মা বউ সন্তান

মা বউ সন্তান

(ছোট গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

দোতলায় উঠে দরজার সামনে এসে মানিক মাস্কটার বাম ফিতা কান থেকে খুলে ফেললেন। তাতে ওটা ডান কানে ঝুলতে লাগলো। মানিক হাত ঘড়িতে লক্ষ্য করলেন রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। কলিং বেল টিপ দিলে মানিকের বউ মণিকা দরজা খুলে দিলেন। মণিকা মানিকের চোখের দিকে তাকিয়ে মুসকি হাসলেন। দেখলেন চোখের নিচে মাস্কের চাপ খেয়ে কেমন দাগ পড়ে গেছে। সেই সকাল থেকে মাস্ক পরে আছে ডাঃ মানিক। তিনি শিশু রোগ বিদ্যায় এম ডি পাস করে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন। আবার বিকেলে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বসে প্রাইভেট প্রাক্টিস করেন। এম বি বি এস পাস করার পর থেকে এম ডি পাস করার আগ পর্যন্ত তিনি প্রাক্টিস করেননি। এরই মইধ্যে ফ্যামিলি কম্পলিট হয়ে গেছে। দুই ছেলের বাবা হয়েছেন। বড় ছেলের বয়স ৫ বছর, নাম রেখেছেন সৌরভ। ছোট ছেলের বয়স ৩ বছর, নাম রেখেছেন গৌরব। মানিকের কাছে মনে হয় ছেলেদের মুখের আকৃতি হয়েছে ট্রাম্পের মুখের আকৃতির মতো। মানিকের মা বলেন মানিকের মুখও ছোট বেলায় সৌরভ গৌরবের মতোই ছিলো। আসলে ট্রাম্পের মুখের আকৃতিটাই হলো শিশুদের মুখের আকৃতির মতো। তাই সৌরভ গৌরব ও মানিকের বেলাও এমন হয়েছে।

করোনা রোগের কোভিড-১৯ টিকার এক ডোজ নেয়ার পর থেকে ডাঃ মানিকের সাহস একটু বেরে গেছে। এখন তিনি নিয়মিত হাসপাতালে যান এবং প্রাইভেট প্রাক্টিস করেন। ডাঃ মানিক মাস্ক পরলেও তার রোগীরা অধিকাংশ মাস্ক পরে না। তাই মানিকের যত ভয়। ডান কান থেকে অপর ফিতাটি খুলে মাস্কটি ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। সোজা ঢুকে পরলেন ওয়াসরুমে। মণিকা লিভিং রুমে বসে গেলেন স্টার জলসার প্রোগ্রামের বাকী টুকু দেখে নিতে। মানিক ফ্রেস হয়ে প্রবেশ করলেন মায়ের রুমে। মা ঈশার নামাজ শেষ করে কিছুক্ষণ তাসবী জপছিলেন। এখন খাটে উচু বালিশে মাথা রেখে বই পড়ছেন। প্রবেশ করে মানিক বললেন

– মা, কী বই পড়ছ?

– বইয়ের নাম শৈশবের একাত্তর।

– একাত্তর আবার শৈশবের হয় কেমনে?

– লেখক একাত্তুরের স্মৃতি কথা লিখেছেন। তিনি তখন ক্লাস ফাইভে পড়তেন। তাই নাম দিয়েছেন শৈশবের একাত্তর।

– সত্য কথা লিখেছেন তো?

– সরলভাবে সত্য কথাই লিখেছেন। যা দেখেছেন, তাই লিখেছেন। ভালোই লাগে পড়তে। তুমি পড়ে দেখতে পারো।

