পাগল নিয়ে যতো কথা

পাগল নিয়ে যতো কথা
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
ছোট বেলা গ্রামে নানান কিছিমের পাগল দেখেছি। সব পাগল ক্ষতিকর ছিলো না। খেপা পাগল বা ভোর পাগল ক্ষতিকর ছিলো। যারা হাল্কা পাগলামি করতো তাদের বলা হতো আধপাগলা বা আতপাগলা। আতপাগলা মানুষ যেখানে সেখানে অবর জবর কথা বলে ফেলতো অথবা কান্ড করে বসতো। কিছু কিছু লোক ছিলো তাদেরকে বলা হতো ভাবের পাগল। তারা বেশী কথা বলতো না। সারাক্ষণ ভাব ধরে থাকতো আজব আজব পোষাক পরে। কিছু মানুষ ছিলো সব সময় আল্লাহর ধ্যান খেয়ালে মগ্ন থাকতেন। তাদেরকে বলা হতো দেওনা পাগল (দেওয়ানা পাগল)। কোনো কোন মানুষ মাথায় চুলের জট পাকিয়ে ভাব ধরে থাকতো আর বুঝাতো যে তাদের লগে কিছু একটা আছে। এগুলোকে বলা হতো জৌটা পাগল। কিছু মহিলা পাগল ছেড়া কাথা গায় গিয়ে ঘুরতো। এদের বলা হতো খেতা পাগল। যারা ঘন ঘন বিয়ে করতে চাইতো তাদের বলা হতো বিয়ার পাগল। যেসব মেয়েরা সারাক্ষণ স্বামীর প্রশংসা করে গল্প করতো তাদের বলা হতো ভাতাড়ের পাগল। কিছু কিছু লোক মাঝে মাঝে মাতলামি করতো কিন্তু তারা সব কিছুতেই সাভাবিক ছিলো। অনেকে তাদেরকে কটাক্ষ করে বলতো “জাতে মাতাল, তালে ঠিক”, সংক্ষেপে জিএমটিটি।
গ্রামের পোলাপানরা পাগল দেখলে মজা পেতো। পাগলের পিছে পিছে হাটতো। যেসব পাগল ল্যাংটা থাকতো তাদেরকে ল্যাংটা পাগল বলা হতো। ল্যাংটা পাগল দেখলে পেছন থেকে পোলাপানরা ইটা দিয়ে ঢিল ছোড়তো। বিরক্ত হয়ে পাগলারা মা বাপ তোলে গালি দিতো। পোলাপানরা গ্রামের ঝগড়া বিবাদ দেখেও মজা পেতো। পাশাপাশি দুই বাড়ির মধ্যে মাঝে মাঝে বিবাদ বেঁধে যেতো। যার যার বাইর বাড়িতে দাঁড়িয়ে মায়ে ঝিয়ে মিলে যে যতো রকম বকা ঝকা করতে পারে করতো। পোলাপানরা অদুরে দাঁড়িয়ে সেইসব বকাঝকা ও ঝগড়াটেদের অঙ্গভঙ্গি দেখে উপভোগ করতো। এখনো শহরের শিক্ষিত মানুষ টেলিভিশন নাটকে পারিবারিক ঝগড়া দেখে উপভোগ করে।
কালিয়ার হাসমত ভাই ছিলেন কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলের ছাত্র সংসদের জি এস। তিনি খুব মজা করে কথা বলতেন। তিনি কথা বললে আমরা মজা করে শুনতাম। ক্লাসের ফাঁকে তিনি প্রায়ই ঝইড়া পাগলার কথা বলতেন। ঝইড়া পাগলা কি কইলো, কি করলো, এসব হাসির কথা বলতেন। মজা পেতাম। তাতে ঝইড়া পাগলাকে আমার দেখার ইচ্ছে হয়েছিলো। এক রাতে কালিয়া বাজারে মঞ্চ নাটক দেখছিলাম। সেই মঞ্চে উঠে ঝইড়া পাগলা গান গাইতে