কোলকাতা ভ্রমণ

কোলকাতা ভ্রমণ
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কোলকাতা ভ্রমণ করেছি ২ বার। প্রথমবার জানুয়ারি ২০০৬ সনে এবং দ্বিতীয়বার ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সনে। প্রথমবার যখন কলকাতা ভ্রমনের ইচ্ছা করেছিলাম তার আগে সরকারি ছুটি ও ভিসা পাওয়ার জন্য ইন্টার্নেটে ভারতের কোথাও প্যাথলজিস্টদের কোন আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আছে কিনা খোজ করছিলাম। একটা কনফারেন্স পছন্দ হলো। তারিখ জানুয়ারির ২৬-২৮, ২০০৬ সন। স্থান কলকাতা। কনফারেন্সের টাইটেল “INTERNATIONAL CME 2006” সংক্ষেপে “INTCME2006″। যৌথ ভাবে আয়োজন করা হচ্ছে ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন অব প্রেক্টিসিং প্যাথলজিস্ট এবং সোসাইটি অব সার্জিকেল প্যাথলজিস্ট অব নর্থ আমেরিকা। আমি এদের ওয়েবসাইট পড়ে বিস্তারিত জেনে নিলাম। জানতে পারলাম এমন সিএমই প্রতি বছরই হয় ভারতের একেক বছর একেক শহরে। প্রথম যাচ্ছি কাজেই কলকাতা হওয়াতে বেশী আগ্রহী হলাম। সাথী সংগি খুঁজলাম। আমি তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলাম। সাবেক অধ্যক্ষ ও প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ আমিনুল হক স্যার ছিলেন আমার সিনিয়র সহকারী অধ্যাপক। আমি স্যারকে রাজি করালাম। শুরু হলো প্রস্তুতি। আমিনুল স্যার এবং আমি এই সম্মেলনে এটেন্ড করবো। রেজিস্ট্রেশন ফি যা ধার্য ছিল তা আমার জন্য একটু বেশী মনে হচ্ছিল। আমি সম্মেলন কর্তৃপক্ষকে ইমেইল করলাম ফি-টা বাংলাদেশি ডেলিগেটদের জন্য কিছু কমিয়ে দিতে। তারা ৫০% ডিসকাউন্ট করে ইমেইল করলেন। আমি আবার ধন্যবাদ জানিয়ে লিখলাম যে আমাদের স্পট রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ দেয়া হোক। তারা তাতেও রাজি হলেন। আমার আশংকা ছিল যদি সম্মেলনের আগে ছুটি ও ভিসা সংগ্রহ করতে না পারি তবে রেজিস্ট্রেশন ফি-টা বৃথা যাবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমরা ছুটি মঞ্জুর করালাম। কিন্তু ভিসা করাতে সমস্যা হলো। তারা আমাদের নামে নামে ভারত থেকে আমন্ত্রণপত্রের কপি দাবী করলেন। আমি ইমেইল করে আমন্ত্রণপত্র আনলাম। ভিসা পেলাম ২৫ তারিখে । ভিসা করতে গিয়ে গুলশানের মাহীমা টোরিজমের প্রতিনিধি দের সাথে তাদের অফিসে গিয়ে টোর পরিকল্পনা করে ফেললাম। বাসের আপ-ডাউন টিকিট করলাম ঢাকা-কোলকাতা-ঢাকা। ২৫ তারিখ রাত ১০ টায় শ্যামলি বাস ছাড়লো ঢাকা থেকে। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারত প্রবেশ করলাম। কোলকাতা মার্কুইস্ট্রিটে পৌছলাম ২৬ তারিখ সকাল ১১ টার দিকে। ঐদিনই ছিল আমাদের সম্মেলনের প্রথম দিন। সকাল ৯ টায় শুরু হয়েছিল। আমরা তাড়াতাড়ি করে এক হোটেলে উঠলাম। দ্রুত গোসল সেড়ে রেডি হয়ে রিক্সায় চলে গেলাম সম্মেলনস্থলে। গিয়ে দেখি লাঞ্চ খাওয়া চলছে। আমরা দ্রুত রেজিস্ট্রেশন স্থলে গেলাম রেজিস্ট্রেশন করতে। আমাদের ডিসকাউন্ট ডকোমেন্ট হিসাবে প্রিন্টকরা ইমেইলটি দেখালাম। ব্যাগ কাধে নিয়ে এবং খাবার কুপন হাতে নিয়ে চলে গেলাম বুফের লাইনে। ইচ্ছে মতো প্লেটে খাবার নিয়ে সরে এলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে। সবাই দাঁড়িয়ে খাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখলাম আমাদের প্রফেসর সৈয়দ মোকাররম আলী স্যার দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন। আমি কাছে গিয়ে পরিচয় দিলাম। তিনি আর কে কে এসেছেন জিজ্ঞেস করাতে আমি আমিনুল স্যারকে ডেকে স্যারের কাছে আনলাম। এর মধ্যে এসে গেলেন আমাদের প্রফেসর মনিমোহন দাদা। তিনি স্যারের সাথে কথা বললেন। জানা গেলো যে আমরা তিন ভাগে এসেছি, কিন্তু কেউ কারো খবর জানতাম না। মনিমোহন দা একটু দূরে সরে গেলে মোকাররম স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন “ঐ ছেলেটি কে যেন?” আমি মনিমোহন দার বিস্তারিত পরিচয় দিয়ে বললাম “ওনার একটা প্যাথলজি বই আছে, ফোর্থ ইয়ারের ছাত্ররা খুব পড়ে ওটা। মনিমোহনের প্যাথলজি নামে পরিচিত।”

