পরীক্ষার জন্য কোন সময়ের প্রস্রাব নিবো?

পরীক্ষার জন্য কোন সময়ের প্রস্রাব নিবো?
(স্বাস্থ্য কথা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আপনারা যারা ডাক্তারের কাছে গিয়েছেন চিকিৎসার জন্য ডাক্তার আপনার শরীর পরীক্ষা করেই দেখবেন কিছু ইনভেস্টিগেশন করার জন্য লিখে দেন। এর মধ্যে থাকে রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা, পায়খানা পরীক্ষা বা অন্য কোনো পরীক্ষা – যেমন এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজি, সিটিস্ক্যান ইত্যাদি। তবে প্রস্রাব পরীক্ষাটা দেখবেন প্রায় সবার ক্ষেত্রেই দেওয়া হয়। বিশেষ করে প্রস্রাবের রুটিন এক্সামিনেশন পরীক্ষা। রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রস্রাবের রুটিন টেস্ট হলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির অবস্থা জানা যায়, ইউরিনারি ট্রাক্ট ইনফেকশন বা অন্য কোনো সমস্যার কথা জানা যায়, শরীরের অন্যান্য অংগের রোগের খবরও জানা যায়। সেসব রোগে প্রস্রাবের যে পরিবর্তন হয় সেগুলি প্রস্রাবের রিপোর্টে পাওয়া। প্রস্রাবের বিভিন্নরকম পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন সময়ের সেম্পল বা নমুনা নিতে হয়। পরীক্ষার জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে সকালের প্রস্রাব বা মর্নিং সেম্পল নিতে হয়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ফ্রেশ সেম্পল বা যেকোন সময়ের প্রস্রাব নিতে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সারাদিন রাতের ২৪ ঘন্টার প্রস্রাব পরীক্ষা করা হয়। অর্থাৎ ২৪ ঘন্টায় যতোটুকু প্রস্রাব হয় তার সম্পুর্ন পরীক্ষা করাতে হয়।

সবচেয়ে বেশী পরীক্ষা লেখা হয় ইউরিন রুটিন এক্সামিনেশন বা আর ই। আর ই পরীক্ষায় মূলত প্রশাবের কালার বা রঙ, এলবুমিন, সুগার, অতিরিক্ত ফসফেট, পাস সেল, ইপিথেলিয়াল সেল, আরবিসি এবং বিভিন্ন রকম ক্রিস্টাল-এর রিপোর্ট দেওয়া হয়। বিভিন্ন রোগে বিভিন্ন কালার হয়। প্রস্রাবের সাথে এলবুমিন গেলে সাধারণত কিডনির সমস্যা আছে ধরে নেয়া হয়। সুগার যায় সাধারণত ডায়াবেটিস মেলাইটাস রোগে। কিছু কিছু রোগে অতিরিক্ত ফসফেট যায় প্রস্রাবের সাথে। প্রতি হাই পাওয়ার ফিল্ডে ৫ টার বেশী পাস সেল পাওয়া গেলে ইউরিনারি ট্রাক্টে ইনফেকশন হয়েছে সন্দেহ করা হয়। কিডনির রোগে প্রস্রাবে আরবিসি পাওয়া যায়। আর ই পরীক্ষার জন্য প্রস্রাব যত ফ্রেস হবে তত ভালো। ল্যাব খোলা থাকা কালীন এক টেস্ট টিউব পরিমান অথবা একটা ইউনিয়ন কালেকশন বোতলে প্রস্রাব দিতে হয়। বাসায় কালেকশন না করে ল্যাবের টয়লেটে গিয়ে কালেকশন করা উত্তম। যাদের প্রস্রাবে ইনফেকশন হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয় তাদেরকে ইউরিন কালচার ও সেনসিটিভিটি বা সিএস পরীক্ষা করতে পরামর্শ দেয়া হয়। সিএস করতে জীবাণুমুক্ত টেস্ট টিউবে প্রস্রাব কালেকশন করতে হয়। এজন্য ল্যাব থেকে এই ধরনের টেস্ট টিউব সংগ্রহ করতে হয়। এই পরীক্ষার জন্য যেকোন সময়ের প্রস্রাব নিলেও চলে। তবে সকালের প্রথম প্রস্রাবটা বেশী ভালো হয়। কারন, সকালের প্রস্রাবে জীবাণুর ঘনত্ব বেশী থাকে।

ব্লাড সুগার পরীক্ষার সাথে সাধারণত করোসপন্ডিং ইউরিন সুগার (CUS) করতে বলা হয়। অর্থাৎ যে সময়ের রক্ত সুগার লেভেল দেখার জন্য নেয়া হলো তখন প্রস্রাবে সুগার এসেছিলো কি না। কাজেই আগে থেকে পেটের ইউরিনারি ব্লাডারে জমে থাকা ইউরিন প্রস্রাব করে ফেলে দিতে হবে। তার ১৫/২০ মিনিট পর প্রস্রাব দিতে হবে। সিইউএস দেখার জন্য এক এমএল প্রস্রাবই যথেষ্ট। আগে থেকে জমে থাকা প্রস্রাবে যখন তার সুগার লেভেল বেশী ছিলো তখনকারটা দেখাতে পারে।

চব্বিশ ঘন্টার প্রস্রাবের পরীক্ষার মধ্যে সবচেয়ে বেশী করা 24 hours urine protein বা urinary total protein (UTP) বা ২৪ ঘন্টার প্রস্রাবের প্রোটিন। দিনে রাতে একেক সময় একেক পরিমাণে প্রোটিন যায় প্রস্রাবের সাথে। তাই একবারের নমুনা দেখে কি পরিমাণ প্রোটিন যায় তা বলা মুশকিল। এইজন্য ২৪ ঘন্টার প্রস্রাব কালেকশন করে সম্পুর্ন প্রস্রাব ল্যাবে জমা দিতে হয়। এটা করতে গিয়ে অনেকেই উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে। তাতে পরীক্ষার রিপোর্ট ভুল আসে। কেউ কেউ ২৪ ঘন্টার প্রস্রাব কালেকশন করে ভুল করে সেখান থেকে মাত্র এক বোতল প্রস্রাব ল্যাবে জমা দেয়। বিশেষ করে খিটখিটে মেজাজের রোগী হলে বলেই ফেলে “ডাক্তারের কি মাথা খারাপ হইছে নাকি যে জগ ভইরা প্রস্রাব দিতে হইবো?” ল্যাব যদি জানতে না পারে যে কম পরিমান সাপ্লাই দিয়েছে তবে প্রোটিনের হিসাব ভুল হবে। ২৪ ঘন্টার হিসাব নিয়েও খটকা আছে। কেউ কেউ মনে করেন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রস্রাব করে ধরে, সারাদিন ও রাতের প্রস্রাব ধরে পরদিন সকাল পর্যন্ত প্রস্রাব করে বৈয়ামে কালেকশন করতে হবে। এই ভুলটা সচরাচর করে থাকে রোগীরা। হিসাব করে দেখুন এক্ষেত্রে কয় ঘন্টা হয়েছে। মনে করুন, রাত ১০ টায় রোগী টয়লেটে প্রস্রাব করে ফেলে দিয়েছে। সকাল ৬ টায় প্রথম প্রস্রাব করে বৈয়ামে রেখে দিলো। সারাদিন রাতে যা হলো তাও রেখে দিলো। পরদিন সকালেরটা ধরে শেষ করলো। কয় ঘন্টা হলো? রাত ১০ টা থেকে সকাল ৬ টা পর্যন্ত ৮ ঘন্টা সকাল ৬ টা থেকে পরদিন সকাল ৬ টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টা। মোট ৩২ ঘন্টার প্রস্রাব দিয়েছে রোগী। রিপোর্টে প্রোটিনের পরিমাণ বেশী আসবে। এটা ভুল রিপোর্ট। চিকিৎসাও ভুল হবে এই রিপোর্ট দেখে। সঠিক নিয়মটা হলো এরকম। রোগী যে কোন সময় থেকেই প্রস্রাব ধরা শুরু করবেন। মনে করুন বিকেল ২ টা থেকে। এই সময় তিনি টয়লেটে প্রস্রাব করে ফেলে দেবেন। তারপর থেকে যতবার প্রস্রাব হবে সব বোতলে ধরবেন এবং পরিস্কার বৈয়ামে রাখবেন। প্রিজার্ভেটিভ হিসাবে বৈয়ামে এক দুই এমএল টলুইন, না পাওয়া গেলে ফরমালিন দেয়া যেতে পারে। ল্যাব থেকে এটা সাপ্লাই দেয়া হয়। পরদিন বিকেল ২ টার সময় শেষ প্রস্রাব করে বোতলে নিতে হবে। প্রস্রাবের চাপ না থাকলেও নির্দিষ্ট শেষ সময়টায় প্রস্রাব ধরতে হবে, এক দুই ফোটা যাই হোক। যদিও আগের দিন ২টার সময় প্রস্রাব করে ফেলে দেয়া হয়েছে তবু সেই সময় থেকেই গণনা শুরু করতে হবে। কারন, সেই সময় থেকেই প্রস্রাব থলিতে জমা হইতে থাকে। হিসাব করে দেখুন এবার ২৪ ঘন্টার প্রস্রাবই পাওয়া গেছে। শুধু ২ টা থেকে নয় যখন পরীক্ষার জন্য লেখা হলো তখন থেকেই শুরু করা যায় টয়লেটে প্রস্রাব করে। তাতে সময় বাচবে। এজন্য রোগীকে আগেই বলে দেয়া ভালো যে কখনকার প্রস্রাব কিভাবে কালেকশন করবেন এবং পরীক্ষার জন্য ল্যাবে জমা দেবেন। সঠিক চিকিৎসার জন্য চাই সঠিক ল্যাবরেটরি ইনভেস্টিগেশন।