চাইলেন। কর্তৃপক্ষ তাকে গান গাওয়ার অনুমতি দিলে দর্শক শ্রোতারা হাসাহাসি করছিলেন। আমি সেদিন তাকে প্রথম দেখলাম। এরপর আর আমি তাকে দেখিনি। তিনি হাতে এক তারা নিয়ে গাই ছিলেন ভক্তিমূলক বাউল গান “আর আমার নালিশের জায়গা নাই…. ….।” গান শুনে আমার মনে হলো তিনি পাগল নন। তিনি বাউল ফকির। আমি কচুয়া স্কুলে পড়াকালীন স্কুলের লাইব্রেরী থেকে বই তুলে তুলে পরতাম। তাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরতচন্দ্র চট্রপাধ্যায় ও জসিম উদ্দিনের বেশ ক’টি বই পড়া হয়ে যায়। এদের মধ্যে পল্লী কবি জসিমউদদীনের স্মৃতির পট বইখানি আমার মনে খুব প্রভাব ফেলে। কবি ময়মনসিংহের গ্রামে গ্রামে ঘুরে লোকগীতি ও লোক সংস্কৃতি সংগ্রহ করতেন। তিনি গ্রাম্য বাউলদের বাড়িতে থেকেছেন, খেয়েছেন, গান শুনেছেন। সেসব মজার অভিজ্ঞতা তিনি স্মৃতির পট বইয়ে লিখেছেন। আমার স্মৃতি কথাগুলো লিখতে এই স্মৃতির পট বইটি বেশ প্রভাব ফেলেছে। সেই বইয়ে আছে কবি এক বাউলের গান শুনেন সারারাত ধরে। বাউলের গানের কথা ও সুর কবি জসিমউদদীনকে বিমোহিত করে। তিনি “আর আমার নালিশের জায়গা নাই” গানটি বিশেষভাবে লিখেছেন। সেই গান ঝইড়া পাগলা গাইছেন নাটকের মঞ্চে। আমি তখন খুব সম্ভব ক্লাস নাইনে পড়ি। তখনই আমি মনে করি তিনি পাগল নন, গ্রাম্য এক বাউল ফকির।
অল্প কিছু সংখ্যক পাগল ছিলো তারা ক্ষেপে গিয়ে জিনিসপত্র ভাংচুর করতো ও মানুষের শরীরে আঘাত করতো। এদের বলা হতো ভোর পাগল বা ঘোর পাগল বা ক্ষেপা পাগল। ক্ষেপা পাগল নিয়ে খুব ভয় ছিলো। যেকোনো সময় যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারতো। তাই তাদেরকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। তখন বলা হতো বান্ধা পাগল। পাগলিকে আমরা বলতাম পাগুল্লি। বর্গা গ্রামে এক ভোর পাগুল্লি ছিলো। বাড়ি থেকে দূরে রাস্তার ধারে ছোট্ট এক কুঁড়ে ঘরে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। সেই ঘরে কোন বাতি ছিলো না। সেই পাগুল্লি সারাক্ষণ চিল্লাচিল্লি করতো সেই নির্জন কুঁড়ে ঘরে। বুবুদের বাড়িতে যাবার সময় রাতে তার চিল্লাচিল্লি শুনতে পেতাম। বুবুকে জিজ্ঞেস করেছি
– পাগুল্লিকে বাড়িতে রাখে না কেন?
– পাগুল্লির চিল্লাচিল্লিতে বাড়ির মানুষের ঘুম অয় না। তাই দুরের চড়া ক্ষেতে কুইড়া ঘর বানাইয়া দিছে থাকবার জন্য।
– পাগুল্লির অন্ধকার রাতে চড়া ক্ষেতে কুইড়া ঘরে ডর করে না?
– পাগলের আবার ডর আছে?
