খতম

খতম
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

খতম বলতে আমরা যা বুঝতাম তা হলো কোন কিছু শেষ করা। কাউকে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরা ফেলাকে বলা হত পিটিয়ে একদম খতম করে ফেলা হয়েছে। পড়া শেষ করলেও বলা হতো খতম করা। কোরআন শরীফ দেখে দেখে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একবার পড়াকে বলা হত এক খতম কোরআন শরীফ পড়া। গ্রামে যারা কোরআন শরীফ পড়তে পারতেন তারা রমজান মাসে অন্তত একবার কোরআন খতম করতেন। কোরআন শরীফে ৩০ টি পারা আছে। প্রতিদিন ভাগ করে এক পারা করে কোরআন পড়লে এক মাসে এক খতম পড়া যেতো। কেউ কেউ মাসে ২/৩ খতম দিতেন। প্রতিখতমের জন্য অনেক নেকী বা সওয়াব আছে। তাই বেশী বেশী কোরআন খতম দেওয়া হত। সেই সময় গ্রামের তেমন কেউ অর্থসহ কোরআন পড়তেন না। তাই কোরআনে আল্লাহ্‌র কি নির্দেশ ছিল তা অনেকেই জানতেন না। এমনকি আমাদের এলাকায় কোরআন পড়ানোর হুজুরও ছিলেন না। ধর্মসভা গুলিতে কোরআন শিক্ষার উপর গুরত্ব দিতে বলায় আমাদের দাদারা পারিবারিক মক্তব চালু করেন। সেইসব মক্তবে কোরআন পড়া শিখানো হতো। প্রথমে শিখানো হতো কায়দা, তারপর সিপারা, তারপর কোরআন। সিপারা পড়া শেষ হলে জুম্মাবারে মসজিদে নিয়ে সকল মুসুল্লিগণের সামনে খাজা বাতাসা বিতরণের মাধ্যমে কোরআন হাতে দেয়া হতো। যিনি কোরআন পড়াতেন তাকে বলা হতো ক্কারী। যত ছাত্র কোরআন হাতে নিতো তত ক্কারী সাহেবের ক্কদর বাড়তো। তাই জুম্মায় নিয়ে সবার সামনে কোরআন হাতে দেয়া হত। আমি ৩/৪ বছর বয়সেই কোরআন হাতে নিয়েছিলাম। আমি ও এছাক মেম্বার ভাই একই দিন সিকদার বাড়ি মসজিদে গিয়ে কোরআন শরীফ হাতে নিয়েছিলাম। বুকের উপর কোরআন শরীফ রেখে গুড়্গুড়ি হেটে যেতাম ক্ষেতের আইল দিয়ে। আশে পাশের লোকেরা অবাক হয়ে চেয়ে থাকতেন। বাড়িতে বসেও কোরআন পড়তাম। আমার দাদা ও মা বাড়িতে নিয়মিত কোরআন পড়তেন নেকির আশায়। আমি মাঝে মাঝে ঠেকে পড়লে দাদা পড়া বলে দিতেন। সেই সময় আমার নামাজ পড়া ফরজ হয় নি। নামাজ পড়তাম না। কিন্তু কোরআন পড়তাম। আমি কায়দা পড়া শুরু করেছিলাম রৌহা নানাবাড়ির মক্তবে রহিম উদ্দিন ক্কারী সাহেবের কাছে। কোরআন শরীফ হাতে নিয়েছিলাম নোয়াখালী নিবাসী কদ্দুস ক্কারী সাহেবের কাছে আমার দাদার মেঝো ভাই মেছের উদ্দিন তালুকদারের মক্তবে পড়ে। মক্তবকে আমরা ক্কারীর স্কুল বলতাম। কদ্দুস ক্কারী সাহেবের ছেলে হারুন আমার ক্লাসমেট ছিল। কিন্তু সে আমার সাথে কোরআন হাতে নিতে পারে নাই। ক্কারী সাব ফ্যামিলি নিয়ে তোয়াজ হাজী দাদার একটা ঘরে থাকতেন। তিনি ক্কারী আব্দুল করিম (চশমা ক্কারী) সাহেবের মেয়ে-জামাই ছিলেন। তিনিও নোয়াখালী নিবাসী ছিলেন। ফ্যামিলি নিয়ে জিতাশ্বরির রশিদ মেম্বার ( রশিদ হাজী) বাড়ির একটা ঘরে থাকতেন। তিনি জিতাস্বরি মক্তব পড়াতেন। পরে সেই মক্তব তার হাতেই মাদ্রাসায় রুপান্তরিত হয়ে জিতাশ্বরি রশিদিয়া দাখিল মাদ্রাসা হয়েছে। তিনি খুব জনপ্রিয় ভালো মানুষ ছিলেন। সচ্ছল জীবন যাপন করতেন। পাওয়ারের গোল চশমা পরতেন বলে চশমা ক্কারী নামে পরিচিতি পান। তিনি এবং কদ্দুস ক্কারী সাব ছোট চওনার পাশে পাইন্না বাইদে জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। চশমা ক্কারী সাহেবের ছেলেদেরকে আমি চিনতাম। দীর্ঘদিন না দেখতে দেখতে ভুলে গিয়েছিলাম। গত দুইদিন আগে তার ছেলে সাইফুল ইসলাম আমাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠান ফেইসবুকে। চিনতে পারছিলাম না । চ্যাট করে জানতে পারলাম তিনি পাইন্নাবাইদের আ: করিম ক্কারী সাহেবের ছেলে।