– আমার কি সাহিত্যের বই পড়ার সময় আছে? মেডিকেলের বই পড়তে পড়তেই জান শেষ।

এভাবে আলাপ করে কেটে গেলো প্রায় বিশ পঁচিশ মিনিট।

ওদিকে মণিকা ডাইনিং টেবিলে খাবার রেডি করে ডাক দিলেন “মা, খেতে আসুন।” মা বললেন “চল্ , মানিক, খেয়ে নেই।” মানিক নাম মা-ই রেখেছিলেন। মানিক হলো খুবই দামী পাথর। মণি পাথর থেকেও দামী। মণি পাথর তৈরি হয় সাপের মাথায়। আর মানিক পাথর তৈরি হয় বেঙের মাথায়। মানিক ডাইনিং টেবিলে বসার আগে প্রবেশ করলেন চাইল্ড বেড রুমে। সৌরভ-গৌরভ মশারির নিচে ঘুমিয়ে পড়েছে পাশাপাশি বালিশে। গৌরবের ডান পা-টা সৌরভের হাটুর উপর রেখে ঘুমিয়েছে। সৌরভের চুলগুলো মোটা মোটা খারা খারা। মানিকের মতোই। গৌরবের চুলগুলো পাতলা লেপ্টানো। ঘুমন্ত সন্তানদের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন মানিক। তিনি সকালেও সন্তানদেরকে এভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখেই হাসপাতালে গিয়েছিলেন। আগামীকাল হাসপাতালে যাওয়ার সময়ও হয়তো এভাবেই ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে যেতে হবে। শুক্রবার ডাঃ মানিক হাসপাতালে যান না। চেম্বারও করেন না। সকালে কিছুক্ষণ বাজার করার জন্য বাইরে যান। তাছাড়া সারাক্ষণই পরিবারের সাথে সময় কাটান। সৌরভ-গৌরবের সাথে ছোট মানুষের মতো হয়ে খেলা করেন। দু’জনের মাথা দু’বাহুতে রেখে শুয়ে শুয়ে গল্প করেন। মোবাইলে কার্টুন দেখান। কোন কোন সময় গল্প শুনতে শুনতে গৌরব মানিকের নরম পেটের উপর ঘুমিয়ে পড়ে। অনেকেই শুক্রবার প্রাক্টিস করতে মফস্বল শহরে চলে যান। মানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি তা করবেন না। তিনি সপ্তাহে একটা দিন পুরাপুরি পরিবারের সাথে কাটাবেন। গফরগাঁও থেকে একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন ডাঃ মানিক যেন তাদের সেন্টারে শুক্রবার বসেন। তাদের গাড়ি দিয়েই ময়মনসিংহ থেকে গফরগাঁও আনা নেয়া করবেন এবং পারিশ্রমিকটাও পুশিয়ে দিবেন। পরিবারের কথা চিন্তা করে মানিক সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

মানিক খাবারের টেবিলে বসলেন। মা বললেন

– বাবা, মানিক, বিকেলের প্রাক্টিসটা বাদ দিতে পারনা? নাতি ছেড়াগুলার সাথে তো তোমার কথাই হয় না শুক্রবার ছাড়া।

– মা, তোমাদের দোয়ায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়েছি। প্রাক্টিস বাদ দিলে চলবে। চেম্বারে ৪০-৫০ জন করে রোগী আসে মা-বাবার সাথে। তারা সবাই আমাদের সৌরভ-গৌরবের মতো শিশু। তারা অসুস্থ হলে তো তোমার মানিকের কাছেই আসবে। তাদেরকে সুস্থ না করে আমি কি ঘরে বসে থাকতে পারি? সৌরভ-গৌরব অসুস্থ হলে আমার যেমন কষ্ট হয় অন্যের বাচ্চা অসুস্থ হয়ে আমার চেম্বারে এলেও আমার কষ্ট হয়। চিকিৎসায় যখন তারা সুস্থ হয়ে উঠে তখন আমারও আনন্দ লাগে।

– তুই ডাক্তার হলে কী হবে, আমার বাতের চিকিৎসাই ত করতে পারস্ না।

– মা, তুমি তো আমাদের বড় শিশু। আমি বড় শিশুর ডাক্তার না। তোমার বাতের চিকিৎসা ত ডাঃ আজিজ ভাই-ই করছে। আবার আজিজ ভাইর বাচ্চার চিকিৎসা করছি আমি। তোমার চিকিৎসা হলেই হলো।

রাতের খাবার শেষ করে মানিক তার বেড রুমে গেলেন। মাও তার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। মণিকা শোবার আগে সৌরভ-গৌরবের মুখদু’টি কিছুক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখে তার রুমে শুতে এলেন।

মানিক মণিকাকে বললেন

-আমি রাতে বাসায় এসে প্রথমেই মা-র রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ সময় দেই। তোমার রুমে আসি সবার পরে। এতে তোমার কোন অভিযোগ নেই?

