নিতা খাওয়া

নিতা খাওয়া
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি যে সময়ের কথা লিখছি সেটা স্বাধীনতা যুদ্ধের আগের সময়ের কথা। তখন একেক মায়ের ৬ থেকে ১৫ জন করে সন্তান থাকত। সেই সময় দেশে মাত্র পরিবার পরিকল্পনার কথা রেডিওতে প্রচার শুরু হয়েছে। তার উপর আবার মৌলভীদের নেতিবাচক মনোভাব ছিল। কেউ কেউ পরিবার পরিকল্পনা গ্রহন করতো, কেউ কেউ করতো না। বিলবোর্ডে লিখা থাকতো “অনেকেই পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, আপনিও করুন।’ অথবা “ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুইটি সন্তানই যথেষ্ট। ” তাই এখন দেখছেন অনেকেরই দুইটি সন্তান মাত্র। আজকাল অনেকেই বাধ্য হয়েই একটি সন্তানই যথেষ্ট মনে করে আর নিচ্ছেন না। এখন আগেরমতো পরিবার পরিকল্পনা গ্রহন করার জন্য প্রচার প্রয়োজন পড়ে না।

আমি সেই সময়ের কথা লিখছি, যে সময় একজন মায়ের ৬/৭ জন করে মেয়ে থাকতো। এদের বিয়ে দিয়ে ৬/৭ জন জামাই পাওয়া যেতো। মেয়ের স্বামীকে গ্রামে জামাই বলা হতো। জামাইকে দাওয়াত করে খাওয়ানোকে বলা হতো নিতা। বড় বোনের স্বামীকে বলা হতো দুলাভাই। ছোট বোনের স্বামীকে বলা হতো মেজবান। মেয়ের মা, খালা, চাচী, ফুফু, বাবা, চাচারা মেয়ের স্বামীকে ডাকতো দামান্দে বলে। দামান্দের খুব ক্কদর ছিল। বিয়ের দিন থেকেই দামান্দের ক্কদর লক্ষ করা যেতো। বিয়ের দিন দামান্দের সাথে দামান্দের সহোদর ছোট ভাই বোন, চাচাত, খালাত, মামাত, ফুফাত ভাই বোন আসতো। তাদেরকে দামান্দের সাথে বিশেষ বিশেষ খাবার দিতে হতো। মেয়েকে শশুর বাড়ি উঠিয়ে নেয়ার দুই একদিন পর জামাই সহ মেয়ের বাড়িতে আনা হতো। এটাকে বলা হতো ফিরানি। ফিরানিটাই ছিল মূলত প্রথম নিতা। ফিরানির সময় জামাইর সাথে জামাইর ছোট সহোদর, খালাত মামাত, চাচাত, ফুফাত ভাই বোনরাও আসতো। মেয়ের এই রকম ভাই বোনরা এমন নতুন মেহমান পেয়ে খুশী হত। তারা একে অপরকে বিয়াই বিয়ানী সম্ভোদন করতো। বিয়াই বিয়ানিদের মধ্যে বেশ ঠাট্টা মশকরা হত। একে অপরকে কানমলা দিতো। কান পিচলা করার জন্য কানের লতিতে সরিষার তেল মেখে নিত। মাঝে মাঝে পিছন দিক থেকে এসে দুলাভাইয়ের কানও মলে দিতো। দুলাভাইয়েও শালা শালির কান মলে দিত। নতুন বিয়াই বিয়ানির ঘারের উপর জামার কলারের ভিতর দিয়ে বিলাই শুং শুংগি ও চোটকার পাতা দিয়ে দিত। চুলকানীর চোটে বিয়াই বিয়ানিরা মাইকেল জ্যাকশনের মত ডান্স করতো। ঠেলায় পড়ে পানিতে নামতে হতো। জামাইর জন্য নানা রকম পিঠা তৈরি হতো। পায়েস রান্না হতো। মোরগ জবাই হতো। সব মেহমান সেই খাবার খেতো। রাতে বিয়াইরা শুইত বাংলা ঘরে বিয়াইদের সাথে। বিয়ানিরা শুইত অন্দরে বিয়ানিদের সাথে। নতুনদের সাথে নতুনদের অনেক নতুন নতুন গল্প হতো। সকালে নাস্তা খেয়ে সবাই চলে যেতো মেয়েকে নিয়ে। যাবার সময় মেয়ের মা জামাইর সাথে আসা সবাইকে টাকা মাইন দিয়ে দিতেন।

