মুকুলের স্মরণে

মুকুলের স্মরণে

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আপনারা যাকে আসাদুজ্জামান তালুকদার নামে চেনেন তার ডাক নাম মুকুল। আমি কোনদিন আসাদ বলে ডাকিনি। আমি সবসময় মুকুল বলেই ডাকতাম। চাচাতো ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের ছিলো মুকুল। সে বয়সে আমার ছোট হলেও আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। সে আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে গেছে গত ১১ অক্টোবর ২০২০ আজ থেকে ১১ দিন আগে। সে নিপোর্ট শাখার ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর ট্রেইনিং সেন্টারের প্রিন্সিপাল ছিলো। আমাদের বংশের দেখার মতো একটা চেহারা ছিলো তার। স্বভাব চরিত্র ছিলো অমায়িক।

মুকুল ছিলো বাবার চাচাতো ভাই আব্দুস সালাম তালুকদারের বড় ছেলে। সালাম কাক্কু ৫ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন। তাই আমরা ছোট কাক্কু ডাকতাম। ছোট কাক্কুর বিয়ের আগের কথাও আমার মনে আছে। তখন তিনি ধলাপাড়া হাই স্কুলে মেট্রিকে (১০ম শ্রেণীতে) পড়তেন। তিনিও বেশ চেহারাবান ছিলেন। লম্বা চুল রাখতেন। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে তিনি ধলাপাড়ার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। মা তার ভাবী হিসেবে ঠাট্টা করে বললেন “ছুট মিয়ার এহন বিয়া করার বয়স অইছে।” শুনে কাক্কু যে হাসি দিয়েছিলেন সেটা আমার দিব্যি মনে আছে। আমি তখন একদম ল্যাংটা পোলাপান ছিলাম। সেই বছরই কাক্কু মেট্রিক পাস করেন। বিয়েও করেন দাইমা গ্রামের হযরত গোলদাইরার মেয়েকে। সকালে মা আমাকে বললেন “নও, নয়া বউ দেইখা আহি।”

– নয়া বউ কেরা?

