মান্দাতার আমলের কৃষি সরঞ্জাম

মান্দাতার আমলের কৃষি সরঞ্জাম

(স্মৃতিচারণ)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি গ্রামে বড় হয়েছি। ইন্টারমেডিয়েট পাশ করার পর থেকে নিয়মিত গ্রামে থাকা হয় না। গ্রামের কৃষিকাজ ও কৃষি সরঞ্জাম খুব কাছে থেকে দেখেছি । এখনো গ্রামের বাড়ি যাই মাঝে মাঝে । লক্ষ্য করছি গ্রামের কৃষিকাজের পদ্ধতি দ্রূত আধুনিকায়ন হচ্ছে । তাই অনেক সরঞ্জাম বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে । সোনালী শৈশবে যা যা দেখেছি তার জন্য কেমন যেন মায়া লাগে। গত কয়েকদিন আগে নিউজ পেলাম সখিপুর উপজেলায় লাঙ্গুইলা গ্রামে করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছে । লাঙ্গুইলা গ্রামের নাম বহুদিন পর পনে পড়লো । কিন্তু লাঙ্গুইলা গ্রামটা সখিপুরের কোন দিকে এটা আমি মনে করতে পারলাম না । আমি গ্রামের একজনকে মোবাইল করে জানতে চাইলাম লাঙ্গুইলা গ্রামটি কোন দিকে যেনো । জানা হলো । এরপর শুরূ হলো লাঙ্গুইলা শব্দটি যেনো কোথায় শুনেছি । মনে পড়লো এটা ক্ষেতের আগাছা পরিস্কার করার একটা কৃষি সরঞ্জাম ছিলো । অনেকদিন না দেখতে দেখতে নামই ভুলে গেছি । মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকলো আমার শৈশবে দেখা মান্দাতার আমলের কৃষিকাজ ও কৃষি সরঞ্জামের স্মৃতি । এমনই হয় মাঝে মাঝে আমার ব্রেইনে । যেদিন যেটা মাথায় আসে সেদিন সেটা সারাদিনই মাথায় খেলতে থাকে । বাধ্য হয়ে লিখে ফেলি এন্ড্রয়েড মোবাইলের নোট প্যাডে। কপি করে পেস্ট করে দেই ফেইসবুক পোস্টে । আজও তাই করলাম ।

আমাদের এলাকায়  মান্দাতার আমলের জিনিসপত্র দিয়েই হাল চাষ করা হতো। এখনো হচ্ছে বেশ কিছুর ব্যবহার । হাল চাষ করার জন্য বাঁশ ও কাঠের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়। হাল চাষে গরু ব্যবহার করা হয় । ১৯৭৭ সনে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম পাওয়ার ট্রিলার দেখলাম। কলেজের মালিকানায় একটা পাওয়ার  ট্রিলার ছিল। সেটা দিয়ে কলেজের অধীন কিছু কৃষি জমি ছিল সেই জমিতে হাল চাষ করা হতো। এরপর এলাকায় কিছু ধনী লোক হাল চাষের জন্য পাওয়ার ট্রিলার আনেন। এলাকায় এটাকে কলের লাঙ্গল বলা হতো । ধীরে ধীরে এই কলের লাঙ্গলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ভাড়ায় হালচাষ করতে থাকে। এখন ধরতে গেলে প্রায়  সবাই পাওয়ার ট্রিলার দিয়েই হাল চাষ করে। আজকালকার ছেলেপেলেরা তেমন লাঙ্গল জোয়ালের দেখা পায় না। একসময় লাঙ্গল জোয়াল বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমি মান্দাতার আমলের কিছু কৃষি সরঞ্জামের কথা লিখে যেতে চাই। আমার বাড়ি যেহেতু সখিপুরের পাহাড়  অঞ্চলে, সেহেতু আমি স্বভাবতই পাহাড়  অঞ্চলের কৃষি সরঞ্জামাদির কথাই লেখব। পাহাড়ে  কৃষি আবাদি জমির পরিমাণ কম ছিল। বেশিরভাগই ছিল বন। যেসব জমিতে হালকা গাছপালা ছিল সেগুলো কেটে ফেলে মোথাও উপরে ফেলা হতো। গাছ কাটার পর শিকরসহ অবশিষ্ট অংশকে বলা হয় মোথা। এসব গাছ ও মোথা জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার হয় । গাছ কাটার কাজে কুড়াল ব্যবহার করা হয় । পাঁচ-ছয় ইঞ্চি লম্বা এক দিকে চ্যাপ্টা, অন্যদিকে গোলাকার অংশ কুড়ালের। গোলাকার অংশে গোল একটা ছিদ্র আছে । এই ছিদ্রের ভিতর দিয়ে  দুই-তিন ফুট লম্বা গোলাকার একটা কাঠের দন্ড লাগিয়ে হাতল বানানো হয়। কুড়ালের চ্যাপ্টা দিক ধারালো । এই অংশে ইস্পাত লাগানো থাকে । ইস্পাত লাগানো অংশকে শান লাগানো অংশ বলা হতো। আমরা বলি পাগাল । ধার কমে গেলে কামারের কাছ থেকে পাগাল দিয়ে আনা হয় । বাকিটুকু লোহার তৈরি । কাঠ কাটা, সাইজ করা ও লাকড়ি চেগানোর কাজে কুড়াল ব্যবহার হয় । মোথা থেকে শিকর বের হয়ে মাটির নিচে অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয় । মোথার চারিদিকের মাটি চার-পাঁচ ফুট পর্যন্ত কোদাল দিয়ে কেটে সরিয়ে মোথা উপড়িয়ে ফেলা হয় । কোদালও কুড়ালের মতো । তবে এটা একটু বড় এবং পাতলা। কুড়ালের ধারালো দিক লম্বালম্বি। আর কোদালের ধারালো দিক আড়াআড়ি। কোদাল দিয়ে মুলত মাটি কাটা হয় । তবে কোন কোন সময় এটা গোবর ধরে মেইল্লা (ছুড়ে) মারার কাজেও ব্যবহার হয় । অথবা উচিতে ময়লা ঠেলে ঢুকানোর কাজেও কোদাল ব্যবহার করা হয় । উচি হলো বাঁশের বেতি দিয়ে বুনোনো ময়লা ফেলার তিনকোনা একটা কৃষি সরঞ্জাম। ছাই ফেলার কাজেও উচি ব্যবহার করা হয় । কোদাল দিয়ে পাগার, পুকুর অ কুয়া কাটা হয় ।  মাটিকাটা কামলারা মাটি মাথায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করে বাঁশের বেতির বুনোনো অর্ধগোলাকৃতি পাইছা। পাইছা যাতে মাথার চামড়ায় না লালে এজন্য তারা মাথায় বিড়া বসিয়ে নেয় । বিড়া বনের নও (লতা) দিয়ে বানানো হয় । নও না পেলে ছেড়া ছালা মাথায় বসিয়ে নেয়া হয় । পাহাড়ের মাটি উঁচু নিচু । উঁচু ঢালু জমি মাটি কেটে সমতল করে চাষ করা হয় । বাইদের (নিচুভুমি) জমি সমতল তাই মাটি কাটতে হয় না । শুধু ক্ষেতের বাতর (আইল) বানানো কাজে কোদাল ব্যবহার হয় । মাটিকাটা কামলারা দলবেঁধে টিলার মাটি কাটে । কতটুকু গভীর মাটি কাটা হলো বা কত ঘনফুট মাটি কাটা হলো তা পরিমাপ করার জন্য কামলারা টিলার মাঝখানের একটা অংশের মাটি খারাভাবে রেখে দেয় । এটাকে বলা হয় মাতির ডিবি । আমরা ডিবি থেকে লাফিয়ে পড়ে  পড়ে  খেলতাম। লাফিয়ে পড়তে গিয়ে মাঝে মাঝে পা মস্কে যেতো।

