আমার ছাত্র ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে

আমার ছাত্র ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে
(স্মৃতিচারণ)

৯/৪/২০১৯ ও ১৬/৪/২০ ১৯ তারিখের স্মৃতিচারণ একসাথে
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৯৬ সনের মার্চ মাসে আমি আবার প্রভাষক পদে প্যাথলজি বিভাগে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ফিরে আসি। এমফিল (প্যাথলজি) পাসের রেজাল্ট হয়েছিল ১৯৯৫ সনের শেষের দিকে। পদায়ন হতে সময় লেগেছিলো। আমি এর আগেও প্যাথলজি বিভাগের প্রভাষক ছিলাম ১৯৯২ সনের জানুয়ারি থেকে ১৯৯৩ সনের জুন পর্যন্ত। ১৯৯৮ সনের মে মাসে আমি সহকারী অধ্যাপক (চঃ দাঃ) পদে যোগদান করি। ২০০৭ সনের শেষ পর্যন্ত আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজেই ছিলাম। সেই হিসাবে আমি এই মেডিকেল কলেজের এম ২৪ নাম্বার ব্যাচ থেকে এম ৪৪ নাম্বার ব্যাচ আমার ছাত্র হিসাবে পেয়েছি। ২৬ ও ২৭ নাম্বার ব্যাচের আমি ক্লাস নিতে পারি নি কারন আমি তখন পিজি কোর্সে ছিলাম আইপিজিএমআর (বিএসএমএমইউ) ঢাকায়। ৪৩ ও ৪৪ ব্যাচের ক্লাস আমি নিতে পারি নি কারন তারা তখন ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে। প্যাথলজি ক্লাস হয় তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে। আমি নিজে ছিলাম এম-১৭ নাম্বার ব্যাচের ছাত্র। আমার মেয়ে ডাঃ মার্জিয়াও ১৭ নাম্বার ব্যাচের ছাত্রী ছিল। তবে ময়মনসিংহে না দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের। যেহেতু ভুটানের ছাত্র লোটে শেরিং এম-২৮ নাম্বার ব্যাচের ছাত্র ছিলেন সেহেতু তিনি আমার সরাসরি ছাত্র। আজ তিনি ভুটানের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আমার মেডিকেল কলেজের আমারই সরাসরি একজন ছাত্র একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়াতে আমি গর্ববোধ করছি। সেই দেশেরই আমার আরেক ছাত্র এম-২৪ নাম্বার ব্যাচের ডাঃ টান্ডি দর্জি এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আরো ভালো লাগার কথা না? শুধু তাই না, খোদ বাংলাদেশেরই, এমনকি আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মুরাদ হাসান এমপি-ও এম-৩০ নাম্বার ব্যাচের সরাসরি ছাত্র। এরা শুধু আমার ছাত্রই না আমার কলেজের ছোট ভাই। গর্বে প্রাণ ভরে যায়। আমি এখন কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের টিচার । আগামী ১৪ এপ্রিল ভুটানের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এসে তার স্মৃতিমাখা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ভিজিট করবেন। সাক্ষাৎপ্রার্থির জন্য কড়াকড়ি নিয়ম। আমি অধ্যক্ষের নিকট অনুমতি নিতে গিয়েছিলাম। তিনি অনুমতি দিয়েছেন। নাম ঠিকানা ও ৫ কপি ছবি জমা দিয়েছি চেষ্টকার্ড তৈরি করার জন্য। এই ৫ কপি ছবি নাকি ৫ স্তরের সিকিরুটির নিকট চলে যাবে। কত দামী আমার ছাত্রটি!

আজ এই ছাত্রের কথা কিছু লিখতে মন চাচ্ছে । তাকে আমি পেয়েছিলাম চতুর্থ বর্ষের এমবিবিএস ছাত্র হিসাবে। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করে আমার ছাত্রদের নিয়ে বেশ কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অভিজ্ঞতা হয়েছে প্রায় ১৪ বছর। শুনেছি অন্যান্য মেডিকেল কলেজের তুলনায় এই কলেজে বিদেশী ছাত্রদের পরিমাণ একটু বেশী। তারমধ্যে নেপাল, ভুটান ও কাশ্মীরী ছাত্রই বেশী ছিল। বিদেশী ছাত্রদের মধ্যে নেপালি ছাত্রগুলি বেশী মেধাবী ছিলো। যারা মেধাবী ছিলো না তারা খুবই ডাল ছিলো। সাধারণত কাশ্মীরী ছাত্ররা মধ্যম মেধাবীর ছিলো। ভুটানেরগুলো মধ্যম ধরনের ছিল। তারা খুবই বিনয়ী ছিল। ক্লাসে চুপচাপ বসে থাকতো।