প্রেগন্যান্সি হয়েছে কিনা দেখার জন্য প্রস্রাব পরীক্ষা করা হয়। বলা হয় প্রেগন্যান্সি টেস্ট। প্রেগন্যান্সিতে প্লাসেন্টার কোরিওনিক ভিলাই থেকে হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রোপিন (HCG) তৈরি হয়ে রক্তে প্রবাহিত হয়ে প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায়। এই হোরমোন তৈরি হয়ে প্রস্রাবে আসতে কয়েকদিন সময় নেয়। সাধারণত পেরিয়ড বা মাসিক যেদিন শুরু হবার সম্ভাব্য তারিখ ছিল তার ৪-৫ দিন পর থেকে প্রস্রাবে এই হরমোনের উপস্তিতি প্রেগন্যান্সি টেস্টের মাধ্যমে নির্ণয় করা যায়। প্রথমদিকে এই হরমোনের ঘনত্ব প্রস্রাবে কম থাকে। তাই সকালের প্রস্রাব নিয়ে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করতে হয়। মাসিক বন্ধের দুই মাস হয়ে গেলে সকালের প্রস্রাব প্রয়োজন পড়ে না। যে কোন সময়ের প্রস্রাব হলেই হবে।

প্রস্রাবের রিপোর্ট সঠিক পাওয়ার জন্য এবং রোগীর হয়রানি কমানোর জন্য চিকিৎসকের দায়িত্ব হলো পরীক্ষার নিয়ম কানুন একটু বলে দেয়া এবং রোগীর দায়িত্ব হলো তা বুঝে নেয়া। পরীক্ষার রেজাল্ট যেমন হবে, চিকিৎসাও তেমন হবে।
১৩/১১/২০২০
ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


থাপ্পড় দিয়ে ঠিক করা

থাপ্পড় দিয়ে ঠিক করা

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কোন কিছু নষ্ট হলে মেরামত করতে হয়। কম্পিউটারের সফটওয়্যার প্রোগ্রামও নষ্ট হলে মেরামত করতে হয়। ইংরেজিতে বলা হয় ফিক্স করা। আমাদের গ্রামে ছোট বেলায় দেখেছি কোন পোলাপান দুষ্টুমি করলে বড়রা ভয় দেখায়ে বলতেন “থাপ্পড় মাইরা সই কইরা ফালামু।” এখানে সই করা মানে হলো ঠিক করে ফেলা। থাপড়াইয়া অনেক কিছু ঠিক করা যায়। আমরা যখন নতুন ডাক্তার হয়েছি তখন দেখেছি সন্তান জন্মগ্রহণের পর পরই নবজাতককে কাঁদাতে। যেসব বাচ্চা কাঁদতে দেরি করতো তাদের দু’পা ধরে মাথা নিচুর দিকে দিয়ে পিঠের উপর হালকা থাপ্পড় মারতেন ডাক্তাররা। এটাই নিয়ম ছিলো। বাচ্চাকে থাপড়াইয়া কাঁদাতে হবে। বাচ্চা কাঁদা মানে তার স্বাস নালী পরিস্কার আছে। এখন নাকি এই পদ্ধতি নেই।

খুব ছোট বেলা থেকেই আমরা রেডিও শুনতাম। ড্রাই সেল ব্যাটারি দিয়ে রেডিও বাজানো হতো। ব্যটারির মাথা ঠিক মতো না বসালে অথবা ভেতরে স্পিকারের সাথে তারের সংযোগের ত্রুটি থাকলে রেডিও বাজতো না। বাজলেও আবার ভেড় ভেড় ঘেড় ঘেড় শব্দ করতো। রেডিওর পেছনে থাপ্পড় দিলে অনেক সময় শব্দ পরিস্কার আসতো। বলা হতো “থাপ্পড় দিয়া রেডিও হজু কইরা ফালাইছি।” এখানে হজু করা মানে ঠিক করে ফেলা। রেডিও বাঁজিয়েছেন অথচ রেডিওকে থাপ্পড় দেন নাই এমন লোক কম আছেন। এখন রেডিও বাজাই না। থাপড়াইতেও হয় না।

আমি যখন মেডিকেলে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি তখন এক সন্ধায় স্টেশন রোডের দোকানে গিয়েছিলাম কিছু একটা কিনতে। সেখানে আমার আরও দু’জন বন্ধুও গিয়েছিলো কিছু কিনতে। দোকানে খুব ভির ছিলো। বন্ধু বার বার জিজ্ঞেস করছিলো “ভাই এটার দাম কতো।” দোকানী শুনতে পারছিলেন না। আরেক বন্ধু বললো “থাপ্পড় দিয়ে জিজ্ঞেস করো।” বলার সাথে সাথে সব দোকালিরা ক্ষেপে গেলো । বলতে লাগলো “এতো বড় কথা! থাপ্পড় মারতে চায়!” গন্ডগোল শুরু হয়ে গেলো। একসময় থেমে গেলে একজন জানতে চাইলেন যে থাপ্পড় মারতে চেয়েছেন কেনো। সে উত্তরে বললো “আমি কেন থাপ্পড় মারতে চাইবো? আমি বলতে চেয়েছিলাম দোকানীর দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য টেবিলে থাপ্পড় দিয়ে শব্দ করতে। আপনারা না বুঝেই হই চই শুরু করে দিলেন।”

একবার জোবেদ ভুইয়া বিল্ডিংয়ে একজন নাম করা ডাক্তার এসে চেম্বার নিয়ে বসলেন। তার একজন চেম্বার এসিস্ট্যান্ট প্রয়োজন হলো। কয়েকজন ছেলে আগ্রহ প্রকাশ করলো এসিস্ট্যান্ট হতে। কিন্তু একজন নাছোড়বান্দা ছেলে বেঁকে বসলো যে তাকেই এসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। ভুইয়া সাব রাজি না হওয়াতে ছেলেটি প্রতিদিন বিকেলে এসে চিল্লাচিল্লি করতো চেম্বারের সামনে। এভাবে তাকে পরপর তিন দিন ডিস্টার্ব করতে দেখেছি। তাকে আর না আসতে দেখে আমি ভুইয়া সাবকে জিজ্ঞেস করলাম

– ঐ ছেলেটির কি হলো। আর যে আসতে দেখি না?

