মাসুমের পায়ের ফোঁড়া

মাসুমের পায়ের ফোঁড়া
(রোগের গল্প)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

মাসুম ক্লাস ফোরে পড়ে। তার শরীরের ভিতরে কে কে বাস করে, আর কি কি চলাচল করে তা এখনো সে জানে না। তার হৃদপিন্ড রক্ত পাম্প করে। সারা শরীরের দুষিত রক্ত শিরার মাধ্যমে পাম্প করে এনে পালমোনারী ধমনির মাধ্যমে ফুসুফুসে পাঠায়। মাসুম নি:স্বাসের সাথে বাতাস থেকে অক্সিজেন নেয় ফুসফুসে। প্রস্বাসের সাথে ফুসফুস থেকে দুষিত গ্যাস কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দেয়। রক্ত ফুসফুসে অক্সিজেন গ্রহন করে আর কার্বন ডাই অক্সাইড পরিত্যাগ করে। মাসুম এখনো জানেই না যে তার শরীরের ভিতর শীরা, উপশীরা, ধমনি, সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম রক্ত নালী দিয়ে অনবরত রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। সেই রক্তের সাথে ভাসমান অনেক কণিকাও চলাচল করছে। শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও পদার্থও রক্তের সাথে প্রবাহিত হচ্ছে। ঝাকে ঝাকে লোহিত কণিকা প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলির গোলাকৃতি কিন্ত মাঝখানে দুইদিক থেকে চেপ্টা। এগুলির ভিতর লোহার লাল দানা থাকে তাই এইগুলি লাল। এইগুলির জন্য মাসুমের রক্ত লাল। মাসুমের রক্তে আরেক ধরনের রক্ত কণিকা আছে যেগুলি সাদা। তাই এগুলিকে শ্বেত কনিকা বলা হয়। শ্বেত কনিকাও আবার আকার আকৃতি অনুসারে পাঁচ রকমের আছে। তার মধ্যে ৫০% থেকে ৭৫% ই নিউট্রোফিল। শ্বেত কনিকাও গোলাকৃতি। সব চেয়ে ছোট এক ধরনের রক্ত কনিকা আছে মাসুমের রক্তে এদের নাম অনুচক্রিকা। নানান রকম রোগে এইসব কণিকা কম বেশী হয় বা আকার আকৃতির পরিবর্তন হয়। প্যাথলজিস্টগণ দেখে বুঝতে পারেন। তাই রোগাক্রান্ত হলে রক্ত পরীক্ষা করা হয়।

যাহোক, মাসুমের বাবার আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো না। মাসুম পড়াশুনা করার পাশাপাশি বাবার কাজে সহায়তা করে। একদিন মাসুমের বাবা টিনের চালায় লাকড়ি শুকানোর জন্য চালের উপর উঠান থেকে ছুড়ে মারছিলেন। বাবার দেখাদেখি মাসুমও একটা লাকড়ি টিনের চালে ছুড়ে মারলো। কিন্ত সেটা বারান্দার চালের কিনারে লেগে বাধা পেয়ে ঘুরে এসে মাসুমের পায়ের উপর পরলো। মাসুম ব্যাথা পেয়ে মাগো বলে কান্না করতে লাগলো। বাবা দেখেন মাসুমের পা ফুলে গেছে, লাল হয়ে গেছে, ব্যথায় হাত দেয়া যাচ্ছে না। পা নাড়াতেও পারছে না। তার যে এই অবস্থা হয়েছে এই অবস্থাকে ডাক্তারগন বলেন প্রদাহ। লাকড়ির আঘাত লাগার সাথে সাথে কয়েক সেকেন্ডের জন্য যায়গাটা ফেকাসে হয়ে গিয়েছিল। কারন, অল্পক্ষণের জন্য ওখানকার রক্তনালী চুপশে গিয়েছিল। এন্ডোথেলিন নামের এক রসের কারনেই রক্তনালী চুপশে গিয়েছিল। তারপর রক্তনালী স্ফীত হতে থাকে। তাতে ঐস্থানে রক্তের পরিমান বেড়ে যায়। তাই ফুলে উঠে এবং লাল হয়ে যায় এবং গরম লাগে, কারন রক্ত গড়ম । স্নায়ু থেতলিয়ে উম্মুক্ত হয়ে যায় এবং প্রোস্টাগ্লান্ডিন রসের কারনে ওখানে মাসুম ব্যাথা পেতে থাকে। মাসুমের বাবা পা টা গামছা দিয়ে মুছে দেখেন চামড়া কিছুটা ছিড়ে গেছে। সামান্য রক্ত বেরোচ্ছে। রক্তনালী ফেটে গিয়ে রক্ত বের হয়েছে। কিন্ত একাই রক্ত ঝরা বন্ধ হয়েছে। কারন, রক্তের মধ্যে যে অনুচক্রিকা আছে সেগুলি দলে দলে এসে ছিদ্রের মধ্যে জমা হয়ে ছিদ্র বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু তাই না, রক্তের মধ্যে যে প্রোটিন আছে সেই প্রোটিনের ফিফ্রিনোজেন থেকে ফিব্রিন সুতা তৈরি হয়ে অনুচক্রিকার উপর জালের মতো করে আটকিয়ে দিয়েছে যাতে ছিদ্র খুলে না যায়।