– তোমার নয়া কাক্কি।

– নয়া কাক্কিরে তো দেখছিই।

– এইডা আরেকটা নয়া কাক্কি। তোমার ছোট কাক্কুর বউ আনছে। নও দেইখা আহি।

ছোট কাক্কুর বড় ছিলেন মিয়া কাক্কু। মানে আবুল কাশেম তালুকদার। মিয়া কাক্কুর শশুর ছিলেন মাইজবাড়ির ঠান্ডু মিয়া। মিয়া কাক্কুর বড় মেয়ে কুলসুম আপা জন্মের পর কাক্কি মারা যান। পরে কাক্কির ছোট বোনকে বিয়ে করেন। তাই তিনি আমাদের নয়া কাক্কি। নয়া কাক্কি বৃদ্ধকাল পর্যন্ত আমাদের কাছে নয়াই ছিলেন। তিনি কয়েক মাস আগে মারা গেছেন। ছোট কাক্কুর স্ত্রী নয়া হয়েও নয়া খেতাব পাননি। তিনি হলেন আমাদের ছোট কাক্কি। আমি মার সাথে ছোট কাক্কিকে দেখতে গিয়েছিলাম। কাক্কি নতুন বউ হিসাবে লম্বা ঘুমটা টেনে লজ্জাবনত হয়ে মেঝের পাটিতে বসেছিলেন। পাড়ার মহিলারা এসে এসে ঘুমটা সরিয়ে সরিয়ে মুখ দেখছিলেন। সুন্দর কাক্কুর জন্য সুন্দরী কাক্কিই পছন্দ করে এনেছিলেন দাদু। মা আমাকে কাক্কির ঘুমটা সরিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বললেন “এই দেখো তোমার নয়া কাক্কি।” আমি কাক্কিকে দেখলাম। বিয়ের বছরান্তেই ছোট কাক্কির ঘরে তালুকদার বংশের সবচেয়ে সুন্দর ছেলেটি জন্মগ্রহণ করে। তার নাম মুকুল। কাক্কু নাম রাখলেন আসাদুজ্জামান তালুকদার মুকুল। কাক্কু মেট্রিক পাস করে কালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের কেরানির চাকরি নিয়েছিলেন। তিনি সালাম কেরানি নামে পরিচিত হলেন। তারপর প্রমোশন পেয়ে সেক্রেটারি হন। তার পর থেকে সালাম সেক্রেটারি নামে পরিচিত হন। সারাসিয়ার মাইন ভাইর ছোট ভাইকে ছোটবেলা সালাম কেরানির মতো সুন্দর দেখা যেতো। তাই তাকে কেরানি বলে ডাকতো। ছোট কাক্কু সরকারি চাকরি করার পাশাপাশি ঔষধের ব্যবসা করতেন। ফার্মেসির নাম দিয়েছিলেন মুকুল ফার্মেসি। মুকুলের দাদীকে দাদী না ডেকে সব নাতিরা বাব্বু ডাকতো। কেনো বাব্বু ডাকতো তার কোন ভালো ব্যাখ্যা আমি পাইনি। আমাদের সবার বড় নুরজাহান আপা নাকি প্রথম দাদীকে বাব্বু ডেকে প্রচলন করেন। মুকুল মারা গেলে নুরজাহান আপা এসেছিলেন। শমে কাক্কুর নাতিরাও সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য তাদের দাদীকে বাব্বু ডাকে। আগের দিনে অনেক মায়ের ৫-৬ জন করে সন্তান থাকতো। প্রায় সব মায়েরা ছোট ছেলেকে বেশি স্নেহ করতো। সেই হিসাবে বাব্বু ছোট কাক্কুকে বেশি স্নেহ করতেন। ছোট কাক্কুর প্রথম ছেলে হিসাবে মুকুলকে বাব্বু বেশী স্নেহ করতেন। ফুটফুটে চেহারার হওয়াতে, বাব্বুর অতি প্রিয় হওয়াতে এবং ছোট কাক্কুর প্রথম সন্তান হওয়াতে তালুকদার বাড়ির মুকুলকে সবাই আদর করতো। মাটিতে নামতেই দিতো না। দেখলেই তাকে কোলে নিয়ে নিতো। মুকুল যখন ৭-৮ মাসের তখন বসে বসে নিজ হাতে ফিডার ধরে দুধ খেতো। ভোলা ভোলা স্বাস্থ্য ছিল। পেটটা ডোবলা ছিলো। নাভিটা ফিডারের বোটার মতো বড় ছিলো। আসলে ওটা ছিল আমবিলিকাল হার্নিয়া। বড় হলে ওটা পেটের সাথে মিশে যায়। আমার এখনো মনে আছে মুকুল পিঠের বেতের পাটিতে ভুড়ি ভাসিয়ে বসে দুইহাতে বোতল ধরে ফিডার খেতো। এই বয়সে শিশুরা যখন তখন যেখানে সেখানে পায়খানা করে দিতে পারে। মুকুলও তাই করেছিলো। আকবর ভাই মুকুলকে পেলেই কাঁধে নিয়ে ঘোড়ায় চরার মতো করে বসিয়ে নাচানাচি করতেন। একদিন এইভাবে তিনি মুকুলকে কাঁধে নিয়ে নাচানাচি করছিলেন। মুকুলের পাছায় যে পায়খানা লেগেছিল সেটা তিনি জানতেন না। আকবর ভাইর কাঁধে পায়খানা লেগে চেরাবেরা হয়ে গেছিলো। ছোট কাক্কি দেখে বলেন “এল্লা, জাউরাডায় আঘাগারিডারে কান্দে নিছে কে।” ছালে আপা দেখে বলেন “এ খোদে! আইঘ্যা চেরাবেরা কইরা ফালাইছে আকবরের কান্দে।” সেই মুকুল দ্রুত বড় হয়ে যায় সবার যত্নে। আমি কৈশোরে থাকতে থাকতেই সে উচ্চতায় আমার কাছাকাছি হয়ে যায়। তার স্বভাব চরিত্র ও বুদ্ধিমত্বা ভালো হওয়ায় অল্প বয়সেই আমার বন্ধুর মতো হয়ে যায়। ওকে নিয়ে বাড়িময় এবং পাড়াময় ঘুরে বেড়াতাম। গলায় গলায় ধরে হাটতাম। পানি পাড়াতাম। পানিতে ঝাপ পাড়তাম, নল খেলতাম। বাব্বু সবসময় তাকে চোখে চোখে রাখতেন। পানিতে নামলে উঠে আসার জন্য তাগিদ দিতেন। তাতে মুকুল বাব্বুর প্রতি খুব বিরক্ত হতেন। আমি বলতাম “বাব্বুর আসলে পানির পাড়ে আসতে ভালো লাগে, তাই মুকুলকে ডাকার নাম করে পানির পাড়ে আসেন।” মুকুল মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে আমার “সোনালি শৈশব” নামের স্মৃতি কথার বইটি প্রকাশিত হয়। এর প্রচ্ছদ পরিকল্পনা আমি করেছি। প্রচ্ছদ অংকন করে দিয়েছে বাসার চালার ধলা মিয়া। প্রচ্ছদে দেখা যাচ্ছে দুইজন ছেলে গলাগলি ধরে পাহাড়ি পানি পাড়িয়ে হেটে যাচ্ছে। আসলে আমার কল্পনায় একজন আমি এবং আরেকজন মুকুল। আমি যখন আমার ছোট বোন শাহীনুরকে বইটি উপহার দিলাম, সে হাতে নিয়ে প্রচ্ছদের স্ক্যাচ দেখে মন্তব্য করলো “এরা কি মুকুল ভাই আর আপনে?” আমার মনে হলো প্রচ্ছদ পরিকল্পনা সার্থক হয়েছে। মুকুলের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা শৈশবেই ছিলাম। আমাদের মধ্যে কথা হতো শৈশবের আঞ্চলিক ভাষায়। তারাতাড়ির আঞ্চলিক শব্দ হলো ধাতুবাত। কিছুদিন আগেও মুকুল আমাকে বললো “ধাতুবাত করুন।”

