মীর্জা স্যারকেও হজ্জ করালাম

মীর্জা স্যারকেও হজ্জ করালাম
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

২০০৫ সনের জানুয়ারি মাসে হজ্জ করে দেশে ফিরলাম। এই ৪০ দিনে অনেক কাবু হয়ে পড়েছিলাম। নিজেকে বেশ শুদ্ধ মানুষ ভাবতাম। যাকে পেতাম তাকেই বিভিন্ন বিষয়ে হেদায়েত করার চেষ্টা করতাম । হজ্জ করার গুরত্ব তুলে ধরতাম । যুবক বয়সেই হজ্জ করতে হয় তা যুবক শ্রেণীর লোকদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করতাম । অনেকেই এমন বলতেন “আমি আর কয়েকটা বছর পর হজ্জ করে দাড়ি রাখবো।” তারা মনে করতেন হজ্জ করলে দাড়ি রাখতে হয় । হয়তো দাড়ি রাখার ভয়েই হজ্জ করছেন না । আমি সেই ভয় ভাঙ্গিয়ে বলতাম “হজ্জের সাথে দাড়ি রাখার সম্পর্ক নেই।” আমি দাড়ি রেখে টুপি মাথায় দিয়ে রাখতাম । বিজ্ঞজনের মতো কথা বলতাম । তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলাম। হজ্জ থেকে ফিরে আগের মতো কর্মস্পৃহা পেলাম না। মীর্জা হামিদুল হক স্যার ছিলেন বিভাগীয় প্রধান। স্যার খুব ভ্রমণ পিপাসু ছিলেন। বিশ্বের সব গুরুত্বপুর্ণ পর্যটন স্থান তার দেখা প্রায় শেষ। দেশেরও সব কিছু তার দেখা শেষ। যেসব দুর্দম জায়গায় কেউ যেতে পারেনা সেইসব জায়গায়ও তিনি ছদ্মবেশ ধরে যেতেন। সেইসব কাহিনী শোনার একমাত্র একাগ্র শ্রোতা ছিলাম আমি। হজ্জ থেকে এসে আমার খুব ইচ্ছা হতো হজ্জের দিনগুলির কথা অন্যের কাছে বলতে। মীর্জা স্যারের কাছেও বলতে ইচ্ছা হতো। শুরু করতাম বলতে। কিন্তু তিনি শুনতে তেমন আগ্রহ দেখাতেন না । উল্টো আমার কথা কেরে নিয়ে ইসলামের বিধানে যেগুলি নেই অথচ সেগুলি ইসলামের মধ্যে ঢুকে গেছে এমন সব নেতিবাচক কথাগুলি বলে আমাকে থামিয়ে দিতেন। স্যার ছিলেন আমার শ্রদ্ধার পাত্র। তাই স্যারের কথাই শুনতাম বসে বসে। স্যার নামাজ রোজা কম করতেন।

এমনি একদিন স্যার প্যারিস ও মিশরের বিখ্যাত স্থাপনা নিয়ে গল্প করছিলেন আমার সাথে। আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। তিনি আমাকে উপদেশ দিচ্ছিলেন “সাদেক, নিজে কামাই করবেন। নিজে ভোগ করবেন নিজের টাকায়। ভ্রমনের মত মজা নাই। দেখেন না আমাকে। পৃথিবীর সব দেখার জিনিস প্রায় দেখে ফেলেছি।” আমি বললাম
– যত কিছুই দেখে থাকেন না স্যার, আসল জিনিস দেখেন নাই।
– কি জিনিস দেখি নাই?
– পৃথিবীর প্রথম স্থাপনা। যেটা  পৃথিবীর প্রায় সব দেশের লাখো লাখো মানুষ হাজার বছর ধরে দেখতে যায়।
– সেটা কি? কোন দেশে?
– সেটা স্যার, কাবা শরিফ, সৌদি আরবের মক্কায়। এটাই পৃথিবীর প্রথম স্থাপনা। আমি দেখে এসেছি। আপনি দেখেন নি।
– সাদেক, আপনি আছেন আপনার তালে।
– যেই তালেই থাকি আমি কাবাঘর দেখেছি। তার বাহিরের অংশে নামাজ পড়েছি। তার দেয়ালে হাত রেখেছি। হজরত আবুবকর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ)-এর বাড়ির দেয়ালে হাত রেখেছি। আপনি পারেন নি।
– কি কন এইবারই দেখতে যাব। আপনি পারেন। আমি পারবো না!

পরেরদিন স্যার আমাকে ডেকে বললেন
– সাদেক, আমি কাবা ঘর দেখতে যাবো। কিভাবে যেতে পারি?
– স্যার, আল কাবা হজ্জ ফাউন্ডেশনের শাহ মোশারফ ভাইকে আমি আপনার কাছে পাঠিয়ে দেবো। তিনিই ব্যবস্থা করে দেবেন।

 

এরপর মোশারফ ভাইর সাথে স্যারের যোগাযোগ হয়। আমাকে আর কিছু করতে হয়নি । মোশারফ ভাই স্যারকে হজ্জ কাফেলার সাথে সংযুক্ত করে সৌদিআরব নিয়ে যান । স্যারের ভ্রমণের নিয়ত হজ্জের নিয়তে পরিবর্তিত হয়ে যায়। আমি খুব খুশী হই। স্যার হজ্জ করে ফিরে এলেন। এলেন তো এলেন, শুধু হজ্জ না দাড়ি নিয়েও ফিরে এলেন। স্যার রেগুলার নামাজ পড়লেন। ইসলাম নিয়ে আগের মত কোন কিছুকে কটাক্ষ করতে আর শুনিনি। এখনো সেই দাড়িই আছে। দাড়ির দিকে তাকালেই আমার মীর্জা স্যারের হুজ্জের কথা মনে হয়। কিভাবে ভ্রমনের নিয়ত তার হজ্জের নিয়তে পরিবর্তন হয়ে গেলো। আমার কেনো যেন মনে হয় স্যারের হজ্জের নেকির অংশীদার আমিও।

১৫/৬/২০১৯ খ্রি.

কিশোরগঞ্জ -ময়মনসিংহ জার্নি