আমি সেই পাগুল্লির কষ্টের কথা ভুলতে পারিনা। আমজানি গ্রামেও এক ভোর পাগল ছিলো সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাকেও বেঁধে রাখতে হতো শিকল দিয়ে। আমি দেখেছি পালানের ক্ষেতে তাকে গরুর মতো করে বেঁধে রাখতে, যেনো হাচার দিয়ে রেখেছে। তার করুণ চাহনি আমাকে এখনো কষ্ট দেয়। রৌহা নানা বাড়িতেও নানার এক ভাই ভোর পাগল ছিলেন। তিনি সিজনাল পাগল হতেন। বছরে এক দু’মাস। সারাক্ষণ আবোল তাবোল বকতেন। মাঝে মাঝে ক্ষেপে যেতেন। তার ছেলেরা ধরে পিঠ মোড়া করে পুকুরে নিয়ে একশ একটা করে ডুব দেওয়াতেন। তাতে পাগলামি থেমে যেতো। সবাই মনে করতো পাগলের মাথা গরম হয়। পানিতে চুবাইলে মাথা ঠান্ডা হয়ে শান্ত হয়। আমি মনে করি, ডুব পারতে পারতে ক্লান্ত হয়ে পাগলারা শান্ত হয়ে যেতো। এই ধরনের চিকিৎসা ছিলো পাগলদের প্রতি নিষ্ঠুরতা। একবার এই নানাকে বারান্দার খামের সাথে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। নানা বারান্দার চালে উঠে বসেছিলেন। তার স্ত্রীর কাছে এক গ্লাস পানি চান। নানী ভয়ে পানি দিয়ে আসেন বারান্দার মেঝেতে। কিন্তু নানা আবদার করেন তার হাতে পানির গ্লাস তুলে দিতে। নানি মায়া করে যেই পানির গ্লাস হাতে তুলে দিচ্ছেন অমনি নানির চুলের মুঠি ধরে টান মেরে চালে তুলে ঘার মটকে দেন। মার কাছে এই ঘটনা শোনার পর আমি এই নানাকে দেখে খুব ভয় পেতাম। একদিন দুই ঘরের চিপা রাস্তা দিয়ে আমি আসছিলাম। হটাৎ সামনে পড়লেন সেই নানা। আমার আত্মা শুকিয়ে গেলো। নানা জিজ্ঞেস করলেন “এই তর নাম কি?” আমি কাপতে কাপতে বললাম “সাদেক আলী।” নানা বললেন “তর ভাইর নাম কি?” বললাম “আকবর আলী।” নানা “আকবর আলী, সাদেক আলী” স্লোগান দিতে দিতে পুকুরের দিকে চলে গেলেন। তিনি সারাদিন সারারাত এই দুই নাম জপলেন। একই কথা বারবার বলতে থাকা পাগলের লক্ষণ। তিনি একবার সারারাত জপলেন “আল্লাহর নাম হয়না যেন ভুল, মওলা দিনের রসুল।” কোন একটা হাটে সেই নানাকে পাবলিক বুঝতে না পেরে বেদম নির্জাতন করে। তারপরই মর্মান্তিক ভাবে তার মৃত্যু হয়।
আমাদের বাড়ির দক্ষিণে চন পাড়ার আজগর ভাই প্রতিবছর বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে ভোর পাগল হতেন। সারা বছর ঝিম মেরে থাকতেন। গরম কাল এলেই তার পাগলামি ভার হতো। দা, বটি নিয়ে মানুষকে মারতে যেতেন। সবাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিতো। আমরা দৌড়ে যেতাম তামাশা দেখতে। তাকে বাগে আনতে খুব ব্যাগ পেতে হতো। তিন চার জন যুবক দিয়ে তাকে ধরে কুয়ার পাড়ে নিয়ে ঠিলার পানি মাথায় ঢেলে ঢেলে মাথা ঠান্ডা করা হতো। আমি মনে করি অতিরিক্ত পানি ঢালার কারনে শরীর অবসন্ন হয়ে পাগলামি কমে যেতো। আজগর ভাইর জন্য মায়া হয়।
আমি যখন এমবিবিএস থার্ড ইয়ারে পড়ি তখন মেডিসিনের অংশ হিসেবে কিছুদিন মনোরোগ বিভাগে ক্লাস করেছি। ওখানে গিয়ে বেশ কিছু পাগল দেখার সৌভাগ্য হয়। ক্লাসটি ছিলো ক্লিনিক্যাল। এধরণের ক্লাসে একজন রোগী নিয়ে স্যারগণ পড়ান। যে রোগী নিয়ে স্যার পড়াচ্ছিলেন সেই রোগী আমাদের এক ক্লাসমেট মেয়েকে তার ছেলের বউ মনে করে নানান কথা বলতে লাগলেন এবং বউ মা, বউ মা করে ডাকতে লাগলেন। ক্লাসমেট ক্লাসে অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। স্যার বললেন “এটা মানসিক রোগের লক্ষণ প্যারাময়েড ইলুশন। সে এই মেয়েকে তার ছেলের বউয়ের মতো দেখছে। তার দোষ না। সে এমন দেখছে। মানসিক রোগের আরেকটা লক্ষণ হলো হ্যালুসিনেশন। এতে এখানে যা উপস্থিত নেই তা দেখা, শোনা বা অনুভব করা। ধরো, লোকটার ছেলের বউ এখানে নেই। আমরা তাকে দেখতে পারছি না। কিন্তু সে তাকে দেখতে পারছে, তার সাথে কথা বলছে। এই জন্য পাগলেরা একা একা কথা বলে, একা একাই হাসে, কাঁদে।
মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করার আগে আমি উপজেলা লেভেলে চাকরি করেছি। প্রথম একবছর ছিলাম বরিশালের এক গ্রামের সাবসেন্টারে। তারপর আড়াই বছর নকলা উপজেলা হাসপাতালে। বিকেল বেলা প্রাক্টিস করতাম। গ্রামে গ্রামে কলেও যেতাম। হাসপাতালে ভর্তিযোগ্য রোগী হাসপাতালে যেতে অপারগ হলে রোগীর বাড়ির বাংলা ঘরকে হাসপাতাল বানিয়ে চিকিৎসা দিতাম। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে যেভাবে চিকিৎসা করতে শিখেছিলাম সেভাবেই চিকিৎসা দিতাম। এভাবে অনেক ধনুষ্টংকার, এক্লাম্পসিয়া, এনক্যাফালাইটিস ইত্যাদি জটিল রোগের চিকিৎসা গ্রামেই করে ফেলেছি। তিন কিলোমিটার দূরে থেকে একটা কল এলো। তারা আমাকে রিক্সা দিয়ে নিয়ে গেলো। রোগী চেয়ারম্যান সাবের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে অনার্স পড়ে। ইউনিভার্সিটির হল থেকে রিক্সা ভাড়া করে নকলার গ্রামের বাড়িতে এসেছে আনুমানিক দু’শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে। কিন্তু কেনো? কেউ বলতে পারছে না। ছেলেটি বাড়ি এসে অনবরত আবোল তাবোল কথা বলে যাচ্ছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে তখন এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলছিলো। নেতাদের ভাষন তার ব্রেইনে গেঁথে গেছে। অনবরত সেসব ভাষন দিয়ে যাচ্ছে কারো দিকে না তাকিয়ে। চেয়ারম্যান সাব ঘুমিয়েছিলেন। তাকে ডেকে আমার কাছে এনে বসানো হলো। বুজতে পারলাম চেয়ারম্যান ব্যাপারটা তেমন জানেন না। চেয়ারম্যানের সাথে দু’চার কথা আলাপ হলো। রোগীকে কাছে নিয়ে আসতে বললাম। রোগী এসে সালাম দিয়ে এক হাত বাড়িয়ে দিলেন নেতার স্টাইলে হ্যান্ড সেইক করার জন্য। চেয়ারম্যান হাত বাড়ালেন না। আমার দিকে হাত বাড়ালে আমি হ্যান্ড সেইক করলাম। ছেলেটি “ডাক্তার স্যাব আমি একটু বাথরুমে যাবো” বলে বেড়া দেয়া টিউবওয়েল পাড়ের দিকে চলে গেলো। চেয়ারম্যান উচ্চারণ করলেন “বেয়াদব ছেলে!” হাত বাড়িয়ে হ্যান্ড সেইক করার একটা আদব আছে। সালাম বা আদাব বা নমস্কার বিনিময়ের পর হ্যান্ড সেইক করার জন্য সাধারণত বড়রা ছোটদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেবে। ছোটরা আগে হাত বাড়াবে না। তাই, চেয়ারম্যান ছেলেটাকে বেয়াদব বলেছেন। আমি আরও অনেক্ষণ চেয়ারম্যানের সাথা গল্প করে কাটালাম। তার পিত্তে পাথর আছে। মাঝে মাঝে তীব্র ব্যাথা হয় এসব জানালেন। সেই ব্যাথা প্যাথেডিন ইঞ্জেকশন ছাড়া কমেনা তাও জানালেন। প্রায় এক ঘন্টা কেটে গেলো ছেলেটা আসছে না টিউবওয়েল পাড় থেকে। সমানে গায়ে পানি ঢালছে আর পেচাল পাড়ছে। কেটে গেল প্রায় দেড় ঘন্টা। বার বার তাকিদ দিলাম রোগী নিয়ে আসার জন্য। শরীরে পানি ঢালতেই লাগলো। আমার