 

ক্ষেতে ফসল বোনার আগে হাল বাইতে হয় । হাল বাওয়া হয় কাঠের লাঙ্গল দিয়ে । সবাই লাঙ্গল বানাতে পারে না। লাঙ্গল বানানোর জন্য বিশেষ বিশেষ লোক দরকার । লাঙ্গল বানানোর কাজে কুড়াল, হাতুড়ি ও বাটাল ব্যবহার করা হয় । সুবিধামতো একটা গজারি কাঠ নেয়া হয় লাঙ্গল বানানোর জন্য। কুড়াল দিয়ে ছেটে এটাকে সাইজ করা হয় । লাঙ্গলের গোড়ার অংশ ১৬০ ডিগ্রি সামনের দিকে এংগল আছে । নিচের অংশ চোক্কা । এই অংশ হাল বাওয়ার সময় মাটি ফালাফালা করে । এইজন্য এই অংশে ইস্পাতের তৈরি একটা চেপ্টা পাত লাগানো থাকে । এটাকে বলা হয় লাঙ্গলের ফলা। উপরের অংশে বাম হাত দিয়ে ধরার জন্য ছোট্ট একটা হাতল আছে । এটুকুও লাঙ্গলের উপরের অংশের কাঠ সাইজ করে কেটে বানানো হয় । এই অংশকে বলা হয় লাঙ্গলের কুটি। হাল বাওয়ার সময় এই কুটি ধরে লাঙ্গলকে সোজা রাখতে হয়। লাঙলের বাকা এংগলে লাগানো থাকে ৭-৮ ফুট লম্বা কাঠের একটা দন্ড। এটাকে বলা হয় লাঙ্গলের ঈশ। ঈশের মাথায় ৬-৭ টা দাঁত কাটা থাকে বাঁশের বা কাঠের জোয়ালের সাথে রঁশি দিয়ে বাঁধার জন্য। ঈশ টাইট করে লাঙ্গলের ছিদ্রে বসানোর জন্য বাঁশের তৈরি খিল লাগানো থাকে । কাঠের খাইটা দিয়ে বাইরাইয়ে খিল টাইট করা হয় । গরু হাচার দেয়ার খোট ডাবাইতেও খাইটা লাগে । জোয়াল মোটা বৌড়া বাঁশ দিয়া বানায় । জোয়ালে গরু বাঁধার জন্য দু’পাশে দু’টি কাঠি লাগানো থাকে । পাটের রঁশি দিয়ে পাগা বানিয়ে জোয়ালের সাথে গুরুর গলায় পরিয়ে আটকিয়ে দেয়া হয় । যিনি হাল চাষ করেন  তাকে বলা হয় আইল্লা (হাইল্লা)। যে গরু দিয়ে লাঙ্গল বা হাল টানা হয় সে গরুকে বলা হয় আলের গরু (হালের গরু)। আইল্লারা বেলা উঠার আগেই লাঙ্গল জোয়াল কাঁধে নিয়ে আইল্লা গরু ডাহাইতে ডাহাইতে (তাড়াতে তাড়াতে) আল ক্ষেতে যায় । জোয়ালে গরু ও লাঙ্গল বেঁধে আল জোড়া হয় । বাম হাতে কুটি ধরা হয় । ডান হাতে থাকে পাজুন। পাজুন হলো বাঁশের তৈরি বেতের মতো লাঠি। এটা দিয়ে গরু বাইরানো (পিটানো) হয় । হালের গরু সাধারণত অলস হয়। না বাইরালে হাল টানতে চায় না। লাঙ্গল টানতে টানতে গরু সামনের দিকে এগুতে থাকে। লাঙ্গলের ফলা মাটিকে দুদিকে ফাঁক করে কেটে কেটে সামনের দিকে আগায় । ক্ষেতের এক দিক থেকে শুরু করে অন্য দিক পর্যন্ত একবার গিয়ে আবার ফিরে আসে ৩-৪ ফুট ফাঁক দিয়ে । আবার সে সামনের দিকে আগায়  কিন্তু ঠিক আগের দাগ দিয়ে না । প্রায়  ৪-৫ ইঞ্চি বাম দিকে আগায় । এভাবে ৪-৫ ইঞ্চি করে বামে সরতে সরতে এক সময় সমস্ত ক্ষেতের হাল চাষ হয়ে যায়। আইল্লা সাধারণত দুপুর পর্যন্ত আল বায়। মাথায় তীব্র রোদ লাগে। তাই সে মাথায় গজারি গাছের পাতা ও বাঁশের তেলি দিয়ে বুনোনো মাথাল পরে। এই মাথাল ইংরেজদের হ্যাডের টুপির মতো মনে হয়। দুপুরের দিকে গরু ক্লান্ত হয়ে