যাহোক, রক্ত পড়া বন্ধ হল। মাসুমের বাবা ক্ষতস্থানটা টিউবওয়েলের পানি দিয়ে পরিস্কার করে ব্যাথানাশক মলম লাগিয়ে দিলেন। মাসুম ঘুমিয়ে পড়লো। পরেরদিন খেলা ধুলা দৌড়া দৌড়ি কাজ কর্ম ঠিকই করল। কিন্তু তার পরেরদিন পায়ের ক্ষতস্থানে নতুন করে ব্যথা করা শুরু করল। আবার ফুলে গেলো, গরম হলো, লাল হলো এবং ভিষন যন্ত্রণা হলো। কারন, লাকড়ির আঘাতে যেখানে চামড়া ছিড়ে গিয়েছিল সেখান দিয়ে স্টেফাইলো কক্কাস জীবাণুরা চামড়ার নিচে নরম টিস্যুতে ঢুকে পড়লো। মনের আনন্দে টিস্যুর খাবার খেয়ে জীবাণুরা বংশ বৃদ্ধি করা শুরু করল এবং টিস্যু নষ্ট করা শুরু করলো। জীবাণুরা খাওয়াখাদ্য করার সময় নানারকম বিষাক্ত পদার্থ ফেলতে লাগল টিস্যুতে। সেই গুলি রক্তের সাথে প্রবাহিত হয়ে অস্থিমজ্জায় গিয়ে খবর দিলো যে মাসুমের পায়ে জীবাণুরা আক্রান্ত করেছে তাদের প্রতিহত করার জন্য সৈন্য সামন্ত পাঠাতে হবে। অস্থিমজ্জা বেশী বেশী শ্বেত কনিকা তৈরি করে ঝাকে ঝাকে রক্তে পাঠানো শুরু করল। বিশেষকরে নিউট্রোফিল সৈন্যই বেশী পাঠালো। এরা রক্তের স্রোতের মাঝ বরাবর চলে যাচ্ছিল। পায়ের ক্ষত স্থানে পৌছে দেখে সেখানকার রক্তনালী স্ফিত এবং স্রোতের গতিও কম। তাই তারা রক্ত নালীর কিনারে এসে ভিড় করল। কিছুক্ষণ তারা মার্বেলের মতো গড়িয়ে অগ্রসর হলো। তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলো। একময় দেখে রক্ত নালীর দেয়ালে একটু ফাক আছে। নিউট্রোফিলদের গায়ের আবরণ রাবারের মত নরম। নিউট্রোফিলরা গায়ের আবরনের কিছু অংশ প্রথমে ফাক দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর শরীরেরও কিছু ফাক দিয়ে ঢুকে পড়ে। শেষে শরীরের বাকীটুকুও রক্ত নালীর ভিতর থেকে বের হয়ে আসে। এইভাবে লাখো লাখো নিউট্রোফিল রক্তনালী থেকে মাইগ্রেশন করে টিস্যু স্পেসে চলে আসে।