ক্লাস নাইনে উঠে আমি চলে যাই ভালুকার বাটাজোর বি এম হাই স্কুলে। তারপর থেকেই মূলত মুকুল থেকে দূরে দূরে থাকতে হয়েছে। ১৯৭৭ সনের মার্চ মাসে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে আমি প্রায় তিন মাস বড়িতে অবস্থান করি। আমি অংকে বেশ ভালো ছিলাম। সাধারণ গনিতে ৯৫ এবং নৈর্বাচনিক গনিতে ৯৮ পেয়েছিলাম ১০০-তে। ছোট কাক্কু আমার মেধার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন “বাজান, রেজাল্টের আগ পর্যন্ত তো তোমার কাজ নাই। এই কমাস আমগ মুকুলেরে দৈনিক একঘন্টা করে অংক করা শিখাবে। আমি তাই করি। মুকুল তখন এইটে পড়ে।” কাক্কু আমাকে বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা আমি ইচ্ছেমতো খরচ করেছি। মুকুলের ছোট ভাই-বোনরা আমাকে সহোদর বড় ভাইয়ের মতো দেখতো। আমিও ওদেরকে সহোদর ছোট ভাই-বোনদের মতো দেখতাম। ওদের মুখের ভাই ডাক আপন বোনের ডাকের মতো লাগে আমার কাছে। নকলা উপজেলায় চাকরিকালীন একজন বাচ্চা রোগী চিকিৎসা করেছিলাম। সেই বাচ্চার মা আমাকে এমন ভাবে ভাই ডাকতো, শুনে মনে হতো মেয়েটা আসলেই আমার ছোট বোন। আমি আউলিয়াদের আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ১৯৮০ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ক্লাস শুরু করি। ছোট কাক্কুও তাই মুকুলকে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে ভর্তি করে দেন। আমার বিয়ের সময় যখন মুকুল আমার শশুরবাড়ি যায় তখন আমি পরিচয় করিয়ে দেই আমার ছোট ভাই বলে। চাচাতো ছোট ভাই না বলে শুধু ছোট ভাই বলি। চাচীশাশুরী, খালাশাশুরী, মামীশাশুড়ীরা একে অপরকে বলেন “ঐটা জামাইর ছোট ভাই।” কি কারনে যেন তারা মুকুলকে দেখে সবাই খুব খুশী ছিলেন। তাদের সবারই মেয়ে ছিলো। এইজন্য কিনা জানিনা। এমন সুন্দর ছেলে দেখলে অনেক মেয়ের মাই খুশী হয়। এটা আমি মনে করতাম। মুকুল এইসএসসি পাস করে করটিয়ার সাদত কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়। তার সময় ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন বর্তমান সখিপুর -বাসাইলের এম পি জননেতা এডভোকেট জোয়াহের ভাই। মুকুলের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিলো। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে এম পি মহোদয় মুকুল ও আমাকে কথা দিয়েছেন আমাদের গ্রামের সিরিরচালা প্রাইমারি স্কুল থেকে বাসারচালা প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত বেহাল দসার রাস্তাটি পাকা করে দেবেন। এটা এলাকার জনগণের প্রাণের দাবী। ফেরুয়ারির সমবর্ধ সভায় আমি ও মুকুল বিশেষ অতীথি ছিলাম। আমরা দুজনই আমাদের বক্তৃতায় এই রাস্তাটি পাকা করে দেয়ার দাবী জানিয়েছিলাম। এমপি মহোদয় তার বকৃতায় কথা দেন “ডাক্তার সাহেব যে রাস্তাটির দাবী করেছেন সে রাস্তাটি হবে আগামী বাজেটে, ইনশাআল্লাহ।” আমি মনে করলাম মুকুলের প্রতি মোহব্বতের কারনেই তিনি রাস্তাটা পাকা করার ওয়াদা করেছেন। সেই রাস্তাটি হবে হয়তো। কিন্তু মুকুল দেখে যেতে পারলো না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেনো আমি দেখে যেতে পারি। মুকুলের জন্য মসজিদের কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। আমরা চাই মসজিদ এক তলা বিশিষ্ট হবে। মুকুল চায় মসজিদ দোতলা বিশিষ্ট হবে। তার ইচ্ছা ছিল দোতলায় হুজুর পাড়ার পোলাপানদের আরবি পড়াবেন। আমরা বলি কি দরকার পাড়ায় ত একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসা আছেই। যাহোক, শেষে এক তলার মসজিদ নির্মাণই শুরু হয়। সে গত শীতের মজদিদের ওয়াজ মাহফিলে মসজিদ নির্মাণের জন্য বেশ বড় অংকের টাকার ওয়াদাও করেছিল। নির্মাণের কাজ ভালোভাবেই শুরু হয়। কিন্তু করোনার লকডাউন ও বর্ষার কারনে নির্মাণ কাজ বন্ধ আছে। যারা জানাজা পড়তে এসেছিলেন তারা রাস্তার অবস্থা ও মসজিদের অবস্থা দেখে অনেকেই ক্ষুব্ধ হন। মুকুল মসজিদ দেখে যেতে পারলো না। আল্লাহ যেনো আমাকে মসজিদ দেখিয়ে নেন।

