মরার পরেও জ্বালায়

মরার পরেও জ্বালায়

(হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

অনেক অনেক দিন আগের কথা। সেই স্বাধীনতার আগের দিনের কথা। তখন এক গ্রামের এক মোড়ল ছিলো খুব পাঁজি। সারাটা গ্রাম জ্বালিয়ে ফেলেছিলো অত্যাচার করে গ্রামের সহজ সরল মানুষকে। মানুষে মানুষে পেঁচ লাগাতে খুব অস্তাদ ছিলো। শয়তানি করায় খুব পটু ছিলো। সাথে কিছু হোমরা চোমরা রাখতো সুবিধার জন্য। মোড়লের বিরোদ্ধে টু শব্দ করার সাহস গ্রামবাসীর ছিলো না।

মোড়ল অতিশয় বৃদ্ধ হয়ে পড়লে তার মনে জান দিলো তিনি আর বেশী দিন বাঁচবেন না। মৃত্যুর পর তার শয়তানী করা আর সম্ভব হবে না। কিন্তু তিনি এমন কিছু একটা করে যেতে চান যেন তার মৃত্যুর পরও তার আমল নামায় শয়তানি লেখা হতে থাকে। বাস, গ্রামের সবাইকে চৌকিদার দিয়ে ডেকে আনালেন তার বাড়িতে। বাড়ির আঙ্গিনায় খর বিছিয়ে বসতে দিলেন সবাইকে। সবাই ভাবলো মোড়ল না জানি কার বিচার করেন। কার পাছায় যে আজ চাবুকের বারি পড়ে? সবাই ভয়ে ভয়ে বসে রইলো মোড়লের অপেক্ষায়। এক সময় চামচাদের সাথে নিয়ে মোড়ল হাজিরানা মজলিসে এলেন। কারুকার্য করা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। তারপর তার বক্তব্য পেশ করলেন। তিনি বক্তব্যে যা বললেন তা ছিলো এমন “আমি তোদের গ্রামের মোড়ল। আমার বাপ দাদারাও এই গ্রামের মোড়ল ছিলেন। কিন্তু আমি আমার বাপ দাদাদের মতো হতে পারিনি। সারাজীবন তোদের উপর অন্যায় অত্যাচার করেছি। আমি অন্যায়কে অন্যায় বুঝেও অন্যায় করেছি। এটা আমার নেশা ছিলো। অন্যায় করে আমি আনন্দ পেতাম। তোদেরকে খুব জ্বালিয়েছি। তোরা হয়তো আমার মৃত্যু কামনা করছিস। তোদের প্রতি অন্যায় অবিচার করেছি বলে আমার অনুশোচনা হচ্ছে। এই জন্য তোদেরকে ডেকেছি একটা কথা বলার জন্য। আমি মনে হয় বেশী দিন বাচবো না। আমার মৃত্যুর পর তোরা আমার লাশের উপর প্রতিশোধ নিবি। মৃত্যুর খবর শুনে তোরা দল বেঁধে আমার বাড়ি আসবি। একটা বৌড়া বাঁশ কাটবি সোব থেকে। তারপর ওটার এক মাথা চোখা করে আমার নিম্নদেশ দিয়ে প্রবেশ করাবি। সড়কের চৌরাস্তার মোড়ে খোন্তা দিয়ে গাতি দিয়ে ঐ বাঁশটা খারা করে গেড়ে দিবি যাতে অনেক দূর থেকে মানুষ দেখতে পায়। বাঁশের আগায় আমার লাশ রেখে উল্লাশ করবি। মিষ্টি খাবি আর গালি গালাজ করবি। তাতে তোদের জ্বালা কিছুটা কমবে।”

 

কথাগুলো শুনে সবাই খুশী হলো। দিন গোনতে লাগলো মোড়লের মৃত্যু কামনা করে। অবশেষে মাঘ মাসের শীতের এক রাতে মোড়লের মৃত্যু হলো। মোড়লের ওয়াসিয়ত অনুযায়ী বাঁশ ঢুকিয়ে চৌরাস্তার মোড়ে বাঁশ গেড়ে দেয়া হলো। অনেক দূর থেকে মোড়লের লাশ দেখা যাচ্ছিলো। দেখে মনে হচ্ছিল কাক তাড়ুয়া। গ্রাম শুদ্ধ জানাজানি হয়ে গেলো মোড়লের লাশের পরিনতির কথা। পোলাপানরাও দেখতে এলো। গ্রামের মুন্সি- মৌলবিরা প্রতিবাদ করলনেন “লাশের উপর অত্যাচার করা গুনাহের কাজ।” চৌকিদার গিয়ে থানায় খবর দিলেন। থানা থেকে পুলিশ এসে গ্রামের সব বেটা মানুষ ধরে নিয়ে থানা হাজতে ঢুকালেন। রিমান্ডে নিয়ে মারধর করলেন। গ্রামের মানুষ পুলিশের মার খেয়ে বলতে লাগলেন “শালার মোড়ল, বেঁচে থাকতেও যেমন জ্বালিয়েছি, মরার পরেও জ্বালাচ্ছে।”

২৪/১১/২০২০ খ্রি.