোসত।

 

মোইষ সব শুনে রাজী অইল। কিন্তু সমস্যা অইল, শিং ভাঙ্গা নিয়ে। আরেকটা মোইষের সাথে নাড়াই কইরা শিং ভাইংগা কাউয়াকে দিতে অব। তাই, হে কাউয়াকে কইল, ঘাস নিয়া আইতে। সেই ঘাস খাইয়া, তার শক্তি বাড়ব। তারপর, নাড়াই কইরা শিং ভাইংগা কাউয়ারে দিব। ঘাস কাটতে কাঁচি লাগব। তাই কাউয়া হেসুম গেল কামারের কাছে। গিয়া কইল-

কামার ভাই, কামার ভাই,

দিবা কাঁচি, কাটমু ঘাস,

খাব মইষ, করব লড়াই, পড়ব শিংগা,

খুঁদমু মাটি, বানামু ঘটি,

ভরমু জল, ধোমু ঠোঁট,

তেসে খামু চড়ুইর গোসত।

কামার কইল, আইচ্ছা। তুই এহনই গিরস্তের কাছ থিগা আগুন নিয়া আয়। আমি লোয়া পুইড়া তোরে কাঁচি বানাইয়া দিমু। কাউয়া গিরস্তের বাইত্যে উইড়া গিয়া কইল-

গিরস্ত ভাই, গিরস্ত ভাই,

দিবা আগুন, বানামু কাঁচি, কাটমু ঘাস,

খাব মইষ, করব নাড়াই, পড়ব শিংগা,

খুঁদমু মাটি, বানামু ঘটি,

ভরমু জল, ধোমু ঠোঁট,

তেসে খামু চড়ুইর গোসত।

গিরস্ত সব হুইন্যা রাজী অইল, আগুন দিতে। কিন্তুক সমস্যা দেহা দিল, আগুন নেয়া নিয়া। কাউয়া কিভাবে আগুন নিব?

অজি পরতম ঠোঁট দিয়া নিবার চেষ্টা কইরা পারল না। এরপরে কয়, পায়ে বাইন্দা দেও। বাঁন্ধার সময়, গরম লাগলে কয় , পাখে দিয়া দেও। তহন, গিরস্ত কাউয়ার পাখে আগুন বাইন্ধা দিল।

কাউয়া যেই না উড়ান দিল, হেই আগুন দপ কইরা জ্বইল্যা উইঠ্যা কাউয়ার গতরে ধইরা গেল, আর কাউয়া পুইড়া মরল।

এমমুরা এরই মইধ্যে চড়ুই তার ভাগের সব ধান খাইয়া শেষ কইরা ফালাইছে। চড়ুই হোনল যে কাউয়ার পাখে আগুন ধইরা পুইড়া মরছে। খুব ভালা অইছে। চড়ুইয়ের খুশী এহন দেখে কে। খুশিতে চড়ুই লাফাইতে নাগল। তেমবালা, চড়ুই কাউয়ারে ঠোঁট ধুইয়া আইতে কইছাল!

১৩/১/২০২১

(সহযোগিতায় সালমা আপা)
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/