দাড়িয়ে পড়ে। আইল্লা পাজুন দিয়ে গরুর পাছায় বারি মারে। গরু আবার চলে। কোন কোন সময় গরু ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ে। বাইরাইলেও উঠতে চায় না। কোন কোন নিষ্ঠুর আইল্লা গরুর লেজের আগায় ফুটন্ত গরম তেলের সেকা দেয়। গরু সেকা খেয়ে লাফ দিয়ে উঠে আবার লাঙ্গল টানে। আমি যখন ল্যাবে মাইক্রোস্কোপি করতে করতে আর মাথা ঠিক রাখতে পারি না তখন সেই হালের বলদের কথা মনে পড়ে। মনে মনে সেকা খেয়ে আবার মাইক্রোস্কোপি করতে থাকি। কারন, রোগীকে সময়মতো রিপোর্ট দিতে হবে। সকাল ১০ টার দিকে আইল্লা ক্ষুধার্থ হয়ে পড়ে। আইল্লার বউ এক হাতে এক বদনা খাওয়ার পানি এবং এক হাতে এক থালি (টিনের থালা) পান্তা ভাত নিয়ে আসে আইল্লা ক্ষেতে। ক্ষেতের বাতরে পলাশ গাছ তলে বসে আইল্লা কাঁচা মরিচ ডলে লবন দিয়ে পান্তাভাত কায় । আইল্লার বউ আঁচল দিয়ে আইল্লার কপালের ঘাম মুছে দেয় । পান্তাভাত খেয়ে বাতরে বসে কিছুক্ষণ উক্কা (হুক্কা) খেয়ে আবার আল বাওয়া শুরু করে আইল্লা। উক্কা বানায় নারিকেলের খুলি দিয়ে। নারিকেলের মুখের ছিদ্র দিয়ে নারিকেল কুড়িয়ে সেই ছিদ্র দিয়ে কাঠের তৈরি নইচ্চা ঢুকানো হয় । নইচ্চার ভিতর দিয়ে নল থাকে । নইচ্চার মাথায় মাটির কল্কি লাগানো হয় । নালী (লালী/চিটাগুড়) দিয়ে তামাক ডলে কল্কিতে ভরে তামাকে আগুন দিতে হয় । খেরের তৈরি বুন্দার আগুন থেকে কল্কির আগুন লাগানো হয় । আইল্লার বউ উক্কা ও বুন্দাও নিয়ে আসে আইল্লার জন্য । খের দিয়ে বেনী পাকিয়ে বুন্দা বানানো হয় । বুন্দায় আগুন ধরিয়ে রাখলে ধীরে ধীরে পুড়তে থাকে । এটা মুলত আগুন সংরক্ষণ ও সররাহের কাজে ্যবহার হয় । আছাড়া বাড়িতে ঘরের কোণায় মাটির আইলায় তুষের মধ্যেও আগুন রাখা হয় । তুশের আগুন ধিগি ধিগি জ্বলে । নাড়া অ সোলার আগুন ফাত করে জ্বলে । খরির (লাকড়ির) আগুন মধ্যম গতিতে জ্বলে । নারিকেলের খুলির এক পাশে একটা ছিদ্র আছে । এখানে মুখ রেখে স্বাস টান দিলে কল্কির ধুয়া নইচ্চার নল দিয়ে এসে উক্কার ভিতরের পানির ভিতর দিয়ে মুখে আসার সময় গুড়গুড়ি এক ধরনের মেলোডি সাউন্ড হয় । শুনতে ভালোই লাগে । নইচ্চায় কাই পড়ে মাঝে মাঝে নল বন্ধ হয়ে যায় । শিক ঢুকিয়ে পরিস্কার করতে হয় । আইল্লার বউ চলে যায় বাড়িতে স্বামীর জন্য দুপুইরা ভাত রান্না করে । আইল্লা আল শেষ করে বাড়ি এসে কুয়ার পানিতে গোসল করে গতরে খাস তেল মেখে দুপুইরা গরম ভাত খেতে বসে। ভাত রান্না হতে দেরি হলে কোন কোন আইল্লা রাগে আইল্লা পাজুন দিয়ে বউ পিটায়। এদিকে আইল্লার বউ চাড়িতে গরুর জন্য কুড়ার সাথে লবন মিশিয়ে পানিতে গুলে রাখে । সেই কুড়া পরিশ্রান্ত ক্ষুধার্থ আইল্লা গরু খেয়ে পেট ডিক ডিক করে ফেলে । চাড়ি হল মাটির তৈরি গরুকে খাবার দেয়ার বড় গামলা।

 

