নোনা ইলিশ

নোনা ইলিশ
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাজারে দু’রকম ইলিশ পাওয়া যায়। একটা হলো নোনা ইলিশ, আরেকটা হলো তাজা ইলিশ। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন বর্ষা সিজন ছাড়া ইলিশ পাওয়া যেতো না। পদ্মা নদীতে ইলিশ ধরে মাঝিরা পাইকারের কাছে বিক্রি করতো। সেখান থেকে আমাদের এলাকার মাছ ব্যবসায়ীরা বরফ দিয়ে নৌকায় করে নিয়ে এসে বিক্রি করতো। পাহাড় ও ভর অঞ্চলের সংযোগ স্থলের হাটগুলো বর্ষাকালে জমতো বেশী। সবচেয়ে বেশী জমতো ইন্দ্রজানীর হাট। এই হাটে বেশ ইলিশ উঠতো। আখকে আমরা কুশাইর বলতাম। কুশার আমাদের এলাকায় হতো না। ইন্দ্রজানীর হাটে কুশাইর আসতো ভুয়াপুর -গোপালপুর এলাকা থেকে। বরফ দেয়া না হলেও ইলিশ তেমন পঁচতোনা। আর ইলিশ পঁচলেও দুর্ঘন্ধ না ছড়িয়ে বিশেষ এক একধরনের সুগন্ধ বের হয়। খেতেও ভালো লাগে। নদী থেকে ইলিশ ধরার পর কিছুক্ষণ ছটফট করে মারা যায়। ইন্দ্রজানীর হাটে থেকে কিন্তু আমরা মরা ইলিশ কিনতাম। বলতাম তাজা ইলিশ। পদ্মানদীতে জেলেরা প্রচুর ইলিশ ধরে। এতো ইলিশ তারা বরফে সংরক্ষণ করতে পারে না। তাই, ইলিশ চাক চাক করে কেটে তার ভেতর লবন ভরে দেয়া হয়। আমরা এগুলোকে কাটা ইলিশও বলি। লবন দেয়ার ফলে ইলিশ পঁচে না। অনেকদিন পরেও খাওয়া যায়। ইন্দ্রজানীর হাটে পাট বিক্রি করে এলাকার মানুষ ইলিশ কিনতো। পোলাপানদের জন্য কিনতো কুশাইর। কুশাইরের একদিকে সদাইর টোবলা আরেক দিকে ইলিশ ঝুলিয়ে কাঁধে করে নিয়ে যেতো বাড়িতে। কেউ কেউ শুধু কাটা ইলিশ, আবার কেউ কেউ তাজা ও কাটা ইলিশ দু’টাই নিতো। আমার একটা দৃশ্য এখনও মনে আছে। বাবা আমাদের জন্য এভাবে কাঁধে করে ইন্দ্রজানি হাট থেকে কুশাইরের একদিকে বিরাট এক তাজা ইলিশ এবং কাটা ইলিশ, আরেক দিকে সদাইর টোবলা নিয়ে এলেন। আমরা এগিয়ে গিয়ে কুশাইর নিয়ে নিলাম। দা দিয়ে কুপিয়ে খন্ড কন্ড করে দাঁত দিয়ে ছিলিয়ে কুশাইর খেলাম। টোবলার ভেতর পদ্মপাতায় পেঁচানো ছিলো জিলাপি। ইন্দ্রজানি হাটের বানানো জিলাপি। আমরা তখন বলতাম জিলাপা। হায়রে স্বাদের ছিলো সেই জিলাপা! কুশাইরা গুড়ের জিলাপা। টসটসে রসে ভরা ছিলো। মা রান্নাঘরের মেঝেতে বসে সেই তাজা ইলিশ কাটছিলেন। সেই ইলিশের বিশেষ ধরনের ঘ্রাণ ছিলো। বিরাট সাইজের কাটা ইলিশটা ছেতুকা দিয়ে বাঁকা করে বাধা ছিলো। সেটা ঝুলিয়ে রাখা ছিলো ঢেকির আরহলুইর সাথে। বেশীরভাগ সময় মা তাজা ইলিশ রান্না করতেন মোটা মোটা ডাটা দিয়ে। কাটা ইলিশ চাক চাক করে লবন সহ কাচের বৈয়ামে ভরে শিকের উপর রেখে দিতেন বৈয়ামের বুটুম টাইট করে লাগিয়ে। তাতে অনেক দিন এভাবে রাখা যেতো। যেদিন রান্না করার তেমন কিছু থাকতো না সেদিন কাটা ইলিশ বটুরি করে কেটে ডাটা বুঝুরির সাথে ভাজি করতেন। ভাজির সাথে আলাদা লবন দিতে হতো না। ইলিশের সাথে থাকা লবনেই হয়ে যেতো। কোন কোন সময় ডাটা মিশিয়ে ভাত খেয়ে ফেলতাম। ইলিশের টুকরো তুলে রাখতাম টিনের প্লেটের কিনারে। শেষে শুধু মাছের টুকরা একটু একটু করে ছিড়ে ছিড়ে খেতাম দেখিয়ে দেখিয়ে। আমি দেখাতাম ছোট বোন সোমলাকে। সোমলা দেখাতো আমাকে। দেশে পাকা রাস্তাঘাট হওয়াতে ইন্দ্রজানি হাট আর আগের মতো জমে না। আমিও শহরে থাকার দরূন হয়তো তেমন জানিনা। তবে শহরে থাকলেও নোনা ইলিশ আমি বাসায় আনি। চিচিঙ্গা ও কচি ডাটা দিয়ে নোনা ইলিশ আমি প্রায়ই খাই। আমার স্ত্রী স্বপ্নাও পছন্দ করে নোনা ইলিশ।