ছোট কাক্কি তালুকদার বাড়ি এসে প্রতি দেড় বছর অন্তর একজন করে সন্তান উপহার দিতে থাকেন। মুকুলের পর একে একে জন্ম নেয় ছফুরা, শিরি, কায়সার, মাজে, আকতার, সাজে ও জোবে। এদের আসল নাম যথাক্রমে ছফুরা খাতুন, শিরিনা খাতুন, আনোয়ার হোসেন, মাজেদা খাতুন, আকতার হোসেন, সাজেদা খাতুন ও জোবেদা খাতুন। জোবেদা ফেইসবুক খুলেছে তালুকদারের ছোট কন্যা নাম দিয়ে। ছফুরাকে দুল্লাকালেই ছোট কাক্কু বিয়ে দিয়ে দেন পাড়ায়ই সবচেয়ে ধনি বাড়িতে আলী মাহমুদের সাথে। ছফুরা খুব হাশি খুশি বোন ছিলো আমাদের। অল্প কিছুতেই হেসে গলে পড়তো। অল্প বয়সেই সন্তান সম্ভাবনা হয়। শশুর বাড়িতেই সন্তান ডেলিভারি করানো হয়। জমজ দুই বাচ্চা হয়ে মারা যায়। ছফুরাও অধিক রক্তক্ষরণ হয়ে মারা যায়। একজন তাজা স্বতঃস্ফূর্ত মেয়ে এমন ছোট বয়সে মরে গেলো! ছোট কাক্কু ও কাক্কি মহা শোক পেলেন। মুকুলও পিঠাপিঠি বোনকে হাড়িয়ে ভেংগে পড়ে। সে আমাকে তার এ বিষয়ে খোভের কথা আমার কাছে ব্যক্ত করে। কাক্কু অনেক মাস পর্যন্ত ছফুরার কবরের কাছে বসে কেঁধে কেঁধে দোয়া কালাম পাঠ করতেন। একবার কাক্কুর টাঙ্গাইল যাওয়ার কারন জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম তিনি কয়েক হাজার টাকার ইসলামি বই কিনে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও মসজিদে দান করে এসেছেন। কাক্কু আমাকে বুঝালেন যে ছফুরা বেঁচে থাকলে বাপের সম্পত্তি পেতেন, তার পেছনে অনেক খরচ হতো। সেই পরিমান টাকা মানুষকে না খাওয়ায়ে সদকায়ে জাড়িয়া করে দিলেন। এর সওয়াব ছফুরা বহুকাল পর্যন্ত পেতে থাকবে। চল্লিশ বছর বয়সে কাক্কুর কিডনি রোগ ধরা পড়ে। প্রথম দিকে আমি ময়মনসিংহে ডাক্তার দেখাই। সেই চিকিৎসায় তৃপ্তি না পেয়ে কাক্কু হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের পাল্লায় ঘুরপাক খান অনেক বছর। রোগ বেড়েই চলে। কাক্কু তার বাল্য বন্ধু সার্জারীর প্রফেসরকে দেখান ময়মনসিংহ। হোমিওপ্যাথি ঔষধ সেবনের হিস্ট্রি শুনে প্রফেসর ছোট কাক্কুকে আমার সামনেই পাহাইড়া বলে টিটকারি দেন। তাতে তারপ্রতি মনক্ষুন্ন হয়ে ঢাকায় চলে যান। আমজানির ডাক্তার শাহ আলম তালুকদার দাদার মামতো ভাইয়ের ছেলে। সেই হিসাবে তিনি কাক্কুর ভাই সম্পর্কে। কাক্কু শাহ আলম কাকার পরামর্শ নিয়ে ঢাকায় নেফ্রোলজিস্ট দিয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসা করান। মুকুলই কাক্কুকে সাথে নিয়ে যেতেন।

এদিকে মুকুল করটিয়া থেকে অনার্স এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স পাস করে বেকার হয়ে পড়ে অনেকদিন পর্যন্ত। কাক্কুর আটজন সন্তান, অল্প বেতনের চাকরি, ব্যয়বহুল চিকিৎসা, মুকুলের বেকারত্ব, সব মিলিয়ে একটা কেমন অবস্থার যেনো সৃষ্টি হয়। কাক্কু এক সময় সরকারি চাকরি রিজাইন দিয়ে চেয়ারম্যান পদে ইলেকশন করে তিন পাখি জমি বিক্রি করে দেন। ইলেকশনে ভরাডুবি খেয়ে সরকারি চাকরি হাড়িয়ে তিনি জিতাশ্বরি রশিদিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক হন। কায়সার খুব দুষ্ট ছিলো। বড় বড় মাছের টুকরা তাকে দিতে হতো। ভালো মানুষ বানানোর জন্য তাকে মাদ্রাসায় হোস্টেলে রাখা হয়। হোস্টেলে গিয়েও সে দুষ্টামি করে বলে পড়া ক্ষান্ত দিয়ে বাড়িতে এসে পড়ে। ভিলেজ পলিটিক্সে জড়িয়ে পড়ে। তাকে নিয়ে কাক্কু অশান্তিতে পড়ে। পাঠিয়ে দেয়া হয় মিডল ইস্টে চাকরি নিয়ে। ভালো কাটে সেখানে তার।