আল বাওয়ার পর মাটি শুকিয়ে বড় বড় ইটা তৈরি হয় । এই ইটা ইটামুগুর দিয়ে  বাইরাইয়া ভেঙ্গে গুরাগুড়া করা হয় । অনেক সময় কুকুর তারাতেও ইটামুগুর ব্যবহার করা হয়। সাধারন লাঠি দেখে কোন কোন কুকুর ভয় পায় না । ইটামুগুর দেখলে ভয় পায় । এজন্য বলা হয় “যেমন কুকুর, তেমন মুগুর।” আল দেওয়ার পরদিন মই দেয়া হয় ক্ষেত মসৃন করার জন্য। মই দেয়ার জন্য বাঁশ দিয়ে চংগ বানানো হয় । চংগ সাধারনত ৭-৮ ফুট লম্বা হয় । একটা মোটা বৌড়া বাঁশকে মাঝখান দিয়ে ফেড়ে দুই ফালা করা হয়। তারপর এক ফুট লম্বা ৮টা কাঠি লাগিয়ে মই বানানো হয়। এটাই হলো চংগ। চংগের দুপাশে দুটি ছিদ্র করে তাতে দুটি লম্বা রঁশি লাগানো হয়। এই রঁশি বাঁধা হয় জোয়ালের সাথে। চাষি চংগের উপর দাড়িয়ে গরুকে চলতে বলে। গরু কিন্তু চাষির নির্দেশের ভাষা বুঝে। যা বললে গরু আগায়। থাম বললে গরু থামে। বায় বললে গরু বামে সরে। ডান বললে ডানে সরে। বায় ঠাইট বললে গরু বামদিকে ইউটার্ন নিয়ে ঘুরে পড়ে। চাষি মইয়ে চড়লে তার চাপে ক্ষেতের ইটা গুড়া করতে করতে মই নিয়ে গরু সামনে আগায়। ওজন বাড়ানোর জন্য কোন কোন চাষি তার বাচ্চাদেরকে কোলে নিয়ে মইয়ে দাড়ায়। বাচ্চারা মইয়ে চড়ে মজা পায়। বাইষ্যা কালে (বর্ষাকালে) বাইদের ক্ষেতে পানি থাকে । এই পানিতে চলা চলা পুটি, কই, রাগা, ছাইতান (টাকি), নোন্দা ইত্যাদি মাছ থাকে । মইয়ের ডলা খেয়ে এসব মাছ মইয়ের পিছনে বের হয়ে কাতরাতে থাকে । পোলাপান দলে দলে সেই মাছ ধরে ধরে খালুই ভরে । খালুই হলো বাঁশের বেতির তৈরি ঝাঝড়া পাত্র। মাছ রাখলে পানি ঝরে গিয়ে মাছ ঝর ঝর করে।

 

মই দেয়া শেষে চাষি ক্ষেতে ফসলের বীজ বোনে। বেত দিয়ে বুনোনো ঢাকিতে বীজ নিয়ে ঘুরে ঘুরে হাত দিয়ে বীজ ছিটিয়ে দেয় সারা ক্ষেতে । বীজ ছিটানো শেষে বীজ মাটিতে মিশানোর জন্য আবার একটা হালকা চাষ ও হালকা মই দিয়ে দেয় । ক্ষেতে ফসল জালানোর পর ফসলের সাথে আগাছা ও ঘাস উঠে । ছেনি (নিরানি) দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সেই ঘাস ও আগাছা পরিস্কার করা হয় । ছেনি হলো ধারালো বাঁকা একটা কৃষি সরঞ্জাম। হাতে ধরার জন্য এর একটা কাঠের আছারি (বাট) আছে। বাটের আগায় একটা রিং লাগানো থাকে। ওটাকে বলে হামি। ছেনির নেরাজি (চোকা অংশ) আছারিতে ঢুকানোর সময় যাতে ফেটে না যায় সেজন্য হামি লাগানো হয়। পশ্চিমা চৌরা (যমুনার চর এলাকার) কামলারা ছেনির পরিবর্তে পাচন ব্যবহার করতো। ছেনির মাথা একদিকে চোকা। কিন্তু পাচনের মাথা দুই দিকে চোকা। পাচন দিয়ে ডানে-বামে উভয় দিকে নিরানো যায়। ধান ও পাট ক্ষেতে অনেক ঘাস হয় । সেগুলো অনেক সময় ছেনি দিয়ে নিরানো সম্ভব হয় না। সেগুলো সরানোর জন্য ক্ষেতে নাঙ্গুইলা (লাঙ্গইলা) দেয়া হয় । নাঙ্গুইলা চিরুনির মতো। এক টুকরো কাঠের সাথে বাঁশের বাতির কয়েকটা চোকা চোকা চিরুনির মতো দাঁত লাগানো থাকে। একেকটা দাঁত এক ফুট করে লম্বা। ৬-৮ টা দাঁত থাকে এমন। লাঙ্গলের মতোই ঈশ আছে। গরুর জোয়ালে লাগিয়ে ফসলের ক্ষেতের ভিতর দিয়ে চিরুনির মতো করে আচরানো হয়। লাঙ্গুইলার দাঁতের সাথে ঘাস আটকে উঠে আসে। কিন্তু ধান গাছ উঠে আসে না। ধান গাছ উঠলেও অল্প উঠে আসে। তাতে ধান সামান্য পাতলা হয়। তাতে ক্ষতি নেই। ঘাস কেনো উঠে আসে? ঘাস সাধারণত আড়াআড়ি ভাবে বৃদ্ধি পায়। তাই লাঙ্গুইলার দাঁতে আটকে উঠে আসে। লাঙ্গুইলা দেয়ার সময় যাতে গরু ফসল খেয়ে না ফেলে সেজন্য গরুর মুখে ঠোনা বেঁধে দেয়া হয়। কোরোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে আমরা যেমন মুখে মাস্ক বেঁধে রাখি তেমন হলো  গরুর ঠোনা। বাঁশের পাতলা বেতি দিয়ে ঠোনা বানানো হয় । দড়ি দিয়ে বুনিয়েও ঠোনা বানানো হয়।

 

