মিয়া কাক্কুর মাতাব্বরি

মিয়া কাক্কুর মাতাব্বরি
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাবার চাচা মেছের উদ্দিন তালুকদারের ছিল ৫ ছেলে। সবার ছোট ছেলে সালাম তালুকদারকে আমরা ডাকতাম ছোট কাক্কু। ছোট কাক্কু তার প্রথম ভাই সোলায়মান তালুকদারকে ডাকতেন বড় ভাই, ২য় ভাই শাসসুদ্দিন তালুকদারকে ডাকতেন মেঝো ভাই, ৩য় ভাই হাছেন আলী তালুকদারকে ডাকতেন সাজ ভাই, ৪র্থ ভাই কাশেম তালুকদারকে ডাকতেন মিয়া ভাই। আমরা তাদের ভাতিজা হিসাবে ডাকতাম যথাক্রমে বড় কাক্কু, ডাক্তার কাক্কু, মাজ কাক্কু ও মিয়া কাক্কু। মিয়া কাক্কু এলাকায় মাতাব্বরি বা মাদবরি করতেন ।

একদিন কথাপ্রসঙ্গে তিনি একটা মাদবরির কথা আমাকে বলেছিলেন। আন্দি না বেরীখোলা গ্রাম এখন আমার মনে আসছে না। সেই গ্রামে জমি নিয়ে একটা কয়চান (ঝগড়া) ছিল শরীকদের মধ্যে। সেই কয়চান মিটানোরর জন্য সাত গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছিল একটা সালিশে। সেই সালিশে সাত গ্রামের বড় বড় মাদবর উপস্থিত ছিলেন। বাসার চালার কায়েম উদ্দিন সরকারও উপস্থিত ছিলেন। একে একে সব বড় বড় মাদবরগণ বিচার করে বিফল হলেন। তাদের বিচার কোন পক্ষই মেনে নিলো না। হট্টগোল শুরু হয়ে গেলো। মারমুখী ভাব উভয় পক্ষে। মিয়া কাক্কু চুপ চাপ বসেছিলেন। কাক্কুর স্বভাবই ছিল কম কথা বলা। যা বলতেন কাজের কথা বলতেন। শেষে নিরুপায় হয়ে একে একে সবাই বিচারের ভার দিলেন মিয়া কাক্কুর কাছে। সবাই একযোগে অনুরোধ করলেন “তালুকদার সাব বিচারটা করেন। ” মিয়া কাক্কু বিচারের ভার নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। সবাই বেশী করে অনুরোধ করলে মিয়া কাক্কু বললেন “আপনারা তো আমার উপর বিচারের ভার দিচ্ছেন। আমি বিচার করে রায় দিলে উভয় পক্ষ মেনে নিবেন কিনা তা জেনেছেন?” উভয়পক্ষ হাত উঠিয়ে সম্মতি প্রকাশ করল। উপস্থিত জনগণও হাত উঠিয়ে সম্মতি জানালো। কাক্কু বললেন ” আমি যা বিচার করব তা আপনারা সবাই যদি মেনে নেন, তাহলে আমি বিচার করব, না হলে করব না। ” সবাই এক যোগে “হ্যা”বললেন। কাক্কু জমির দলিল পত্র উভয় পক্ষ থেকে নিয়ে নিলেন। পড়ে দেখলেন। দলিল মুড়িয়ে চোঙা বানিয়ে ফিতা দিয়ে বাঁধলেন। মাঠের এক কোণায় রেখে দিয়ে বললেন “আমি যদি বিচার করি তাহলে আপনারা কেউ এই দলিল দেখতে পারবেন না। এই যে আমি দলিল বেধে রেখে দিলাম। যতদিন আমার রায় অনুসারে দেয়া জমি আপনারা ভোগ করবেন ততদিন কেউ এই দলিল খুলে দেখতে পারবেন না। রাজী আছেন?” সবাই রাজী হলে কাক্কু জমি দেখিয়ে বললেন “এই জমিটুকু তোমার আর এই জমিটুকু ওনার।” কেউ আর এর দ্বিমত করতে পারলো না। কারন, সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে বিচার যাই হোক মেনে নিতে হবে।
আমি বললাম “কাক্কু, আপনি দলিল বেধে রাখলেন কেন?” কাক্কু বললেন “ঐ দলিল গুলিই হল ঝগড়ার মুল কারন। দলিল দিয়ে বিচার করলে কোনদিন বিচার শেষ হবে না। তারপর তাদের মধ্যে আর জমি নিয়ে ঝগড়া হয় নাই। ”