লাঞ্চের পর বসে পড়লাম কনফারেন্স রুমে লেকচার শুনতে এবং প্রজেক্টারে স্লাইড দেখতে। চিফগেস্ট ছিলেন একারম্যান্স সার্জিকেল প্যাথলজি বইয়ের এডিটর জন রোজাই। তিনি তার প্রেজেন্টেশন শেষ করে মঞ্চ থেকে নেমে দর্শক সারিতে ঠিক আমার বাম পাশে এসে বসলেন। কি সরল মানুষ তিনি! আমার কি যে ভালো লাগছিল! ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইংল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বড় বড় প্যাথলজিস্ট এসেছিলেন সেই সম্মেলনে লেকচার দিতে ও লেকচার শুনতে। তিন দিন ভালো করে শিখলাম অনেক কিছু। শেষের দিন ক্লোজিং সেরিমনি হলো। বড় বড় প্যাথলজিস্টগণকে মেমেন্টো ও ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হলো। একসময় কানাডা থেকে আগত একজন রিসোর্স পারসনকে মঞ্চে আমন্ত্রণ করা হলো। ঘোষনা হলো “এখন অতিথিকে ফুলের তোড়া দিচ্ছেন প্রফেসর সাদেকুল ইসলাম তালুকদার।” আমি একটু বিচলিত হলাম এই ভেবে যে এদেশেও একজন আমার নামের প্যাথলজির প্রফেসর আছেন। আবার ঘোষনা হলো। কিন্তু কেউ মঞ্চের দিকে এগুলেন না। অতিথি মঞ্চে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমিনুল হক স্যার আমার পাশেই বসা ছিলেন। তিনি বললেন
-মনে হচ্ছে আপনাকেই মঞ্চে ডাকা হচ্ছে।
– আমাকে ডাকবেন কেন, ডাকলে তো মোকাররম স্যার অথবা আপনাকে ডাকবেন। এদেশেও তো সাদেকুল ইসলাম থাকতে পারে।

এই সময় ঘোষনা হলো “অনুগ্রহপুর্বক, বাংলাদেশ থেকে আগত প্রফেসর সাদেকুল ইসলাম তালুকদার মঞ্চে আসুন।” এইবার আমি উঠে মঞ্চে গেলাম। আমার হাতে একটি ফুলের তোড়া ও মেমেন্টো দেয়া হলো। আমি কানাডাবাসী অতিথির হাতে তুলে দিলাম। মনে হচ্ছিল অতিথি আমার থেকেও দেড় ফুট লম্বা। তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে বাকা হয়ে আমার হাত থেকে উপহার গ্রহণ করলেন। কিছুক্ষণ পর আমিনুল স্যারেরও ডাক পড়লো আরেক অতিথিকে উপহার তুলে দেয়ার জন্য। আমি আমিনুল স্যারকে বললাম
– আমি দুইটা কারনে ইতস্তত ছিলাম। প্রথমত তারা দেশের নাম উল্লেখ করছিল না। ত্বিতীয়ত তারা আমাকে প্রফেসর সম্ভোধন করছিল। আমি তো এসিস্টেন্ট প্রফেসর।
– তারা আপনাকে প্রফেসরই মনে করেছে। আপনিই তো সব যোগাযোগ করেছেন।
-হতে পারে।