এরপর মেয়ে আবার শশুর বাড়ি গিয়ে ঘুরে আসলে বলা হত ঘুরানি। ঘুরানির সময় জামাই সাধারণত মেয়ের সাথে একাই আসতো। এইবার জামাইকে একা পেয়ে খুব আদর যত্ন করে খাওয়াতেন। এইজন্য বলা হয় জামাই আদর।

এরপর মেয়ে নিয়মিত শশুর বাড়িতেই থাকতেন। এক মাস, দুই মাস পরপর মেয়ের বাবা মেয়েকে শশুর বাড়ি থেকে এক দুই সপ্তাহের জন্য বাপের বাড়ি নিয়ে আসতেন। মেয়ের শশুর এসে বউকে নিয়ে যেতেন।

বছরে তিনবার নিতার দাওয়াত দেয়া হতো জামাইদের জন্য। মেয়ের বাবা এক সাথে সব জামাইকে দাওয়াত দিতেন। এটাকে বলা হতো নিতা খাওয়া। জামাইরা একে অপরের ভায়েরা। সেদিন সব ভায়েরা মিলে এক সাথে শশুরবাড়ি নিতা খেতেন। তখন গ্রামে শিক্ষার হার কম ছিল। চাকুরিজীবিও কম ছিল। বেশী ভাগ জামাই কৃষি কাজ করতো। ধান কাটা শেষ হলে তেমন কাজ থাকতো না জামাইদের। সেই সময় তাদের নিতার দাওয়াত দেয়া হতো। মাঘ ফাল্গুনে আমন ধান গোলায় তোলার পর একটা নিতা হতো। তখন জামাইদের জন্য খেজুরের গুড়ের পায়েস ও নানা রকম তেলে ভাজা পিঠা বানানো হতো। বাড়িতে পালা বড় বড় মোরগ ও হাসা জবাই করা হতো। গ্রামের মোরগগুলি ফৃ স্টাইলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াতো। লাল রঙের বৌলওয়ালা দেশী মোরগ গলা বাকিয়ে কুকুরু কু বলে ডাক দিতো। কাতুর কুতুর করে হেলে দুলে হাটত সেই মোরগগুলি। জামাই এলে শ্যালকের দল মোরগ ধরার কাজে লেগে যেতো। মোরগের দৌড়ের সাথে বাচ্চাদের দৌড়ের গতি কম ছিল। সবাই মিলে মোরগের পিছু দৌড়াত। মোরগ এবাড়ি ওবাড়ি আওড়া কাওড়া দৌরাত। এক সময় উড়াল দিয়ে পেয়ারা গাছে উঠে বসত। পোলাপান গাছে উঠত মোরগ ধরার জন্য। মোরগ উড়াল দিয়ে টিনের চালের টুইয়ে গিয়ে বসত। পোলাপান চালে গিয়ে উঠত। চাল থেকে উড়াল দিয়ে মোরগ খেরের পালায় গিয়ে বসত। বাঁশের কোটা দিয়ে অপকা দিলে লাফ দিয়ে নেমে মোরগ খেরে পালার গোড়ার খেরের ভিতর গিয়ে চুপ্টি মেরে বসে হাফাতে থাকতো। এই সুযোগে খপ করে ধরে ফেলতো মোরগরে। মোরগ উচ্চস্বরে কক, ক অ ক, ক অ ক, করতে থাকতো। সেই ডাক শুনে পাড়ার মানুষ জেনে যেতো যে এই বাড়িতে মোরগ জবাই হচ্ছে। পাড়ার মুন্সির কাছে নিয়ে দা দিয়ে মোরগ জবাই করে আনা হতো। মেয়ের মা সেই মোরগ কষিয়ে রান্না করতেন মাটির হেঁসেলে লাকড়ি দিয়ে। মাংস সিদ্ধ হলে পাতিল থেকে বাস্পের সাথে এক ধরনের ঘ্রাণ বের হতো। সেই ঘ্রাণ বাতাসের সাথে মিশে গ্রামময় ছড়িয়ে পড়তো। মেঝেতে পাটি বিছিয়ে সব জামাইকে এক সাথে বসিয়ে খাওয়াতেন মেয়ের মা। মেয়ের মা মনে করতেন যতো জামাইকে খাওয়াবেন ততো মেয়ে জামাইর ভালবাসা পাবে। পেট ভরে খেয়ে জামাইরা এক সাথে চৌকিতে পাতালি হয়ে শুয়ে গল্পগুজব করতো। ৫/৭ ভায়রা এক সাথে শুয়ে গল্প করলে দৃশ্যটা কেমন লাগে ভেবে দেখেছেন? আমি এমন দৃশ্য দেখেছি। জামাইরা যখন শুয়ে শুয়ে গল্পগুজবে জমে থাকতো তখন মেয়েরা সবাই জামতলায় গাছের শিকরে অথবা কাঠের পিড়িতে লাইন দিয়ে বসে মাথায় বিলি দিতো আর শশুর বাড়ির গল্প করতো “আমার জায়ে এই কইল, আমার জায়ে ঐ কইল, ননদে শাশুরির কথা শুনে না, দেবরে লেখাপড়া করার কথা কইয়া বেশী বেশী টাকা ভাংগে, ইত্যাদি। ”