– আর আসবে না। একটা থাপ্পড় মাইরা ঠিক কইরা ফালাইছি। তিন দিন ধৈর্য্য ধইরা দেখলাম। ঠিক হইলো না। শেষের দিন আমাকে দেখিয়ে চিল্লাচিল্লি করে আর বিল্ডিংয়ের ওয়ালে লাথথি মারে। আমার হাতের নাগালেই ছিলো। গালের মধ্যে এমন জোরে একটা থাপ্পড় মারছি যে ঘুরতে ঘুরতে ওয়ালে বারি খাইয়া পইরা গেছে। তারপর উঠে চইলা গেছে। আর আইবো না। এক থাপ্পড়েই ঠিক অইয়া গেছে।

কয়েক বছর আগে একটি এইচ পি ব্রান্ডের প্রোবুক ল্যাপটপ কিনেছিলাম। অপারেটিং সিস্টেম দেয়া হয়েছিল উইন্ডোজ ১০। কিন্তু প্রথম থেকেই ল্যাপটপ প্রোগ্রামে ডিস্টার্ব দিতে থাকে। নিজে ঠিক করতে না পেরে কম্পিউটার মেরামতের দোকানে নিয়ে গেলাম। সেখানকার নিয়ম হলো কেউ রুমের ভেতর প্রবেশ করতে পারবে না। তারা স্লিপ দিয়ে ল্যাপটপ জমা রাখবে। মেরামত করা হয়ে গেলে ফোন করা হবে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বড় টেনশনের কাজ। কম্পিউটারে কত কি প্রাইভেট জিনিস থাকে। সেগুলো যদি তারা কপি করে রেখে দেয়? তারপরও নিরুপায় হয়ে তাদের হাতে ল্যাপটপ দিয়ে এলাম। দুই ঘুরানি খাওয়ালো, টাকাও নিলো কিন্তু ল্যাপটপ হজু হলো না। শেষে বললো যে এটাতে উইন্ডোজ ১০ চলবে না। দিয়ে দিলো উইন্ডোজ ৮। এটা দিয়েই এতদিন চালালাম। সম্প্রতি বড় ঝামেলা শুরু করলো আমার কম্পিউটারে। কাজ করছি, কাজ করছি, হঠাৎ উইন্ডোজ হেল্প ফাইল অটো ওপেন হতে লাগলো শত শত বার। শেষে হ্যাং হয়ে থাকে কম্পিউটার। কি কারনে এমন হয় তা খুঁজে গুগল থেকে বের করে পড়তে লাগলাম এবং ইউটিউব থেকে দেখতে লাগলাম। অনেক ঘন্টা নষ্ট করলাম। কিন্তু হজু করতে পারলাম না। শপে নিয়ে গেলাম না, যদি তারা কিছু কপি করে নিয়ে রাখে? আমি সাক্কেস কম্পিউটারের জাকিরকে বিশ্বাস করি। টুকটাক সমস্যা হলে তার কাছেই যাই। ফোনে আমার সমস্যাটা জানালে তিনি উইন্ডোজ ১০ ইন্সটল করতে বললেন। আমি কয়েকঘন্টা চেষ্টা করে ইউন্ডোজ ১০ ইন্সটল করলাম। কম্পিউটার আরও ফাস্ট হলো কিন্তু আবার আগের সমস্যাটা দেখা দিলো। এই কাজটা জাকির বা অন্য কেউ করে দিলে হয়তো আমি তাদেরকে দোষারোপ করতাম। আমি জাকিরকে ফোনে জানালাম “এতো সময় ব্যয় করে উইন্ডোজ পাল্টালাম সমস্যাটা রইয়াই গেলো।” জাকির বললেন “স্যার, আমার মনে হয় আপনার ল্যাপটপের কিবোর্ড-এ ময়লা ঢুকেছে। একটু থাপ্পড় দিন ঠিক হয়ে যাবে। অনেক সময় কি বোর্ডের ফাঁক দিয়ে ময়লা ঢুকে বাটন শর্ট হয়ে থাকে। ফলে বার বার কি বোর্ড থেকে সিগনাল গিয়ে কমান্ড চলতে থাকে। একটু থাপ্পড় দিয়ে দেখুন, স্যার। ঠিক হয়ে যাবে।” আমার ছোট বেলার রেডিও থাপড়ানির কথা মনে পড়লো। ল্যাপটপের কি বোর্ড উপুর করে ধরে ডান হাত দিয়ে কয়েকটা থাপ্পড় মারলাম। তারপর থেকেই ঠিক। কাজ করেও আরাম পাচ্ছি আগের থেকে। ইচ্ছা করলে জাকির তার শপে নিয়ে আমার ল্যাপটপটাকে কয়েকটা থাপ্পড় দিয়ে ঠিক করে আমার থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু জাকির তা করবে না। জাকিরের জীবন সাক্কেস ফুল হউক। সাক্কেস কম্পিউটারের জাকির।

৬/১১/২০২০

ময়মনসিংহ

 

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


সমস্যাঃ ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া

সমস্যাঃ ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ আসাকে ডাক্তারি ভাষায় ফ্রিকুয়েন্সি অফ মিকচুরেশন বলা হয়। ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ হলে স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটে, ঘনঘন ঘুম ভেঙ্গে যায়। দিন রাত ২৪ ঘন্টায় যদি তিন লিটারের বেশি প্রস্রাব হয় তবে এটাকে পলিইউরিয়া বা বহুমুত্র বলা হয়। বাথরুমের পৌঁছার আগেই যদি প্রস্রাব করে কাপড় নষ্ট হয়ে যায় তখন বলা হয় ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স।

 

পেটের ভেতর মেরুদণ্ডের দু’পাশে দু’টি কিডনি থাকে। কিডনি রক্ত থেকে ছেকে দূষিত পদার্থ পানির সাথে বের করে দেয়। এটাই ইউরিন বা প্রস্রাব। সর্বদায়ই কিডনি থেকে প্রস্রাব তৈরি হচ্ছে। সেই প্রস্তাব ইরেটার নালী দিয়ে এসে তলপেটে মূত্রথলি বা ইউরিনারি ব্লাডারে জমা হচ্ছে। জমতে জমতে ব্লাডার পূর্ণ হয়ে গেলে প্রস্রাবের চাপ অনুভূত হয়। তখন বাথরুমে গিয়ে প্রস্রাব করে ব্লাডার খালি করতে হয়। বেশিরভাগ মানুষ ২৪ ঘন্টায় প্রস্রাব করে ছয় – সাত বার। বাচ্চাদের থলি যেহেতু ছোট থাকে সেহেতু তারা বড়দের থেকে বেশি ঘন ঘন প্রস্রাব করে।

ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়ার কারণ

 

কেউ কেউ আছেন ঘন ঘন পানি খান। ঘন ঘন পানি খেলে তো ঘন ঘন প্রস্রাব হবে, এটা সহজ কথা। বিশেষ করে রাতে ঘুমাবার আগে বেশি পানি খেলে ঘুম থেকে উঠতে হবে ঘন ঘন প্রস্রাব করার জন্য। শীতের দিনে শরীর কম ঘামে তাই শীতের দিনে কম পানি খেলেও চলে। শীতের দিনে বেশী পানি খেলে আরও ঘন ঘন প্রস্রাব হবে। কোনো কোনো রোগী আছে তাদের অনেক প্রকার ঔষধের সাথে অনেক পানি খেতে হয়। এটা অতিরিক্ত পানি। অতিরিক্ত পানি খাওয়ার জন্য ঘন ঘন প্রস্রাব হবে। কোন কোন বাচ্চা ঘনঘন বাথরুমে যায় তার শারীরিক কোনো সমস্যা না থাকলেও। এটাকে বলা হয় টিক। কোন একটা কাজ বারবার করলে বলা হয় টিক। প্রস্রাব করাও একটা কাজ। বাচ্চাদের প্রস্রাব করার ঠিক হতে পারে। এসব বাচ্চা ঘন ঘন প্রস্রাব করতে বাথরুমে যাবে। কিছু কিছু বাচ্চা আছে তারা লেখাপড়া করা তেমন পছন্দ করে না। তাই বাড়িতে হাউজ টিউটর এলেই বাথরুমে প্রবেশ করে। কোন কোন বাবাও আছেন বাইরে থেকে বাসায় এসেই বাচ্চাকে পড়া ধরেন। ভয়ে বাবা বাসায় আসার শব্দ শুনেই বাচ্চা বাথরুমে প্রবেশ করে। এসব সমস্যা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।

 

বেশি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা গুলো হল কিডনি ইউরেটার ব্লাডার এবং প্রোস্টেট সমস্যা অথবা অন্য কোনো রোগ, যেমন ডায়াবেটিস মেলাইটাস, ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস ও প্রেগ্ন্যাসি। আরো কিছু কিছু কারণ আছে যেমন দুশ্চিন্তা বা এংজাইটি, প্রস্রাব বৃদ্ধিকারী ঔষধ সেবন, ইনফেকশন, ক্যান্সার স্টোন বা পাথর, ইউরেথ্রাল স্ট্রিকচার ইত্যাদি।

ইউরিনারি ব্লাডার-এর যদি ইনফেকশন হয় তাহলে ব্লাডার অল্পতেই সংবেদনশীল হয়ে প্রশ্রাবের চাপ হয়। ব্লাডারে পাথর হলে প্রস্রাবের রাস্তার মুখে ঘষাঘষি করে। ফলে প্রস্রাবের চাপ হয়। পুরুষের মুত্রনালীর শুরুতে এবং মুত্রথলির সংযোগ স্থলে সুপারির সমান একটি নরম গ্রন্থি আছে যাকে বলা হয় প্রোস্টেট গ্লান্ড। ষাট বছর বয়সের কাছাকাছি এসে অনেকেরই এই গ্রন্থি হাইপারপ্লাসিয়া হয়ে অথবা ক্যান্সার হয়ে বড় হয়ে যায়। যেহেতু প্রস্রাবের নালী এই গ্লান্ডের ভেতর দিয়ে এসেছে সেহেতু এই নালীর চারপাশে চাপ পড়ে। ফলে নালী সরু হয়ে যায়। সাভাবিক গতিতে এবং সাভাবিক পরিমাণে তখন প্রস্রাব বের হয় না। প্রস্রাব করার পরও কিছু প্রস্রাব ব্লাডারে থেকে যায়। এটাকে বলা হয় পোস্ট ভয়েড রেসিডিউয়াল (পিভিআর) ইউরিন। যেহেতু আগে থেকেই ব্লাডার কিছুটা ভরা থাকে সেহেতু বাকীটুকু ভরতে বেশী সময় লাগে না। ফলে অল্পক্ষণ পরই আবার প্রস্রাব ধরে। এজন্য প্রোস্টেট হাইপারপ্লাসিয়া ও প্রোস্টেট ক্যান্সার রোগীরা ঘন ঘন বাথ রুমে যায়।

 

এমন সমস্যা হলে ডাক্তার দেখাতে হবে। শারীরিক কোন সমস্যা না থাকলে যে কারনে ঘনঘন প্রস্রাব হচ্ছে সেগুলো চিহ্নিত করে তা পরিহার করলেই হলো। ইনফেকশন সন্দেহ হলে প্রস্রাবের রুটিন টেস্ট করা হয় প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে। প্রোস্টেট বড় হয়ে গেছে কিনা তার সহজ পরীক্ষা হলো ডাক্তার সাব হাতে গ্লাবস পরে আংগুলে পিচলা গ্লিসারিন লাগিয়ে পায়খানার রাস্তা দিয়ে আংগুল দিয়ে প্রোস্টেটের উপর চাপ দিয়ে অনুভব করেন। এটাকে বলা হয় ডিজিটাল রেকটাল এক্সামিনেশন। ক্যান্সার সন্দেহ হলে রক্তের পি এস এ পরীক্ষা করা হয় ল্যাব থেকে। ক্যান্সার হলে এটার লেভেল বেড়ে যায়। প্রোস্টেট বড় হলে অপারেশন করে ফেলে দেয়া হয়। তাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের সমস্যা দূর হয়। ক্যান্সার আছে কিনা তার জন্য হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করা হয়। অপারেশনের আগে সূঁই দিয়ে প্রোস্টেট থেকে সেম্পল নিয়েও হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করা হয়। অপারেশন শেষে পুরা প্রোস্টেটের হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করা হয়। এসব বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে ইউরোলজিস্ট বলা হয়। প্রস্রাবের সমস্যা হলে নিয়ম হলো প্রাথমিক ভাবে একজন এমবিবিএস ডাক্তার দেখানো। তিনি প্রাথমিক কারন নির্ণয় করে ইউরোলজিস্টের নিকট রেফার্ড করবেন।

৬/১১/২০২০

ময়মনসিংহ

 

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 1.00 out of 5)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