ডাক্তারি ব্যাগে সব সময় কিছু ইমার্জেন্সি ঔষধ রাখতাম। তারসাথে ক্ষেপাপাগলকে পুশ করার জন্য একটা ইঞ্জেকশনও ছিলো। নিরুপায় হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম একটা মেরে দেই। চারজন তাগড়া যুবককে বুজিয়ে বললাম “আমি এর গায়ে পুশ করার জন্য একটা ইঞ্জেকশন ভরে রাখবো। আমি চোখ ইশারা দেয়ার সাথে সাথে একযোগে তাকে চেপে ধরবেন। সেকেন্ডের মধ্যে পুশ করে দেব ইঞ্জেকশন। কয়েক মিনিটের মধ্যে শান্ত হয়ে যাবে মাথা। যেই কথা সেই কাজ। কিছু খাওয়ার ট্যাবলেট প্রেস্ক্রিপশন করে দিয়ে চলে এলাম বাসায়। পরদিন সকালে একজন লোক সাথে নিয়ে সেই পাগলা ছেলেটি এলো আমার কাছে। একদম সাভাবিক কথা-বারতা ও আচরণ। তার নতুন সমস্যা ছিলো হাতের আঙ্গুল কাপছিলো। বুজতে পারলাম ইঞ্জেকশনের সাইড ইফেক্ট হয়েছে। তার জন্য ঔষধ লিখে দিয়ে বললাম “এবার সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
একদিন আমার চেম্বারের সামনের বারান্দা দিয়ে চেম্বারের দিকে যাচ্ছিলাম। একজন লোক একাকি চুপ করে বসেছিলো চেয়ারে। অন্য রোগীরা ছিলো ওয়েটিং রুমে। আমি লোকটার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তাকে ক্রস করার সাথে সাথে জোড়ে আমার পায়ে একটা লাথি মারলো যে আমার আত্মা ধরে গেলো। আমি তারাতাড়ি রুমে ঢুকে পড়লাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম যে লোকটা ভোর পাগল। পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব হলো। আমি যে লাথি খেয়েছি তা কাউকে বললাম না। বললে অপমানিত হতাম। শুধু বললাম পাগল রোগী তাড়াতাড়ি বিদায় করে দাও যে কাউকে লাথি মারতে পারে। সেই আঘাত সারতে আমার এক সপ্তাহ লেগেছিলো।
একদিন আমি ফজলু মুন্সিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম “আপনারা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারের সাথে ফার্মেসিতে বসেন। পাগল রোগীরা উৎপাত করে না?” তিনি বললেন “রোগী তেরিবেরি করলে দুইতিনজনে চাইপ্পা ধইরা একটা ইঞ্জেকশন মাইরা দেই। সব ঠান্ডা অইয়া যায়। স্যারেই বইলা দিছে এই ইঞ্জেকশন দিতে।” হাসপাতালের মানসিক রোগীদের ওয়ার্ডেও সব রোগী খোলামেলা আছে। কেউ কাউকে আঘাত করে না। সবই ঐ ঔষধের গুণে।
একবার এক মানসিক রোগীর বাবার সাথে আমার আলাপ হলো। রোগী ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু পাগল। তাই তাকে পরিবার থেকে পৃথক রাখতে হয়। চার তলা বাড়ির নিচতলার এক পাশের একটা ফ্লাটে একাই সে থাকে দরজা জানালা বন্ধ করে। নিজের খাবার নিজেই রান্না করে খায়। বাবার কাছ থেকে মাস মাস টাকা নেয় খরচ করার জন্য। এতে কোন অসুবিধা নেই। অসুবিধা হলো হঠাৎ করে তার ছোট ভাইটার মুখের মধ্যে একটা ঘুষি মেরে দিলো। বা ঘরের জিনিসপত্র ভাংতে শুরু করলো। এমন অবস্থা হলে প্রাইভেট মানসিক হাসতালে ভর্তি করে রাখতে হয়। একটানা ৪০ দিন বা ৫০ দিন করে রাখতে হয়। প্রতিদিন ৪ হাজার টাকা করে ভাড়া দিতে হয়। লাখ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে চিকিৎসা করে। ভালো হয়ে বাড়ি ফিরে আসে কিন্তু আবার যেতে হয় হাসপাতালে। কারন, বাড়ি এসে সে ঔষধ সেবন করে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– হাসপাতালে নেন কিভাবে?
