ছাপার অক্ষর

ছাপার অক্ষর

স্মৃতিচারণ

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার


ক্লাশ থ্রিতে পড়ার সময় বাড়ির কাজ ছিল পড়া মুখস্ত করা এবং বাংলা ও ইংরেজি ১ পাতা করে হাতের লিখা। হাতের লিখা খুব সুন্দর হলে দশে দশ পাওয়া যাবে। কেউ দশ পায় না। আমার ইচ্ছা হল দশ পেতে হবে। আমি খুব প্রকৃতি প্রেমিক ছিলাম। বাড়ির পাশে ঝোপ জংগলে নানা রকম গাছের সাথে আমার ছিল ভালবাসা। অনেক গাছের নাম জানতাম। অনেক বন্য ফুলের নাম জানতাম। অনেক পাখির নাম জানতাম। কোন পাখি কোন পাখির বউ আমি চিনে রাখতাম। তাদের বাসা বানানো, ডিম পারা, বাচ্চা ফুটানো, বাচ্চা লালন করা সব কিছু আমি খোঁজ রাখতাম। স্কুল থেকে এসে খাবার খেয়ে আম গাছে উঠে আম পেরে গাছের ডালে বসেই খেতাম। নানা জাতের পাখির ডাক শুনতাম। আমাদের বাহির বাড়িতে একটা কাঠাল গাছ আছে। ওটার বয়স আমার বয়সের সমান। তখন আমার বয়স নয় ছিল। নয় বছর বয়সের কাঠাল গাছ কতটুকু হয় হয়ত অনুমান করতে পেরেছেন। ওই গাছের বড় ডালে বসে দুই পা দুই পাশে ঝুলিয়ে গাছের সাথে হেলান দিয়ে বসে আরামে পড়া মুখস্ত করতাম। আশে পাশে পাখিরা নানা রকম কথা বলত। ফিংগে পাখি বলত “ভেরি গুড । টেরেংচি।” ভেরি গুড মানে খুব ভাল। কিন্তু টেরিংচির মানে বুঝতাম না। দোয়েল পাখি বলত “চিমটি দিলেও দোষ, কোনতা না করলেও দোশষ।” ছোট বোন সোমেলাকে মাঝে মাঝে চিমটি দিতাম। মার কাছে বিচার দিত। এমনকি চিমটি দেইনি শুধু কাছে গিয়েছি চিমটি দেয়ার জন্য তাতেই চিল্লায়ে উঠে বলতো “মা, ছোট ভাই চিমটি দেয়।” মনে করতাম পাখিটি সেই কথাই বলছে। গাছের নিচ দিয়ে হাটুরেরা হাটে যাওয়ার সময় বৃক্ষ প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসত। এখনো অনেকে আমার সেই দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেন। ঘরের ভিতর বসে লিখতে ভাল লাগতো না। তাই জল চৌকি কাঠাল গাছ তলায় এনে তার উপর বালিশ রেখে বালিশের উপর বুক রেখে হাতের লিখা লিখতাম। সাদা কাগজ ছিল ১০ আনা দিস্তা। ১৬ আনায় ছিল এক টাকা। সাদা কাগজে অংক কসতাম। লিখতাম ফাউন্টেইন কলমে সুলেখা কালি ভরে। ধনিরা লিখত পেলিকান কালি দিয়ে। গরীবরা লিখত সীমের পাতার রস দিয়ে কঞ্চির কলমে। কেউ কেউ পাখির পালকে কালি লাগিয়েও লিখত । দাগটানা খাতা ছিল। বাংলা খাতা ছিল দুই দাগের। ইংলিশ খাতা ছিল তিন দাগের। মাঝকানেরটা লাল দাগ ছিল। খুব সুন্দর হাতের লিখা চেষ্টা করতে গিয়ে এক সময় ইচ্ছা হল বইয়ের অক্ষরের মত করে লিখতে। কিন্তু পারছিলাম না। বাবাকে বললাম Continue reading “ছাপার অক্ষর”

ঢোলের বাইদ্যে আমার পড়া

 

ঢোলে বাইদ্যে আমার পড়া  
ক্লাস ফোর থেকে আমাদের ইংলিশ বই পাঠ্য হল। ইংরেজি বর্নমালা শিখছিলাম। B অক্ষর শিখানোর জন্য সেন্টেন্স ছিল এই রকম।
Bring.
Bring, bring.
Bring the duster.
Continue reading “ঢোলের বাইদ্যে আমার পড়া”