১৯৮৮-৮৯ সনে বরিশাল ছিলাম। সেখানে আমি দেখেছি নদী থেকে আসলেই তাজা ইলিশ ধরতে। নৌকার পাটাতনে পুটিমাছের মতো ছটফট করতে দেখেছি। আর আমরা মরা পঁচা ইলিশকে বলি তাজা ইলিশ। এই ইলিশ ওখানে খুব সস্তা ছিলো। কিন্তু সেগুলো ইন্দ্রজানি হাটের ইলিশের মতো স্বাদ লাগতো না। ওদের সাথে আলাপ করতে গিয়ে বলি যে আমরা এমন নোনা ইলিশ খাই। ওরা বলাবলি করতো “ময়মনসিংহের মানুষ নাকি পঁচা ইলিশ খায়। ওদের হাটে আমি নোনা ইলিশ দেখিনি।

একবার বাকেরগঞ্জের বাস খুজতে কীর্তন খোলা নদীর পার ধরে একটু পেছনের দিকে গিয়েছিলাম। দেখলাম এক লোক বসে বটি দিয়ে তাজা ইলিশ মাছ গ্যাচগ্যাচি কেটে লবন মেখে ছুড়ে মারছেন। তাতে প্রতিটি ইলিশ কেটে লবন লাগাতে সময় লাগছে ১০-১২ সেকেন্ড। এত দ্রুত কাজটি করছেন। ইলিশ মাছগুলো খেরের পালার মতো স্তুপ হয়ে বসে যাচ্ছে। অভিজ্ঞতা হলো কিভাবে কাটা ইলিশ বানায়।

গত দু’বছর আগে শহরের বাজারে গেলাম নোনা ইলিশ কিনতে। এক দোকানী দেখলাম নোনা ইলিশ চাকা ধরে বিক্রি করছেন। আমি এত বড় ইলিশের চাকা দেখিনি। আমি জিজ্ঞেস করলাল এমন বড় ইলিশ আস্ত আছে কিনা। তিনি বললেন
– এত বড় ইলিশের দাম অনেক। কেউ নিতে চায় না। তাই চাকা ধরে নোনা ইলিশ বিক্রি করছি।
– এতো বড় তাজা ইলিশও তো দেখি না।
– এগুলো পদ্মা নদীর ইলিশ। ইন্ডিয়া চলে যায়।
– আমি কোলকাতার ধানসিঁড়ি হোটেলে খাওয়ার সময় ইয়া বড় একটা ইলিশের পিস নিয়েছিলাম। সরিষা-ইলিশ। খুব স্বাদের ছিলো সেই ইলিশ।
– সাব, নোনা ইলিশের এই পিসটা নিয়ে যান খুব স্বাদ পাবেন। ইলিশ যত বড় হবে স্বাদ তত বেশী হবে।
– এই পিসটার দাম কত?
– সাব, এটার দাম ৫০০ টাকা। আপনি নিলে ৪৫০ টাকা, এক দাম।
– এক টুকরো ইলিশের দাম ৪৫০ টাকা? ১৫০ টাকায় তো আস্ত ইলিশ কেনা যায়।
– কি যে কন সাব? ১৫০ টাকায় ইলিশ পাবেন না, ঝাটকা পাবেন।
– ঠিক আছে। বাদ দেন সব কথা। কত হলে দেবেন?
– বিশ্বাস করুন, খোদার কসম এই টুকরাটা বেচলে আমার লাভ অবো মাত্র ১০ টাকা। বিশ্বাস করে নেন। খাইয়া দেখুন মাছটা।
– কিন্তু আপনিতো আমাকে ঠকাচ্ছেন।
– আল্লাহর কসম। বিশ্বাস করুন।

লোকটাকে দেখে ধার্মিক মনে হলো। মাথায় টুপি আছে, লম্বা দাড়ি আছে। বিশ্বাস করে ৪৫০ টাকা দিয়েই নোনা ইলিশের পিসটি নিলাম। মাছ নিয়ে ঘুরে রওনা দেয়ার সাথে সাথে লোকটা গেয়ে উঠলেন “আল্লাহ, মাফ করে দাও, ক্ষমা করে দাও।” শুনে কেমন যেনো মনে হলো লোকটি আমাকে ঠকিয়ে আল্লাহর কাছে গানের সুরে সুরে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন। আমি ঘুরে দাড়ালাম। লোকটা অন্য দিকে ঘুরে আবার গাইলেন “মাফ করে দাও, ক্ষমা করে দাও।” মানুষের প্রতি অবিশ্বাস না থাকাই ভালো ভেবে নোনা ইলিশের পিস নিয়ে চলে এলাম।
৪/১১/২০২০ খ্রি.
ময়মনসিংহ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/