সবজি জাতীয় ফসল বেগুন-মরিচ টালের চারিদিকে গচির বেড়া দেয়া হয় । বেগুন ও মরিচের খেতকে টাল বলা হয় । ছাগল গরু ফেরানোর জন্য গচি খাড়া করে মাটিতে পুতে বাঁশের বাতি দিয়ে বেঁধে দেয়া হয় । এক মানুষ উচু বন্য গাছকে গচি বলা হয় । সাধারণত চাড়া গজারি গাছ গচি হিসাবে ব্যবহার হয় । গচি বেড়া দেয়া ও লাকড়ির কাজে ব্যবহার হয় । গচি হাটে বিক্রি হয় । কিশোরগঞ্জে একটা জায়গার নাম গচি হাটি। আমার মনে হয় ওখানে গচি বিক্রি হতো। দাও (দা) দিয়ে কেটে গচি বানানো হয় । গচি দুই দিকেই চোকা থাকে । দাও দিয়ে বাঁশের বেতও তোলানো হয় । গচি বাঁধবার জন্য নও দিয়ে সুতলি তোলাতেও দাও লাগে। নও না পাওয়া গেলে কলাপাতার গোড়ার আঁশের ছেতুকা দিয়েও বেড়া বান্ধা যায় । খোন্তা (সাবলের মতো) দিয়ে গাতি (গর্ত) দিয়ে মোটা গচি মাটিতে গারা হয় । আরেক ধরনের দাও আছে সেটার নাম রাম দাও। সেটা দিয়ে কৃষিকাজ করে না। সেটা দিয়ে ময়মনসিংগা কিছু মানুষ মারামারি কোপাকুপি করে। ওটা লম্বা ভারী এবং পাখির ঠোঁটের মতো একটা চোকা ঠোঁট আছে। দায়ের মতো কিছুটা তার নাম বটি। এটা দিয়ে লাউ কুমড়া কাটা হতো। বটির আছারি কাঠের পিড়ির মতো । আছারিতে বসে মেয়েরা বটি দিয়ে তরি তরকারি ও মাছ কুটে (কাটে)। বটির আগায় মোরগের বৌলের মতো একটা অংশ আছে । ওটা দিয়ে নারিকেল কোরানো হয় ।

 

ধান ক্ষেতে বন্য পশু পাখি আক্রমণ করে । এজন্য ধান ক্ষেতের মাঝখানে একটা খুটির মধ্যে ভাংগা মুড়ির টিন ঝুলিয়ে তার ভিতর একটা কাঠের দন্ড ঝুলিয়ে দন্ডের সাথে রঁশি বেঁধে ক্ষেতের আইলে টং ঘরে বসে থাকে চাষি। মাঝে মাঝে রঁশি টান দিয়ে কাঠি নাড়াচাড়া করলে টিনের সাথে বারি খেয়ে ঘটরঘটর শব্দ হয় । তাতে পশুপাখি ভয়ে চলে যায় । খর দিয়ে মানুষের মুর্তি বানিয়ে তার গায়ে পুরাতন সাদা শার্ট পরিয়ে দেয়া হয় । মাথায় কালি পাইল্লা (পাতিল) লাগিয়ে তার মধ্যে চুন দিয়ে চোখ বানিয়ে কাক তারুয়া বানানো হতো। দিনের বেলা এটাকে মানুষ মনে করে ধান ক্ষেতে কাক, টিয়া ও ময়ুর পাখি বসে না। রাতে ধান ক্ষেতে ভয়ে বন্য শুকর আসে না। কচি ধান ক্ষেতে গাছের মরা ডাল খারা করে গেথে দেয়া হয় । ফেইচ্চা পাখি (ফিংগে) সেই ডালে বসে উড়ে গিয়ে ধরে ধরে ফরিং ও মাজরা পোকা খেয়ে কঁচি ধানের উপকার করে । পোকায় বেশি আক্রমণ করলে মুরা হাছুন (ছনের ঝাড়ু) দিয়ে ক্ষেতে কীটনাশক ছিটিয়ে দেয় । কেউ কেউ ফসল ক্ষেতের মাঝখানে ঠোলা পাইল্লা (ভাংগা মাটির পাতিল) ঝুলিয়ে রাখে । তাদের ধারণা  ফসল ক্ষেতে খারাপ মানুষের কুনজর পড়লে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। কুনজরকে বলা হয় চোখ লাগা। ঠোলা পাইল্লা বেঁধে রাখলে চোখ লাগে না। ঠোলা পাইল্লার ভিতর দইনছ (দোয়েল) পাখি বাসা বানায় । বাচ্চা তোলায় । আশেপাশের ফসল গাছের পোকা ধরে ধরে খায়। বাচ্চাকেও খাওয়ায় । তাতে ফসলের উপকার হয় । চাষি মনে করে চোখ লাগে নাই।

 

বোরো ধান ক্ষেতে পানির সেচ দিতে হয় । ক্ষেতের কানিতে ছোট ছোট দোবা আছে । ডোবা থেকে ডোংগা দিয়ে পানি সেচে বোরো ক্ষতে দেয়া হয় । ডোংগা হলো টিনের তৈরি তিন কোণা একটা উচির মতো পানি সেচার সরঞ্জাম । এতে দড়ি বেঁধে দুইজন দুই দিক থেকে পানিতে ফেলে পানি সহ মেইল্লা মারে ক্ষেতের ড্রেইনে। কেউ কেউ পানি সেচার জন্য হিচা ব্যবহার করে । একটা মোটা কাঠের মধ্যে গর্ত খুরে নৌকার মতো বানানো হয় । কিন্তু এক দিকে বন্ধ ও এক দিকে খোলা থাকে । একটা খুটির সাথে বাঁশ ঝুলিয়ে বাঁশের একদিকে গাছের মোথা এবং অন্য দিকে হিচার বন্ধ দিকের আগা বাঁধা হয় । একটা বাঁশের উপর দাঁড়িয়ে হিচার মাথায় পাড়া দিয়ে পানি ভরে ছেড়ে দিলে মোথায় ভারে হিচার মাথা পানিসহ উপরের দিকে উঠে ড্রেইনে গিয়ে পড়ে ।

 

ধান পাকলে হুতি দিয়ে কাঁচি (কাস্তে) দিয়ে ফেসিয়ে ধান গাছের গোড়ার দিকে ৭-৮ ইঞ্চি পরিমাণ নাড়া রেখে ধান কাটা হয়। কাঁচি লম্বাটে চাঁদের মতো কিছুটা বাঁকা। ঝাঝরা করে ধার কাটা আছে। কাঁচিরও দায়ের ন্যায় হামিযুক্ত আছারি আছে। ধান গাছ, নাড়া ও খের (ক্ষর) কাটতে কাঁচি ব্যবহার করা হয় । লাউ কুমড়ার বোটা কেটে লাউ কুমড়া জাংলা থেকে পারতেও ব্যবহার করা হয় । ফয়তার দাওয়াতের কলাপাতা কাটতেও এই কাঁচি বাঁশের কোটার মাথায় বাঁধতে হয় । তিল গাছ কাটতে কাঁচি লাগে ।