প্রথমদিকে আমি প্রভাষক ছিলাম। তাই টিউটোরিয়াল ও প্রেক্টিক্যাল ক্লাস নিতাম। লেকচার ক্লাস নিতেন সহকারী, সহযোগী ও ফুল অধ্যাপকগণ। প্রফেসর শাহ মনির হোসেন ও প্রফেসর মীর্জা হামিদুল হক স্যার প্রায়ই রাজনৈতিক মিটিং-এ ব্যস্ত থাকার কারনে আমাকে দিয়ে লেকচার ক্লাসের প্রক্সি দেওয়াতেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ছিল ছাত্র রাজনীতি ও চিকিৎসক সংগঠনের জন্য উর্বর প্রতিষ্ঠান। তাই এখান থেকে তৈরি হয়েছে বড় বড় চিকিৎসক নেতা। তারাই সারাদেশের চিকিৎসকদের সাংগঠনিক কাজ কর্ম নিয়ন্ত্রণ করছেন সবসময়। মেধাবীর দিক দিয়েও তারা এগিয়ে। বিদেশী ছাত্রদের যেহেতু ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত তাকার প্রয়োজন ছিল না সেহেতু তাদের মেডিকেলের বই পড়ার সুযোগ বেশী ছিলো। এমন একজন ছাত্র ছিলো আমাদের এই লোটে। ভুটানি ছাত্রদের মধ্যে খুব বেশী পরিচিত ছিল আমাদের এই লোটে। প্রত্যেক ছাত্ররই ক্লাসের নির্দিষ্ট একটা সীটে বসার অভ্যাস আছে। কিছু কিছু ফাঁকিবাজ ছাত্র সবসময় পিছনের সারির কর্ণারে মাথা নিচু করে বসতে চায়। এই জায়গাটা ছাত্রদের জন্য বিপদজনক । এইগুলো ভাইভা পরীক্ষায় সাধারণত ফেল করে। এগুলোকে মাঝে মাঝে আমি জোড় করে সামনে এনে বসাই। আমি লক্ষ করেছি লোটে ২ নাম্বার সাড়িতে আমার হাতের বাম বা তাদের সাড়ির ডান অংশে বসতেন। টিউটোরিয়াল ক্লাসগুলোতে সাধারণত ৩০ জন ছাত্র বসতো। ছাত্র কম থাকাতে খুব কাছে থেকেই আমি তাদেরকে দেখেছি। আমার ক্লাসে ছাত্ররা ঠিকমতো বুঝতে পারছে কিনা আমি তা তাদের মুখ, চোখ ও মাথা নাড়ানো দেখে বুঝতে পাড়ি। কেউ কেউ মাথা সামনে পিছনে নাড়ায় অর্থাৎ সে বুঝতে পারছে। কেউ কেউ ডানে বামে নাড়ায় অর্থাৎ সে বুঝতে পারে নি। কেউ কেউ মাথা আড়া আড়ি নাড়ায় অর্থাৎ সে কিছুটা বুঝছে, কিছুটা বুঝে নি। কেউ কেউ আশে পাশে বন্ধুরের সাথে ফিস ফিস করে অর্থাৎ সে আমার কথা মানতে পারছে না। চোখের চাহনি দেখেও আমি বুঝতে পাড়ি সে কেমন বুঝতে পারছে। ভুটানিদের চোখ বেশী নড়ে না। চোখ দেখে বুঝার উপায় নাই। লোটে ক্লাসে সোজা হয়ে চুপচাপ বসে থাকতেন। নড়াচড়া করতেন না। প্রশ্ন করে উত্তর পেয়ে বুঝতে পারতাম লোটে বুঝেছেন। টিউটোরিয়াল ও প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসগুলো দুপুরের পর হয়। এই সময় ছাত্ররা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ৩০-৪০ মিনিট ক্লাশ নেয়ার পর ঝিমিয়ে পড়ে। তাদের চাংগা করার জন্য আমি হাসির গল্প ছাড়ি। হাসতে হাসতে অনেকের পেটে খিল ধরে যায়। ঘুম ভেংগে যায়। আবার শুরু করি। কারো কারো হাসি পায় না সহজে। তখন গন্ডারের গল্প বলি। গন্ডারের রাখাল গতকাল আসরের ওয়াক্তের পর লাঠি দিয়ে গন্ডারের পাজরে একটা কাতুকুতু দিয়েছিলো। আজ আসরের ওয়াক্তের পর গন্ডার হাসছে। গন্ডারের চামড়া অনেক পুরু। চামড়া দিয়ে কাতুকুতু পৌছতে গন্ডারের ২৪ ঘন্টা সময় লাগতো। এতটুকু শোনার পর অবশিষ্ট ছাত্ররা মৃদু হাসতো। আমাদের লোটের হাসিটা ছিলো মৃদু হাসি। তিনি তার ঠোট সামান্য ফাক করতেন। তাতে তার সাদা দবদবে দাঁতের আগা সামান্য বের হতো। হাসলে গালে টোল পড়তো। খুব সুন্দর লাগতো আমাদের লোটেকে। ভুটানি ছাত্রছাত্রীদের সবার দাঁতই সমান ও সুন্দর। সবগুলো দেখতে প্রায় এক রকম। ওদের ব্যাচে খুব সম্ভব ৪ জন ভুটানি ছাত্রী ছিলো। মাইক্রোস্কোপে স্লাইড দেখানোর সময় একদিন ভুটানের রাজ পরিবার নিয়ে কথা বলি। ওরা বাংলায় কথা বলতেই সাচ্ছন্দ বোধ করতো। আমি শুনেছিলাম ভুটানের রাজা এক সাথে চার বোন বিয়ে করেছেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম
– তোমাদের দেশের রাজা একই সাথে একজনের কাছে সব মেয়ে বিয়ে দেয় কেনো?
– স্যার, রাজা মারা গেলে মেয়ের জামাই রাজা হলে যেনো সব মেয়েই রানী হতে পারে।

লোটেদের ব্যাচ আমার কাছে ক্লাস করেছে ১৯৯৬ সনের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত প্রায় ৯ মাস। ক্লাসে পড়া ধরলে লোটে নরমভাবে দাঁড়িয়ে উত্তর দিতেন। সামান্য ভুল করলে একটু লজ্জার হাসি হাসতেন। মানে দুই ঠোটের ফাঁক দিয়ে একটু সাদা দাঁত বের হতো এবং গালে সামান্য টোল পড়তো। তাদের প্যাথলজি প্রফেশনাল ফাইনাল পরীক্ষা হয় ১৯৯৭ এর জানুয়ারি মাসে। যেহেতু আমি প্রভাষক পদে ছিলাম সেহেতু আমি তাদের ভাইভা নিতে পারি নি। তবে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় ইনভেজিলেটর হিসাবে ছিলাম। তার রেজাল্ট কেমন হয়েছিল আমার জানা নেই। তারপর কত কত ব্যাচ বের হয়ে গেছে! লোটের খবর আর রাখি নি। গত বছর একজনের ফেইসবুক পোষ্ট থেকে জানতে পাড়ি ভুটানে লোটে পার্লামেন্ট-এ ইলেকশন করেছেন। লোটেদের দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ইলেকশনে। যেহেতু লোটে এই দলের প্রধান সেহেতু লোটেই হবেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি তাই হলেন। আমার কি যে ভালো লাগছিলো! যিনি এক সময় আমার সামনে লজ্জিতভাবে দাঁড়িয়ে পড়া বলতেন তিনিই আজ পৃথিবীর একটা দেশের প্রধান। তিনি আমি যে কলেজে পড়েছি সেই কলেজেরই ছাত্র ছিলেন। কিন্তু একটা জিনিস আমার মাথায় এখনো ধরছে না। এত শান্তশিষ্ট একটা ছেলে কিভাবে এত বড় একটা দায়িত্ব পেলেন? কার কাছ থেকে তিনি রাজনীতি শিখলেন? তবে কি তিনি ময়মনসিংহ থেকেই রাজনীতির তালিম নিয়েছিলেন আমাদের সোনার ছেলেদের থেকে? ইন্টার্নেটে তার জীবনী পড়ে দেখলাম তিনি বাংলাদেশ থেকেই সার্জারিতে পোস্টগ্রাজুয়েট এফসিপিএস পাস করে দেশে ফিরে সরকারি চাকরি করছিলেন। পরে চাকরি ইস্তফা দিয়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। তার মেধাই টেনে নিয়ে গেছে দেশের শীর্ষস্থানে।

