নাড়ী ঢিলা রোগ আইবিএস

নাড়ী ঢিলা রোগ আইবিএস
(স্বাস্থ্য কথা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

অনেকে পেটের পাকস্থলীকে ভুড়ি আর অন্ত্রকে নাড়ী বলে। একসাথে বলে নাড়ী- ভুড়ি। আবার হাতের কব্জিতে রক্তনালীর উপর আঙুল রেখে রক্ত চলাচলের ঢেউ গণনা করে হার্ট রেট বা পাল্স গণনাকেও অনেকে নাড়ী দেখা বলে। মানুষ জানে যে অন্ত্রের ভিতর পায়খানা থাকে। ছাগল গরু জবাই করে অনেকেই দেখেছে যে নাড়ীর ভিতর পায়খানা থাকে। কাজেই অনেকেই মনে করে নাড়ী ঢিলা থাকলে পায়খানা ধরে রাখা যায় না। খাবার হজম না হয়েই পড়ে যায়। দেখবেন, অনেকেই এমন আছেন, সকালে নাস্তা খাওয়ার কিছুক্ষণ পর পেটে একটা মোচর দিয়ে পায়খানার বেগ হয়। দৌড়ে যেতে হয় লেট্রিনে। কমোডে বসলে কলকলি সব পায়খানা পড়ে যায় কমোডে। নরম পায়খানা। আগের দিনে গ্রামের অনেকেই লোটা অথবা বদনা নিয়ে দৌড়ে যেতেন আড়া জংগলে। এসে বলতেন পেটের সব পড়ে গেছে গেলগেলি। অথচ এই সব লোক সুস্থ মানুষের মতোই। অন্য কোন সমস্যা নেই। নেই কোন জ্বরজারি। শুধু বলে মুখটা একটু তামা তামা লাগে। বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলে নাড়ী ঢিলা মানুষ।

আসলে এই নাড়ী ঢিলা রোগটিকে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় ‘আইবিএস’। এর ফুল মিনিং ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম। যে সব রোগের কারন জানা গেছে সেসব রোগের চিকিৎসাও সহজ হয়েছে। যেসব রোগের প্রকৃত কারন এখনো জানা যায় নি সেসব রোগের ভালো চিকিৎসাও নেই। আইবিএস হলো এমন রোগ যার প্রকৃত কারন এখনো জানা যায় নি। ধারনা করা হচ্ছে এই রুগীরা একটু বেশী শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করে। বাওয়েল বা অন্ত্রের মুভমেন্ট বা ঢেউ অসামঞ্জস্যপুর্ণ। কোন সময় বেশী চলে কোন সময় কম চলে। তাই কয়েকদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে আবার কয়েকদিন ডাইরিয়া থাকে। তিন চার দিন পায়খানা না হয়ে যখন রুগী কমোডে বসে তখন কমোড ভরে যায় পায়খানায়। একটু উল্টাপাল্টা খেলে আরো বেশী পায়খানা হয়। এজন্য রুগী ভয়ে এটা সেটা খেতে চায় না।

অল্প কিছু কার্যকরী ঔষধ আছে এই রোগের। কিন্তু তাতে রুগীরা তেমন সন্তুষ্ট না চিকিৎসা নিয়ে। তাই তারা কিছুদিন পরপর ডাক্তার বদলায়। প্রতিটি ডাক্তার তার সিম্পটম শুনেই রোগ ধরতে পারেন। তারপরও বেশ কিছু দামী দামী পরীক্ষা নিরিক্ষা করান অন্য কোন খারাপ রোগ আছে কিনা জানার জন্য। পরীক্ষার রিপোর্ট সবসময় ভালো আসে। রুগী এইসব রিপোর্ট প্রেসক্রিপশন ফাইলে সুন্দর করে ক্লিপ দিয়ে সাজিয়ে রাখে। একটা রিপোর্টও হারাতে চান না। তাতে তার কাছে এক গাদা কাগজ জমা হয়। এই কাগজ আবার নতুন ডাক্তারকে দেখার জন্য অনুরোধ করে। না দেখলে অসন্তুষ্ট হয়। এটাও একটা লক্ষন আইবিএস রুগীর। রুগী সামর্থ্য থাকলে ডাক্তার বদলাতে বদলাতে সুদুর ব্যাংকক পর্যন্ত চলে যায়। তারাও রুগীকে কয়েক বার ঘুরায় ফলো আপ দেয়ার জন্য। শেষে এই রুগের রহস্যটা বলে দেয়। লাখ লাখ টাকা ভাংগার পর রুগী চিকিৎসা ক্ষান্ত দিয়ে হতাসার আলাপ শেয়ার করে বন্ধুদের সাথে। বন্ধুরা হতাস না হয়ে হার্বাল মেডিসিনের আশ্রয় নিতে বলে। সেখান থেকে হতাস হয়ে হোমিওপাথি মেডিসিন সেবন করে বহু বছর কাটায় কেউ কেউ। কিন্তু নাস্তা করার পর পেটে কামর দিয়ে লেট্রিনে যাওয়ার অভ্যাসটা তার থেকেই যায়। কারন, আইবিএস এর এখনো কোন কারন জানা যায় নি এবং এর কার্যকরী চিকিৎসাও আবিষ্কার হয় নি। কিন্তু যিনি চিকিৎসা করেন তিনি রুগীকে কিছুটা আশ্বাস দেন যে তার ঔষধ খেয়ে ভালো হবার সম্ভাবনা আছে। রুগী তখন তার পূর্বের চিকিৎসকে দোষারোপ করে এবং নতুন বিশ্বাসে কিছুদিন ঔষধ খেয়ে মানষিক প্রশান্তি লাভ করে।

চিকিৎসকগণ সিম্পটম কমানোর জন্য ফাইবারযুক্ত খাবার খেতে বলেন। তৈলাক্ত খাবার খেতে নিষেধ করেন। পেট ভরে না খেয়ে অল্প অল্প খাবার ঘনঘন খেতে বলেন। কপি ও ব্রুকলি খেতে নিষেধ করেন। রোগের সম্পর্কে ধারনা নিয়ে মনের জোড় বাড়ালে আইবিএস এমনি এমনি কমে যায়।
২৫/৮/২০১৯ খ্রী.