বাইরে এসে কিছুক্ষণ ভাবে কোন দিকে যেতে হবে। যেমন, একটা কুয়ায় জন্ম থেকেই অনেক বছর যাবৎ একটা ব্যাং বাস করতো। একদিন আষাঢ় মাসে প্রচুর বৃষ্টি হলে পানিতে কুয়া ভরে গিয়ে কিনারা পর্যন্ত পানি এসে গেলো। ব্যাংটা একটা বড় লাফ দিলে কুয়ার পাশের পানি ভরা মাঠে পড়ে গেলো। ব্যাংটি কোনদিন এতো পানি দেখে নি। শুনেছিল সবচেয়ে বড় পানির আধার হলো সমুদ্র। এই ক্ষেতের পানি দেখেই তার কাছে মনে হলো এইটাই সমুদ্র বা সাগর। অবাক হয়ে ব্যাংটি বলে বসল “খোদার দরিয়া কি এত বড়!” যারা সমুদ্র থেকে অনেক দূরে বাস করত তারা বড় দীঘি বা পুকুরকেই সাগর বলত। উত্তর বংগে এমন কয়েকটি সাগর আছে। যেমন, রাম সাগর, আনন্দ সাগর ও নীল সাগর। কিছুক্ষণ মনের আনন্দে সাতার কাটলো। তারপর আর বেশী ভালো লাগছিল না। কোন দিকে যাবে ভাবছিল। দেখলো ছোট ছোট ডানকানা মাছ আসছে। টপাটপ ধরে খাওয়া শুরু করল। যেদিকে মাছ বেশী ছিল সেইদিকে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল আরও অনেক ব্যাং ডানকানা মাছ ভক্ষণ করছে। সেইরূপ, নিউট্রোফিলরাও ঝাকে ঝাকে যেদিক থেকে জীবাণু গুলি থেকে নিঃসরিত পদার্থ আসছিল সেই দিকে আকৃষ্ট হয়ে যাওয়া শুরু করল। এটাকে বলা হয় কেমোটেক্সিস। দেখা পেলো জীবাণুদের সাথে। শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ জীবানুদের সাথে। যুদ্ধে জীবাণু ও নিউট্রোফিল উভয়ই মারা যেতে লাগলো। নিউট্রোফিলদের শরীর থেকে নিঃসরিত সাইটোকাইনদের থেকে খবর পেয়ে অস্থিমজ্জা আরও শ্বেত কণিকা তৈরি করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতে থাকলো। যুদ্ধে অনেক শ্বেত কনিকা বিশেষ করে নিউট্রোফিল ও জীবাণু মারা গেল। উভয় পক্ষই বেশ কিছু টিস্যু নষ্ট করল। রক্ত নালীর ফাক দিয়ে রক্ত থেকে প্লাজমা প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় পদার্থ সহ পানিও টিস্যুতে এসে জমল। পান, প্লাসমা প্রোটিন, মৃত নিউট্রোফিল, মৃত জীবাণু ও নষ্ট টিস্যু মিলে  পুঁজ তৈরি হল। এই ক্ষতিকর পুজকে আটকে দেয়ার জন্য পুঁজের চারিদিকে পর্দা তৈরি হলো। পুঁজ ভর্তি টিস্যুকে বলা হল এবসেস বা ফোঁড়া। পুঁজের চাপে ফোঁড়া টনটন করে ব্যাথা করতে লাগলো। যন্ত্রনায় ছটফট করতে লাগলো। মাসুমের মা ফোঁড়ার উপর দিয়ে চুনের প্রলেপ দিয়ে দিল। ফোঁড়া যাতে ফেটে পুঁজ বের হয় এর জন্য চামড়ার উপর তেতুল লাগিয়ে দিল মাসুমের দাদী। এক ফকিন্নি বেটি ভিক্ষা করতে এসে দেখে বললো “পোলাডার পায়ে ছুত লাগছে। ” আরেক বেটি এসে বলল “পায়ে ছেংগা লাগছে। ” আরেক ফকির এসে বলল “পায়ে নাঁড়া লাগছে।” পাড়ার গেদু ফকির এসে ছেংগা লাগার ঝাড়ফুঁক দিয়ে গেলো। বাড়ির আশে পাশে শেতশতে ময়লার সাথে ছুত থাকে। এই ছুত লাগলে তাদের ধারনা ঘাঁ ভালো হয় না। ছেংগা হলো সবুজ রঙের শুংগাওয়ালা লার্ভা পোকা এবং নাড়া হলো কালো শুংগাওয়ালা লার্ভা পোকা। তাদের ধারনা এই পোকার প্রসাব লাগলে ঘাঁ ভালো হয় না। রাতে মাসুমের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। রাতের খাবার খেলো না। মাসুমের ঘুম ঘুম ভাব কিন্তু ঘুমায় নাই। মাসুমের মা শিতানে বসে কপালে জলপট্টি দিয়ে দিচ্ছিলেন। মাসুম বড় বড় করে চোখ বের করে তাকালো। মাসুমের মা ভয় পেয়ে গেলো। মাসুমের বাবাকে ডেকে বললেন “মাসুম জানি কিবা করতাছে। আমার ভয় লাগতাছে।” মাসুমের বাবা এসে দেখেন মাসুম চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। বাবা আবার গিয়ে শুয়ে পড়লেন। মা জালালি ইসিম পড়া শুরু করলেন। মাসুরের শরীরে প্রোস্টাগ্লান্ডিন বেড়ে গেছে। তাই খুব বেশী জ্বর ও ব্যাথা। জ্বরের তাপিসে প্রলাপ বকতে লাগলো “বন্ডি, বি বি ই ঈ, বোংগা, কিলি বিলি, বন্ডি, মা মা নিক্কা নাইনকা, বো নি খামু না, যাইগা।” মাসুমের মা বলেন “বাবা, কি কও? কিছু খাবা? কলা খাবা? হরবি কলা আছে। দিমু? হক বিস্কুট আছে দিমু?” মাসুম কোন শব্দ করে না। মা একটু একটু চিনির পানি মুখে দিয়ে দেন। মাসুম চুটকিয়ে গিলে।

