পজিটিভ – নেগেটিভ রিপোর্ট

পজিটিভ – নেগেটিভ রিপোর্ট

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কিছু কিছু প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্ট আছে যেগুলির রেজাল্ট পজিটিভ বা নেগেটিভ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। ডাক্তার সাব যা জানতে চান তা যদি রোগীর সেম্পল বা নমুনায় উপস্থিত থাকে তাহলে রিপোর্ট পজিটিভ, না থাকলে নেগেটিভ। প্রশ্ন হলো তাহলে কি কি জিনিস ডাক্তার সাব আছে কি না জানতে চান?

অনেক রোগ আছে যেগুলো শরীরে রোগ জীবাণু প্রবেশ করে রোগ তৈরি করে। জীবাণুর গায়ের অতিক্ষুদ্র প্রোটিনের অংশকে আমাদের শরীরের রক্তের শ্বেতকণিকা চিনে ফেলে। এই প্রোটিন কণিকাকে এন্টিজেন বলা হয়। এই এন্টিজেনকে নষ্ট করে দেয়ার জন্য শ্বেত কণিকা এন্টিবডি নামে আরেকটা প্রোটিন তৈরি করে যেটা শুধু ঐ এন্টিজেনকেই নিস্ক্রিয় করে বা ধ্বংস করে ফেলে যাতে রোগ তৈরি করতে না পারে। এই প্রোটিনকে ইমিনোগ্লোবিনও বলা হয়। রোগীর শরীরের অথবা শরীর থেকে বের হওয়া নমুনায় যদি এনটিজেনের উপস্থিতি পাওয়া যায় তাহলে টেস্ট পজিটিভ। এটা হলো ডাইরেক্ট বা প্রত্যক্ষভাবে পজিটিভ। জীবাণু থেকেই এন্টিজেন এসেছে। কাজেই এটা সরাসরি পজিটিভ। নমুনায় যদি ঐ জীবাণুর এন্টিজেনের বিরোদ্ধের এন্টিবডি পাওয়া যায় তাহলেও পজিটিভ। তবে প্রত্যক্ষ না, পরোক্ষভাবে পজিটিভ। কারন হলো, এন্টিজেনের বিরোদ্ধে এন্টিবডি তৈরি হয়ে অনেকদিন পর্যন্ত রক্তের সাথে ঘুরে বেরায় এন্টিবডি। ততদিনে হয়তো এন্টিজেন শরীর থেকে শেষ হয়ে গেছে এবং রোগ ভালো হয়ে গেছে। শুধু এন্টিজেনই না, জীবাণুর ডিএনএ / আরএনএ-র উপস্থিতি দেখেও পজিটিভ – নেগেটিভ টেস্ট করা হয়। এমনকি মাইক্রোস্কোপ দিয়ে নমুনাতে জীবাণু দেখেও পজিটিভ -নেগেটিভ রিপোর্ট দেয়া হয়। শুধু জীবাণুর বেলা-ই না নমুনাতে ক্যান্সার কোষ আছে কিনা তা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখে পজিটিভ -নেগেটিভ রিপোর্ট দেয়া হয়। নমুনায় হরমোনের উপস্তিতি আছে কি না এটা দেখেও পজিটিভ – নেগেটিভ রিপোর্ট দেওয়া হয়।

জীবাণুর এন্টিজেন অথবা এন্টিবডি ডিটেক্ট করার জন্য সবচেয়ে সহজ ও সস্তা পরীক্ষা হলো স্লাইড এগ্লূটিনেশন ও প্রিসিপিটেশন মেথড। এই মেথডে কাঁচের স্লাইডের উপর এক ফোটা নমুনা দিয়ে তার সাথে এক ফোটা রিয়েজেন্ট মিশিয়ে ঘুটা দেয়া হয়। রিএজেন্টে থাকে নির্দিষ্ট জীবাণু বা প্রোটিনের এন্টিজেন অথবা এন্টিবডি যেটা বড় বড় পার্টিকল বা দানার সাথে লাগানো থাকে। এন্টিজেনের সাথে এন্টিবডি বিক্রিয়া করে দলা পাকিয়ে যায়, যা বড় দানার সাথে খালি চোখেই দেখা যায়। এমন হলে পজিটিভ, না হলে নেগেটিভ।

এরচেয়ে একটু ভালো এবং একটু বেশী মূল্যের পরীক্ষা পদ্ধতি হলো আইসিটি মেথড। এগুলো ডিভাইস দিয়ে করা হয়। এই ডিভাইসে একটা ব্লটিং পেপারের স্ট্রিপ থাকে যার মধ্যে নির্দিষ্ট এন্টিজেন অথবা এন্টিবডি লাগিয়ে দেয়া থাকে একটা দাগ বরাবর। ঐ স্ট্রিপের এক মাথায় নমুনার সলুশন দেয়া হয় ফোটা ফোটায়। দাগের ভিতর দিয়ে নমুনা যাওয়ার সময় এন্টিবডি এন্টিজেনের সাথে সাক্ষাৎ পেয়ে রিএকশন করে। স্ট্রিপের এন্টিজেন অথবা এন্টিবডির সাথে এমন একটা জিনিস দেয়া থাকে যেটা রিএকশন করার পর রঙিন হয় দাগ বরারার এবং সেটা খালি চোখেই দেখা যায়। দাগ হলে পজিটিভ, না হলে নেগেটিভ। সাথে এমন একটা দাগ দেয়া থাকে যেটা জানা এন্টিজেন অথবা এন্টিবডি যার সাথে নমুনার দাগটা তুলনা করা হয়। যেটাকে বলা হয় পজিটিভ কন্ট্রোল।