আমি অল্প অল্প করে কোরআন শিখতে শিখতে পড়তে পড়তে অল্প দিনেই খতম দিয়ে দেই। খতমের পর মুন্সী ডেকে মিলাদ পড়িয়ে মৃত মুরুব্বিদের নামে হুজুর বকশিয়ে দেন। এর পর সারাবছর কিছু কিছু করে কোরআন পড়ে খতম দিতাম। দাদা দাদী নানা নানী মারা যাবার পর আমার খতমগুলি তাদের নামে বকশিয়ে দেয়া হয়েছে। এখনো আমি কোরআন খতম দেই। কিন্তু সেই ভাবে না। প্রথম থেকে অর্থসহ পড়তে পড়তে অনেক দিনে শেষ করি বুঝে বুঝে পড়ে। আমি আল্লাহ্‌র বাণী ও নির্দেশগুলি জানার জন্যই মুলত পড়ি। খতম দেয়ার উদ্যেশ্যে নয়। সব নির্দেশ জানার জন্যই খতম দিতে হয়।

গ্রামে কেউ অসুস্থ হলে বা মারা গেলে কোরআন খতম দেয়া হতো। বাড়িতে পরহেজগার কেউ থাকলে নিজেই কোরআন খতম দিতেন। না থাকলে মৌলভী ও মুন্সী দাওয়াত দিতেন খতম দেয়ার জন্য। ১০ বা ১৫ জন মুন্সী বা মৌলভী একসাথে বসে প্রতিজনে ৩ পারা বা ২ পারা করে ৩০ পারার কোরআন ভাগ করে পড়ে খতম দিয়ে দিতেন । বাংলা ঘরে পাটি বিছিয়ে কাঠের রেহাল ও বালিশের উপর কোরআন রেখে এক হাটু খারা করে আরেক হাটু ভাজ করে বসে একযোগে মাথা ঝুকে ঝুকে সবাই কোরআন পড়তেন। বাড়িতে নাইয়র আসতো। ভালো ভালো রান্না হতো। বাচ্চারা খেলা করতো। উৎসবের আমেজ থাকতো বাচ্চাদের মধ্যে। আমি এমন দৃশ্যও দেখেছি যে বাড়ির কর্তার বাবা মৃত্যুসজ্যায় ঘরে ঘোংরাচ্ছে। সেই রুগীর জন্য কোরআন খতম দেয়া হচ্ছে। মৌলভীরা কোরআন পড়ে যাচ্ছেন। ছেলে নাভির নিচে লুঙ্গী পরে খালি গায়ে পেট ভাসিয়ে শুয়ে তালের পাখার বাতাস খাচ্ছেন আর পান চিবাচ্ছেন। নামাজেরও খোজ নাই তার। যেন মুন্সি ডেকে কোরআন খতম দিয়ে তিনি সকল দায় থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এবার তার বাবা মরে গেলেও কেউ আফসোস করবেন না। এখনকার দিনে এইরূপ অবস্থায় খতমের চিন্তা না করে ভ্যান ভাড়া করে অথবা মাইক্রোবাস ভাড়া করে শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখায়ে পরীক্ষা নিরিক্ষা করে রোগ ধরে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি আনেন অনেকেই। যারা পারেন না তারা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন। খতম শেষ হলে মোরগের গোস্ত দিয়ে ভাত ও পায়েস খাওয়ানো হতো মৌলভীগণকে। খতমকারী প্রতি জনকে ১০০ বা ১৫০ টাকা করে হাদিয়া দেয়া হতো ।

