রমিজ ভাইকে মনে পড়ে

রমিজ ভাইকে মনে পড়ে
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

রমিজ ভাইকে আমি প্রথম দেখি খুব সম্ভব ১৯৭৫ সনের শীত কালে। রাতে কচুয়া স্কুল প্রাংগনে মঞ্চস্থ হয়েছিল একটা নাটক। নাটকটা স্থানীয় ঘটনার সাথে মিল রেখে রচনা করেছিলেন এই স্কুলেরই একজন প্রাক্তন ছাত্র আমাদের বড় ভাই আব্দুল কদ্দুছ। তিনি এই স্কুলের ফার্স্ট বয় ছিলেন তার সময়। কদ্দুছ ভাই রচিত ড্রামা মঞ্চস্থ হচ্ছে জেনেই আমি ড্রামা দেখতে গিয়েছিলাম।  ঘোনার চালার হাসমত ভাইকে দেখেছি সার্বিক শৃঙ্খলা সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখতে। নাটকের নাম ছিলো “মেদের মেয়ে জ্যোৎস্না।” নাটকের কাহিনী উপভোগ্য ছিলো। কিন্তু সেই কাহিনী এখন আমার মনে নেই। নাটকে জ্যোৎস্না চরিত্রে অভিনয় করেছিল কচুয়া স্কুলেরই ছাত্র হাশিম রেজা। সে খুব সম্ভব ক্লাস সেভেনে পড়তো। তার কথায় মেয়েলি টান ছিলো। জ্যোৎস্না চরিত্রে তাকে বেশ মানিয়েছিলো। তার একটা উক্তি দর্শক শ্রোতাদেরকে বেশ আনন্দ দিয়েছিল। নায়ক যখন রোমান্টিক মুহুর্তে কিছু বলে জ্যোৎস্না এক বিশেষ ভঙ্গি করে বলে উঠে “কি! ওরে আমার আবাজাবা, ঐ মুখে বাতাশা খাবা?” নাটকের দৃশ্য পরিবর্তনের ফাঁকেফাঁকে একটা করে স্থানীয় শীল্পির গান অথবা নাচ অথবা কৌতুক পরিবেশনা হচ্ছিলো। ঘোনার চালার বাকী ভাই আব্দুল আলীমের পল্লীগিতী গেয়েছিলেন। ঘোনার চালার বারী, আমার সহপাঠী,  লেংড়া খোঁড়া সেজে এমন অংগভংগি করে কৌতুক করছিলো যে হাসতে হাসতে পেটে খিজ ধরে গিয়েছিলো। Continue reading “রমিজ ভাইকে মনে পড়ে”

আমাদের এলাকার মেম্বারগণ

আমাদের এলাকার মেম্বারগণ
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারদেরকে গ্রামে শুধু মেম্বার বা মেম্বর বলা হতো। আমাদের ইউনিয়নের নাম কাকরাজান। ইউনিয়ন পরিষদের অফিসের নাম ছিল বোর্ডঘর। আমাদের বোর্ডঘর ছিল কাকরাজান গ্রামে। স্বাধীনতার কয়েক বছর পর ইন্দ্রজানীর শামছুল হক পান্না মামা পরপর কয়েকবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে তিনি বোর্ডঘর তার এলাকা গড়বাড়ীতে স্থানান্তরিত করেন। কাকরাজান ইউনিয়নের  বোর্ডঘরে আমি কখনো যাইনি। গ্রামের উন্নয়নের জন্য মেম্বারগণ সরকারী অনুদান আনতেন। সেই অনুদানে রাস্তাঘাট, সাকো ও কালভার্ট নির্মান করা হতো। কিছু কিছু অনুদান মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ ও মেরামতের কাজে ব্যায় করা হতো। গরীবদের জন্য রিলিফের গম, আটা, কাপড় চোপড় ও ঢেউটিন এলে সেগুলো মেম্বারগণ বিতরণ করে দিতেন। এইজন্য তাদেরকে বলা হতো গ্রামের জনগণের সেবক। তাই তারা পোস্টারে এইভাবে লিখতেন “আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গেন্দু মিয়াকে মোরগ মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিন।” যারা চেয়ারম্যান মেম্বার পদপ্রার্থী ছিলেন তাদেরকে বলা হতো ‘ভোটে দাঁড়াইছেন’। ছোট বেলায় আমি ভোটে দাঁড়ানো কথাটার মানে বুঝতাম না। দাঁড়ানোকে আমরা বলতাম খাড়ানো। ভোটে আবার খাড়ায় কিভাবে, এটা ছিল আমার প্রশ্ন। মুরুব্বীদের থেকে জানতে পারলাম যে ভোটের সময় আসন্ন হলে গ্রামের সবাই একজায়গায় সভায় মিলিত হয়। সেখানে গণ্যমান্য ব্যাক্তি জানতে চাইতেন “আগামী ভোটে কে কে প্রার্থী হতে চান  দাঁড়ান।” একজন বা দুইজন বা তিনজন দাঁড়িয়ে ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। কেউ না দাঁড়ালে গ্রামের লোকেরাই জোড় করে একজনকে দাঁড়া করিয়ে দিতেন। খুব সম্ভব এভাবেই এসেছে ভোটে দাঁড়ানোর কথাটি। সাধারণত গ্রামের প্রভাবশালীরাই ভোটে দাঁড়াতেন। স্বাধীনতার পর প্রভাবশালীদের ক্ষমতা কিছুটা খর্ব হলে সাধারণ পরিবার থেকে আমরা মেম্বার চেয়ারম্যান পাই। কোন কোন সময় অস্ত্রবাজ ও চাঁদাবাজদের হাতে প্রভাব চলে যায়। তখন তারাই রাজনীতির মারপ্যাচে চেয়ারম্যান মেম্বার নির্বাচিত হন বা নির্বাচিত করেন। ছোট বেলা গ্রামে কাটলেও এখন চাকরি ও প্রাক্টিসের ঝামেলার জন্য গ্রামে বেশী যাওয়া হয় না। গ্রামের লোকজন চেম্বারে আসেন। গ্রামে গিয়ে লোকজনের সাথে কথা বলি। কোন কোন মেম্বারের খুব প্রশংসা শুনি আবার কোন কোন মেম্বারের বদনাম শুনি। বেশী কিছু না জানলেও আমার এ ক্ষুদ্রজীবনে আমাদের এলাকার কয়েকজন মেম্বারের স্মৃতি আমার মনে আছে। তাদের নিয়ে আমি কিছু লিখতে চাই আজ। আমার স্মৃতিচারণে বেশ কিছু নাম করা মেম্বার বাদ পড়ে যেতে পারেন । কারন হলো তিনি যখন মেম্বার ছিলেন আমার তখন হয়তো এলাকায় যাওয়া হয়নি । যাদের কথা মোটামুটি মনে পড়ছে তাদের নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করতে চাচ্ছি ।