পাটগাছ মানুষের চেয়েও লম্বা। পাট গাছের গোড়া কেটে আনতে দরকার হয় বেকী বা বাগী। বাগী কাঁচির মতো বাঁকা কিন্তু অনেক লম্বা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পানির নিচ থেকে তোষাপাট কেটে আনা যায়। আমাদের পাহাড়ের চালার জমিতে তেমন তোষাপাট হয় না। কিন্তু ফারাম (ফার্ম) পাট নামে এক ধরনের পাট হয় । সেগুলো নিরানি না দিলেও ভালো ফলন দেয় । কোন যত্ন ছাড়াই বেড়ে উঠে  সেগুলো। এদের পাটখরি খুব শক্ত । এদের কাটতে শক্ত কাঁচি লাগে । এদের ফুল ঢেড়সের ফুলের মতো বড় বড় । পাট কেটে আটি বেঁধে পাগারের পানিতে জাগ দিয়ে রাখা হয় । আঁশ পচে নরম হলে আতা (হাতা) দিয়ে পিটিয়ে সোলা বা পাটখড়ি থেকে পৃথক করা হয় । এটাকে বলা হয় পাট এরানো। পাট এরানোর আতা কাঠের তৈরি হয়, ক্রিকেটের ব্যাটের মতো দেখতে। আড়া আড়ি বাঁশ বেঁধে তার উপর বাঁশ ফেলে, বাঁশের উপর পাটের আঁশ ঝুলিয়ে রৌদ্রে শুকানো হয় । এটাকে বলা হয় বাঁশের আড়।

 

ক্ষেত থেকে পাকা ধান গাছ কেটে সেই ধান গাছ দিয়ে ছোট ছোট আঁটি বাঁধা হয় । কয়েকটি আঁটি একত্র করে রঁশি দিয়ে বেঁধে বোঝা বা ভার বানানো হয় । বাইকের দুই মাথায় দুই বোঝা ধানের আঁটি ঝুলিয়ে বাইক কাঁধে নিয়ে কৃষক বাড়ি নিয়ে যায় । বাইক হলো বাঁশের তৈরি। বাইকের মাঝখানে মোটা থাকে । দুইপ্রান্তে দু’টি গুটি থাকে ভার আটকানোর জন্য । গরুর গাড়ি করেও ধানের আটি আনা হয় । গরুর গাড়ির একটা বাঁশের মাচা আছে, এটাকে বলা হয় চাংগারি । চাঙ্গারির সামনে বা৬শের জোয়াল আছে । পিছনের দিকে আছে কাঠের ডল্লা । ডল্লা কাঠের চাকার ভিতর দিয়ে প্রবেশ করিয়ে বাঁশের ঊংকিল (নাতের মতো) দিয়ে আটকানো হয় ।গাড়ি চলার সময় ডল্লার সাথে চাকার ঘর্ষন খেয়ে ক্যার ক্যার শব্দ হয়। তাই ডল্লায় মাইট্যা তেল লাগানো হয় ।  বাড়িতে এনে ধানের আটি পালা (স্তুপ) দিয়ে রাখে । তারপর গরু দিয়ে মলন জোড়ে মাড়িয়ে ধানের হিঞ্জা (শিশ) থেকে ধান পৃথক করা হয় । বাঁশের কারাইল দিয়ে ঝেরে খের আলাদা কর হয় । ঊঠানে পড়ে থাকে ধান। হাপট দিয়ে সেগুলো জড়ো করে ঠেংগি দেয়া হয়  । হাপট হলো এক টুকরা তক্তার মধ্যে বাঁশের একটা হাতল লাগিয়ে শস্য ঠেংগি দেয়ার একটা সরঞ্জাম । হাপট দিয়ে সব ধান গোছানো যায় না। এরপর বাঁশের হলা (ঝারু) দিয়ে হোরা (ঝারু) দিতে হয় । চাউল হোরার জন্য ছনের হাছুন (ঝারু) ব্যবহার করা হয় ।

 

মুরুব্বীরা কাজ করতেন না। বইল্লাআলা খরম পায় দিয়ে নাটুর নুটুর করে হাটতেন অথবা টুলে বসে কাজের নির্দেশনা দিতেন। এখন খরম দেখা যায় না । খরম হলো হাতে তৈরি কাঠের সেন্ডেল। ফিতা ছিলো না এতে। এর বইল্লা পায়ের আঙুলের চিপায় ধরে হাটতে হতো। বইল্লা ছিল পাইল চাপনির বুটুমের মতো। পাতিলের ঢাকনাকে বলা হয় পাইল চাপনি। চাপনি ধরার গোলাকার চাকতিকে বলা হয় বুটুম। ভাতের পাতিলকে বলা হয় বুরকা। বুরকার ঢাকনা হলো খোরা। খোরায় বুটুম নাই। খরমের সামনের অংশে রাবারের টায়ার দিয়ে ফিতা লাগালে বলা হতো পয়টা। মেয়েরা সাধারণত পয়টা পরতো। বিয়ের সুটকেসেও বউয়ের জন্য রঙিন পয়টা নিয়ে আসতো মেয়ের শশুরবাড়ি থেকে। সাথে ছিল পায়ে লাগানোর জন্য লাল টুক টুকে আলতা।

 

বাঁশের বেতির বুনোনো জাড়না বা কুলা দিয়ে ধান ঝেরে চিটা আলাদা করা হয় । ধান রৌদ্রে শুকিয়ে মেপে গোলায় তোলা হয় । মাপার জন্য আছে বড় বড় দাড়িপাল্লা। পাল্লা বুনোনো হয় বেত দিয়ে। এক পাল্লায় এক পাহাড়ি বা এক ধরা বা এক পাল্লা ধান ধরতো। পাঁচ সেরে ছিলো এক পাহাড়ি। আট পাহাড়িতে হলো এক মন। এক সের প্রায় এক কেজির সমান। আশি তোলায় ছিল এক সের। কোন কোন ক্ষেত্রে চুরাশি তোলায় এক সের ছিলো। এখন সেই মাপ নেই । যিনি দাড়িপাল্লা দিয়ে ধান মাপেন  তিনি মনে রাখার জন্য সুর করে গণনা করেন । সব সংখ্যা তিনি দুইবার উচ্চারণ করেন । তিনি এক বলেন না, বলেন  আল্লাহ । তিনি এগার না বলে বলেন গার। উনিশ না বলে বলেন নাইশ।

যেমন

আরে আল্লাহ, আল্লাহ

দুইয়ে দুই

তিনে তিন

……..