লাঞ্চের পর দেখলাম একটা টেবিলের উপর ছড়িয়ে রাখা হয়েছে সম্মেলনের অনেক ফটো। পছন্দের ছবি অনেকেই কিনে নিচ্ছেন। আমি দেখলাম আমার সামনে সেই কানাডিয়ান অতিথি এগুচ্ছেন ছবি কেনার জন্য। তাকে ফুল দেয়া অবস্থায় আমার ছবি টেবিলে থেকতে পেলাম। আমি কিনব ভাবছিলাম। এমন সময় তিনি ছবিটা হাতে নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে মুল্য পরিশোধ করে ডান দিকে সরে পরলেন। এমন ছবি আর পেলাম না। একটাই ছিল। আমি অতিথিদের গ্রুপ ছবি কিনে নিয়ে এলাম। নিজের ছবি পেলাম না।

রাতে গ্রান্ড ডিনার হলো। কত কিছু খেলাম। কত গানই যে শুনলাম। সব কিছু আমি খাই নি। দুই একটি আমার জন্য খেতে ধর্মীয়ভাবে নিষেধ ছিল ।

সম্মেলনপর্ব শেষ করে বেড়াতে ইচ্ছা করলাম। আমরা ছুটি চেয়েছিলাম ১৫ দিনের। মঞ্জুর হয়েছিল ৭ দিনের। ৩ দিন কেটে গেলো সম্মেলনে। ১ দিন ফিরতে লাগবে। হাতে ছিল মাত্র ৩ দিন। আমরা দুইজন মাত্র ছিলাম। টোর প্লান করতে পাড়লাম না। ইচ্ছা ছিল দিল্লী আগ্রা দেখার। হিসাব করে দেখলাম ফিরে আসতে আসতে আমাদের ছুটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। সকালে একটা ট্রাভেল এজেন্ট-এর সামনে বসেছিলাম। দেখলাম রাস্তার সাপ্লাই পানির টেপ ছেড়ে এক লোক চামড়ার মশক ভরে কাঁধে করে পানি নিয়ে যাচ্ছে। মশকের ছবি আমি বইয়ে দেখেছিলাম। বাস্তবে দেখে আমি মশক চিনে ফেললাম। মশক দেখার অভিজ্ঞতা হলো। ছোটবেলা থেকেই মশক দেখার ইচ্ছে ছিল। শুনেছিলাম মহানবমী মুহম্মদ (স:) ছোটবেলা মশক কাকে করে ঘুরে ঘুরে হাজিদেরকে পানি পান করাতেন।

আমিনুল স্যার প্রস্তাব দিলেন “এত টেনশন নিয়ে দিল্লী-আগ্রা যাওয়া ঠিক হবে না। তারচেয়ে বরং আমরা কোলকাতাকেই ভালো করে দেখে যাই।” আমিও তাই মনে করলাম। একটা রোড দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম। স্যার বললেন “দেখেন, এইটা সেই রোড যে রোডের কোন এক বাড়িতে রবি ঠাকুর রাত্রিযাপন করছিলেন। সকালে ঘুম ভেংগে দেখেন এক চিলতে রোদ তার থাকার কক্ষে প্রবেশ করেছে। তিনি তখন কবিতা লিখেছিলেন “আজিকে প্রভাতে রবির কর, কেমনে পশিল প্রাণের পর…..।”

আমরা মার্কুইস্ট্রিটে একটি হোটেলে থাকতাম। ধানসিঁড়ি হোটেলে দেশী খাবার খেতাম । অত বড় এবং অত স্বাদের সরিষা ইলিশ দেশের কোন হোটেলে এখনো খাই নি। পদ্মার ইলিশ ছিল সেটা। টেক্সি নিয়ে কোলকাতার সব দর্শনীয় স্থান ঘুরে ঘুরে দেখেছি। ন্যাশনাল মিউজিয়ামে অনেক কিছু দেখেছি। দেখার মতো শিখার মতো আছে অনেক কিছু। ইংরেজ আমলের নিল চাষ করা থেকে নিল উৎপাদন পর্যন্ত সকল স্টেপ নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ডামি দিয়ে।