আকতার পড়তো হাফেজি। হাফেজ হয়েছিলো। মুকুল মাস্টার্স পাস করে ঢাকার খিলগাওয়ে মেসে থেকে একটি কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করতে থাকে। আকতারকেও মেসে রাখে। সে আরবি লাইনে পড়তে থাকে। আমি বিসিএস ও পোস্ট গ্রাজুয়েট এডমিশন টেষ্ট দিতে গিয়ে মুকুলের মেসেই থাকতাম। তার তখন বিয়ে করার উপযুক্ত বয়স। এই বেকারত্বর সময় কেই রাজি হয়? মুকুল একজন এম পির কাছে যেতো ঘন ঘন। এমপি নাকি তাকে খুব পছন্দ করতেন । মুকুলের ধারনা ছিল এম পি সাবের সাথে ঘুরাফেরা করলে একটা চাকরি হবে। আমি বুঝালাম এমপির সাথে থাকলেই চাকরি দেবেন এটা আমি মনে করিনা। মুকুলের চাকরি হলে মুকুল আর এমপির কাছে যাবে না। কাজেই মুকুল যতদিন বেকার থাকবে ততদিন এম পি তাকে কাজে লাগাবে। তারপর থেকে সে এমপির কাছে যাওয়া কমিয়ে দেয়।

১৯৯৫ সনে আমি শাহবাগ পিজি হোস্টেলে ছিলাম এমফিল থিসিস পার্টে ছিলাম। একদিন মুকুল তার সরকারি চাকরির এপয়েন্ট লেটার নিয়ে এলো আমার হোস্টেল কক্ষে। খুব খুশী হলাম। মনে মনে ভাবলাম মুকুলের বিয়ের বাঁধা দূর হয়ে গেলো। ওর ছোট ভাই একাই সিদ্ধান্ত নিয়ে আগেই বিয়ে করে ফেলেছিলো। ভালোই করেছিলো আমার মতে। বিয়ের বয়স হয়েছে বিয়েতো করবেই। চাকরি পাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে মুকুল আবার এলো আমার হোস্টেলে এই বলে যে তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে শাহ আলম কাকার ইডেন কলেজে অনার্স পড়ুয়া শ্যালিকার সাথে। ছোট কাক্কু ও শাহ আলম কাকার ইচ্ছায় এই বিয়ে হচ্ছে। আমি আলহামদুলিল্লাহ, ভালো হবে বলে আকদের অনুষ্ঠানে গেলাম। পরে একদিন অনুষ্ঠান করে বউ নিয়ে এলাম বাড়িতে। মুকুলের ভাগ্যে সরকারি ভালো চাকরি ও বিয়ে দুইটাই জুটে গেলো। প্রথমে প্রভাষক পদে যোগদান করেছিলো। পরে নিপসম থেকে ডিপিএইচ ডিগ্রি করে প্রিন্সিপালের পোস্ট পায়। বিয়ের প্রথম কয়েকদিনের মধ্যেই মুকুল তার বউকে নিয়ে কি বিষয়ে যেনো হালকা একটি মন্তব্য করে। আমি সাথে সাথে রিয়েক্ট করি। বলি “সাবধান, নিজের বউকে নিয়ে কারো কাছে মন্তব্য করবে না।” মুকুল ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। সে বুঝতে পারে আমি তার শুধু বন্ধুই না, একজন শিক্ষক এবং বড় ভাইও। এইবার যে শিক্ষাটা আমার কাছে পেয়েছিলো সেই কথাটা সে কৃতজ্ঞতার সাথে আমার কাছে বেশ কয়েকবার বলেছে। সম্মানজনক চাকরি, ভালো ফ্যামিলিতে বিয়ে এবং ভালো একজন বউ পাওয়ার সবাই খুশী হয়। মুকুল তার ছোট দুই বোনকে ঢাকায় বাসায় রেখে ভালো স্কুল ও কলেজে পড়ায়।

আকতারকেও ঢাকায় মেসে রেখে পড়ায়। মুকুলের বউ ওদেরকে ছোট ভাই বোনের মতো স্নেহ করে। মুকুল কায়সার ও আকতারকে অনেক টাকা খরচ করে বিদেশ পাঠিয়ে দেয় চাকরি করতে। কাক্কুর ব্যহবহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে থাকে। একসময় কাক্কু চলে যান পরপারে। কাক্কু জীবিত থাকতে মুকুলের সব বোনকে এনে একাত্র করে ঈদ ও বিভিন্ন রকমের আয়োজন করতেন। সেই দায়িত্ব কাধে নেয় মুকুল। কাক্কু যাযা করতেন মুকুলও তাই তাই করতো।

দীর্ঘদিন হয়ে গেলো মুকুলের কোন সন্তান হলো না। দেশে বিদেশে অনেক চেষ্টা তদবির করে কোন ফল হলো না। নিজের ঔরস দিয়ে দুইবার টেষ্ট টিউব বেবি নিয়েও ব্যর্থ হয়ে পাগল প্রায় হয়ে গেলো দুজনে। কায়সারের ঘরে এক কন্যা সন্তান হলে তাকে তারা মেয়ের মতো করে যত্ন করতে থাকে। সেই মেয়ে বড় হয়ে ময়মনসিংহ এক কলেজে ভর্তি হয়। সেখানে ম্যাল ভালো পায় না। কি কারনে যেন সে আত্বহত্যা করে মারা যায়। মুকুল মহা শোক পায়। শাহ আলম কাকার ফুটফুটে মেয়েকেও মুকুলের বউ নিজের সন্তানের মতো করে যত্ন নিতো। সেই মেয়ে আমেরিকা গিয়ে কলেজে ভর্তি হয়। সেও একদিন অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরন করে। সেই মৃত্যুতেও তারা শোকে ভেংগে পড়ে।