এরপর আমাদের এলাকায় আরেকটা খতমের খুব প্রসার লাভ করে। এই খতমে কোরআন পড়ার অভিজ্ঞতা লাগে না। শুধু নামাজ কালাম জানলেই হলো। এই খতমের নাম ছিল জালালি খতম। “লা ইলাহা, ইল্লা আন্তা সোবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জালেমিন ” এই দোয়াটি ১লাখ বার পাঠ করা হয় একটি জালালি খতমে। ১০ জনে এক সাথে বসে প্রতিজনে ১০ হাজার বার এই দোয়া পাঠ করলে ১ লাখ বার হয়। এই দোয়া পড়ার পদ্ধতিটা ছিল এই রকম। পাটি বিছিয়ে ১০ জন গোল হয়ে বসতেন। ১ হাজার তেতুলের বিচি নেয়া হতো। প্রথমজন ১ টা করে তেতুলের বিচি ধরে এই দোয়া পড়ে ডানের জনকে দিতেন। ডানের জন পড়ে তার ডানের জনকে দিতেন। এইভাবে ১০০ রাউন্ড ঘুরলে ১ লাখ হতো। অর্থাৎ এক খতম হতো। এক খতম জালালি খতম পড়ালে অনেক নেকী। তাই বাবা মা মারা যাবার সময় অনেকে জালালি খতম পড়িয়ে দিত। অনেকে তিরস্কার করে বলত “তার বাপেরে চিকিৎসা না করাইয়া খতম কইরা দিছে। ” খতমকারীরা মোরগ দিয়ে ভাত খেয়ে ১০০/১৫০ টাকা হাদিয়া নিয়ে চলে যেতেন সমস্ত সোওয়াব অসুস্থ ব্যক্তির জন্য বখশিয়ে দিয়ে। একজন দলনেতার কাছে তেতুলের বিচির থলে রাখতেন। দলনেতাকে কন্টাক্ট করতে হতো জালালি খতমের জন্য। অনেকসময় বুকিং দিয়ে রাখতে হতো। কারন, তাদের খুব চাহিদা ছিল।

