মাথা থেঁতলানো এক রুগী

মাথা থেঁতলানো এক রুগী
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৭ সনের দিকে আমি যখন টাংগাইলের নাহার নার্সিং হোমের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ছিলাম তখন একজন রুগীর গ্যাস্ট্রোজেজুনোস্টোমি অপারেশন হয়েছিল। প্রাইভেট ক্লিনিকে অপারেশন করালেও তার আর্থিক অবস্থা তত ভালো ছিল না। ক্রনিক ডিওডেনাল আলসার রুগীর চিকিৎসা না করালে আলসার শুকিয়ে এক সময় পাকস্থলীর শেষের অংশ অর্থাৎ পাইলোরিক পার্ট সরু হয়ে যায়। তখন বলা হয় পাইলোরিক স্টেনোসিস। এই অবস্থায় পাকস্থলীর খাবার সহজে ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করতে পারে না। তাই বলা হয় গ্যাস্ট্রিক আউটলেট অবস্ট্রাকশন। রুগীর বমি হয়। পচা ঢেঁকুর উঠে। সার্জন অপারেশন করে পাকস্থালীর সাথে জেজুনামের (ক্ষুদ্রান্ত্রের অংশ) লাইন করে দেন। এটাকেই বলা হয় গ্যাস্ট্রোজেনোস্টোমি। সেই রুগীর আমরা এই অপারেশন করেছিলাম। সার্জন ছিলেন ডাঃ রেজাউল ইসলাম।বি এস এম এম ইউ-এর মাননীয় সাবেক ভিসি, বর্তমানে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান খান তখন টাংগাইলে মেডিকেল অফিসার ছিলেন। তিনি এবং আমি সহকারী সার্জন হিসাবে ছিলাম এই অপারেশনে। রহস্যজনক ভাবে লক্ষ করেছি লোকটাকে দেখতে আসার মতো তেমন কেউ ছিল না। তাই আমি তার বিশেষ যত্ন নিতাম। লোকটা খুব নিরিহ প্রকৃতির ছিল। বয়স ৫৪/৫৫ বছর হবে।

অপারেশনের তৃতীয় দিন তিনি আমাকে বললেন
– ডাক্তার সাব, আমার মাথার এখানের চামড়া থেতলানো কেন। খুব ব্যাথা পাচ্ছি এইখানে।