বসা নিয়ে মারামারি

বসা নিয়ে মারামারি

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
স্মৃতিচারণ

১৯৬৮ সনে ক্লাস টুতে পড়তাম ঘোনারচালা ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে। আমার বয়স তখন ৭-৮ বছর হবে। আমাদের স্যার ছিলেন চার জন। হেড স্যার ছিলেন মোঃ খোরশেদ আলম। সেকেন্ড স্যার ছিলেন আমার চাচা মোঃ সোলায়মান তালুকদার। থার্ড স্যার ছিলেন মোঃ সাখাওয়াৎ হোসেন। ফোর্থ স্যার ছিলেন মোঃ আঃ লতিফ। লতিফ স্যার একই সাথে কচুয়া পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্তার ছিলেন । তাই আমরা বলতাম পোস্টো স্যার । আমাদের ক্লাসে সাতটি বেঞ্চ ছিল। স্যার বসার সামনা-সামনি সারিবদ্ধ তিন সারিতে ছয়টি। স্যারের ডান পাশে আড়া-আড়ি ভাবে একটি। সামনের দুই বেঞ্চে মেয়েরা বসত। ছেলেরা মেয়েদের পিছে বসতো । জামাল আমাদের মধ্যে একটু ডানপিটে ছেলে ছিল। সে আমাদের ফার্স্টবয় ক্লাস ক্যাপ্টেন বারীর ভাগ্নে ছিল। একদিন জামাল আমাদেরকে ডেকে বলল “আমরা সবাই একই ক্লাসে পড়ি। সবার সমান অধিকার। কেন মেয়েরা সামনে বসবে আর আমরা সবসময় পিছনে বসব? আগামীকাল থেকে আমরা মেয়েদের আসার আগেই এসে সামনের সীটে বসে পড়ব।” আমরা সবাই রাজি হলাম। পরেরদিন সবাই আগে এসে সামনের বেঞ্চে বসে পড়লাম। সবার ডানে জামাল বসেছে যেখানে মেয়েদের মধ্যে যে একটু বড় এবং শক্তিশালী সে বসত। একে একে মেয়েরা আসে। বলে “তোমরা তোমাদের বেঞ্চে যাও।” ছেলেরা কেউ কথা বলে না। তাকায়ও না সেদিকে। একসময় মেয়ে লীডার জামালের বইগুলো বেঞ্চ থেকে ছুরে মারল। জামালও মেয়ের বইগুলি নিয়ে ছুরে মারল। মেয়েটি জামালকে কিল মারল। জামালও কিল মারল। কিলাকিলি লেগে গেল দুই পক্ষের মধ্যে। দুর্বল চিত্তের মেয়েরা ভয়ে চিল্লাচিল্লি শুরু করল। অফিস থেকে সাখাওয়াৎ স্যার এসে গণহারে বেত্রাঘাত করতে লাগলেন। বেতাইতে বেতাইতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে বললেন “কি হয়েছে?” কেউ উত্তর দিচ্ছে না। নিরুপায় হয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন। সবাই আমাকে নির্ভর যোগ্য এবং একটু বিশ্বাসী মনে করতেন। আমি বিস্তারিত বললাম। স্যার আমাদের চিরাচরিত াগের নিয়মেই বসতে বললেন। স্যারের সামনেই আবার হট্টগোল শুরু হল। এইবার সোলেমান স্যার এলেন বেত হাতে। সবাই বুঝল এবার চামড়া ছিড়ে ফেলবে। স্যার সব শুনে সাখাওয়াৎ স্যারকে বললেন “আপনি নিজে ওদেরকে একজন ছেলে একজন মেয়ে এইভাবে বসিয়ে দিন। এতে কেউ রাজি না হলে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। আমি বেতিয়ে চামড়া ছিড়ে দিব।” আমরা শান্ত থাকলাম। সাখাওয়াৎ স্যার ফার্স্ট বয় বারীকে আড়া-আড়ি বেঞ্চের ডান সাইডে বসালেন। সেকেন্ড বয় আমাকে বেঞ্চের মাঝখানে বসালেন। থার্ডবয় লুৎফরকে বেঞ্চের বাম সাইডে বসালেন। বারী ও আমার মাঝখানে স্যারের ভাতিজিকে বসালেন। আমার ও লুৎফরের মাঝে স্যারের মেয়েকে বসালেন। এখানে হাসির কিছু নাই। আমরা মাত্র ক্লাস টু-এ পড়তাম। শিশু ছিলাম। অন্যান্য বেঞ্চেও একজন ছাত্র একজন ছাত্রী এই ভাবে বসিয়ে দিয়ে বললেন “ক্লাসে আগে আসুক, আর পরে আসু্‌ এই ভাবেই বসতে হবে।”

আমি একটু লাজুক প্রকৃতির ছেলে ছিলাম। মেয়েদের সাথে সহজে কথা বলতাম না। ডানে বামে ঘুরতে পারতাম না। আমার খেলার নেশা ছিল না। খেলার আওয়ারে আমি বেঞ্চেই বসে থাকতাম। মেয়েরা সাধারণত খেলতে যেত না। ক্লাসে বসেই গল্প করত। মাঝখানে আমি থাকাকে তারা দুই কাজিন গল্প করতে পারত না। আমাকে খেলতে যেতে বলত। আমি বলতাম “আমি খেলতে পারি না।” ঠাট্টা করে বলত “কুঁইচা মুরগীর মত ক্লাসে বসে থাকে।” তবে এই ব্যবস্থাটা কয়েকদিন মাত্র স্থায়ী ছিল। আপনা আপনি আগের ব্যবস্থায় চলে যায়। অসাভাবিক নিয়ম বেশীদিন স্থায়ী থাকে না।

৮/১০/২০১৭ খ্রি.

 

ক্লাস টুর পড়া

ক্লাস টুর পড়া

(স্মৃতিচারণ)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার


১৯৬৮ সনে ক্লাস টুতে উঠে বাংলা ও অংক বিষয়ের সাথে যোগ হল সমাজপাঠ। ভুগোল, পৌরনীতি ও ইতিহাস নিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারের একটা বই ছিল ‘সমাজ পাঠ’ নামে। ওখানে দিক নির্নয় শিক্ষার জন্য একটা লেসন ছিল। সুর্য যে দিকে উদয় হয় তাকে পুর্ব দিক বলা হয়। উদিয়মান সুর্যের দিকে ঘুরে দাড়ালে হাতের ডান দিক দক্ষিন, হাতের বাম দিক উত্তর এবং পিছনের দিক পশ্চিম। মাথার উপরের দিক উর্ধ এবং পায়ের নিচের দিক অধ। এইভাবে বই পড়ে স্যারগণ আমাদের দিক শেখাতেন। স্যার প্রশ্ন করতেন “খলিফা বাড়ি স্কুলের কোন দিকে?” আমরা বলতাম “পিছনের দিকে।” স্যার শুধ্রে দিতেন “না, উত্তর দিকে।” Continue reading “ক্লাস টুর পড়া”