মাসুমের একুট ফেউজ রিয়েকশন হচ্ছে। তীব্র প্রদাহের কারনে শরীরে একুট ফেইজ প্রোটিন তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে সি-রিয়েক্টিভ প্রোটিন বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে ক্ষুধামান্দ্য, তন্দ্রাচ্ছন্ন, জ্বর, প্রলাপবকা ইত্যাদি হচ্ছে। আবারও প্রলাপ বকতে থাকলো। উপরের দিকে বড় বড় করে তাকালো। মাসুমের মার মনে হলো আজ্রাইল ফেরেস্তা তাকে নিতে এসেছে। মা বলতে লাগলো “খোদা, আমার কলিজার টুকরা বাজানরে কষ্ট দিওনা। তার রোগ আমারে দেও। আমি জুম্মাঘরে মোমবাতি দিমু। জানের বদলে জান দিমু। তাও আমার বাবারে নিও না।” মাসুমের বাবা ভাবে “মাসুমের মা তো মান্নত করতাছে। এইগুলি কিনব কি দিয়া। একটা ষাড় গরুর দাম তো অনেক। জানের পরিবর্তে জান দিব কেমনে?”

ভোর হল। জ্বর কিছুটা কমল। সামান্য ভালো বোধ হলো। স্কুলের মাস্টার সাব যাচ্ছিলেন বাড়ির কাছ দিয়ে। মাসুম কয়েকদিন স্কুলে যায় নি বলে খোঁজ নিলেন। দেখে পরামর্শ দিলেন গ্রামের কমিনিটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সাইকেল ভ্যানে শোয়াইয়ে মাসুমকে নিয়ে যাওয়া হলো গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিকে। সেখানে স্বাস্থ্য কর্মী মাসুমকে দেখে পরামর্শ দিলেন “রুগীর যে অবস্থা তা এখানে ব্যবস্থা করা ঠিক হবে না। উপজেলা হাসপাতালে নিতে হবে। তাই হল। সেখানে মেডিকেল অফিসার দেখে বললেন “পায়ে এবসেস বা ফোঁড়া হয়েছে। অনেক পুঁজ জমেছে। ইনসিসন এন্ড ড্রেইনেজ দিতে হবে। মানে সামান্য কেটে ছিদ্র করে সব পুঁজ বের করে গজ কাপড় ঢুকিয়ে রাখতে হবে। একদিন পর গজ বের করে খত পরিস্কার করতে হবে। প্রয়োজনে আরো কয়েকবার এভাবে ড্রেসিং দিলে ঘাঁ ভালো হয়ে যাবে।” প্রস্তুতি সরূপ রক্তের কয়েকটা টেস্ট করা হলো প্যাথলজি ল্যাব থেকে। তাতে দেখা গেলো টিসি কাউন্ট অর্থাৎ রক্তের শ্বেত কনিকার সংখ্যা বেরে গেছে। একুট ইনফ্লামেশন বা সাময়িক প্রদাহ হলে এমন হয়। ডিসি কাউন্টে নিউট্রোফিল পারসেন্ট বেরে গেছে। এটাও একই কারনে হয়। আরবিএস বা রক্তের সুগার সাভাবিক আছে। ডায়াবেটিস হলে সুগার বেশী থাকে। সুগার বেশী খেয়ে জীবানুরা আরো বংশ বৃদ্ধি করে । সহজে ফোঁড়া হয়। ফোঁড়া সহজে ভালো হয় না। মাসুমের মা বললেন
– ডাক্তার সাব, কাটাছিড়া না কইরা ক্যাপসুল খাইলে ফোঁড়া ভালা অইব না?”