  Continue reading “আমাদের এলাকার মেম্বারগণ”

রোগ জীবাণু গুলে সরবত পান করা

রোগ জীবাণু গুলে সরবত পান করা
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমরা যখন মেডিকেল কলেজে পড়তাম তখন বই পড়ে জেনেছি যে পাকস্থলীতে কোন জীবাণু থাকে না। মেডিকেল মাইক্রোবায়োলজি পড়েছি ১৯৮৪ সনে। এর ঠিক ১০ বছর পর ১৯৯৪ সনে আমি যখন এম ফিল থিসিস পার্ট-এর গবেষণা করার জন্য সেম্পলের খোজে বার্ডেম হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগে যাই তখন প্রফেসর আনিসুর রহমান স্যার বলেন “জাপানের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি নামে এক প্রকার জীবাণু স্টোমাক ও ডিওডেনামের অনেক রোগের জন্য দায়ী। আপনি বাংলাদেশের রোগীদের নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পারেন।” আমি এ ব্যাপারে রেফারেন্স সংগ্রহ করতে মহাখালীর ন্যাশনাল লাইব্রেরী ও আইসিডিডিআরবি লাইব্রেরী এবং শাহবাগের বার্ডেম লাইব্রেরী ও আইপিজিএমআর লাইব্রেরী থেকে কিছু আর্টিকেল ফটোকপি করে এনে সারারাত ধরে পড়লাম। পড়ে খুব ইন্টারেস্ট পেলাম। জানতে পারলাম জীবাণু বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকে জানতে পারতেন যে প্রাণীর পাকস্থলীতে এক প্রকার স্পাইরাল (পেচানো) জীবাণু পাওয়া যায়। এই জীবাণু মানুষের পাকস্থলীতে থাকে কি না কারো জানা নেই। ডাঃ বারী জে মার্শাল নামে একজন অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার ১৯৮৪ সনে যখন মেডিসিন ওয়ার্ডে কাজ করেন তখন তার ধারনা হয় যে এই স্পাইরাল জীবাণুই মানুষের পাকস্থলীর প্রদাহ বা গ্যাস্ট্রাইটিস ও আলসার বা ক্ষত করে। ১৯৮৫ সনে জার্নালে নিশ্চিত করে জানালেন যে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি নামের এক প্রকার রোগজীবাণু পাকস্থলীর আলসার বা ঘা করে। কিন্তু কেউ তার এই থিউরি বিশ্বাস করলেন না। তিনি প্রাণীর পাকস্থলী থেকে সেম্পল নিয়ে জীবাণু কালচার করে প্রাণীর পাকস্থালীতে সংক্রমণ করে রোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হলেন। যেহেতু এই থিউরিটি মানুষের শরীরে টেস্ট করা বৈধ না সেহেতু তিনি নিজের উপরই এই পরীক্ষাটি চালালেন। তিনি প্রথমে নিজের পাকস্থলী্র এন্ডোস্কোপি পরীক্ষা করায়ে নিশ্চিত হয়ে নিলেন যে তার পাকস্থলীতে  কোন রোগ নেই । তিনি যে সময় এই পরীক্ষা করেন আমি সে মময় এমবিবিএস ফাইনাল ইয়ারে পড়ি । তিনি প্রাণীর পাকস্থালী থেকে জীবাণু নিয়ে ল্যাবরেটরিতে কালচার করলেন। তিনি কালচার করা জীবাণু এক গ্লাস পানিতে ঘুটা দিয়ে সরবত বানালেন। তিনি নিজেই এই জীবাণু মিশ্রিত সরবত পান করলেন। তার মাকে জানালেন যে তিনি কি করেছেন। তার মা লক্ষ্য করলেন যে মার্শাল তিনদিন পর পেটের ব্যাথায় ভুগছেন। এন্ডোস্কোপি করে দেখা গেলো যে তার পাকস্থলীতে প্রদাহ (গ্যাস্ট্রাইটিস) হয়েছে। দিন দিন পেটের ব্যাথা বেড়েই চললো। কয়েকদিন পর আবার এন্ডোস্কোপি করে দেখা গেল যে তার পাকস্থলীতে আলসার হয়েছে। তিনি এক কোর্স এন্টিবায়োটিক খেয়ে সেরে উঠলেন। তার এই অবজারবেশনের ফলাফল আবার জার্নালে প্রকাশ করালেন। তার এই আজব অভিজ্ঞতার নিউজ গ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগলো জীবাণুবিদ ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোজিস্টদের মাঝে। সেই আর্টিকেলটি সবচেয়ে বেশী পঠিত আরটিকেল। শুরু হয়ে যায় মানুষের শরীরে এই জীবাণুর পরীক্ষা নিয়ে প্রচুর গবেষণা বিশেষ করে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে।