– অভিযোগ থাকবে কেনো? আমার বাবাকেও আমি তাই করতে দেখেছি। মায়ের অধিকার সবার আগে। আমি আমার সৌরভ -গৌরবের জন্য কত কী করি। মাও তোমার জন্য কত কী করেছেন। কাজেই তুমি এসে প্রথমেই মায়ের কাছে যাবে, এটাই সাভাবিক। হিসাব করে দেখো, মা আজ তোমাকে পেলেন মাত্র ৩০-৪০ মিনিট। আমি পাব বাকী সারারাত। সকাল পর্যন্ত তুমি আমার কাছে থাকবে। কে বেশী সময় তোমাকে পেলো?

কিছুক্ষণ এমন মধুর মধুর কথা বলতে বলতে উভয়েই ফেইসবুকে চলে গেলেন। বন্ধুদের পোস্ট করা স্টেটাসে লাইক কমেন্ট করে একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন।

আবার সকাল হলো। হাসপাতালে যাবার সময় হলো। রেডি হয়ে সৌরভ-গৌরভের রুমে গিয়ে দেখলেন তারা ঘুমিয়েই আছে। করোনা মহামারির কারনে স্কুল সব ছুটি। স্কুল খোলা থাকলে হয়তো আগেই ঘুম ভাঙিয়ে এদেরকে রেডি করতে হতো। স্কুল খুললেই গাড়ির প্রয়োজন পড়বে। গাড়ি কেনার জন্য মণিকাও মাঝে মাঝে তাকিদ দেন। মণিকাও চান নানিক প্রেক্টিসে বেশী সময় দিক, যাতে গাড়ি বাড়ি তারারারি হয়ে যায়। প্রাক্টিস জমেছে ভালো। প্রায় ত্রিশ লাখ টাকা জমিয়েছেন প্রাইভেট কার কেনার জন্য। প্রিমিও সিরিজের কিনবেন, না এলিওন কিনবেন এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তার আগ পর্যন্ত রিক্সাই ভরসা। সৌরভের মুখটা উপর হয়ে আছে বালিশের উপর। ল্যাব্রা পড়ে বালিশ আঠা আঠা হয়েছে। সৌরভের এডেনয়েড টনসিল বড় হয়ে গেছে। তাই, হা করে ঘুমায়। তাতে বালিশে ল্যাব্রা পড়ে। নাক কান গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ বিনয়কে দেখানো হয়েছে। অপারেশন করতে হবে এডেনয়েড টনসিল। মানিক ঘড়ি দেখলেন। সময় নেই। মার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। মণিকা দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। মোবাইল, চশমা, মানিব্যাগ, কলম, চাবি, মাস্ক, ব্যাগ নিয়েছেন কিবা চেক করলেন। ছিটকিনি বন্ধ করে বেড রুমের বারান্দায় গিয়ে দাড়ালেন। মাও তার রুমের বারান্দায় গিয়ে দাড়িয়েছেন। দু’টি বারান্দাই পূর্ব দিকে। উভয়েই দেখলেন ডাঃ মানিক গেইট দিয়ে বের হয়ে পূর্ব দিকের রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছেন। হাটার সময় মানিকের ডান পায়ের স্টেপটা বাম পায়ের স্টেপ থেকে একটু লম্বা হয়। এমনো হতে পারে বাম পা সামান্য খাটো। তাতে অসুবিধা নেই। এভাবে হাটাতেই মানিককে আরো বেশী ভালো লাগে। রাস্তাটা ডান দিকে বাঁকা। বাঁকা অংশে প্রবেশ করতেই ডাঃ মানিক দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন।

৫/৩/২০২১ খ্রি.

ময়মনসিংহ

 
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 2.00 out of 5)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/