কিভাবে নিলকররা নিল চাষি ও নিল শ্রমিকদেরকে অত্যাচার করতো তা খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আমি সবচেয়ে ইন্টারেস্ট পেয়েছি মিসর থেকে সংগ্রহ করা মমি দেখে। মিসর না গিয়ে মিসরের মমি দেখতে পেলাম। ন্যাশনাল পার্কে গেলাম। সারাবিকেল কাটালাম। কি যে ভালো লাগছিল! দি গ্রেট বেনিয়ান ট্রি অর্থাৎ বিশ্বের বৃহত্তম বট গাছ দেখলাম। কয়েক একর জমি জুরে এর ঠেসমুল বিস্তৃত। মুল কান্ড খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আছে শুধু ডালপালা। জোড়াসাঁকোয় গেলাম রবি ঠাকুরের বাড়ি। তার জন্মস্থান। এখন মিউজিয়াম ও রবিন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ঠাকুর বাড়ির বংশধর ও পরিবারের ছবি ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখলাম মিউজিয়ামে। তার ব্যবহৃত প্রাইভেট কারটি দেখলাম। মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে হঠাৎ আমিনুল স্যার ঠাকুর বাড়ির পিছন দিকে চলে গেলেন গিয়ে ফিরে এলেন। আমি বললাম
– স্যার, আপনি বাড়ির পিছনে গেলেন কেন?
– আমি রবীন্দ্রনাথের এক লেখায় পড়েছি তার বাড়ির পেছনের ডোবায় কচুগাছ ছিলো। সেই ডোবায় বেঙ ডাকতো। দেখতে গিয়েছিলাম সেই ডোবা আছে কি না। ডোবা নেই। পিছনের জায়গাটা পাকা করা।

গড়ের মাঠ দেখলাম। বিরাট এক খোলামেলা মাঠ। আমিনুল স্যার বললেন “এই মাঠের নাম গড়ের মাঠ। রবিন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র ও বিভিন্ন রাইটারের লেখায় এই গড়ের মাঠের উল্লেখ আছে। ঠিক এই আদলের একটা মাঠ আছে দিনাজপুর। কেউ এই মাঠ এখনো নষ্ট করতে পারে নাই। এইসব বড় মাঠে আগের দিনে ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগীতা হতো। ঢাকায়ও এমন খোলামেলা মাঠ ছিল। সেখানেও ঘোড়দৌড় প্রতিযোগীতা হতো। তাই মাঠের নাম ছিল রেইস কোর্স ময়দান। এই ময়দানেই বংগবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন। এখন গাছ লাগানোয় সেই মাঠ আর খোলামেলা নেই।”

পার্কস্ট্রিট দেখলাম। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখলাম। দেখলাম হাওরা ব্রিজ। বইয়ে ও খবরে অনেকবার ট্রামের কথা পড়েছিলাম, শুনেছিলাম। এবার বাস্তবে দেখলাম ট্রাম। পাকা রাস্তার মাঝখান দিয়ে ট্রেনের মতো নির্দিষ্ট ট্রেকে চাকা ঘুরে ধীরে চলে ট্রাম । যাত্রী উঠছে, নামছে। আমরাও অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্য কিছুক্ষণ ট্রামে ভ্রমণ করলাম। ভাড়া খুবই কম। চলে বিদ্যুতে। ওদেশের ট্রেনও বিদ্যুতে চলে। লাইনের উপর দিয়ে চলে গেছে বিদ্যুতের তার। তার টাচ করে চলে ট্রেন ও ট্রাম। কিছুদুর মেট্রোরেলে ভ্রমণ করলাম অভিজ্ঞতা নেয়ার জন্য। কিছুদুর মাটির নিচ দিয়ে, কিছুদূর মাটির উপর দিয়ে চলে মেট্রোরেল।