তিনি প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার কিছুদিন পরই জানতে পারলাম তার মন্ত্রী সভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন আমারই আরেক ছাত্র টান্ডি দর্জিকে। জয় হোক আমার ছাত্রদের।

ভুটানে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা আমার আছে। যাব ইনশাল্লাহ। কয়েকদিন আগে শুনলাম লোটে আমাদের প্রাইম মিনিস্টারের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসছেন। আমার ইচ্ছা হলো দেখা করার। আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের বরাবর আমার ইচ্ছাটা ব্যক্ত করেছিলাম। প্রাক্তন টিচার হিসাবে আমার নাম তালিকাভুক্ত করেছেন। ৫টি পাসপোর্ট আকারের ছবি নিয়েছেন। নিয়েছেন বাসস্থান ও কর্মস্থলের ঠিকানা, মোবাইল ও ইমেইল। ৫ স্তরের সিকিউরিটি থেকে নাকি আমাদেরকে যাচাই বাচাই করে চেস্ট কার্ড প্রধান করা হবে। গতকাল হেলিকপ্টার এসে টহল দিয়ে গেছে। যেখানে হেলিকপ্টার নামবে তার কাছেই আমার বাসস্থান। সিকিউরিটির লোকজন আমাদের মহল্লায় বেপক খোঁজ খবর নিচ্ছেন। কলেজ ক্যাম্পাস টাইলসে টাইলসে সজ্জিত হচ্ছে। তিনি কলেজে অবস্থান করবেন মাত্র দেড় ঘন্টা। আসবেন তিনি সকাল ১১ টায়। আমাদের প্রবেশ করতে হবে ভোর সাড়ে ছয়টার আগে। এতক্ষণ বসে কাটাবো কিভাবে? বাপরে আমার ছাত্র! ভুটানের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডাঃ লোটে শেরিন। জয় হোক তার।
৯/০৪/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ- ঢাকা – ময়মনসিংহ জার্নি

 

দাঁড়িয়ে সন্মান দেখালাম ছাত্রকে
আমি বরাবরই আমার ছাত্রদের “তুমি” সম্বোধন করি। তাই লোটেকে তুমি সম্বোধন করতাম। এখন তিনি বিশ্বে একজন সন্মানিত ব্যক্তিত্ব। তাই আমিও আমার লেখায় তাকে সম্মান করে “তিনি” সম্বোধন করছি। আমি ক্লাসে প্রবেশ করলে লোটেরা দাঁড়িয়ে আমাকে সম্মান প্রদর্শন করতেন। আমি চেয়ারে বসার আগ পর্যন্ত দাঁড়িয়েই থাকতেন। ক্লাস শেষে বের হওয়ার সময়ও তারা আমাকে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতেন। যতদূর মনে পড়ে ওদের ব্যাচের তুহীন ও রূপম একটু বেশী চঞ্চল সভাবের ছিলো।  এখনো তুহীনকে আমি “এই তুহীন” বলে ডাকি। রতনকে “এই রতন” বলে ডাকি। কিন্তু লোটেকে আর “এই লোটে” বলে ডাকতে পারব না। তার নামের আগে “ইউর এক্সিলেন্সি” বলতে হবে।

লোটের সাথে দেখার কি নিয়ম কানুন তা জানতে আমি মেডিকেল কলেজে গেলাম। অধ্যক্ষ সারের পিএ বললেন যে এব্যাপারে অধক্ষের অনুমতি লাগবে। অধ্যক্ষ এম-১৬ ব্যাচের প্রফেসর আনোয়ার হোসেন স্যার সেই সময় কনফারেন্স রুমে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর আগমের প্রোটকল ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত মিটিং করছিলেন ভুটানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, জেলাপ্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তাগনকে নিয়ে। আমি অধক্ষের খালি রুমে বসলাম। এক মগ কফি দেয়া হলো। পান করলাম আর দেয়ালে ঝুলানো প্রাক্তন অধ্যক্ষগণের ছবি দেখলাম। মোবাইল বের করে স্যারদের চবির একটা ভিডিও ক্লিপও নিলাম। মিটিং শেষে স্যার এলেন। আমি জানালাম
– স্যার, আমি লোটে শেরিং-এর সরাসরি শিক্ষক ছিলাম। আমার ইচ্ছে হয়েছে আপনাদের সাথে থাকতে। আমি কি সেই অনুষ্ঠানে থাকতে পারবো?
– অবশ্যই। তবে আগে থেকেই লিস্টেড থাকতে হবে। তুমি একটু ভাইচ প্রিন্সিপ্যালকে আমার কথা বলে নাম লেখাও।

ভাইস প্রিন্সিপালও এম-১৬ ব্যাচের, প্রফেসর ডাঃ আবুল হোসেন স্যার। আমি আমার কথা জানালে তিনি বললেন
– ১২০ জনের নাম লিস্ট হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে আরও ২০ জনের নাম নিবো। তুমি নাম ঠিকানা ও ৫ টি ছবি জমা দাও। আমি নাম ঠিকানা ও ৫ টি ছবি জমা দিলাম ডাঃ খোর্শেদ আলম শিবলুর কাছে। তাকে এই কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। পরেরদিন ৯ তারিখ লোটেকে নিয়ে একটা স্মৃতিচারণ লিখে ফেইসবুকে পোস্ট দিলাম। শীরোনাম দিলাম “ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং যখন ছাত্র ছিলেন।” অনলাইন পত্রিকা মেডিভয়েস সেই লেখাটি “ছাত্র হিসাবে কেমন ছিলেন ভুটানের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং” শিরোনামে প্রকাশ করলো। পরেরদিন এর একটি ইংলিশ ভার্সন পোস্ট করলাম ফেইসবুকে। শিরোনাম দেয়া হলো “How Good was Prime Minister Lotay Tshering as a Student”।