– হাসপাতালে যেতে চায় না। তারা পিক আপ নিয়ে আসে। চারজন ইয়া মোটা তাগড়া জোয়ান কপ করে ধরে পিকআপে করে নিয়ে যায়।
– আপনার ছেলের জন্য মায়া লাগে না?
– মায়া লাগে। কি করবো? যদি বড় কোন অঘটন ঘটিয়ে ফেলে তাই পাঠাতে হয়।
– তাগড়া জোয়ান লোকেরা হাসপাতালে নিয়ে চিপা মাইর মারে না তো?
– মারতেও পারে। মারলে পাগলের কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে? তারা যেভাবে শান্ত করে রাখতে পারে পারুক। ছেলেটা নিয়ে আমরা বড় পেরেশানিতে আছি।
সম্প্রতি একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেছে অনুমোদনহীন এক মানসিক হাসপাতালে। খবরে দেখলাম সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারন করা একটা ভিডিও। জানা গেছে যে বিসিএস পাস এক পুলিশ কর্মকর্তা মানসিক অসুস্থতার জন্য উক্ত হাসপাতালে যান। সেখানে গিয়ে নাস্তাও করেন। নাস্তা করার পর তিনি ওয়াসরুমে যেতে চান। হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় জাতীয় কিছু তাগড়া জোয়ান ছেলে, ৮ জনের মতো হবে, তাকে নিচ তলা থেকে তিন তলায় নিয়ে যায়। রোগীর সাথে আসা তার সহোদর বোনও একজন ডাক্তার নাম নিচেই বসা ছিলেন । তিনি মনে করেছেন ভালো টয়লেটে নিয়ে যাচ্ছে উপর তলায়। ভিডিওতে দেখা গেলো ঐ যুবকরা তাকে ছোট এক সাউন্ড প্রূফ কক্ষে ঢুকানোর চেষ্টা করছে। তিনি প্রবেশ করবেন না। তাই তারা টেনে হিছড়ে ভেতরে নিয়ে চেপে ধরছে ও কনুই দিয়ে বুকে আঘাত করছে। এক সময় চিত করে শোয়ানো হলে সেই পুলিশ অফিসার নিস্তেজ হয়ে যায়। ধস্তাধস্তি করার সময় পুলিশ অফিসার প্রস্রাব করে দেন মেঝেতে যার জন্য তিনি ওয়াসরুম খুজছিলেন। তারা ক্লিনার ডেকে প্রস্রাব পরিস্কার করায়। মুখে পট থেকে পানি নিয়ে খেতে দেয়। নাকে মুখে পানি ছিটায়। ডাক্তার ঢাকে। নিচ তলা থেকে ডাক্তার এসে বাচানোর চেষ্টা করেন। শেষে ঘোষণা দেন রুগী মারা গেছে। কি মর্মান্তিক ঘটনা! কি রহস্যময় কারবার। কোন যুগে আছি আমরা?
১২/১১/২০২০
ময়মনসিংহ

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

<script async src=”//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js”></script>

<!– mobileads –>
<ins class=”adsbygoogle”
style=”display:block”
data-ad-client=”ca-pub-9696652946187583″
data-ad-slot=”4053143233″
data-ad-format=”auto”
data-full-width-responsive=”true”></ins>

<script>
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

</script>