দশে দশ

গার গার

তের তের

…..

ঠার ঠার

নাইশ নাইশ

বিশে বিশ

এই ভাবে।

ধান পাট রাখার জন্য ঘরের একাংশে উচু করে মাঁচা বানানো হয় । বলা হয় উগার। উগারে থাকে বাঁশ দিয়ে বুনোনো ডোল, গোলা ও বেড়। মাটির তৈরি রাইং ও নাইন্দা। এগুলি ভরে সংরক্ষণ করা হয় শস্য দানা। পাটের তৈরি ছালায় (বস্তায়) ভরে হাটে নিয়ে বিক্রি করা হয় শস্য ।

 

নিজেরা খাওয়ার জন্য ধান সিদ্ধ করে শুকিয়ে সিদ্ধ চাউল বানানো হয় । বড় বড় ডেগে ধান সিদ্ধ ক্রা হয় নাড়ার আগুনে। সিদ্ধ চালের ভাত রান্না করা হয় মাটির বুরকায়। মাটির খোরায় ভাতের ফেন (মার) জমানো হয় । ছাগলের বাচ্চাকে ফেন খাওয়ায় । মাটির পাইল্লায় সালুন (তরকারি) রান্না করে । পাইল-চাপনি দিয়ে পাইল্লা ঢাকে । মাঝে মাঝে চাপনির বুটুম ধরে উচু করে নাহইর (নাকইর) দিয়ে সালুন নাড়া দিতে হয় । নাহইর হলো বাঁশের কাঠি। পিতলের চামচ দিয়ে সালুন পাতে দেয় । কাঠের ঘুটনি দিয়ে ডাউল ঘুটা দেয়া হয় । নারিকেলের খুলির কাপা দিয়ে দাউল পাতে দেয় । পিঠা সেকার জন্য আছে মাটির খোলা। চাইর খোলা পিঠা বানানোর জন্য লাগে চাইরখোলা। ভাঁজি করার জন্য  লোহা ও পিতলের ভাঁজাকাটা। ধান থেকে চাউল বানানো হয় ঢেকি পাড় দিয়ে। ঢেকি হলো কাঠের তৈরি। এর পিছা, কেরকি, মাথা, গুলাযুক্ত ওচা ইত্যাদি অংশ আছে। ঢেকি দিয়ে চিড়াকোটা হয় । ডাউল ভাংগানো ও পায়ড়া ছাতুর কাজে ব্যবহার হয় পাথরের তৈরি যাতা। যাতার দুইটা অংশ আছে । উপরের অংশ হাতল দিয়ে ঘুরানো হয় । উপরের ছিদ্র দিয়ে কলাই দিয়ে যাতা ঘুরালে যাতার চাপে কলাই ভেংগে যায় । বেশি ঘুরালে ভেংগে ছাতু হয়ে যায় । অনেকে নাস্তা হিসাবে পায়রার ছাতু খায় । মসলা বাটার কাজে ব্যবহার হয় পাথরের শীল-পাটা।

 

মোটা ধানের চাউল দিয়ে মুড়ি ভাঁজা হয় । মুড়ি ভাজতে প্রয়োজন ঝাঞ্জইর, ছাপ্নি ও বালুখোলা । বালুখোলায় বালু গরম করে তার মধ্যে চাউল ঢেলে দিলে চাউল গরমে ফুটে মুড়ি হয় । ভালোভাবে বালুর সাথে চাউল মেশার জন্য বালুখোলা দাঁড়িয়ে ঘুরাতে হয় । তখন বালুখোলার ভিতর হুম হুম করে শব্দ হয় । ছাপ্নির উপর ঝাঞ্জইর বসিয়ে ঝাঞ্জইরের মধ্যে বালুসহ মুড়ি ঢেলে দেয়া হয় । একজন কলাপাতার ডাইগ্যা দিয়ে ঝাঞ্জইরের বালু নাড়া দেয় । ঝাঞ্জইরের ছিদ্র দিয়ে বালু ছাপ্নিতে পড়ে। মুড়ি আলাদা হয়ে যায় । এই মুড়িতেও হাল্কা বালি থাকে । তাই এই মুড়ি চালা (চালুন) দিয়ে ছাকা হয় । চালা বাঁশের বেতি দিয়ে বুনানো হয় । চালাতেও চারকনা ছোট ছোট ছিদ্র থেকে । সেই ছিদ্র দিয়ে বালু পড়ে যায় কিন্তু মুড়ি থেকে যায় । ঝাইঞ্জরের ছিদ্র খুব শুরু কিন্তু অসংখ্য । এই জন্য গ্রামে একটা প্রবাদ আছে “ঝাইঞ্জরে কয় চালারে তোর নিচে এতো ছিদ্র কেনো?”