– পুঁজের ভিতর দিয়ে ক্যাপসুলের এন্টিবায়োটিক বা জীবাণুনাষক ঔষধ সহজে প্রবেশ করতে পারে না। তাছাড়া অতগুলি পুজ শরীরের সাথে মিশে যেতে অনেক সময় লাগবে। পুঁজ বের করে দিলে বাকী জীবানু সহজেই কাবু হয়ে যাবে। অল্পকিছু নষ্ট পদার্থ যা থাকবে তা ম্যাক্রোফেজ কোষরা খেয়ে ফেলবে। ম্যাক্রোফেইজ রক্তের মনোসাইট শ্বেতকনিকার পরিবর্তিত রূপ। মনোসাইট টিস্যুতে এসে খেয়ে দেয়ে বড় হয়ে ম্যাক্রোফেজ নাম ধারন করে। যেটুকু খেতে পারবে না সেটুকু লসিকা নালী দিয়ে লিম্ফ নোডে যাবে। সেখান থেকে পরিশোধিত হয়ে লসিকা নালী দিয়ে গিয়ে রক্তের সাথে মিশে যাবে। মাসুমের ইংগুইনাল রিজিওনে বা কোমড়ের চিপায় যে যায়গাটা ফুলে উঠেছে ওটাই লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থি। লিম্ফোসাইট কোষ বেড়ে গিয়ে এবং ম্যাক্রোফেজ জমে এমন বড় হয়েছে।
– এত কিছু বুঝি না। তবে আমরা এটাকে বলি বাইমা। কেউ কেউ কয় পায়ের ঘাঁয়ে পিচলায় গুড় গুড়ি টান দিছে। আমার জায়ে কয় বাগি টান দিছে। আইজকাইল কেউ কেউ এইগুলিকে টিমার কয়।

যাহোক, ওটিতে নিয়ে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে মাসুমের ফোঁড়া কেটে পুঁজ বের করে দেয়া হলো। একটা জীবাণুমুক্ত টেস্ট টিউবে সামান্য পুঁজ নিয়ে মাসুমের বাবার হাতে দিয়ে ডাক্তার সাব বললেন
– এই যে, এই পুঁজটা প্যাথলজি ল্যাবে কালচার পরীক্ষা করতে দিন।
– পুঁজ সব বের করা হয়েছে। তারপর পরীক্ষা কেন? কালচার পরীক্ষা কিরূপ?
– আমি জীবাণু মারার জন্য একটা এন্টিবায়োটিক ক্যাপসুল প্রেস্ক্রিপশন করেছি। সব জীবাণু সব এন্টিবায়োটিকে মারা যায় না। আশা করি আমি যে মেডিসিন লিখেছি তাতেই মারা যাবে জীবাণু। তারপরও কনফার্ম হওয়ার জন্য কালচার পরীক্ষা দিয়েছি।
– কালচার মানে কি।
– কালচার মানে হল আবাদ করা। কৃষক যেমন বীজতলায় বীজ ছিটালে দুই একদিন পর চারা গজায়। ঠিক তেমনি কাঁচের প্লেটে খাবার দিয়ে সেই খাবারে পুঁজ বা জীবাণুযুক্ত কিছু লেপ্টে দিলে সাধারণত ২৪ ঘন্টা পর জীবাণু বেড়ে গিয়ে খালি চোখেই বিভিন্ন কালার ও আবাদের আকৃতি দেখে জীবানুর বংশ চিনতে পারেন প্যাথলজিস্টগন। সেখান থেকে কিছু নমুনা আরেকটি প্লেটে লেপ্টে দিয়ে বিভিন্ন এন্টিবায়োটিকের চাকতি দিয়ে ইনকিউবেটর নামে যন্ত্রে আরো ২৪ ঘন্টা রেখে দিলে যে যে এন্টিবায়োটিকে সেনসিটিভ বা মারা যায় সেই চাকতির চারিদিক পরিস্কার থাকে। আর যেগুলি রেজিস্টেন্ট বা কাজ করে না তার চারিদিকে গ্রোথ বা আবাদ হয়। রিপোর্ট দেখে বুঝব আমার লিখা এন্টিবায়োটিকে কাজ করবে কিনা। না করলে দেখব কোনটিতে বেশী কাজ করবে।
– বুঝতে পারলাম। এটাতো একটা খুব ভালো পরীক্ষা।