৩০ জানুয়ারি সকালের ট্রেনে শান্তিনিকেতন যাওয়ার উদ্দেশ্যে ২৯ তারিখ টিকিট করে রাখলাম। টিকিট করার আগে এক দালালে ধরেছিল। আমিনুল স্যার সরলভাবে দালালকে বিশ্বাস করছিলেন। আমি বললাম “এই লোককে তো আমাদের চরপড়ার রুগীর দালালের মতো মনে হচ্ছে। আসেন কষ্ট করে নিজেরাই টিকিট করি।” তাই, নিজেরাই টিকিট করলাম লাইনে দাঁড়িয়ে। তাতে দালালের রেইট থেকে তিনভাগের দুইভাগ টাকা কম লাগলো।

পরেরদিন টেক্সি নিয়ে হাওরা স্টেশনে গেলাম। ট্রেন ছাড়বে খুব সম্ভব সকাল ৯টায়। মাত্র ৩০ মিনিট সময় বাকী আছে। হাওড়া গিয়ে হাবা হয়ে গেলাম। অসংখ্য প্লাটফরম। কোনটায় ট্রেন শান্তিনিকেতনের ট্রেন থাকবে কিছুই বুঝলাম না। মাইকে ঘোষনা হচ্ছে। কিন্তু মানুষের হট্টগোলে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কাউকে জিগাইলে একেকজন একেক দিকে দেখিয়ে দেন। পরে গেলাম বিভ্রান্তিতে। এক লোক হেল্প করার জন্য এগিয়ে এলেন। স্যার বললেন
-তুমি আমাদেরকে শান্তিনিকেতনের ট্রেনের প্লাটফরম চিনিয়ে দিতে পারবে?
– পারব। ১০ রুপি দেন।
স্যার ১০ রুপি দিলেন। লোকটি আমাদেরকে নিয়ে গেলেন একটি প্লাটফরমে। এইখানেই আসবে ট্রেন বলে চলে গেলেন। এদিকে ট্রেন ছাড়ার সময় হলে গেলো। ট্রেন এলো না। চিন্তিত হয়ে পড়লাম। পাশ দিয়ে এক ভদ্রলোক যাচ্ছিলেন। আমাদের ভাব দেখে জিজ্ঞেস করলেন
– আপনারা কোথায় যাবেন?
– আমরা শান্তিনিকেতন যাবো। শান্তিনিকেতনে যেতে হয় অমুক ট্রেনে। ঐ যে ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে আপনাদের।

দেখলাম দুই প্লাটফরম পড়ে একটি ট্রেন ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা দৌড়িয়ে গিয়ে ট্রেনে উঠলাম। ট্রেন ভরা যাত্রী। অর্ধেক যাত্রী বসা অর্ধেক যাত্রী দাঁড়ানো। আমাদের টিকিটে সিট নাম্বর নেই। দাড়িয়েই যেতে হবে ১৬৭ কিলোমিটার পথ। অল্পের জন্য ট্রেন ধরতে পেরেছিলাম। প্রতারক কিভাবে ১০ রুপি নিয়ে চলে গেলো বোকার মতো দাড়া করিয়ে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বসা যাত্রীদের কথাবার্তা শুনছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন কোলকাতা কেন্দ্রের নাটক দেখছিলাম বাস্তবে।

বসা এক যাত্রী আমাকে প্রশ্ন করলেন
– দাদারা বুঝি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন?
– জি, বাংলাদেশ থেকে এসেছি।
– কেমন চলছে আপনাদের বাংলাদেশ?
– ভালোই চলছে।
– পেপারে দেখেছি, হিন্দুদের উপর বেশ অত্যাচার হচ্ছে।
(আমিনুল স্যার আমার পিঠে চিমটি দিচ্ছিলিনে। বুঝলাম বাইরে এসে দেশের রাজনীতি নিয়ে আলাপ করা ঠিক না)
– পেপারে আমরাও পড়েছি। কিন্তু আমি বাস্তবে দেখি নি। তবে আমি রাজনীতি বেশী বুঝি না। শান্তিনিকেতন যাচ্ছি রবি ঠাকুরের।

এই বলে ঐস্থান ত্যাগ করলাম। অন্য জায়গায় দাঁড়ালাম। রবীন্দ্রনাথের চেহারার হুবহু এক লোক পেলাম। হাতে তার একতারা ছিল। তিনি গাইছিলেন “গ্রামছাড়া ঐ রাংগামাটির পথ, আমার মন ভুলায় রে।”