নোনা ইলিশ

নোনা ইলিশ
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাজারে দু’রকম ইলিশ পাওয়া যায়। একটা হলো নোনা ইলিশ, আরেকটা হলো তাজা ইলিশ। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন বর্ষা সিজন ছাড়া ইলিশ পাওয়া যেতো না। পদ্মা নদীতে ইলিশ ধরে মাঝিরা পাইকারের কাছে বিক্রি করতো। সেখান থেকে আমাদের এলাকার মাছ ব্যবসায়ীরা বরফ দিয়ে নৌকায় করে নিয়ে এসে বিক্রি করতো। পাহাড় ও ভর অঞ্চলের সংযোগ স্থলের হাটগুলো বর্ষাকালে জমতো বেশী। সবচেয়ে বেশী জমতো ইন্দ্রজানীর হাট। এই হাটে বেশ ইলিশ উঠতো। আখকে আমরা কুশাইর বলতাম। কুশার আমাদের এলাকায় হতো না। ইন্দ্রজানীর হাটে কুশাইর আসতো ভুয়াপুর -গোপালপুর এলাকা থেকে। বরফ দেয়া না হলেও ইলিশ তেমন পঁচতোনা। আর ইলিশ পঁচলেও দুর্ঘন্ধ না ছড়িয়ে বিশেষ এক একধরনের সুগন্ধ বের হয়। খেতেও ভালো লাগে। নদী থেকে ইলিশ ধরার পর কিছুক্ষণ ছটফট করে মারা যায়। ইন্দ্রজানীর হাটে থেকে কিন্তু আমরা মরা ইলিশ কিনতাম। বলতাম তাজা ইলিশ। পদ্মানদীতে জেলেরা প্রচুর ইলিশ ধরে। এতো ইলিশ তারা বরফে সংরক্ষণ করতে পারে না। তাই, ইলিশ চাক চাক করে কেটে তার ভেতর লবন ভরে দেয়া হয়। আমরা এগুলোকে কাটা ইলিশও বলি। লবন দেয়ার ফলে ইলিশ পঁচে না। অনেকদিন পরেও খাওয়া যায়। ইন্দ্রজানীর হাটে পাট বিক্রি করে এলাকার মানুষ ইলিশ কিনতো। পোলাপানদের জন্য কিনতো কুশাইর। কুশাইরের একদিকে সদাইর টোবলা আরেক দিকে ইলিশ ঝুলিয়ে কাঁধে করে নিয়ে যেতো বাড়িতে। কেউ কেউ শুধু কাটা ইলিশ, আবার কেউ কেউ তাজা ও কাটা ইলিশ দু’টাই নিতো। আমার একটা দৃশ্য এখনও মনে আছে। বাবা আমাদের জন্য এভাবে কাঁধে করে ইন্দ্রজানি হাট থেকে কুশাইরের একদিকে বিরাট এক তাজা ইলিশ এবং কাটা ইলিশ, আরেক দিকে সদাইর টোবলা নিয়ে এলেন। আমরা এগিয়ে গিয়ে কুশাইর নিয়ে নিলাম। দা দিয়ে কুপিয়ে খন্ড কন্ড করে দাঁত দিয়ে ছিলিয়ে কুশাইর খেলাম। টোবলার ভেতর পদ্মপাতায় পেঁচানো ছিলো জিলাপি। ইন্দ্রজানি হাটের বানানো জিলাপি। আমরা তখন বলতাম জিলাপা। হায়রে স্বাদের ছিলো সেই জিলাপা! কুশাইরা গুড়ের জিলাপা। টসটসে রসে ভরা ছিলো। মা রান্নাঘরের মেঝেতে বসে সেই তাজা ইলিশ কাটছিলেন। সেই ইলিশের বিশেষ ধরনের ঘ্রাণ ছিলো। বিরাট সাইজের কাটা ইলিশটা ছেতুকা দিয়ে বাঁকা করে বাধা ছিলো। সেটা ঝুলিয়ে রাখা ছিলো ঢেকির আরহলুইর সাথে। বেশীরভাগ সময় মা তাজা ইলিশ রান্না করতেন মোটা মোটা ডাটা দিয়ে। কাটা ইলিশ চাক চাক করে লবন সহ কাচের বৈয়ামে ভরে শিকের উপর রেখে দিতেন বৈয়ামের বুটুম টাইট করে লাগিয়ে। তাতে অনেক দিন এভাবে রাখা যেতো। যেদিন রান্না করার তেমন কিছু থাকতো না সেদিন কাটা ইলিশ বটুরি করে কেটে ডাটা বুঝুরির সাথে ভাজি করতেন। ভাজির সাথে আলাদা লবন দিতে হতো না। ইলিশের সাথে থাকা লবনেই হয়ে যেতো। কোন কোন সময় ডাটা মিশিয়ে ভাত খেয়ে ফেলতাম। ইলিশের টুকরো তুলে রাখতাম টিনের প্লেটের কিনারে। শেষে শুধু মাছের টুকরা একটু একটু করে ছিড়ে ছিড়ে খেতাম দেখিয়ে দেখিয়ে। আমি দেখাতাম ছোট বোন সোমলাকে। সোমলা দেখাতো আমাকে। দেশে পাকা রাস্তাঘাট হওয়াতে ইন্দ্রজানি হাট আর আগের মতো জমে না। আমিও শহরে থাকার দরূন হয়তো তেমন জানিনা। তবে শহরে থাকলেও নোনা ইলিশ আমি বাসায় আনি। চিচিঙ্গা ও কচি ডাটা দিয়ে নোনা ইলিশ আমি প্রায়ই খাই। আমার স্ত্রী স্বপ্নাও পছন্দ করে নোনা ইলিশ।

১৯৮৮-৮৯ সনে বরিশাল ছিলাম। সেখানে আমি দেখেছি নদী থেকে আসলেই তাজা ইলিশ ধরতে। নৌকার পাটাতনে পুটিমাছের মতো ছটফট করতে দেখেছি। আর আমরা মরা পঁচা ইলিশকে বলি তাজা ইলিশ। এই ইলিশ ওখানে খুব সস্তা ছিলো। কিন্তু সেগুলো ইন্দ্রজানি হাটের ইলিশের মতো স্বাদ লাগতো না। ওদের সাথে আলাপ করতে গিয়ে বলি যে আমরা এমন নোনা ইলিশ খাই। ওরা বলাবলি করতো “ময়মনসিংহের মানুষ নাকি পঁচা ইলিশ খায়। ওদের হাটে আমি নোনা ইলিশ দেখিনি।

একবার বাকেরগঞ্জের বাস খুজতে কীর্তন খোলা নদীর পার ধরে একটু পেছনের দিকে গিয়েছিলাম। দেখলাম এক লোক বসে বটি দিয়ে তাজা ইলিশ মাছ গ্যাচগ্যাচি কেটে লবন মেখে ছুড়ে মারছেন। তাতে প্রতিটি ইলিশ কেটে লবন লাগাতে সময় লাগছে ১০-১২ সেকেন্ড। এত দ্রুত কাজটি করছেন। ইলিশ মাছগুলো খেরের পালার মতো স্তুপ হয়ে বসে যাচ্ছে। অভিজ্ঞতা হলো কিভাবে কাটা ইলিশ বানায়।

গত দু’বছর আগে শহরের বাজারে গেলাম নোনা ইলিশ কিনতে। এক দোকানী দেখলাম নোনা ইলিশ চাকা ধরে বিক্রি করছেন। আমি এত বড় ইলিশের চাকা দেখিনি। আমি জিজ্ঞেস করলাল এমন বড় ইলিশ আস্ত আছে কিনা। তিনি বললেন
– এত বড় ইলিশের দাম অনেক। কেউ নিতে চায় না। তাই চাকা ধরে নোনা ইলিশ বিক্রি করছি।
– এতো বড় তাজা ইলিশও তো দেখি না।
– এগুলো পদ্মা নদীর ইলিশ। ইন্ডিয়া চলে যায়।
– আমি কোলকাতার ধানসিঁড়ি হোটেলে খাওয়ার সময় ইয়া বড় একটা ইলিশের পিস নিয়েছিলাম। সরিষা-ইলিশ। খুব স্বাদের ছিলো সেই ইলিশ।
– সাব, নোনা ইলিশের এই পিসটা নিয়ে যান খুব স্বাদ পাবেন। ইলিশ যত বড় হবে স্বাদ তত বেশী হবে।
– এই পিসটার দাম কত?
– সাব, এটার দাম ৫০০ টাকা। আপনি নিলে ৪৫০ টাকা, এক দাম।
– এক টুকরো ইলিশের দাম ৪৫০ টাকা? ১৫০ টাকায় তো আস্ত ইলিশ কেনা যায়।
– কি যে কন সাব? ১৫০ টাকায় ইলিশ পাবেন না, ঝাটকা পাবেন।
– ঠিক আছে। বাদ দেন সব কথা। কত হলে দেবেন?
– বিশ্বাস করুন, খোদার কসম এই টুকরাটা বেচলে আমার লাভ অবো মাত্র ১০ টাকা। বিশ্বাস করে নেন। খাইয়া দেখুন মাছটা।
– কিন্তু আপনিতো আমাকে ঠকাচ্ছেন।
– আল্লাহর কসম। বিশ্বাস করুন।