আমি দেখলাম তার মাথার উপরে চামড়া থেতলানো। কালো যখম হয়ে গেছে। যেনো কেউ তার মাথায় কিছু দিয়ে বেশ কয়েকবার আঘাত করে থেতলিয়ে দিয়েছে। যাকে বলা যায় ছেচা মাইর। বা মাথায় ছেচা দিয়েছে কিছু দিয়ে। আমি চিন্তিত হলাম। তিন দিন আগে আমাদের ক্লিনিকেই তার অজ্ঞান করে পেটে অপারেশন করা হয়েছে। মাথায় ছেঁচা খাবে কেন? কিছু ব্যাখ্যা দিতে পারলাম না তাকে। এনিয়ে তাকে নানান প্রশ্ন করলাম। কিন্তু কোন ক্লু খুঁজে পেলাম না। ২৪ ঘন্টার মতো এ নিয়ে আমি চিন্তা করলাম। কিছুই বুঝলাম না। পরের রাতে তাকে ফলো আপ দিয়ে কিছুক্ষণ হাটিয়ে বারান্দায় চেয়ারে নিয়ে বসালাম। আমিও তার সামনে একটা চেয়ার নিয়ে বসলাম। বারান্দা থেকে পশ্চিম আকাশে পুর্নিমার চাঁদ দেখা যাচ্ছিল। আমি মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করছিলাম আর রুগীর সাথে কথা বলছিলাম। রুগীকে বুঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে আমাদের অপারেশন করার সময় বা তার আগে পরে আপনার মাথায় ছেঁচা লাগার মতো কারন আমি খুজে পাচ্ছি না। আমি এজন্য দুঃখিত। রুগীর সামনে একটা বারান্দার পিলার ছিল। হঠাৎ রুগী বলে উঠলো
– ডাক্তার সাব, আমি মাথা ছেঁচার কারণ খুঁজে পেয়েছি।
– কি কারন?
-অপারেশনের আগেদিন গভীর রাত পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় আমার ঘুম আসছিল না। আমি চেয়ার নিয়ে বারান্দায় ঠিক এইভাবে এখানে বসেছিলাম। আমি একজন নিরিহ গরীব মানুষ। আমি জীবনে কারো ক্ষতি করি নাই। সংসার চালাতে গিয়ে খুব কষ্ট করেছি। কিছু টাকা নিয়ে বন্ধুর সাথে ব্যবসায় নেমেছিলাম। সেই বন্ধু আমার ব্যবসার পুঁজি মেরে দিয়েছে। সেই বন্ধুর সাথে আমার শত্রুর সম্পর্ক হয়। আমাকে ঘায়েল করার জন্য একটা ঘুনের আসামী করে দেয়। কোন অপরাধ না করেও আমাকে অনেকদিন জেল খাটতে হয়। আত্বীয় স্বজনরা আমাকে অপরাধী ভাবে। তাই তারা অনেকেই দূরে সরে গেছে। সেই খুনের মামলা থেকে খালাস পেতে উকিলের পিছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করেছি। সব টাকা পয়সা শেষ করে একদিন আমাকে মামলা থেকে খালাস দিল। যেদিন খালাসের রায় হবার কথা ছিল সেদিনও উকিল আমার কাছ থেকে ৪০০ টাকা খসিয়ে নিল মাত্র এক শলা সিগারেট কিনিয়ে।
– বুঝলাম না। এক শলা সিগারেট, আবার ৪০০ টাকা?
– হ্যা, এক শলা সিগারেটের দাম ৪০০ টাকা হয় কিভাবে? সিগারেট তো ১/২ টাকা শলা। আমিও ত তাই জানি। কিন্তু ঐ উকিল খায় ৪০০ টাকা দামের সিগারেট।
– মাথা ঠিক আছে তো?
– মাথা ঠিকই আছে।
– তাইলে, এক শলা সিগারেটের দাম ৪০০ টাকা হয় কেমনে?
– যেদিন আমার রায় হয় সেদিন সকালে উকিল আমাকে বললেন ‘তোমার কাছ থেকে অনেক টাকাই নিলাম। তাতে তোমার উপকারই হয়েছে। তুমি আজ খালাস পাচ্ছ। তোমার কাছে আর কিছু চাইব না, শুধু একটা সিগারেট খাওয়াও।’ আমি এক প্যাকেট গোল্ড লিফ সিগারেট কিনে এনে উকিলকে দিলাম। কিন্তু উকিল বলল ‘আমি অন্য সিগারেট খাইনা। তুমি এই সিগারেটটা আনো। এটা সব দোকানে পাবে না। এটা পাবে অমুক যায়গার অমুক দোকানে। এক শলার দাম কিন্তু ৪০০ টাকা।’ এই বলে আমার হাতে একটা সিগারেটের নাম লিখা ছোট কাগজের টুকরা দিলেন। সেই দোকান থেকে ৪০০ টাকা দিয়ে একটা সিগারেট এনে উকিলকে দিলাম। আমার খালাসের রায় হলো। উকিল যেমন টাকা কামাই করে, ভাংগেও তেমন। এক সিগারেট খেয়ে শেষ করে ৪০০ টাকা।

আমি রুগীর এই কথাটা বিশ্বাস করলাম না। বললাম
– ঠিক আছে, আপনার মাথা থেঁতলে গেলো কেমনে সেইটা বলেন।
– ও, হ্যা। আমার জীবনের এই করুণ দশা নিয়ে অপারেশনের আগের রাতে ভাবতে ভাবতে ঘুম আসলো না। এখানে এই বারান্দায় বসে আক্ষেপ করে আল্লাহ্‌র কাছে বললাম ‘আল্লাহ্‌ আমি তোমার কাছে কি অপরাধ করেছিলাম? বন্ধু আমার ব্যবসার পুঁজি মেরে খেলো তুমি তার বিচার করলা না। বিনা অপরাধে আমাকে জেল খাটাইলা, আত্বীয়স্বজন দূরে চলে গেলো। মামলা থেকে খালাস পেতে প্রচুর টাকা খোয়াইলাম। আমার পেটে এমন অসুখ দিলা সারাজীবন পেট বেদনায় কষ্ট করাইলা। শেষে যা ছিল তাই দিয়ে অপারেশন করাইতে চলে যাচ্ছে। বাকী জীবন কি আমাকে এমন করেই কাটাতে হবে? কিন্তু কেনো? কেনো? কেনো? আমি কেনো কেনো করেছি আর আক্ষেপ করে এই পিলারে মাথা ঠুকিয়েছি চেয়ারে বসে । তখন আমি বেহুশ ছিলাম। তাই মাথায় ব্যথা পাই নি। সেই কারনেই হয়তো আমার মাথা থেতলিয়ে গেছে। এইটাই আসল কারন।
– তাই বলেন। আমি আপনার মাথা দেখার পর খুব ভেবেছি কিভাবে হতে পারে? ঠিক আছে ভালো হয়ে যাবে।