কাক্কু ইন্দ্রজানী হাটে একটা মজার কাইন্ড ঘটিয়েছিলেন। আগের দিনে হাটে গরু ছাগল জবাই করে মাংস বিক্রেতারা কলারপাতা অথবা বাঁশের বেতীর ধাড়ি বিছায়ে ৫ টাকা, ১০ টাকার ভাগা দিয়ে মাংস বিক্রি করতো। পাহাড় অঞ্চলে ঘাসের খুব অভাব ছিল। বেশীভাগ গরু ছাগল অপুষ্ট বা খোয়ার ছিল। মাংসে তেল থাকতো না। তেলছাড়া মাংস স্বাদ লাগতো না। তাই সবাই তেলওয়ালা মাংস পছন্দ করতো। বিক্রেতারা মাংস ভাগা দেয়ার সময় হাড্ডি নিচে রেখে মাংস দিয়ে ঢেকে দিতো। মাংস লাল করার জন্য রক্ত মেখে দিতো। তেল তেল দেখানোর জন্য পেটের নাড়িভুঁড়ির তেল নিয়ে মাংসের ভাগার উপর দিয়ে ছড়িয়ে দিতো। এখন এর চেয়েও মানুষ বেশী চালাক হয়েছে। একি সাথে তাজা গরু ও প্রায় মরা গরু জবাই করে কৌশল করে মিক্সার করে করে বিক্রি করে। মাংস লাল করার জন্য কেমিকেল রঙ ব্যবহার করে। আরো কত কি যে করে। সব জানা কি আমাদের সম্ভব? ইন্দ্রজানীর হাটের সেই মাংস বিক্রেতার ভাগাগুলির উপর তেলের পর্দা দিয়ে ঢাকা ছিল। মিয়া কাক্কু ভিতরের মাংসের অবস্থা দেখার জন্য আংগুল দিয়ে পর্দা সরাতেই মাংস বিক্রেতা থাবা দিয়ে কাক্কুর হাত সরিয়ে দিয়ে পর্দা দিয়ে আবার মাংস ডেকে দেয়। তাতে কাক্কু অপমানিত বোধ করেন। কিন্তু কিছু না বলে তিনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন অনেক্ষণ। আরেকজন ক্রেতা কাক্কুর মতো করে যেই মাংসে আংগুল দিয়েছেন অমনি তার হাত থাবা মেরে সরিয়ে বিক্রেতা বলে “এই মিয়া ভাগা নষ্ট কর কেন?” শুরু হয়ে গেলো দুই জনের মধ্যে ঝগড়া। জনগণ কাক্কুর কাছে বিচার দিলে কাক্কু বললেন “আমি এখানে দাড়িয়েই ছিলাম। এই ব্যাটা তার হাতে থাবা মারছে। ব্যাটা মরা গরুর মাংস তেল দিয়ে ঢেকে বিক্রি করছে, আর আংগুল দিয়ে দেখলে থাবা মারে। ওর সব মাংস পাগাড়ে নিয়ে ফেলে দে।” বিক্রেতা বিপদে পড়ে কাক্কুর কাছে মাপ চাইল।

হাট থেকে ফেরার সময় জিজ্ঞেস করলাম “কাক্কু, আপনাকেও তো থাবা মেরেছিল। তখন কিছু বললেন না কেন?” “কাশেম তালুকদারকে কশাইয়ে থাবা মারছে মানুষ জানলে ইজ্জৎ যাবে। তাই তখন ঝামেলা না করে অপেক্ষা করছিলাম অনুরূপ আরেকজনের সাথে করুক। তখন বুঝা যাবে। ”
এমনই ছিল মিয়া কাক্কুর মাতাব্বরি।

১০/৬/২০১৯ ইং
ময়মনসিংহ