১৩ তারিখ বিকেলে ডাঃ শিবলুর কাছ থেকে পরিচয়পত্র ও সিকিউরিটি পাস সংগ্রহ করলাম। জানতে পেলাম সকাল ৯ টার মধ্যেই অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করতে হবে। মোবাইল সাথে নেয়া যাবে। আইডি কার্ডে লিখা ছিল “এমএমসি শিক্ষক”। ১৪ তারিখ সকাল ৮ টা ৩০ মিনিটে আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে সিকিউরিটি পাস বুক পকেটে নিলাম। মানিব্যাগে কিছু টাকা ও ভিজিটিং কার্ড নিলাম। পেন্টের পকেটে চাবি রাখলাম। দুইটি চাবি আমার কাছে সবসময় থাকে। একটি বাসার গেটের আরেকটি ল্যাবের ড্রয়ারের। বুক পকেটে একটা চিরুনি ও কলম নিলাম। আমার চুল সবসময়ই সামনের দিকে এসে যায়। তাই, আমাকে ঘনঘন চুল আচরাতে হয় । অনেকের কাছেই আমার এই বদ অভ্যাসটি ধরা পড়েছে। তবে রেস্টুরেন্ট-এ গিয়ে কিন্তু আমি চুল আচরাই না। এক্সিডেন্টালি যদি একটি চুল উড়ে গিয়ে কারো খাবারের উপর পড়ে। তুলকালাম বেঁধে যাবে রেস্টুরেন্ট-এ।

 

বাসা থেকে কলেজ পর্যন্ত রিক্সাভাড়া ১৫ টাকা। ২০ টাকার নোট দিলাম। ৫ টাকার কয়েন ফেরৎ পেলাম। পেন্টের সামনের ডান পকেটে কয়েনটি রেখে দিলাম। গেটে দাঁড়িয়ে ডানে বামে তাকালাম। আমার হাতের ডান দিকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সুন্দর বিরাট ছবি সাঁটানো আছে গেটের এক উইং-এ। অন্য উইং-এ সাঁটানো আছে কিংডম অব ভুটানের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডাঃ লোটে শেরিং-এর সুন্দর ছবি। ছবির দিকে তাকালাম। যেনো আমাকে দেখে তিনি খুব খুশী। সামনের দাঁতের আগা সামান্য বের হয়েছে। যেন বলতে চাচ্ছেন “কেমন আছেন, স্যার?” লোটে আমাদের সাথে বাংলায় কথা বলতেন।

প্রবেশ করলাম আমার স্মৃতিমাখা ক্যাম্পাসে। এই ক্যাম্পাসে এমবিবিএস ছাত্র কালীন ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত ৫ বছর, ইন-সার্ভিস-ট্রেইনি হিসাবে ১ বছর ও শিক্ষক হিসাবে ১৪ বছরের স্মৃতিমাখা পদচারণা আমার। প্রবেশ পথের হাতের ডান পাশে অডিটোরিয়াম। এই অডিটোরিয়ামটি ২০০৭ সনের দিকে নির্মিত হয়েছে। এটি বুঝে নেয়ার জন্য তদানিন্তন অধ্যক্ষ স্যার আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমি আমার সহকর্মী ও সহকারীদের নিয়ে এই অডিটোরিয়াম সরেজমিনে দেখে ওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী বুঝে নিয়ে অধ্যক্ষের নিকট হস্তান্তর করেছিলাম। এর আগ পর্যন্ত এই জায়গা খালী ছিল। আমরা ছাত্রকালে এখানে খেলতাম। আমার ছাত্ররাও এখানে খেলাধুলা করতো। যতবার কলেজে বড় বড় মন্ত্রী এসেছেন ততবারই এখানে একটি অডিটোরিয়াম নির্মানের জন্য দাবী করা হয়েছে এবং নির্মানের জন্য প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে । অবশেষে সেই অডিটোরিয়াম নির্মিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের লোটে দেখে যেতে পারেন নি।

আমি ডানদিকে এগুলাম। সিকিউরিটি ডোর দিয়ে প্রবেশ করতে হলো। সিকিউরিটি পাস কার্ড দেখাতে হলো। আরেকবার আরেকটা ডোর পার হতে হলো। প্রত্যেকবার আমার পাস কার্ড দেখানো হলো। মোবাইল ফোন হাতে রেখেছিলাম। প্রত্যেকবার আমার পেন্টের চোরা পকেটে টিপ দিয়ে জিজ্ঞেস করার আগেই বলে দিলাম বাসার চাবি। সাইড পকেটে টিপ দিয়ে জিজ্ঞেস করার আগেই উত্তর দিলাম ৫ টাকার কয়েন। অডিটোরিয়ামের সামনে সাঁটানো বাংলাদেশ ও ভুটানের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীগণের সামনে দাঁড়িয়ে সেল্ফি ছবি তুললাম। কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্র বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আমার সাথে কুশল বিনিময় করলো। তাদের অবস্থান জেনে আমি খুশী হলাম। আমার অবস্থান জেনে তারা মনখুন্ন হলো। ওদের দেখে আমি আমার অতীতের মধুরতম দিনগুলির কথা মনে করলাম। ধীরগতিতে লাউঞ্জে প্রবেশ করলাম। আগের মতো আরও ২ বার চেক করা হলো। এবার বলা হলো “স্যার, ঐদিক দিয়ে প্রবেশ করতে হবে।” আমি পূর্ব দিক দিয়ে প্রবেশ করতে গেলাম। সেখানে আবার চেক করা হলো আগের মতোই। তবে এবার দেখলাম যার একের অধিক কলম আছে একটি নিতে দিয়ে আর সবগুলি রেখে দেয়া হচ্ছে। আমার পকেটে মাত্র একটা কলম ছিলো। আমার কলম নিয়ে সমস্যা হলো না। আমার পকেট চিরুনিটা রেখে দিলো কাঁচের জানালার কাছে। ভিতরে গিয়ে মাঝ বরাবর ৪র্থ সারিতে বসলাম। আয়োজকরা অনুরোধ করলেন সামনের দুই সারি অতিথিদের জন্য খালি রাখতে। আমার সামনের সারিতে আগে থেকেই কয়েকজন বসেছিলেন। আমার ডান পাশে এসে বসলো হেমাটোলজিস্ট ডাঃ হাবিবুর রহমান তারেক। তারেক এম-২৪ ব্যাচের ছাত্র ছিলো। আমি বললাম
– তারেক, আমি তোমাদের ২৪ নাম্বার ব্যাচ থেকে পড়ানো শুরু করেছিলাম। সেই হিসাবে তোমাদের ব্যাচ আমার প্রথম ছাত্র। সেই হিসাবে ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাঃ টান্ডি দর্জিও আমার ছাত্র।
– আপনি আমাদের অল্পদিন ক্লাস নিয়েছেন। আমরা তখন ৪র্থ বর্ষে পড়তাম। আপনি থার্ড ইয়ারের ক্লাস বেশী নিয়েছেন। ভুটানের আমাদের আরেক ব্যাচমেট ডাঃ ফোর্ব দর্জিও সেখানের স্বাস্থ্য উপদেস্টা ও পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিকেল ফ্যাকাল্টির ডীন।
– এতো দেখছি আরেক গর্বের বিষয়!
– স্যার, ওখানে আপনার ছাত্র আরও আছে যারা স্বাস্থ্য বিভাগের বড় বড় পোস্টে আছে।

পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখি প্রফেসর ডাঃ পিযুস দা বসেছেন। দাদাকে আমার খুশির কথাটা বললাম। দাদা বললেন
– আপনি এম- ১৭ নাম্বার ব্যাচ। ২৪ নাম্বার ব্যাচ আপনার ছাত্র এটা কেউ বিশ্বাস করবে?
-এই যে দেখুন। তারেক আমার ছাত্র। ও তো ২৪ নাম্বার ব্যাচের। এখন বিশ্বাস করেন। আমি বিশ্বাস করলাম, কিন্তু অন্যরা বিশ্বাস করবে না।

 

সকাল ৯ টার মধ্যে অডিটোরিয়াম ভরে গেলো প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষক, ডাক্তার ও ছাত্রছাত্রী দিয়ে। গ্রাউন্ড ফ্লোর ভরে উপরের বেলকনিও ভরে গেলো। অনুষ্ঠান ঘোষক প্রফেসর ডাঃ শ্যামল (এম- ১৮) বার বার ঘোষণা দিলো “… ভুটানের প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে আগমন ও প্রস্থানের সময় অনুগ্রহ পুর্বক আপনারা দাঁড়িয়ে সন্মান প্রদর্শন করবেন।” যে লোটে আমি ক্লাসে আগমন ও প্রস্থানের সময় দাঁড়িয়ে আমাকে সন্মান জানাতেন সেই লোটের এখন এমন সন্মান যে তারই শিক্ষক তার আগমন ও প্রস্থানে দাঁড়িয়ে সন্মান জানাবেন। এ এক অন্যরকম অনুভুতি। এমন সন্মানিত ছাত্র আরও চাই। দাঁড়িয়ে সন্মান জানিয়ে ধন্য হবো। আগন্তুকদের কিছু ছবি তুলে নিলাম। ঘোষনায় আরও জানতে পারলাম মাননীয় মন্ত্রী এখান থেকে যাবেন ১ নাম্বার গ্যালারিতে। সেখানে এম-২৮ ব্যাচের বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ কাটাবেন। তারপর এনাটমি বিভাগ ও সার্জারি বিভাগের ৬ নাম্বার ওয়ার্ড পরিদর্শন করবেন।

অবশেষে বহুল প্রতিক্ষিত অতিথিগন মঞ্চে আগমন করলেন সকাল এগারোটায়। এতদিন আমার ধারনা ছিলো আমাদের লোটে মন্ত্রী হবার পর অনেক বড় সড় হয়ে গেছেন। কিন্তু না। তিনি আগের মতই আছেন। সেই লোটেই। সেই টান্ডিই। তারা ছাত্রদের মতোই লাজুক পদক্ষেপে মঞ্চে হেটে হাত নাড়িয়ে চেয়ারের সামনে দাঁড়ালেন। মৃদু হাসলেন। সেই হাসি। আমিও অন্যদের মতো দাঁড়িয়ে মন্ত্রী মহোদয়গণকে সন্মান প্রদর্শন করলাম। হাত নাড়লেন। করতালি দিয়ে তাকে সাদর সম্ভাষণ জানালাম আমরা। মঞ্চে ৭ টা আসন ছিলো। তিনি বসলেন মাঝের আসনে। তার বামে তার স্ত্রী, তার বামে পররাস্ট্রমন্ত্রী, সর্ব বামে তাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রী বসলেন। প্রধানমন্ত্রীর ডানে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের বর্তমান প্রিন্সিপাল এম-১৬ ব্যাচের প্রফেসর আনোয়ার হোসেন। তার ডানে আমাদের মাননীয় দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ডাঃ এনামুর রহমান এবং সর্বডানে স্বাস্থ্য সচিব জনাব জিএম সালেহ উদ্দিন বসলেন। পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলো থেকে পাঠ করে অনুষ্ঠান শুরু হলো। অধ্যক্ষ মহোদয় স্বাগত ভাষণ দিলেন। লোটের জীবনীর উপর নির্মিত একটি প্রামাণ্য ভিডিও দেখানো হলো। সেই সময়ের কয়েকজন শিক্ষকের নামসহ ছবি দেখানো হলো। আমাকেও দেখানো হলো। আমি আবারও গর্বিত হলাম। বক্তব্যের পালা শুরু হলো। তিনি বক্তব্য শুনছিলেন। মাঝে মাঝে ঠোট নেড়ে কি যেনো বলছিলেন। আমি মনে করে নিলাম ধর্মীয় কোন বাণী পাঠ করছিলেন। আমি তাকে নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। তিনি চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দর্শকদের সবাইকে একটু দেখে নিলেন। উপরের বেলকনির দর্শকদের দিকে চোখ দিলেন। আমিও ঘার বেকিয়ে একটু দেখে নিলাম। মনে পড়লো ২০০৭ সনের কথা। আমি এই অডিটরিয়ামটি নির্মান শেষ হবার পর পি ডাব্লিউ ডি থেকে বুঝে নিয়েছিলাম প্রিন্সিপাল স্যারের নির্দেশে। সব ফিটিংসগুলো একটা একটা করে ওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী বুঝে নিয়েছিলাম। সীট সংখ্যা ছিলো ১৩০০ টি। লোটে তার ঠিক মাথার উপর দিকে তাকালেন। আমি বুঝতে পারলাম মঞ্চ বরাবর উপরের দিকে সুউচ্চ সিলিং পর্যন্ত যে ক্যাটওয়াক আছে তাই তিনি দেখছেন। ওয়ার্ক অর্ডারে লিখা ছিলো ক্যাটওয়াক। আমি ক্যাটওয়াক কি তা জানতাম না। রাতে ইন্টার্নেট থেকে পড়ে ও ছবি দেখে চিনে নিয়েছিলাম। মঞ্চের স্ক্রিন, লাইট ও সাউন্ড সিস্টেম লাগানো ও খোলার জন্য আকাবাকা মই বিড়ালের (ক্যাট) মত বেয়ে বেয়ে উপর দিকে উঠতে হয়। তাই, তার নাম ক্যাটওয়াক। মনে হলো লোটে ক্যাটওয়াক দেখছেন। এরপর তিনি ডান পাশে বসা প্রিন্সিপাল আনোয়ার হোসেন স্যারের সাথে কি যেন বললেন। এরপর বাম দিকে ঘুরে তার স্ত্রীর সাথে কি যেন বললেন। আমি মনে করে নিলাম যে তিনি তার সময় যে এই অডিটোরিয়াম ছিল না তাই তিনি বললেন। সবার বক্তৃতার শেষে তিনি ডায়াসে এলেন সেই প্রতিক্ষিত বক্তৃতা দিতে। অল্পক্ষণ ইংলিশে বলে বাংলায় বলা শুরু করলেন। আমি আগেই ধারনা করে রেখেছিলাম তিনি বাংলায় বলবেন। কারন, তিনি ছাত্র অবস্থায় ইংরেজির চেয়ে বাংলায় কথা বলতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তিনি ছাত্রদের উদ্যেশ্যে বললেন যে ভালো ডাক্তার হতে হলে ভালো মানুষ হতে হবে। ভালো চিকিৎসা দিতে হলে রুগীর হিস্ট্রি ভালো ভাবে নিতে হবে। তার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেন।