বিয়ের প্রায় যুগ পেরিয়ে যাবার পর আল্লাহ মুকুলকে একটা ছেলে সন্তান দেয়। সেই সন্তানকে পেয়ে মুকুল ও তার বউ মনে করে সোনার টুকরো। তার কোন কিছুর অভাব হয় না। যা চায় তাই খায়। এমন বড় সড় হয়ে গেছে বেটা বেটা দেখা যায়। অথচ বয়স এখন মাত্র ১২ কি ১৩ বছর। ইংলিশ মিডিয়ামে ঢাকার নামীদামি স্কুলে পড়ে। মাত্র ক্লাস ফাইভে পড়ে। এবার সিক্সে উঠবে। ছেলে বাপ ছাড়া কিছু বুঝে না। অথচ এই ছেলেটা ছেড়ে আল্লাহর ডাকে চলে যেতে হলো আজীবন সংসার সংগ্রামী মুকুলকে। আল্লাহ তার সন্তান ও স্ত্রীকে শোক সইবার এবং ধৈর্য ধারণ করবার তৌফিক দান করুন।

গত ছয় সাত বছর আগে ওরা যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়ে সেটল হতে চেয়েছিল। ভিসাও হয়েছিলো। বউ বাচ্চা নিয়ে দুইবার গিয়েছিলো। মুকুল সেসময় তার ছেলের কথা আমাকে বারবার বলতো। ওরা স্কাইপিতে কিকি বলতো তা আমাকে মোবাইল করে জানাতো। তাতে আমি বুঝতে পারতাম মুকুল ছেলেকে খুব মিস করে। মুকুল চাকরি ছেড়ে ছেলের কাছে চলে যেতে চায়। এনিয়ে আমার সাথে কথা বলে মোবাইলে অনেক্ষণ। এক দিকে অনেকগুলি ভাইবোন ও মায়ের টান, আরেকদিকে ছেলে ও বউয়ের টান। মানষিক দ্বিধাদন্দে কাটতে থাকে তার রাতদিন। আমাকে সিন্ধান্ত দিতে বলে কি করবে সে। আমি বললাম “তোমার ভালো-মন্দ তুমি দেখবে। তোমার যেখানে সুখ সেখানে তুমি থাকবে। আমেরিকা যারা গিয়েছে তারা বাংলাদেশে আসার তেমন সময় পায় না। আমার পরিচিত জনদের দেখে আমার এই ধারণা হয়েছে। তুমি কেমন করবে আমি জানি না। তবে তুমি চলে গেলে কাক্কি অসহায় হয়ে পড়বে, তুমি আছো বলে বোনগুলা আসে একসাথে। তুমি প্রতিবছর ঈদ করো বাড়িতে সবাইকে নিয়ে। আমি বাড়ি গেলে তুমিও বাড়ি আসো। সেই সুখগুলো বিলীন হয়ে যাবে। তবে তোমার ছেলে হয়তো ওদেশে এদেশের থেকে ভালো থাকবে। তুমিই সিদ্ধান্ত নাও কি করবে। কয়েকদিনের মধ্যে সে চীন সফর করে এসে আমাকে ফোন দিলো “ভাই, আমি আমেরিকা যাবো না।” মুকুল আর আমেরিকা গেলো না।

আমি যখনই বাড়ি যেতাম যাবার আগেরদিন মুকুলকে জানাতাম । মুকুলও বাড়ি এসে পড়তো । কত রকম না বলা কথাই যে বলতো । সব জমানো কথা আমার কাছে শেয়ার করতাম । আমিও আমার না বলা জমানো কথা মুকুলের কাছে শেয়ার করতাম ।

ওদিকে কায়সারও বিদেশে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থতার ভেতর দিয়ে অতিবাহিত করতে লাগলো। কায়সার আমার খুব ভক্ত ছিলো। আমার সামনে কোনদিন তাকে বেয়াদবি করতে দেখি নি। বাড়িতে গেলে সে সব সময় আমার সাথে সাথেই থাকতো। বিদেশ থেকে সে আমাকেই বেশী ফোন দিতো। অসুস্থ হওয়াতে আরও বেশী ফোন দিতো। তার কষ্টের কথা আমাকে জানাতো। তার ডাক্তার ছিল আমার সিনিয়র ডা. আনোয়ার ভাই। অনেকে আনোয়ার -আসাদ জুটি হিসাবে চেনেন। কায়সার ভাইগো বলে ডাক দিয়ে ফোন করতো। আমি আনোয়ার ভাইর সাথে কিডনির কন্ডিশন নিয়ে কথা বলতাম। আনোয়ার ভাইর কথায় বুঝা গেলো কায়সারের আয়ু আর বেশী দিন নেই। তার কষ্টের কথা শুনে আমার বুক হু হু করে কেধে উঠতো। আমি বললাম

– কায়সার, ভাই তুমি চাকরি বাদ দিয়ে দেশে আইয়া পড়।

– এত সুন্দর চাকরি ছাইড়া আইয়া পড়মু? কোন পরিশ্রমের কাজ নাই। খালি কর্মচারী সুপারভাইস করতে হয়। দেশে আইয়া করমু কি?