Continue reading “রোগ জীবাণু গুলে সরবত পান করা”

ব্যাঙ দিয়ে প্রেগন্যান্সি টেস্ট

ব্যাঙ দিয়ে প্রেগন্যান্সি টেস্ট
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

আমি যখন ১৯৮০ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে অধ্যয়ন করি তখন ঘাটাইল থেকে আমার এক পরিচিত লোক আসেন তার স্ত্রীকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে। তার কি কি সমস্যা ছিল আমার এখন মনে নেই। তবে তাকে দেখায়েছিলাম স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডাঃ জোবায়েদ হোসেন স্যারকে। স্যারের চেম্বার কাম বাসস্থান ছিল ময়মনসিংহ শহরের আমলাপাড়ায়। বাসায় একাই থাকতেন। স্যারের বাড়ি খুব সম্ভব খুলনা বা সাতক্ষিরার দিকে ছিলো। জোবায়েদ স্যারকে পেয়েছিলাম আমরা তৃতীয় বর্ষ থেকে। তাকে দেখে সবাই বাগের মতো ভয় পেতো। যেহেতু তখন আমি প্রথম বর্ষে ছিলাম সেহেতু জোবায়েদ স্যার কি জিনিস আমি জানতাম না। তাই অত্যন্ত সাহসের সাথেই সেদিন স্যারের সাথে কথাবার্তা বলেছিলাম। স্যার রোগী পরীক্ষা করে বললেন “রোগী গর্ভধারণ করেছে কি না আমি নিশ্চিত না। প্রেগন্যান্সি টেস্ট করে নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসা দিতে হবে।” তিনি প্রেগন্যান্সি টেস্ট লিখে একটা এডভাইস স্লিপ দিলেন প্রফেসর ডাঃ এম এ জলিল স্যারের প্যাথলজি ল্যাবরেটরি থেকে টেস্ট করে আনার জন্যে। তখন কয়েকটি মাত্র ল্যাবরেটরি ছিল চড়পাড়ায়।মাত্র কয়েকটি টেস্ট হতো তাতে। ল্যাবরেটরিটরিগুলোর নাম ছিল না। চরপাড়া মোড়ে প্যাথলজি বিভাগের প্রফেসর আব্দুল হক স্যারের ‘আত-তাহলিল’ নামে একটা ছোট্ট ল্যাবরেটরি ছিলো। নিজ হাতে রক্ত টানতেন, নিজ চোখে পরীক্ষা করতেন এবং নিজ হাতে রিপোর্ট লিখতেন। রিপোর্ট ভুল হবার প্রশ্নই উঠতো না। প্রফেসর জলিল স্যার দেশী হিসাবে আমাকে একটু বেশী স্নেহ করতেন। প্রেগন্যান্সি পরীক্ষার এডভাইস নিয়ে জলিল স্যারের নিকট গেলাম। তিনি তার টেকনোলজিস্ট গোলাম মোস্তফা ভাইর কাছে পাঠালেন। মোস্তফা ভাই বললেন Continue reading “ব্যাঙ দিয়ে প্রেগন্যান্সি টেস্ট”