বাংলায় তিনি যা বললেন তার সারকথা হলো তিনি যখন এখানে এমবিবিএস ৪র্থ বর্ষে পড়েন তখন তার সারারাত পেটে তীব্র ব্যাথা হয়েছিলো। তিনি সকালে হাসপাতাল আউট ডোরে এটেন্ড করলে মেডিকেল অফিসার তার পেটের ব্যাথার কথা শুনেই ওমেপ্রাজল ট্যাবলেট লিখে দেন। আর কোন হিস্ট্রি নেন না এবং শরীর পরীক্ষাও করেন না। আসলে আমরা হাসপাতাল আউট ডোরে ভিরের সময় তাই করি কমন গ্যাস্ট্রিক রোগ মনে করে এন্টাসিড দিয়ে দেই। আরো কত কি রোগ হতে পারে তা চিন্তা করার সময় পাই না। আমিও অনেক সময় ছাত্রাবস্থায়য় আউট ডোরে গিয়ে পেট ব্যথার কথা বলে এন্টাসিড এনে গরীব আত্বীয়ের পেট ব্যাথায় দিয়েছি। লোটের বেলায়ও তাই হয়েছে। পরেরদিন লোটের পেট ব্যাথা আরো তীব্র হলে আবারো হাসপাতালে এটেন্ড করে। এবার আর পি সাহেব গ্যাস্ট্রিক ডিজিজ মনে করে তাকে হাসপাতালের ছাত্র কেবিনে ভর্তি দিয়ে দেন। হাসপাতালে তাকে মেডিসিনের ডাক্তারগণও তেমন ইনভেস্টিগেশন না করে আগের মতোই চিকিৎসা দিতে থাকেন। অসুস্থতা বেড়েই চলে। এমন সময় রাউন্ড দিয়ে ফিরার সময় সার্জারির প্রফেসর ডাঃ খাদেমুল ইসলাম স্যার তাকে দেখে পরীক্ষা করে বলেন “তোমার এপেন্ডিসাইটিস হয়েছে। তাড়াতাড়ি অপারেশন না করলে এপেন্ডিক্স ফেটে যাবে। এখনই অপারেশন করতে হবে। আমার উপর ভরসা করতে পারো, আমি এমন কেইস হাজারোটা করেছি।” শুনে লোটে বুঝতে পারেন যে তার এপেন্ডিসাইটিসই হয়েছে। তিনি তো ফোর্থ ইয়ারের ছাত্র। তিনি ভালো ভাবেই জানেন এপেন্ডিসাইটিস কি এবং অপারেশন না করলে কি ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। খাদেম স্যার আরো আশ্বাস দিলেন “তোমার বাবা মা অনেক দূরে থাকলে কি হবে আমরা তো আছি। আমিই তোমার অভিভাবক। ভয় পেয়ো না।” শুনে লোটে আশ্বস্ত হয়ে রাজী হয়ে গেলেন। রাতে অপারেশন হয়ে গেলো। পাওয়া গেলো গ্যাংরিনাস এপেন্ডিক্স। মানে এপেন্ডিক্স পঁচে গেছে। আর একটু পরেই ফেটে যেতো। সেই থেকে খাদেম স্যার লোটের কাছে গডের মতো। খাদেম স্যার তার বাংলাদেশের অভিভাবক। তার কাছে হাতে কলমে সার্জারি ট্রেইনিং নিয়েছেন। তার সাথে চলে গিয়েছেন ঢাকায়। ভর্তি হয়েছেন সার্জারিতে এফসিপিপিএস কোর্সে। পাশ করে দেশে ফিরে সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেছেন বিশেষজ্ঞ সার্জন হিসাবে।

 