নোয়াখালীর ক্কারী সাহেবদের অবদানে, মাশা আল্লাহ, আমাদের এলাকায় অনেক কোরআন শিক্ষিত লোক বেড়ে যায়। নতুন মক্তব মাদ্রাসার জন্য আর নোয়াখালীর হুজুর ধার করতে হয় না। আমরা অনেক কোরআনে হাফেজ পেয়ে যাই। নতুন নতুন হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে দেশী হাফেজদেরকে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের দ্বারা আরো নতুন নতুন হাফেজ তৈরি হয়। যে ব্যক্তি সমস্ত কোরআন মুখস্ত করে মাথায় ধারণ করেন তাকে হাফেজ বলা হয়। হাফেজ মানে হেফাজতকারী। কোন কারনে ছাপানো কোরআন নষ্ট হয়ে গেলেও এই হাফেজদের মস্তিস্কের কোরআন রয়েই যাবে। কাজেই তারা কোরআনের হাফেজ বা সংরক্ষণকারী। একজন হাফেজ সমাজের অন্যান্য মুসলিম থেকে বেশী মুল্যবান। হাফেজদের সুপারিশেও নিকট আত্বীয় নাজাত পেতে পারেন। তাই আমাদের সমাজে হাফেজদের ক্কদর বেড়ে যায়। হাফেজিয়া মাদ্রাসাগুলির বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে হাফেজদের মর্যাদা ও সবিনা খতমের গুরত্ব বর্ণণা করে ওয়াজ করা হয়। সবিনা খতম হল একজন হাফেজ এক নাগারে মাইকে মুখস্থ কোরআন পড়ে শেষ করেন। মাইকে সবিনা পড়াতে এর জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। খতমের জন্য লাগে শুধু একজন হাফেজ। খাওয়াতে হয় মাত্র একজনকে। মাইকে কোরআন পড়ায় গ্রামের সবাই জেনে যেতো কার বাড়িতে সবিনা হচ্ছে। অনেকে সন্তানের জন্মদিন বা অন্য কোন কারনে খুশী হলেও সবিনা দিয়ে দিতেন। হাফেজ সাব হাদিয়া নিয়ে সবিনা বখশিয়ে দিতেন। এই মাইকে সবিনা নিয়ে আলেমদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। কেউ কেউ যুক্তি দেন খতম দিতে হবে ধীরে ধীরে দেখে দেখে পড়ে। কেউ কেউ বলেন সবিনায় যখন কোরআন পড়া হয় মাইকে তখন অনেকেই প্রশ্রাব পায়খানায় কোরআন শুনা অবস্থায় জরুরত কাজ সমাধান করেন। এটা ঠিক না। মাইকের শব্দে অনেকের অসুবিধা হয়। এই সব যুক্তি দেখিয়ে মাইকে সবিনা পড়া বন্ধ করেন। ঘরে বসে মাইক ছাড়া সবিনা পড়াতে তেমন কেউ আর আগ্রহ দেখান না। বড় বড় উচ্চ শিক্ষিত আলেমদের প্রভাব বাড়তে থাকে গ্রাম অঞ্চলেও। কোরআন খতম বা সবিনা করে হাদিয়া দেয়া নেয়ার প্রতি অনেকেই নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। মানুষ মারা গেলে কোরআন খতম ও ফয়তার দাওয়াতও কমে গেছে। এইগুলি করার চেয়ে মসজিদ মাদ্রাসায় দান করাকে গ্রামের জনগণ প্রাধান্য দিচ্ছে। বড় বড় আলেম বক্তা এনে ওয়াজ মাহফিল করাকেই বেশী পছন্দ করছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমি গ্রামের বাড়ির বাহির বাড়িতে বসেছিলাম। চাচাত ভাই ছাদ্দাকাস জামা কাপড় গায়ে দিয়ে পশ্চিম দিক থেকে বাড়ির দিকে আসছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– ছাদ্দাকাছ কোথায় গিয়েছিলে?
– ভায়রার বাড়িতে আম্বিয়া খতমের দাওয়াত খেতে গিয়েছিলাম।
– আম্বিয়া খতম আবার কি?
– হে, আমিও জানতাম না আম্বিয়া খতম সম্পর্কে। এই বার দেখলাম।
– কি দেখলা?
– একটা ঘরে কয়েকজন মহিলা বসে আম্বিয়া খতম পড়ছিলেন। ভিতরে কোন পুরুষ মানুষ যাওয়া নিষেধ। বাইরে থেকে একটু একটু শব্দ শোনা গেল হে হুম, হে হুম। কি যে বলছিল মহিলারা, হে।
– আম্বিয়া খতম কি?
– আমিও তো জানি না। শুধু জানলাম এটা মহিলারাই পড়ে। কেউ কেউ বলে জালালি খতমের মতো। এখন গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষই বিদেশ করে। মহিলার সংখ্যাই বেশী। ভালোই, আম্বিয়া খতম পড়ে ভালোই করছে তারা, হে।

আমি আরো কয়েকজনের কাছে শুনেছি গ্রামে এখন অনেকেই মহিলাদের দিয়ে আম্বিয়া খতম পড়ান। তবে নিয়মটা কি কেউ ঠিকমত বলতে পারেন না।

আরও কত রকম খতম আছে বা আসবে কে জানে!
১/৭/২০১৯ ইং
ময়মনসিংহ