পরীক্ষা করাতে দিয়ে ঔষধ নিয়ে ফিরে এলেন সবাই। মাসুমের মা মন্তব্য করলেন “ডাক্তারডা খুব ভালা।” ডাক্তার সাব উপদেশ দিয়েছেন ঘাঁ শুখানো পর্যন্ত একদিন পরপর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে ড্রেসিং করাতে হবে। তিন দিনের দিন কালচার রিপোর্ট দেখাতে হবে। সাত দিনেই ঘাঁ শুকিয়ে যাবে। তবে পুরাপুরি শক্ত হতে চার সপ্তাহ লাগবে।

সব কিছু ঠিক ঠাক মতো হলো। চার সপ্তাহ পর মাসুম আগের মতোই সব কিছু করতে লাগলো। মাসুমের মায়ের মনে হলো মান্নতের কথা। এক ডজন মোমবাতি আর একটা জানের বদলে জানের কথা। মাসুমের বাবার সংসারে এখন অভাব। মাঠ ভরা কঁচি সবুজ ধান। ঘরে ধান নেই। তেমন কামাই নেই। কি দিয়ে মান্নত কিনবেন? অগত্যা দুই ইঞ্চি লম্বা সাইজের এক ডজন মোমবাতি আর একটি মাঝারি সাইজের মোরগ কিনে আনলেন মান্নত দেয়ার জন্য। মসজিদে হুজুরের কাছে মান্নতের মোমবাতি দিলে হুজুর মন্তব্য করলেন “এখন কি আর মসজিদে এই পিচ্চি পিচ্চি মোমবাতির দরকার আছে। মসজিদে সৌর বিদ্যুৎ আছে। মোমবাতি লাগে না। আনছেন যখন রেখে দিলাম। ” মোরগটি নিয়ে গেলেন পীরের মাজারে। খাদেম সাব মোরগ পেয়ে মন্তব্য করলেন “এখন কি আর কেউ এত ছোট জিনিস মান্নত করে। খাশি ও ষাড়ের যুগ এখন।” মাসুমের বাবা মনে মনে বলেন “জানের বদলে একটা জান দিলেই হলো। এক ডজন মোমবাতি দেয়ার কথা ছিল। এক ডজন দিলেই হলো। যেমন অবস্থা তেমন ব্যবস্থা। ”

মাসুমের ছোট মামা এলেন সাইকেল নিয়ে টুনটুনিয়ে। সাইকেল দেখে মাসুমের খুশিতে আটখানা। সাইকেল রেখে মাসুমের মামা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এই সুযোগে মাসুম সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লো পূর্ব দিকে। এত দিন মাসুম সাইকেল চালাত সীটে না বসে সাইড দিয়ে পা দিয়ে। সীটে বসে সে পেডেল নাগাল পেতো না। সেদিন সে সীটে বসে সাইকেল চালাল। পায়ের আগা দিয়ে সামান্য ছোয়া পেলে পেডেলে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে কোমড় এদিক সেদিক বাকিয়ে সাইকেল চালাচ্ছিল। দেখে মাসুমের মা মন্তব্য করলেন “আংগ গেদা না বড় অইয়া গেল!” বাড়ির পুব পালানে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন মাসুমের মা। বিস্তির্ন মাঠ। সবুজ কঁচি ধান আর ধান। মাঠের আইল দিয়ে যেতে যেতে বলদ মারা ক্ষেত পার হয়ে মাসুম দৃষ্টির সীমানা ছেড়ে যাচ্ছিল। মাসুমের মা বাম হাত কোমড়ে, ডান হাত কপালে রেখে ডাক দিলেন “মাসুম, মাসুম, মাসুম, অত দূর যাসনেরে, বাবা।”


তারিখ : ৬/৬/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