লোকটাকে দেখে ধার্মিক মনে হলো। মাথায় টুপি আছে, লম্বা দাড়ি আছে। বিশ্বাস করে ৪৫০ টাকা দিয়েই নোনা ইলিশের পিসটি নিলাম। মাছ নিয়ে ঘুরে রওনা দেয়ার সাথে সাথে লোকটা গেয়ে উঠলেন “আল্লাহ, মাফ করে দাও, ক্ষমা করে দাও।” শুনে কেমন যেনো মনে হলো লোকটি আমাকে ঠকিয়ে আল্লাহর কাছে গানের সুরে সুরে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন। আমি ঘুরে দাড়ালাম। লোকটা অন্য দিকে ঘুরে আবার গাইলেন “মাফ করে দাও, ক্ষমা করে দাও।” মানুষের প্রতি অবিশ্বাস না থাকাই ভালো ভেবে নোনা ইলিশের পিস নিয়ে চলে এলাম।
৪/১১/২০২০ খ্রি.
ময়মনসিংহ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


তিন চাচী ও কিছু আপনজনের স্মরণে

তিন চাচী ও কিছু আপনজনের স্মরণে

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমার সবচেয়ে কাছের চাচী এবার মারা গেলেন। তাও আবার করোনাকালে। জানাজায় যেতে পারলাম না। এক বছরের মধ্যে তিন চাচী মারা গেলেন। এবার আরও অনেকজন আত্নীয় ও প্রিয়জন মারা গেছেন। তবে আজ আমি বিশেষ করে আমার মার ঘনিষ্ঠ বন্ধবী যে চাচী ছিলেন তাকে নিয়ে কিছু কথা লিখবো। তিনি হাছেন কাক্কুর স্ত্রী, হবির মা, মামুনের দাদী।

 

এবার করোনায় আমার খুব কাছের বড় ভাই, ৫ বছরের সিনিয়র, এম-১২ নং ব্যাচের প্রফেসর আনিসুর রহমান ভাই মারা যান করোনা হয়ে করোনার প্রথম দিকেই। তারপর মারা যান আমার ৪ বছরের সিনিয়র রাজু ভাই। একই হোস্টেলে থাকতাম। টাঙ্গাইলের রাজু ভাই। তিতাসের এম ডি না কি যেনো ছিলেন। করোনা হয়ে মারা গেলেন। আমারই ক্লাস মেট এম-১৭ ব্যাচের বন্ধু জহিরও মারা গেলো করোনা হয়ে। এক বছরের সিনিয়র, কচুয়ার আব্দুল্লাহ স্যারের ছেলে সাইফুল ভাইও এবার মারা গেলেন করোনা হয়ে। কতো যে ভালো বাসতেন আমাকে! আমাদের মুকুল যে হার্ট এটাক হয়ে মারা গেলো তারও কিন্তু প্রথম করোনা হয়েছিলো। করোনা নেগেটিভ হওয়ার কিছুদিন পর তার হার্ট এটাক করে। করোনায় এমন অনেক আপন জন মারা গেছে। মকুল মারা যাবার মাত্র ৪ দিন আগে আমার আরেক প্রিয় চাচাতো ভাই সাইফুলও মারা গেলো রক্তশুন্যতা হয়ে। এক বছর ধরে বার বার মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয়েছে আমাকে।

 

তালুকদার বাড়ির সবার বড় বোন নূরজাহান বুবুর স্বামী, আমাদের প্রথম দুলাভাই ছোট চওনার মজিবুর রহমান, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আমাদের কাকরাজান ইউনিয়ন পরিষদ, মারা গেলেন এই বছরের প্রথম দিকেই। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। নুরজাহান বুবুর ছোট বোন হলো নাজমা। তার স্বামী হাতেম খাও মারা গেলো গত ঈদুল ফিতরের পর। আমার সাথে তার বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিলো। আমার আপন চাচা ভিয়াইল থাকতেন। তার মেয়ে, আমার চাচাতো বোন শেফালী অল্প বয়সেই বিয়ে হয়েছিল আমি যখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়তাম। সে আমার থেকে অল্পদিনের ছোট ছিলো। দূরে থাকার জন্য তাকে আর বেশী দেখিনি। এবার ময়মনসিংহ আসে অসুস্থ হয়ে। চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়। অল্প কিছুদিন পরই আবার আসে স্ট্রোক করে অজ্ঞান হয়ে। এসে মারাই গেলো আমার চোখের সামনে।

 

এই এক বছরের মধ্যে তিন চাচী মারা গেলেন। আমরা চাচাকে কাক্কু ও চাচীকে কাক্কি ডাকি। আবুল কাশেম তালুকদার যাকে আমরা মিয়া কাক্কু ডাকতাম তার স্ত্রী, মানে কাদেরের মা এই এক বছরের মধ্যেই মারা গেছেন স্ট্রোক করে। খুব হাসি খুশি ছিলেন সেই কাক্কি। আমরা ডাকতাম নয়া কাক্কি বলে। কাক্কির বড় বোন ছিলেন কুলসুম বুবুর মা। কুলসুম বুবুর জন্মের পরই সেই কাক্কি মারা গেলে সেই কাক্কির ছোট বোনকে মিয়া কাক্কু বিয়ে করেন। তাই নয়া কাক্কি ডাকা হতো। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাদের কাছে নয়া কাক্কিই ছিলেন। কাক্কি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আমি কাক্কিকে কারো সাথে রাগারাগি করতে দেখিনি। নয়া কাক্কির বড় ছেলে শাজাহানের বয়স ছিল আমার থেকে সামান্য বেশী। আমার নিত্যদিনের খেলার সাথী ছিল সে। সেও ট্রাক্টর এক্সিডেন্টে মারা গেছে আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম, সেই ১৯৭৩ সনে। খেলার সাথীর মা হওয়াতে কাক্কিও আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। কাক্কির বাবার বাড়ি ছিলো মাইজবাড়ি। কাক্কির বাবার নাম ছিলো ঠান্ডু। আমরা কাক্কিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতাম “আইজকা খুব ঠন্ডা নাগতাছে ।” কাক্কি মনে করতেন কাক্কির বাপের নামকে ব্যাঙ্গ করা হচ্ছে । কাক্কি “এই জাউরা” বলে হেসে হেসে ঢলে পড়তেন। কাক্কির এই হাসিটা দেখার জন্য ঠান্ডা কথাটা উচ্চারণ করতাম। কাক্কির হাসি যদি কেউ দেখতো অনেক্ষণ পর্যন্ত মন ভালো থাকতো তার। কাক্কির উদরের বড় ছেলে শাজাহানের খেলার সাথী ছিলাম বলেও কাক্কির বেশী বেশী আদর পেয়েছি। মারা যাওয়ার প্রায় এক বছর আগে কাক্কির সাথে একটা ছবি তুলেছিলাম। কাক্কিদের ঘরের সামনের সিড়ির সাথে কংক্রিটের বেঞ্চিতে মাঝখানে আমি বসেছিলাম। আমার দু’পাশে দুই কাক্কি হবির মা কাক্কি আর নয়া কাক্কি বসেছিলেন। দু’জনেই খুশী খুশী ছিলেন ছবি তোলার সময়। এমন একটা ভালো কাক্কি এক বছরের মধ্যেই চলে গিয়েছেন পরপারে।