তিনি আরেকটি মজার ঘটনা উল্লেখ করলেন। একদিন তার জুনিয়র সার্জন হাসপাতালে এক ভিআইপি রোগীর জন্য লোটেকে কল দিলেন। রোগী ছিলো নতুন পাশ করা এক মেয়ে চিকিৎসকের চাচা। তাই তিনি জুনিয়র সার্জনের কাছে ভিআইপি। লোটে মেয়ে চিকিৎসককে আশ্বস্ত করে চাচার এপেন্ডিসেক্টমি করলেন। সেই সুবাদে মেয়ে চিকিৎসকের সাথে লোটের জানাশুনা হলো এবং পরে বিয়ে। তিনি মঞ্চের দিকে তার স্ত্রীর দিকে ইংগিত করে বললেন “এই সেই মেয়েটি যার চাচার এপেন্ডিক্স অপারেশন করতে গিয়ে আমার জীবনসংগী হয়েছে।” দর্শক এক যোগে হাততালি দিয়ে হেসে ফেললো। লোটের স্ত্রী হয়ত বাংলা ভালো বুঝতে পারে নি। পাশের সীটের ডাঃ টান্ডির সাথে বুঝে নিয়ে লোটের দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসি দিলেন। লোটের স্ত্রী একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। লোটে আরো বললেন “কাজেই এপেন্ডিসাইটিস আমার জীবনে দুইটি কারনে গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো খাদেমুল ইসলাম স্যারের মতো একজন গড পেয়েছি। আরেকটি হলো সামাজিক, মানে আমার এই স্ত্রীকে পেয়েছি।” সবাই আরেকবার হাসলো।

এরপর লোটে কিভাবে রাজনীতিতে এলেন তা নিয়ে কিছু কথা বললেন। তিনি বললেন যে ১৯৯১ এর শেষের দিকে তিনি বাংলাদেশে আসেন পড়তে। প্রথম দিকে তিনি বাহিরে মাসকান্দায় এক বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। ১৯৯২ সনে তিনি বাঘমারায় মেডিকেল হোস্টেলের মেইন বিল্ডিং-এর ২০ নাম্বার রুমে ওঠেন। সেখানে আগে থেকেই তার চার বছরের সিনিয়র আরেক ভুটানি ভাই থাকতেন যিনি এখন তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঞ্চে বসা ডাঃ টান্ডি দর্জি। তারা দুইজনে ১৯৯২ সনেই স্থির করেন দেশে গিয়ে তারা রাজনীতি করবেন। এবং তাদের রাজনীতির মুলনীতিগুলো এখানে বসেই স্থির করেন। আমি শুনে আশ্চর্য হলাম এই ভেবে যে তিনি আসার আগে ৯ তারিখে স্মৃতিচারণ গল্পে আমি এটাই সন্দেহ করেছিলাম যে আমার মনে হয় লোটে বাংলাদেশ থেকেই রাজনীতি করার পরিকল্পনা করে ফেলে আমার দেশের সোনার ছেলেদের দেখাদেখি। তিনি বলেন যে তারা দেশে গিয়ে ভালো সার্ভিস দিতে থাকেন। সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে সারাদেশে প্রচুর স্বাস্থ্য সার্ভিস দিতে থাকেন এবং জনগণকে বুঝাতে থাকেন শক্তিশালী জাতি পেতে হলে জনগণের স্বাস্থ্য ভালো থাকতে হবে। জনগণের স্বাস্থের দিকে সরকারের বেশিগুরুত্ব দিতে হবে। তারা ২০১২ সনেই একটি নতুন পার্টি গঠন করে ২০১৩ সনেই জাতীয় ইলেকশনে করে হেরে যায়। তাতে অসুবিধা নাই। ভালো কাজ করলে জনগণ একদিন চাবেই। তাদের দলের বেশীভাগই নেতা ডাক্তার এবং বেশীভাগই বাংলাদেশ থেকে পাশ করা। ২০১৮ সনে দ্বিতীয় বার ইলেকশন করে তাদের দল জিতে গিয়ে সরকার গঠন করে। তিনি বলেন “এই যে মঞ্চে বসে আছেন, আমার সিনিয়র ভাই, এম-২৪ নাম্বার ব্যাচের, তিনি আমার রাজনীতির গুরু। তিনিই আমাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন। তারসাথে আমার মাঝে মাঝে মতের গড়মিল হলেও আমরা সব সময় একত্রে আছি। মতে অমিল হতেই পারে। কোন অসুবিধা নাই। তিনি হয়তো বললেন হোয়াইট। আমি বললাম অফ হোয়াইট। কোন অসুবিধা নাই।”  শুনে আমি আবারো আশ্চর্য হলাম। আমি লোটেদের ক্লাশে টিউবারকিউলোসিস উপড়ানোর সময় বলতাম “যেখানে টিউবারকিউলোসিস হয় সেখানে ক্যাজিএশন নেক্রোসিস হয়। এই নেক্রোসিস খালি চোখে দেখতে হোয়াইটিস। তুমি অফ হোয়াইট বললেও কোন অসুবিধা নাই। অফ হোয়াইট বুঝলাতো? অফ হোয়াইট হলো ফোর্থ ইয়ারের এপ্রোনের কালারের মতো। ফার্স্ট ইয়ারের এপ্রোনের কালার হলো হোয়াইট। এই এপ্রোন পুরাতন হয়ে অফ হোয়াইট হয়ে যায়।”

তিনি বলেন যে এমবিবিএস পড়া ও ইন্টার্ন করার জন্য তাকে প্রায় ৭ বছর ময়মনসিংহ এবং এফসিপিএস পড়ার জন্য ঢাকায় ৩ বছর মিলে প্রায় ১০ বছর বাংলাদেশে থাকা হয়েছে। বাংলাদেশ তার সেকেন্ড হোম। আবার তিনি আসবেন। বাংলাদেশ থেকে ডাক্তার ও নার্স নেয়ার ইচ্ছা তার আছে। ভুটান থেকে যেনো আরো বেশী বেশী ছাত্র বাংলাদেশে পড়তে পারে সেজন্য তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করেছেন। এবং তিনি রাজিও হয়েছেন।

 

প্রধানমন্ত্রী ডাঃ লোটে শেরিং আরো অনেক কথা বললেন যেগুলো শ্রোতাদের মুগ্ধ করলো। বক্তৃতা শেষে তিনি চলে যাওয়ার সময় আমরা সবাই দাঁড়িয়ে সন্মান প্রদর্শন করলাম। তিনি যাওয়ার সময় ডায়াসে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আবার বললেন “আমি আমার সাথে আসা সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।” এই বলে সাথে আসা সবাইকে মঞ্চে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এদের অনেককেই চেনাচেনা মনে হলো কারন অনেকেই এই কলেজেরই ছাত্র ছিলেন। লোটে চলে গেলেন এক নাম্বার গ্যালারিতে। সেখানে তার এম-২৮ নাম্বার ব্যাচের বন্ধুরা অপেক্ষা করছে তাকে নিয়ে মজা করতে।