 

চাউল মাপার জন্য ব্যাবহার করে কাঠা । কাঠা বানায় বেত দিয়ে। মুড়ি ও চাউল ঢালার জন্য আছে বেতের তৈরি ঢাকি । বাঁশ দিয়ে বুনিয়ে বাটির বানায় । তার নাম ডালা । ভাতের চাউল পরিমাণ মতো বের করার জন্য আছে আইচা । নারিকেলের খুলি অর্ধেক করে কেটে আইচা বানানো হয় । ছোট ছোট বাচ্চারা আইচায় নিয়ে মুড়ি খায় । ফকিরকে (ভিক্ষুক) ভিক্ষা দেয়ার কাজেও আইচা ব্যবহার হয় । ফকির ভিক্ষা নেয়ার জন্যও আইচা ধরে । ফকির হাঁতে আইচা এবং কাধে ঝোলা নিয়ে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে । এজন্য গ্রামে একটা প্রবাদ আছে “এভাবে অপচয় করলে কয়দিন পর আইচা নিয়ে বাইরন লাগবো।”

 

গ্রামে নানা রকম শস্য উৎপাদন হয় । ধানে মধ্যে আছে চামারা, আলোই, নাজির শাইল, ভাতুরি, কালিজিরা, বিরই, কামক্ষামণি ইত্যাদি । এছাড়া আছে গম, ভুট্টা, পায়রা, জোয়াইর, বাজ্রা, চিনা, কাউন ইতযাদি । কালাই বা ডাউল জাতীয় শস্যের মধ্যে আছে মসুরী, খেশারী, মুগ, মাস, অরহর, বুট, মোটর ইত্যাদি । শত রকমের শাক সুবজিও আব্দ হয় গ্রামে । এসব চাষও হয় মান্দাতার আমলের সরঞ্জাম দিয়েই ।

 

খাওয়া ও গোসলের পানির জন্য আছে কুয়া । গোল করে ৫-৬ ফুট ব্যাসের একটা গর্ত করা হয় বাড়ির পালানে । ভুগর্ভস্ত পানি এর তলায় জমা হয় । মাটির ঠিলার (ছোট কলসি) গলায় দড়ি বেঁধে কুয়ার পানিতে ডুবিয়ে পানি তুলে কলস (কলসি) ভরা হয় । কলস কাকে নিয়ে মেয়েরা বাড়িতে পানি আনে । কলসে ২০-৩০ লিটার পানি ধরে । কলস কাকে নিয়ে মেয়েরা বাঁকা হয়ে হাটে । কলস কাঁকে নিতে নিতে মাজায় চয়রা পড়ে যায় । তাই, ধনি ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরা কলস কাকে নেয় না । ধনি মানুষের বাড়িতে পাটকুয়া (ইঁদারা) আছে । সিমেন্টের রিং বসিয়ে অথবা ইট দিয়ে গেঁথে গেঁথে পাটকুয়া বানানো হয় । পাটকুয়া অনেক গভীর হয় । সহজে ঠিলা তোলার জন্য চরকগাছ ব্যবহার করা হয় । কুয়ার পাড়ে একটা গাছের গুড়ি খারা করে গেড়ে তার মাথার চেংগিতে একটা লম্বা বাঁশের মাঝ বরাবর ফিট করা হয় । বাঁশের এক দিকে ঠিলার পানির চেয়েও বেশি ওজনের খাইটা বাঁধা হয়। অন্য মাথাতে ঠিলার গলায় বাঁধা দড়ির এক মাথা বাঁধা হয় । ঠিলা কুয়ায় নামিয়ে দড়ি নাড়িয়ে পানি গল্কিয়ে ঠিলা ভরে দড়ি ছেড়ে দিলে খাইটার ভারে চরকবাঁশ সোজা হয় আর ঠিলা উপরে উঠে আসে । কেউ কেউ একাজে কপিকলও ব্যবহার করে । কপিকলও অনেকে কাঠ দিয়ে বানিয়ে নেয় ।

 

কৃষি কাজের পাশাপাশি  নিজেরা খাবার জন্য ডোবা, জোড়া, পাগার, পুকুর, খাল, বিল, নদী, নালা থেকে বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে মাছ ধরে। এদের মধ্যে আছে ঠুই, বাইন্নাতি, ধিয়ারি, খুইয়া, জালী, ছিপজাল, ঝাকি ঝাল, খরা, ডল্লা জাল, কারেন্ট জাল, পলো, চাবী, চাকঝাল, ফছকা, কোচ, বর্শি ইত্যাদি। তারা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে খায়। এরমধযে আছে পুটি, টেংরা, গোলসা, খৈলসা, চাটা, মলা, ঢেলা, চেলা, রাগা, ছাইতান (টাকি), নোন্দা, কৈ, শৈল, গজার, বোয়াল, চিতল, কাতল, রুই, কাল্কিনি, বাউস, কাইক্কা, বালুখাইকা (বাইল্লা), জিয়ল (শিং), মাগুর, আইর, গুজা, পাংগাস, বেত রঙ্গা, গুত্তুম, চিরকা, বাইম ইত্যাদি ।

 

আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম আসাতে মান্দাতার আমলের অনেকগুলি সরঞ্জাম বিলুপ্ত হয়েছে। অনেকগুলি বিলুপ্তির পথে। আরও অনেক কিছু বিলুপ্ত হবে । উন্নত জাতের হাইব্রিড শস্য ঊদ্ভাবনের দ্রুত সেগুলি গ্রামের কৃষকরা আবাদ করছে । তাই, মান্দাতার আমলের ফসলও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে । মাছের মধ্যে তো গুটি কয়েক টিকে আছে । হাইব্রিড মাছে বাজার ছেয়ে যাচ্ছে । হাইব্রিড গরু, ছাগল, মুর্গি উৎপাদন হচ্ছে খামারে। আদি জাতের গরু, ছাগল ও মুর্গিও বিলুপ্তের পথে ।

 

আমার এখন অনেক বয়েস হয়েছে। প্রায় ৬২ বছর হবে। সব সরঞ্জামের কথা মনে করতে পারছি না। সব ফসল, মাছ ও পুশুপাখির নাম মনে করতে পারছি না । আমার স্মরনে যা এলো তা আপাতত লিখলাম। এছাড়া অনেক রকম কৃষি সরঞ্জাম ছিল মান্দাতার আমলের। আধুনিক যন্ত্রপাতির যুগে এগুলো ধ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বাংলার ঐতিহ্য, বিশেষ করে আমাদের সখিপুরের ঐতিহ্য, যারা স্মরণ রাখতে চান তাদের জন্য আমার এই লেখাটি কিছুটা উপকারে আসতে পারে মনে করে লিখে রাখলাম।

১৩/০৫/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কোবিড-১৯ লকডাউন

উপলক্ষে ঘরে অবস্থানকালীন সময়ে লেখা

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.