এবার আমার বিশ্বাস হলো তার মাথা থেঁতলানোর কারন। তিনি সিনেমার নায়করা যেমন পার্কের গাছে মাথা ঠুকেন তেমনি বারান্দার পিলারে মাথা ঠুকিয়ে থেতলিয়ে দিয়েছিলেন নিজের মাথা। কিন্তু ৪০০ টাকা দিয়ে সিগারেট কেনার কথা আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। রুগীর বাওয়েল সাউন্ড ও পায়ুপথে গ্যাস পাস করার পর ডাবের পানি খেতে দিয়েছিলাম। তারপর পাউরুটি খেতে দিয়েছিলাম। রুগীর পায়খানা হবার পর এক নম্বর ডায়েট খেতে বলেছিলাম। অষ্টম বা নবম দিনে সেলাই কেটে দিয়েছিলাম। রুগী জানালেন
– আমার ভালো খুধা হয়। হজমও ভালো হচ্ছে। এখন কি সব খেতে পারবো?
– খেতে পারবেন।

পরেরদিন গিয়ে দেখি রুগী এবডোমেন ডিস্টেন্ডেট অর্থাৎ পেট ফুলে গেছে। রুগী অসস্থি অনুভব করছে। কেমন যেন ছট ফট করছে। খারাপ অবস্থা। আমি তাড়াতাড়ি ডাঃ রেজাউল ইসলাম স্যারকে কল দিলাম। স্যার চলে গেছেন ঢাকায়। আমার সিনিয়র ডাঃ কামরুল ভাইকে কল দিলাম। তিনি দেখে বললেন
– আপনি গতকাল কি খেয়েছিলেন?
– পোলাও মাংস ও পায়েস।
– পোলাও মাংস পায়েস খেতে গেলেন কেন?
– ডাক্তার সাবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সব খেতে পাড়ব কিনা। ইনি বললেন পাড়ব। তাই, গিন্নিকে বলেছিলাম কতদিন পোলাও মাংস পায়েস খাইনা। অপারেশনের পর বেশ খুধা লাগতো। হজমও হতো ভালো। তাই পেট ভরে পোলাও মাংস পায়েস খেয়েছিলাম। এখন দেখছি একটাও পাস করছে না। উ, উ, উ।
– ঠিক আছে। এখন আর মুখে কিছু খাইয়েন না পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত। যা করতে হবে ডাঃ সাদেক তালুকদারকে বলে দিচ্ছি। ডাঃ সাদেক, রুগীগে ন্যাজোগ্যাস্ট্রিক সাকশন দাও। আই ভি ফ্লুইড দাও।

আমি নাক দিয়ে টিউব ঢুকিয়ে সিরিঞ্জ দিয়ে টেনে রুগীর পাকস্থলির সব খাবার বের করে ফেললাম। সেলাইন লাগালাম শিরায়। এইভাবে চিকিৎসা দেয়ার পর ভালো হয়ে সেই রুগী চলে গেলেন ক্লিনিক থেকে।

তার কয়েকমাস পর এক রুগীর ওভারিয়ান টিউমার অপারেশন হলো আমাদের সেই নার্সিং হোমে। তার স্বামী ছিলেন মাদক নিয়ন্ত্রন বিভাগের টাঙাইল জেলার প্রধান। অফিসারটি খুব ভাল ছিলেন। একদিন সেই বারান্দায় বসে বিভিন্ন রকমের মাদক নিয়ে তার সাথে আমি আলাপ করলাম। এটা আমার অভ্যাস। অন্য বিষয়ের উপর কারো কোন জ্ঞান থাকলে তার সাথে আলাপ জমিয়ে সেই বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করতে চেষ্টা করি। জানতে পারলাম সিগারেটের মতো করে বানিয়ে তার ভিতর মাদক রেখেও মাদক বিক্রি হয়। তখন আমি সেই রুগীর ঘটনা উল্লেখ করে বললাম
– ৪০০ টাকা দিয়ে একটা সিগারেট কিনায় এক উকিল। আমি বিশ্বাস করি নাই। এখন আপনার কথায় মনে হচ্ছে ওটা সিগারেট না, ওটায় মাদক ছিল।
– ঠিক বুঝেছেন। ওটায় মাদক ছিল। আপনি কি দোকানের অবস্থান বলতে পারবেন? আমি সোর্স পাঠাবো।
– না, আমি চিন্তাই করতে পারি নাই তখন যে ওটায় মাদক ছিল। এখন বিশ্বাস হচ্ছে যে এক শলা সিগারেটের দাম ৪০০ টাকা।

মাথা থেঁতলানো রুগীর মাধ্যমে শিখার ছিল অনেক কিছু। তাই তাকে আজও মনে পড়ে।

১৩/৮/২০১৯ খ্রী