 

আমাদের তালুকদার বাড়ির সবচেয়ে বড় চাচী, সোলায়মান তালুকদার মাস্টারের স্ত্রী, রাজ্জাকের মা মারা গেছেন সম্ভবত এ বছর জানুয়ারির দিকেই। এই কাক্কির বাপের বাড়ি ছিল গোহাইল বাড়ি। নানার নাম ছিল খুব সম্ভব চান মামুদ। আমরা কাক্কিকে কোন কোন সময় ঠাট্টা করে চান্দের মেয়া বলতাম। কাক্কির উদরের বড় ছেলে রাজ্জাক আমার থেকে বয়সে সামান্য ছোট। একসাথে খেলতাম, একসাথে বেড়াতাম, একসাথে স্কুলে যেতাম। প্রথম দিকে খেলার সাথী ছিল মজি ভাই, শাজাহান ও রাজ্জাক। তারপর মুকুল তারাতারি বড় হয়ে গেলে সেও খেলার সাথী হয়ে যায়। রাজ্জাককে যখন কাক্কি খাওয়াতেন তখন আমি রান্নাঘরের ঢেকির উপর বসে অপেক্ষা করতাম। খাওয়া শেষ হলেই খেলতে চলে যেতাম। রাজ্জাকের খেলার সাথী হিসাবে কাক্কি আমাকেও খুব স্নেহ করতেন। আদর করে গেঁদা ডাকতেন আমাকে। কাক্কির সারা শরীরে লাল লাল চাক্কা দাউদ ছিলো। সারাক্ষণ চুলকাতেন। গরমের দিনে বেশী হতো। হাতের নোখেও ছিলো। কাক্কির এই সমস্যার জন্য আমার কাক্কির জন্য কষ্ট হতো। এটাতে কাক্কি টোটকা মলম টলম লাগাতেন। কিন্তু নিচুইটা ভালো হতো না। আমি ডাক্তার হয়ে প্রথম চিকিৎসা করেছি কাক্কির এই দাউদ। আমি একটানা দেড় মাস কাক্কিকে ঔষধ খাইয়েছি। দাউদ ভালো হয়ে যায়। চান্দের মেয়ে চান্দের মতোই চেহারা ছিলো। দাউদ পরিস্কার হয়ে চান্দের মতোই হয়ে যায়। কাক্কি খুব খুশী হন। আমি চিকিৎসা করে খুব তৃপ্তি পাই। কাক্কি হজ্জ করেছিলেন। হজ্জের অভিজ্ঞতা অনেক শেয়ার করেছেন আমাদের কাছে। কাক্কির সন্তানরা সবাই শহরে সেটলড হয়েছেন। তাই বাড়িও নেই গ্রামে। এসে যখন এবাড়ি ওবাড়ি বেড়াতেন আমার খুব খারাপ লাগতো। এই চাচী এই তালুকদার বাড়ির বড় বউ ছিলেন। সেই চাচীও এবার স্ট্রোক করে মার গেলেন ।

হাছেন কাক্কুর শশুর বাড়ি বড় চওনা চৌধুরী বাড়ি। কাক্কির বাবার ডাক নাম ছিলো সোনাউল্লাহ চৌধুরী। কাক্কির প্রথম মেয়ের নাম ছিলো হাজেরা। আমি হাজেরা বুবুকে দেখেনি। আমাদের লাইলি বুবুর সমান বয়স ছিলো। এখনো বুবু বলেন হাজরাগ বাড়ি গেলাম। হাজরা বুবুর পর ভানু বুবু। তারপর মজি ভাই। তারপর মনো। আমি মজিভাইর ছোট ও মনোর বড়। আমরা দল বেঁধে মজি ভাইগ ঘরে পলান পলান খেলতাম। তখন পাঁচ কাক্কু একই বাড়িতে থাকতেন। মাঝখানে ছিলো বিরাট উঠান। কাক্কুরা যার যার ঘরের সামনে বসে ফজরের নামাজ পড়ে উচ্চস্বরে কোরআন পরতেন। কাক্কিগ উগারের মাঝখানে একটা গোল প্রবেশ পথ ছিল। এখানে পলায়ে টুক্কু দিতাম। ডোলের ভেতর পালিয়েও টুক্কু দিতাম। কাক্কির রাইংগভর্তি পাকা কলা ছিল। একদিন আমরা পলান পলান খেলার সময় ডোলের ভেতর বসে সব কলা খেয়ে ফেলেছিলাম। জেনেও কাক্কি বেজার হননি। কাক্কির চেহারা আর আমগ মার চেহারা খুবই সুন্দর ছিলো। দু’জনের মধ্যে খুবই খাতির ছিলো। মা সময় পেলে কাক্কির রান্নাঘরে বসে আলাপ করতেন। কাক্কির সময় হলে মার সাথে আমাদের রান্নাঘরে বসে বসে আলাপ করতেন। হাছেন কাক্কু বাবার থেকে সামান্য বয়সে বড়। তাই, কাক্কিকে মা বুঝি ডাকতেন। কাক্কি মাকে ডাকতেন নাইলির মাও বলে। বাবাকে ডাকতেন নাইলির বাপ বলে।

 

আমার যেবছর মুসলমানী হয় সে বছর আমার নিজের নানী মারা যান মুসলমানীর দু’এক দিন পরই। মা আমাকে রেখে রৌহা নানীগ বাড়ি চলে যান। বাড়িতে ছিলাম আমি আর বাবা। বাবার রান্না করার কোন অভিজ্ঞতা ছিলো না। ভর্তাভাত রান্না করতে পারতেন। আমি আবার ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে পারতাম না। তাই বাবা ক্ষেত থেকে বেগুন তুলে লম্বা করে কেটে লবন পানি দিয়ে সেদ্ধ করেছিলেন ছালুন হিসাবে। কারন, ছালুন হলে সামান্য চারটে ভাত খেতে পারতাম। এমন সময় কাক্কি এলেন আমাদের রান্না ঘরে। চুলার পারে গিয়ে “দেখি, নাইলির বাপে কি রানছে” বলে পাইলচাপনি উচু করে ছালুন দেখে মুসকি হাসলেন। বললেন “এইডা ছালুন অইছে? মনে অইতাছে বেগুন সিদ্ধ।” বাবা বললেন “সাদেক ছালুন ছাড়া খেতে পারে না, তাই বেগুনের ঝোল রানছি।” কাক্কি ওর মধ্যে কিছু মসলা মিশিয়ে ছালুন রেঁধে দিলেন। এরপর বুবু এলেন তার শশুরবাড়ি আমজানি থেকে। বুবুই রান্না করে দিলেন ছালুন। মুসলমানী করার সাত দিনের দিন গোসল করানো হয় বিয়ের গায়ে হলুদের মতো আনন্দ করে। বুবু ও কাক্কি আমাকে কাপড় কাঁচার ফিড়াতে (পিড়ি) দাঁড় করিয়ে গোসল করালেন। অন্যান্য বাড়িতে মুসলমানীর ৭ দিনের দিন খুব আনন্দ ফুর্তি হতো। গ্রামোফোন রেকর্ডের গান মাইকে বাজানো হতো। কিন্তু তালুকদার বাড়িতে এসব নিষেদ ছিল। মুসলমানির উৎসবে অন্যরা বিভিন্ন রকম উপহার সামগ্রি দিতো। আমাদের বাড়িতে উৎসব না হলেও বুবু আমাকে গোসল করায়ে একটি কাশার গ্লাস উপহার দেন। সেই কাশার গ্লাসটি অনেক বছর আমাদের বাড়িতে ছিলো। আমি কাশার গ্লাসে পানি খেতাম না। আমি পানি খেতাম ফটিকের গ্লাসে। কাঁচের গ্লাসকে আমরা ফটিকের গ্লাস বলতাম। খুব সম্ভব স্ফটিক থেকে ফটিক হয়েছে। যখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিলো না তখন ইসতিরির ভেতর কয়লা জালিয়ে ইসতিরি গরম করা হতো। আমি জলন্ত কয়লা আমার সেই কাশার গ্লাসে ভরে গরম করে তার মসৃন তলা দিয়ে ঘসে আমার শার্ট ইসতিরি করতাম।