এরচেয়েও দামী এবং কার্যকরী পরীক্ষা পদ্ধতি হলো এলাইজা মেথড। এটা বড় দামী মেশিন দিয়ে করতে হয়। এই সুক্ষ্ণ মেথডে এন্টিজেন, এন্টিবডি, হরমোন, প্রোটিন ইত্যাদির পরিমাণসহ বের করা যায়।

সবচেয়ে দামী মেথড হলো পিসিআর মেথড। এই মেথডে শুধু জীবাণুর ডিএনএ / আরএনএ বের করা যায়। করোনা ভাইরাসের উপস্তিতি নির্ণয়ের জন্য রোগীর নাক থেকে সেম্পল নিয়ে পিসিআর পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেয়া হয় কোভিড-১৯ এর। পজিটিভ হলে মনে করতে হবে করোনা ভাইরাস দিয়ে সংক্রমণ হয়েছে।

ডিভাইস মেথডে কোভিড-১৯ এর এন্টিবডির উপস্থিতি বুঝা যায়। পজিটিভ হলে মনে করতে হবে করোনা ভাইরাস দিয়ে সংক্রমণ হয়েছে বা হয়েছিলো।

সব মেথডেই কিছু না কিছু ফলস পজিটিভ অথবা ফলস নেগেটিভ হবার সম্ভাবনা আছে। একটা কথা আছে “সস্তার তিন অবস্থা / কানা পয়সা যার গেঘা বেগুন তার।” যত সস্তায় পরীক্ষা করাবেন ফলস রিপোর্ট তত বেশী পাবেন।

জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে বসে থাকে না। বংশ বৃদ্ধি করতে থাকে অথবা মারা যেতে থাকে এন্টিবডি দিয়ে অথবা ঔষধ খেয়ে। তাই, নমুনায় প্রোটিন পার্টিকল পরিমাণও কম বেশি হতে থাকে। প্রোটিন থাকলেই যে পজিটিভ হবে তা না। পজিটিভ হবার জন্য নূন্যতম একটা পরিমাণ বা লেভেল লাগবে। ওটার উপরে উঠেলেই পজিটিভ দেখাবে। এই লেভেলটাকে বলা হয় কাট আপ ভেলু। একেক পরীক্ষার জন্য একেকটা কাট আপ ভেলু দেয়া থাকে। রিএজেন্ট তৈরির ফ্যাক্টরি তা রিএজেন্ট কিটের লিটারেচারে লিখে দেন। মনে করুন, কোন একটা পরীক্ষার কিটে লেখা আছে কাট আপ ভেলু ৮ ইউনিট/এমএল। রোগীর সেম্পলে আছে ৭ ইউনিট/এমএল। টেস্ট রেজাল্ট হবে নেগেটিভ। আসলে কিন্তু রোগীর শরীরে জীবাণু বা নির্দিষ্ট প্রোটিন বা হরমোন আছে। এই পরীক্ষায় তা ধরা পরলো না। কিন্তু এক ঘন্টা পর পরীক্ষা করে পজিটিভ ধরা পরলো। এর মানে হলো এই এক ঘন্টার মধ্যে প্রোটিন বেরে গিয়ে কাট আপ ভেলু অতিক্রম করেছে। দুইটি সেম্পল দুই ল্যাবে পরীক্ষা করে একটিতে পজিটিভ, আরেকটিতে নেগেটিভ রিপোর্ট পেয়ে মিডিয়াতে খবর যাবে। তখন কে শুনবে কার কথা। কাজেই পজিটিভ থেকে নেগেটিভ হতে যেমন মুহুর্তের ব্যাপার তেমনি নেগেটিভ থেকে পজিটিভ হওয়াও মুহুর্তের ব্যাপার। মেথড ডিফারেন্ট হবার কারনেও দু’রকম রিপোর্ট হতে পারে। কোন একটা মেথডে, ধরুন, কাট আপ ভেলু ধরা হয়েছে ৮ ইউনিট/ এমএল। অন্য মেথডে হয়তো ধরা হয়েছে ৬ ইউনিট/এমএল। এ ক্ষেত্রেও দুই জায়গায় দু’রকম রিপোর্ট হবে।

মেশিনের কারনেও দু’রকম রিপোর্ট হতে পারে। মেশিনের মধ্যেও ভালো ও কম ভালো মেশিন আছে। টেকনোলজিস্টও দক্ষ ও কম দক্ষ আছেন। তাদের কারনেও দু’রকম রিপোর্ট হতে পারে। রিএজেন্টের কারনেও দু’রকম রিপোর্ট হতে পারে। ভালো ও কম ভালো দু’রকম রিএজেন্ট কোম্পানিও আছে। ক্যান্সার সেল দেখে চিনতে হয়। এটা দেখেন বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্ট যিনি ক্যান্সার সেল চিনেন। এব্যাপারে সবাই সমান দক্ষ না। কাজেই একই সেম্পলে দু’জনের কাছ থেকে দু’রকম রিপোর্ট আসতে পারে। একজনের দৃষ্টিতে ক্যান্সার কোষ আরেকজনের দৃষ্টিতে ক্যান্সার কোষ নয়। এই দু’জনের মধ্যে একজনের রিপোর্ট ভুল। কিন্তু তিনি ইচ্ছে করে ভুল করেননি। তার নিজের বিচারে এটা ক্যান্সার বা ক্যান্সার না।

কাজেই নেগেটিভ রিপোর্ট পেলেই রোগ নেই নিশ্চিত না। এর সাথে আনুসংগিক আরো পরীক্ষার রিপোর্ট মিলিয়ে এবং রোগীর রোগের হিস্ট্রির সাথে মিলিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে ডাক্তার রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা দিয়ে থাকবেন।

৪/৯/২০২০ খ্রি

ময়মনসিংহ
কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/