মেয়ের ছোট ছোট বাচ্চারা বাড়ির বাচ্চাদের খুটিমুচি দিয়ে খেলা করতো সারাদিন। দুপুরে গাছের ডালে ছাগলের রশি দিয়ে ঝুলন বানিয়ে ঝুলনে বালিশ দিয়ে কুশন বানিয়ে দোল খেতো। একজন পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে গণনা করত। বিশ দোল খেলে পালা বদল করা হতো।

এরপর জ্যৈষ্ঠ মাসে একটা নিতা হতো। উদ্যেশ্য ছিল জামাইকে ইচ্ছামত আম দুধ খাওয়ানো। এই সময় জামাইরা শশুর বাড়ি নিতা খেতে আসার সময় একজগ করে দুধ ও কিছু মালদই আম নিয়ে আসতো। মেয়ের বাবাও আম দুধ আনতেন। আগের মতই মোরগ জবাই হত। এবার পায়েসের পরিবর্তে পাতে আম দুধ দেয়া হতো।জামাইরা আমদুধ দিয়ে ভাত খেয়ে বিচুনের বাতাস খেতেন এক সাথে এক চৌকিতে। মেয়েরা নিজ হাতে বাপের গাছের আম পেড়ে কাশুন্দি দিয়ে ভর্তা করে সবাই মিলে এক সাথে খেতো।

আরেকটা নিতা হতো ভাদ্র মাসে। আউশধান কাটা শেষে। নতুন ভাতুরি ধানের চিড়া কোটা হতো। সেই চিড়ার সাথে কুশাইরা গুড় ও নারিকেল মিশিয়ে ঢেকিতে পার দিয়ে বানানো হত নারিকেল চিড়া পার। নারিকেল চিড়া পার খুব স্বাদের। ভাদ্র মাসে তাল পাকতো। তালের রস ও কুসাইরা গুড় চাউলের গুড়ার সাথে গুলে তালের পিঠা বানানো হতো। সেই পিঠা খেয়ে জামাইরা ঘুম দিতো। সবাই বলত “জাইদেরকে তালের নেশায় ধরেছে। ”

এছাড়াও কেউ কেউ বেশী বেশী জামাই আদর করার জন্য জামাইরে নিতার দাওয়াত দিত। কর্মক্লান্ত জামাইদের জন্য নিতার দাওয়াত খাওয়া বিশ্রাম ও বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল বটে।

৬/৭/২০১৯ ইং
ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ জার্নি