আর ডং ডং ডং, ডন ডন করে একটারা বাজাচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন রবীন্দ্রনাথ গান গাইছেন লালনের মতো করে। এরপর দেখলাম একটা ছেলে হনুমান সেজে লাফিয়ে লাফিয়ে এক সীট থেকে আরেক সীটে ছুটাছুটি করছে। আমি স্যারকে বললাম
– দেখেন, ঠিক হনুমান।
– সাবধান, হুনুমান নিয়ে কোন মন্তব্য করবেন না।

যেতে যেতে যাত্রীদের আচার ব্যবহার লক্ষ করছিলাম। চা বিক্রেতারা ফ্লাস্ক থেকে চা বিক্রি করছিলেন। একই চা চারটি পাত্রে চার রকম দামে বিক্রি করছিলেন। এক ছিপি পরিমান চা ছিল ১ রুপি, এক মাটির কাপ চা ২ রুপি, এক প্লাস্টিকের কাপে চা ৪ রুপি এবং এক প্লাস্টিকের গ্লাসের চা ছিল ৮ রুপি। আমি অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ৪টি পাত্রেই চা খেয়েছি। সবগুলি কাপই ছিল ওয়ানটাইম ইউজের জন্য। কি সুন্দর ব্যবস্থা, সামর্থ্যানুযায়ী চা খাওয়া।

দুপুরের আগেই শান্তিনিকেতনের অদুরের বোলপুর স্টেশনে নামলাম। ট্রেন চলে গেলো গন্তব্যের দিকে। রিক্সা করে শান্তিনিকেতনের দিকে চললাম। খুব সম্ভব ২ কিলোমিটার যাওয়ার পর শান্তিনিকেতন পৌঁছলাম। নেমে একটা ছোট হোটেলে খেতে গেলাম। কি দিয়ে খেয়েছিলাম মনে নেই। ওখানেও দেখলাম বিভিন্ন রকম খাওয়ার প্লেট আছে। কারো জন্য কলার পাতা, কারো জন্য গজারির পাতার বুনুনো প্লেট, কারো জন্য মাটির সানকি, কারো জন্য টিনের থালা এবং কারো জন্য মেলামাইনের প্লেট। এর ব্যাখ্যা জানতে আগ্রহ হয়েছিল কিন্তু জানতে চাই নি।

খেয়ে হাটতে হাটতে শান্তি নিকেতনের ভিতর চলে গেলাম। টিকিট করে মিউজিয়ামে প্রবেশ করলাম। এটা ছিল শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাসস্থান। খুব সম্ভব তিনটি ঘড় সেখানে। কবির ব্যবহার করা অনেক জিনিসপত্র দেখলাম। দেখলাম মুল্যবান পান্ডুলিপি। দেখলাম অনেক মুল্যবান ডকোমেন্ট। মৃদু সাউন্ডে মিউজিয়ামে রবীন্দ্র সংগীত বাজছিল। মনে হচ্ছিল যেন, আমার প্রিয় এক কবি ছিলেন। তিনি এই বাড়িতেই থাকতেন। বর্নাড্য জীবন ছিল তার। আমি যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম কল্পনার জগতে। গান বাজছিল “তখন আমায় নাই বা মনে রাখলে!” আমার চোখ থেকে এক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো রবি ঠাকুরের ঘরের মেঝেতে। “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে।”

মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে শান্তিনিকেতন ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এখানে যারা লেখাপড়া করছে তাদের কাধে একটা করে ঝোলা দেখতে পাচ্ছিলাম। ছেলেদের গায়ে ফতুয়া আর মেয়েদের পরনে সুতীর চেক শাড়ী ছিল। সবগুলিকেই কবি মনে হলো। অনেকেই বাইসাইকেল নিয়ে ঘুরাফিরা করছিলেন। গাছের নিচে অর্ধচন্দ্রাকৃতি সিমেন্ট কংক্রিটের বেঞ্চ বানানো ছিল। শিক্ষক বসার জন্য সামনে একটি চেয়ার বানানো ছিল কংক্রিটের। এখানে বসে ছবি তুললাম এনালগ ক্যামেরায়। একটা জায়গার নাম ছাতিয়ান তলা। এটা কি জন্য যেনো একটা ঐতিহাসিক নিদর্শন। এখানে আছে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। শান্তিনিকেতন জায়গার নাম। রবীঠাকুরের বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন নামের এই ৩০ বিঘা যায়গা ১৬ আনা দিয়ে কিনেছিলেন এক মালিকের কাছ থেকে। পরে রবীন্দ্রনাথকে এই জমি দিয়ে দেন তার বাবা। আমি আশ্চর্য হলাম এই ভেবে যে শান্তিনিকেতনের ভুমি ও গাছপালার ধরন ঠিক আমাদের ঢ্নডিয়া গ্রামের মতোই।