– তুমি বিদেশে একা রইছো। তোমার কষ্ট দেখার কেউ নাই। তুমি দেশে এসে কষ্ট কর। আমরা তোমার কষ্ট দেখমু।

– ভাই, আমি মনে হয় আর বাচমু না। আমার কিডনি ডায়ালাইসিস করতে অইব।

– যদি মরতেই হয়, আমাদের কাছে এসে মরো। তোমার কষ্ট দেখার কেউ নাই, এটা ভেবে আমার খুব কষ্ট হয়। আইয়া পড়।

কায়সার এসে পড়লো। ময়মনসিংহে ডায়ালাইসিস শুরু করলো। প্রতি সপ্তাহে খরচ হতো ১০ হাজার টাকা করে। টাকার উপর আল্লাহয় বাচিয়ে রাখলেন তিন বছর। তার কামাই করা গচ্ছিত টাকা সব শেষ হয়ে গেলো। শেষে মুকুল তার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করলো। অবশেষে সেই আমাদের ছেড়ে পরপারে চেলে গেলো দুবছর আগে। চলে যাওয়ার আগে তার এক কন্যা সন্তান হলো। বড় ছেলে নিলয় ইন্টারে পড়তো। তার চাকরির জন্য আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম। আলহামদুলিল্লাহ সে আর্মিতে প্রবেশ করেছে।

ছোট কাক্কি একে একে হারালেন ছফুরাকে, কাক্কুকে, কায়সারের মেয়ে বিন্তিকে, কায়সারকে শেষে মুকুলকে। কি করে কাক্কি এই শোক সইবেন? আল্লাহ কাক্কিকে সব শোক সইবার ধৈর্য দিন। দাফরাইয়া দাফরাইয়া কাদেন। আমরা বারন করে বলি দোয়া পড়ুন। কতক্ষণ আর দোয়া পড়ে চুপ থাকা যায়। বাবা করে চিতকার দিয়ে উঠেন। মুকুলের বোনগুলায় আক্ষেপ করে বলে উঠে আমার ভাইগুলারেই আল্লাহ্য় নিয়া যায় কেন? আমি ওদেরকে বুঝ দিতে পারি। আমি বুঝ দেবার ভাষা গুছিয়ে বলতে পারি না।

মুকুলের কাছে ফোন করলে ঠিকমতো কথা বলতে পারতো না। পাশ থেকে ছেলে ডিস্টার্ব করতো। সেই ছেলে এখন বাপছাড়া হয়ে কেমন করবে। আল্লাহ এই ছেলের যেমন মঙ্গল আমাদের মুকুল চেয়েছিলেন তার চেয়েও বেশী মঙ্গল করুন।

করোনাকালীন সময়ে মুকুলের সাথে আমার দেখা হয়নি। মোবাইলে করোনা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। রিস্ক নিয়ে এবার কুরবানির ঈদ বাড়িতেই করেছে। আমি ছিলাম ময়মনসিংহ। ঈদের আগে পাছের ঘটনা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। করোনাকালিন সময়ে মুকুল ফ্যামিলি নিয়ে ঢাকার নিজস্ব ফ্লাইট ছেড়ে কর্মস্থল ঘাটাইল থাকতো। মোবাইল করে বুঝা গেছে মুকুল অসুস্থ্য। কিন্তু আমাকে কিছু বলে নি। তার কিডনি খারাপ হয়েছিলো। তেমন চিকিৎসা করেনি সম্ভবতঃ। যে ছোট ভাইয়ের চিকিতসার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করলো তার নিজের জন্য কেন করলো না? নাকি করোনার ভয়ে ডাক্তারের কাছে যায় নি। যেদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে সেদিন দেখা গেলো কিডনির অবস্থা এতো খারাপ যে ডায়ালাইসিস করতে হবে, রক্তশুন্যতা এতো যে কমপক্ষে ৪-৫ ব্যাগ রক্ত ভরতে হবে। হাসপাতালে ভর্তির সময় পরীক্ষা করে ধরা পড়লো করোনা পজিটিভ। কয়েকদিনেই করোনা নেগেটিভ হলো। কিন্তু তার হার্ট এটাক করলো। করোনার কষ্ট নিয়েই এক রাতে মোবাইলে তার সাথে কথা হয়। বলে “ভাই, গলায় খুব কষ্ট। বুকে খুব কষ্ট। আমি আসার সময় আপনেরে জানাইতে পারি নাই।” আমি বললাম “অসুবিধা নাই। আমি জানি। আমরা সবাই দোয়া করতাছি। আল্লাহ আল্লাহ করো।” আমি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে মেডিসিন কলসালন্স খুজে বের করে মুকুলকে বিশেষভাবে যত্ন নিতে বলি। তারা বিশেষভাবে যত্ন নেয় এবং আমাকে দৈনিক আপডেট দেয়। তাদের একজন আমার প্রাক্তন প্রিয় ছাত্র মাহবুব। ভাগ্য খারাপ করোনা ভালো হয়ে গেলেও আমার ভাইয়ের হার্ট এটাক করলো। নেয়া হলো ইউনাইটেড কার্ডিয়াক হাসপাতালে। আই সি ইউতে ভর্তি রইলো। মোটামুটি সুস্থ্য হলে কেবিনে আনা হলো। অনেকের সাথে অল্প অল্প কথা বলেছে মোবাইলে। তার ক্লাসমেট বন্ধু, আমার চাচাতো শ্যালক কাম মামাতো ভায়েরা রফিক তার কেবিনে গিয়ে ফেইসবুক মেসেঞ্জারে ভিডিও কল দেয়। তাতে আমি অসুস্থ মুকুলকে দেখতে পাই গালভর্তি সাদা দাড়ি। এযেনো অন্য রকম মুকুল। সে শুধু বলে ভাই, ভাই, কদ্দুছ? আমি মোবাইল কদ্দুসকে দেই। কদ্দুছের সাথে বেশ কিছু কথা বলেছে কিন্তু কদ্দুস বুঝতে পারেনি। তারপর আমি আমার শ্যালক সুমুনের কাছে দেই। মুকুল সুমনের সাথেও কথা বলেছে। পরদিন নাকি সারাদিন চেষ্টা করেছে সিদ্দিক ভাইকে কিছু বলার জন্য। কিন্তু সিদ্দিক ভাইর মোবাইল সেদিন নষ্ট ছিল। খুব সম্ভব মসজিদের ব্যাপারে কিছু বলতো। তার কাছে কে কত টাকা পায় তার একটা লিস্ট করায় সেদিন। তারপর আবার হার্ট এটাক করে তীব্রভাবে। প্রথমে আই সিইউ পরে লাইফ সাপোর্টে। একদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ১১ অক্টোবর ২০২০ শনিবার সকাল ৭-৩০ টায় তাকে মৃত ঘোষণা করে। শাহ আলম কাকা আমাকে জানান ৭-৩৭ টায়। ফেইসবুকে নিউজ দিয়ে চলে যাই বাড়িতে।