 

এবার আমাদের বেরুবার পালা। লাইন ধরে বেরুলাম। দেখলাম আমার সেই পকেট চিরুনিটি জানালার কাছেই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। চিরুনিটার জন্য মায়া হলো। অনেকদিন ব্যবহার করেছি তো! অনেকদিন তাকে বুক পকেটে রেখেছি। আসতে করে কাছে গেলাম। কেউ যাতে দেখতে না পারে। চট করে চিরুনিটি পকেটে নিয়ে নিলাম। সামনে এগুলাম। ভোলান্টিয়ারগণ সবাইকে এক প্যাকেট খাবার ও এক বোতল পানি দিয়ে দিচ্ছিলেন। আমি নেব না ভাবছিলাম। কিন্তু নেবনা কেনো। প্রাইম মিনিস্টারের আগমন উপলক্ষে দেয়া খাবার। নিয়ে নিলাম। গরম খাবার। হাতে গরম অনুভূত হলো। বাম হাতে খাবারের প্লাস্টিক প্যাকেট আর ডান হাতে বোতল নিয়ে রাস্তায় বের হলাম। চরপাড়া-মাস্কান্দা প্রশস্ত রাস্তা ফাকা। যান বাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। আই ল্যান্ডে রংগিন পতাকা দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। দুইদেশের প্রধানমন্ত্রীর বড় বড় ছবি টাংগানো পিলারে পিলারে। রাস্তার দুই ধারে পুলিশ দাঁড়ানো। আমি মাসকান্দার দিকে হাটলাম। আমার হাতে খাবার ও পানি দেখে এক পুলিশ বুঝতে পেলেন আমি মিটিং-এ গিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করলেন
– মিটিং শেষ হয়েছে?
– একটা শেষ হয়েছে। আরেকটা শেষ হতে আরো ৩০-৪০ মিনিট লাগতে পারে।

 

সেদিন ছিলো পহেলা বৈশাখ। রিক্সা না পেয়ে কয়েকজন তরুণ – তরুণী বৈশাখী সাজে হেটে আসছিলো। তারা বলছিলো “প্রধানমন্ত্রী এসে আমাদেরকে কষ্ট দিচ্ছেন।” হেটে হেটে আমি বাসায় পৌছলাম। আমার ছোট মেয়ে ডাঃ মার্জিয়ার হাতে খাবার প্যাকেটটা দিয়ে বললাম “মামণি, গরম আছে, খেয়ে ফেলো, আমি খাব না। বাইরের খাবার আমি এখন খেতে পারি না।” লিভিং রুমে বসে আমার স্ত্রী স্বপ্না টেলিভিশন দেখছিলো। বললো
– তোমাকে দেখলাম টিভিতে।
– কোন চ্যানেলে?
– ডিবিসিতে।
– ডিবিসি চ্যালেল দাওতো, আবার দেখায় কিনা।

 

ডিবিসি চ্যানেল দিলে খবর দেখানো হলো। আমি মোবাইল ক্যামেরা অন করে প্রস্তুতি নিলাম ভিডিও করতে। লোটের সংবাদ শুরু হতেই মোবাইল বাটনে ক্লিক করলাম। আমাকে দেখা গেলো চতুর্থ সারিতে। ভিডিও ক্লিপটি সেইভ করলাম। বেডরুমে শুয়ে শুয়ে এই ভিডিও ক্লিপ ও মিটিং-এ রেকর্ড করা ভিডিও ক্লিপটি ছবিসহ ফেইসবুকে শেয়ার করলাম। বন্ধুরা পেয়ে লাইক, কমেন্ট করলেন। জানতে চাইলেন কথা হয়েছে কি না। জানিয়ে দিলাম টাইট প্রোগ্রাম ছিলো। কথা বলার সুযোগ ছিলো না।

 

দুপুরের খাবার পর আবার খবর দেখলাম। দেখানো হলো ময়মনসিংহ আসার আগে লোটে ঢাকায় বংগবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত পহেলা বৈশাখে বাংলায় ভাষন দেয়াকে বেশ হাইলাইট করা হচ্ছে। জনতাও তাকে সামনাসামনি দেখার সুযোগ পেলো। ফেইসবুক স্ক্রল করে লোটেকে নিয়ে অনেক নিউজ ফিড দেখতে পেলাম। দেখলাম ১ নং গ্যালারিতে এম-২৮ নাম্বার ব্যাচের বন্ধুদের সাথে মজা করছেন। ছাত্রজীবনের মতোই ২ নাম্বার সারিতে ডান পাশে বসেছেন। আমি ৯ তারিখের স্মৃতি চারনে লিখেছিলাম যে লোটে আমার ক্লাসে দ্বিতীয় সারিতে ডান পাশে বসতেন। সেটা এবার প্রমাণ হলো। আমি তার ১৯৯৬ সনের ৪র্থ বর্ষের স্মৃতির মিল পেলাম। মামণি ডাঃ মার্জিয়া (দীনা) মোবাইল নিয়ে এসে দেখিয়ে বললো “আব্বু, দেখেছ, প্রধানমন্ত্রী কি সুন্দর ক্লাশে বেঞ্চে বসে আছে?” আমি মুগ্ধ হয়ে আবার দেখলাম। সেই মিষ্টি হাসি। সেই গালে টোল পড়া মৃদু দাঁত বের করা হাসি আমাদের লোটের।

প্রায় ২৭ বছর যাবৎ মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করছি। এর মধ্যে ৬ বছর পোস্ট গ্রাজুয়েট ক্লাসও নিয়েছি। আনুমানিক ৪ হাজার ডাক্তারের শিক্ষক হবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের সাফল্যে আমি গর্বিত হই। সেই সব ছাত্রছাত্রীরা আমি ক্লাসে প্রবেশ ও প্রস্থান করার সময় দাঁড়িয়ে সন্মান প্রদর্শন করতো। আমি সেইসব ছাত্রদের উদ্দেশ্য বলতে চাই তাদের সাফল্যগাঁথা যেন জানিয়ে আমাকে আনন্দিত করে এবং এমন মানুষ হয় যেন আমি তাকে দেখে দাঁড়িয়ে সন্মান প্রদর্শন করে ধন্য হই।

১৬/৪/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ – কিশোরগঞ্জ -ময়মনসিংহ জার্নি

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.