বিকেলে ট্রেন ধরার জন্য রিক্সা নিয়ে চলে এলাম বোলপুরে । বেশ কিছু আগেই স্টেশনে ফিরে এসেছিলাম। সেই স্টেশনে রবি ঠাকুরের অনেক স্মৃতিময় ডকোমেন্ট রয়েছে। মৃত্যুর আগে যে ট্রেনে করে কবি চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন সেই ট্রেনের রেপ্লিকা বানিয়ে রাখা হয়েছে রেল স্টেশনে। স্টেশনের বেঞ্চে বসে আমরা যাত্রীদের আনাগুনা লক্ষ করছিলাম। হৃদয়ে কবি কবি ভাব এসেছিল আমার। আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে আমি একজন ডাক্তার, আমি একজন শিক্ষক, আমি একজন প্রেক্টিসিং প্যাথলজিস্ট, আমি একজন বাবা এবং আমি এক জনের হাজবেন্ড। কবি হওয়ার চুরান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেলাম কল্পনায়। এমন সময় ট্রেন এসে গেলো হর্ন দিয়ে। হুরমুরি উঠে পরলাম ট্রেনে। এবারও দাঁড়িয়ে ফিরতে হলো হাওরা পর্যন্ত। রাতে লম্বা একটা ঘুম দিলাম। ৩১ তারিখ নাস্তা করে কেনাকাটার জন্য মার্কেটে গেলাম। রাতের বাসে ফিরে এলাম বাংলাদেশে বেনাপোল হয়ে। কাজেই ৩১ তারিখেই বাংলাদেশ প্রেবেশ করেছিলাম বৈধ ছুটি থাকা অবস্থায়ই।

এরপরও আরেকবার আমার কোলকাতা ভ্রমণ করা হয়েছে ২০০৯ সনের জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারি মাসে। তখন সংগে ছিল আমার স্ত্রী স্বপ্না, প্রফেসর আমিনুল হক স্যার ও ভাবী, প্রফেসর এ এফ এম সালেহ (ইকবাল) এবং প্রফেসর রুহিনী কুমার দাস। দিল্লী-আগ্রা-জয়পুর যাওয়া ও আসার দিন কোলকাতা ভ্রমণ করেছিলাম । স্বপ্নাকে কোলকাতা দেখানোর জন্য ন্যাশনাল পার্ক ভ্রমণ করেছিলাম জানুয়ারির ৩০ তারিখে। স্বপ্না সাথে থাকাতে সেবার আগের চেয়েও বেশী ভালো লেগেছিলো । পরেরদিন সকালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি পরিদর্শন করি। স্বপ্নাকে নিয়েও আগের মতো ধানসিঁড়ি রেস্তরাঁয় সরষে ইলিশ খেয়েছিলাম। স্বপ্না এখনো সেই ইলিশের স্বাদের প্রশংসা করে। পার্কে লেকের পাড়ে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। সেই ছবি স্বপনা ফেইসবুকে প্রোফাইল পিকচার হিসাবে সেট করেছে। দিল্লী থেকে কোলকাতায় ফিরে এসেছিলাম ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখে। হোটেলে সিট নিয়ে বিকেল স্বপ্নাকে নিয়ে শপিং-এ গেলাম নিউমার্কেটে । কেনাকাটা করার সময় একটা দোকানে দেখি বাংলাদেশের চিত্রজগত ও টিভি নাটকের বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা শেখর আহমেদ। আমি ডেকে উঠলাম
– আরে শেখর দা না?
– দাদা আপনি?
– আমি ডা. সাদেক। ময়মনসিংহ-এর।