বিকেল ৫ টার পর জানাজা পড়ে মুকুলকে সমাহিত করা হলো তালুকদার বাড়ির গোরস্থানে ছোট কাক্কুর কাছাকাছি। আমি সকালে কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলাম, সভাবত আগের মতই বাড়ি গিয়ে পরেরদিন সকালে যা করি। হাটতে হাটতে চলে গেলাম বাবা-মার কবরের কাছে। কল্পনা করলাম আমাকেও এখানে মাটির নিচে শোয়ায়ে রাখা হবে। রাস্তায় দাড়িয়ে পশ্চিম দিকে মুখ করে দাড়িয়ে কবরবাসীর জন্য দোয়া করলাম। এবার দোয়া করার সময় আমার পাশে মুকুলকে পেলাম না। মুকুলের কবরটা সামনে পড়লো। কি নির্মম! ছয় ফুট লম্বা মুকুল আজ আমার সামনে মাটির নিচে শুইয়ে আছে। না জানি ফেরেস্তাদের কি কি প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে? আল্লাহ মুকুলকে মাফ করে দিন। আমাকেও মাফ করে দিন। বিনিময়ে বেহেশত দান করুন যেন আমরা আবার একসাথে বেড়াতে পাড়ি আপনার প্রতিশ্রুত উদ্যানে। চলে এসেছি ময়মনসিংহে। আবার কাজে যোগ দিয়েছি। আপনারা আমাকে ব্যস্ত রেখেছেন। চারটি জার্নাল সম্পাদনা করছি। আপনারা আপনাদের সার্থে আমাকে চাপে রেখেছেন আপনাদের কাজটা আগে করে দেয়ার জন্য। বিকেলে চেম্বারে আমাকে চাপে রেখেছেন আপনাদের পরীক্ষার রিপোর্ট আগে দেয়ার জন্য। মুকুলের জন্য আমাকে কাদবারও সময় দেন না। আমার কান্না বাইরে থেকে দেখা যায় না। আমার মন খুব শক্ত। আমি মাকে রাতে কবর দিয়ে সকালে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি বোর্ডের। শত শোকেও আমি থেমে থাকার লোক না। যতদিন বেচে আছি আমি পৃথিবীর বুকে কিছু করে রেখে যেতে চাই আমার কর্মকে, আমার মনের কথাকে। তাই, শত শোকের মধ্যেও আমি কাজ করে যাই। বৃষ্টি কমে গেলে রাস্তার কাদা শুকালে আমি আবার বাড়ি যেতে চাই। মসজিদের কাজ শেষ করতে চাই। কবরের বাউন্ডারি ওয়াল করতে চাই। কাদা রাস্তায় কাউচি ফেলতে চাই। আল্লাহ যেন আমাকে মসজিদ ও পাকা রাস্তা দেখিয়ে দুনিয়া থেকে তুলে নেন।

বাড়ি গিয়ে পাড়াময় ঘুরে বেড়াবো আমার পিছে আর মুকুলকে পাবো না। নাপিতের চালায় গিয়ে দাড়াবো। মুকুলকে কাছে দেখবো না। বাব্বুর চালায় গিয়ে দাড়াবো মৌচাকটার কাছে। মুকুল ছোট বেলায় মনোভাইগ খুইংগা চাকের কামর খাওয়ার আলাপ আর করবে না। মসজিদে গিয়ে সুন্নত নামাজ পড়ে বসে থাকবো। হুজুর মুকেলে আসার পর কুদবা শুরু করবেন বলে অপেক্ষা করবেন। মুকুল আর আসবে না। মোটকথা প্রতিটি মুহুর্তে মুকুলকে মিস করতে হবে আমাকে।

২৩/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/