 

একবার মজি ভাই নাড়াই করে আমাকে চেরা দিয়্র ডেইল দিয়ে কপাল কেটে ফেলেছিলেন। গভীর রাতে কাক্কু হাটে থেকে এলে কাক্কুকে নিয়ে কাক্কি বদনা বাতি জালিয়ে আমাকে দেখতে আসেন। আমাকে শান্তনা দেন “মজির বাপে আট থাইকা আইয়া হুইনা মজিরে মাইর দিছে। ইন্ডিয়ান বাম লাগাইলেই ভালো অইয়া যাবোগা।”

আমি এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার সময় ১৯৭৯ এ আমার মা ইন্তেকাল করেন। আমি আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে এসে রাতেই মাকে দাফন করে ভোরে ফিরে গিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। ফিরে যাবার সময় কাক্কি মনে করিয়ে দেন “সাদেকে মনে হয় বছরকারি ফল আম খায় নাই। কবে না কবে আবার আবো। হেসুম আম থাকপো না। ওরে আম ছিলাইয়া দেও।” বুবু আমাকে আম ছিলিয়ে দিলেন দুধের সাথে। আমি খেলাম।

 

কাক্কু মারা যাবার পর থেকে মুলত কাক্কির স্বভাব স্তিমিত হতে থাকে। আমি এক বছর বা ছয়মাস পর পর বাড়ি যাই। বাড়ি এসেছি শুনেই কাক্কি আমাদের বাড়িতে আসতেন। হাসি হাসি মুখে বলতেন “সাদেক কুনসুম আইলা। মুনার মায় আইছে?” কাক্কির কোলে ও সাথে বেশ কয়েকজন করে নাতি নাত্নি থাকতো। আমি জিজ্ঞেস করতাম কোনটা কার ছেলে/মেয়ে? কাক্কি বলতেন “এইডা আমগো আলমগিরের, এইডা আমগো ছাদ্দাকাছের পোলা, এইডা হবির পোলা” ইত্যাদি। আমি এগুলো মনে রাখতে পারতাম না। আমি কাক্কির হাতে মজার প্যাকেট দিলে সব নাতী নাত্নিদের বিলিয়ে দিতেন। কাক্কির ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠতো। কাক্কি এসে আমার কাছে বসতেন। বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ খবর নিতেন।

বয়স বাড়তে থাকে কাক্কি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকেন। তখন তিনি আমাদের বাড়িতে তেমন আসতে পারতেন না। বাড়িতে কিছু খাবার জিনিস নিয়ে গেলে আমি কাক্কির জন্য নিয়ে গিয়ে দেখা করে আসতাম। শেষের দিকে কাক্কির শরীর শুকিয়ে কংকালসার হয়ে যায়। গাল কপাল ও চোখের কোনায় চামড়ার ভাঁজ পড়ে যায়। এই ভাঁজ পড়ার চামড়ার হাসিও আমার কাছে ভালো লাগে। কাক্কির কমন সমস্যার কথা বলতেন এভাবে “বাজান, কিচ্ছু ভালা নাগে না গো, কিচ্ছু ক্ষাপ্পাই না।” আমি ভাবতাম আমার মা যদি বেঁচে থাকতেন তা হলে এমনি ভাবেই হয়তো বলতেন “কিচ্ছুই খাপ্পাই না গো সাদেগালী বাজান।” তাও আমার ভালো লাগতো। আল্লাহ আমার মা ও এই চাচীকে মাফ করে দিয়ে বেহেস্তের ঘরে বসে আলাপ করার সুযোগ করে দিন। সাথে আমাদেরও।

 

গত ফেব্রুয়ারিতেই কাক্কির সাথে আমার শেষ দেখা। আমি ফেরার সময় কাক্কির হাতে অল্প কিছু টাকা দিয়ে আসতাম কিছু কিনে খাওয়ার জন্য। আমার স্ত্রী স্বপ্নাও কাক্কির জন্য বেশ টাকা পয়সা দিয়ে দিতেন আমার কাছে। আমার মেয়েরাও আমার হাতে দিয়ে দিতো এই বলে “দাদুর হাতে এই টাকাটা দিয়ে বলবে কিছু কিনে খেতে।” এবার কাক্কিকে খুব দুর্বল দেখেছিলাম। আরেকবার এসে পাবো কিনা সন্দেহ হলো। ঠিক তাই হলো। এবার ঈদুল আজহা হয়েছিল পহেলা আগষ্ট। করোনা মহামারির প্রকোপ খুব বেশী ছিলো। আমি বাড়ি যাইনি। মুকুল ও কদ্দুস রিস্ক নিয়ে বাড়ি গিয়েছিলো। আমি বাড়িতে কোরবানি দিয়েছিলাম। ভাতিজারা ম্যানেজ করেছিলো। ঈদ হয়েছিলো শনিবার। রবিবার দিন গত রাতে অর্থাৎ আগষ্টের ৩ তারিখে সোমবার কাক্কি ইন্তেকাল করেন। আমি জানাযায় শরীক হতে পারিনি।

 

তারপর মুকুলের জানাজায় শরীক হতে ১১ অক্টোবর বাড়ি গিয়েছিলাম। কাক্কির কথা খুব মনে পড়লো। মুকুলও কাক্কিকে খুব খোঁজ নিতো। সেও চলে গেলো। ৪ দিন আগে চলে গেছে আরেক প্রিয় চাচাতো ভাই সাইফুল। গত বছর চলে গেছে খসরু কাক্কু। তারপর কায়সার। সব নতুন কবর। কেমন জানি মনে হলো এরপরই আমার ডাক আসবে। আমি কি প্রস্তুত?

ফেরার সময় আগের মতোই কাক্কিদের বাড়িতে প্রবেশ করলাম। এবার আগের মতো ডাক দিলাম না “কাক্কি কোন ঘরে” বলে। দেখলাম বাড়িতে কেউ নেই। কাক্কি যে ঘরে থাকতেন সেই ঘরের দরজায় তালা লাগানো। আমি ডাক দিলাম বাড়িতে কেউ নাই নাকি। কার বউ যেন এসে বললো “বসুন।” আমি বললাম “কাক্কি এই ঘরে থাকতেন।” সে বললো “না পরে এই ঘরে থাকতেন। এই ঘরে মারা গেছেন। আমার বুক ফেটে কান্না এলো। চলে এলাম চোখ ভর্তি অশ্রু নিয়ে।

৩০/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/