আমি বিস্তারিত পরিচয় দিলাম। তিনি একটি টিভি নাটকে নায়িকাকে গৃ্হশিক্ষক হিসাবে পড়াতে গিয়ে কিভাবে স্টাইল করে হাটতে হবে তাও শিখিয়েছিলেন। সেই হাটার ভংগিটা অভিনয় করে দেখানোটা আমার খুব ভালো লেগেছিল জানিয়ে দিলাম। তিনি শুনে হো হো করে হাসলেন। আমি আরো জানালাম যে ফেরদৌসি বেগমের গান শিক্ষার আসরে বাচ্চাদের আকর্ষণ করে ধরে রাখার জন্য নেপথ্যে থেকে মন্টি নামের পুতুলের কন্ঠ দেয়াটা আমাদের খুব ভালো লাগতো।
-এখন আপনাকে টিভিতে দেখি না কেনো?
– আমি অনেকদিন হয় কোলকাতায় এসে পড়েছি। এই সিটিগোল্ডের দোকান আমার। আমি এই ব্যবসা করি আর কোলকাতার সিনেমায় অভিনয় করি। এখানে আমার ভালোই চলছে। এই কার্ড নিন। যারা কোলকাতায় আসবেন তাদের দেবেন আমি টাকা দিয়ে হেল্প না করতে পারলেও কেনাকাটা ও বিপদে আপদে হেল্প করতে পারব।

আমি স্বপ্নার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। শেখর ভাইর সাথে ছবি উঠলাম। শেখর ভাই সব ধরনের দোকানে পরিচয় করিয়ে দিলেন যে আমরা বাংলাদেশে থেকে এসেছি। ভালো ভালো জিনিস পছন্দ করতে এবং কেনাকাটায় হেল্প করলেন। শেষে শেখর ভাই থেকে বিদায় নিয়ে হাতে টানা রিক্সায় চলে এলাম হোটেলে। কোলকাতায়ই শুধু আছে এমন আজব রিক্সা। পরেরদিন ফিরে এলাম বাংলাদেশে। কার্ড দেখে শেখর ভাইর নাম্বারটা মোবাইলে সেইভ করলাম। শেখর ভাইকে ফোন দিলাম। তিনি ফোন ধরলেন
– হেলো।
– দাদা, আমি ময়মনসিংহ থেকে ডা. সাদেক বলছি।
– ডা. সাব, ভালো আছেন, ভাবী ভালো আছেন?

কিছুক্ষণ কথা হলো মোবাইলে। কোলকাতা ভ্রমণের স্মৃতি কথা অনেকসময়ই মনে পড়ে। মনে পড়ে বেনাপোল স্থল বন্দর, মার্কুইস্ট্রিট, পার্কস্ট্রিট, নিউমার্কের, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি, ধানসিঁড়ির সরষে ইলিশ,গড়ের মাঠ, মিউজিয়াম, দি গ্রেট বেনিয়ান ট্রি, ন্যাশনাল পার্ক, হাওড়া ব্রিজ, পাতাল ট্রেন, ট্রাম, বিদ্যুৎ চালিত ট্রেইন, টানা রিক্সা, বোলপুর রেলস্টেশন, শান্তিনিকেতন, বিভিন্ন কাপের চা, ইত্যাদি। কোলকাতা ভ্রমণ করে কয়েকটি বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তাহলো, হাতে টানা রিক্সা, পাতাল ট্রেইন, ট্রাম, ইলেক্ট্রিক ট্রেইন, মিসরের মমি আর ছিপি, মাটির কাপ, প্লাস্টিকের কাপ ও প্লাস্টিকের গ্লাসে একই চা সামর্থ্যানুযায়ী বিভিন্ন পরিমানে বিভিন্ন দামে বিক্রি করা। এই সব মনে করার পর মনে পড়ে শেখর ভাইকে। তাই মাঝে মাঝে ভাইকে ফোন করি। ফোন ধরে শেখর ভাই বলেন “হেলো ডাক্তার সাব, ভালো আছেন? ভাবী সাব ভালো আছেন?” আমার ভালো লাগে শেখর ভাইর সাথে কথা বলে। অনেক দিন বিলম্ব দিয়ে একবার ফোন দিয়েছিলাম। কলটা সেন্ট না হয়ে মেসেস এলো ইনভেলিড নাম্বার। বুঝতে পারছিনা সমস্যা কোথায়। আজও ফোন দিয়েছিলাম ইনভেলিড নাম্বারে। কেউ কি শেখর ভাইর ভেলিড নাম্বারটা দিতে পারবেন?

২১/৮/২০১৯ খ্রী