প্রথম দেখা সখিপুর

প্রথম দেখা সখিপুর
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি প্রথম সখিপুর যাই ১৯৭৬ সনে, আজ থেকে প্রায় ৪৩ বছর আগে। তখন আমি ক্লাস টেন-এ পড়তাম। সবেমাত্র সখিপুর নতুন থানা হিসাবে ঘোষনা দিয়েছে। থানা হওয়ার কথা ছিল আমাদের কচুয়ায়। ছোটবেলা থেকেই শুনছিলাম কালিহাতি থানা ভেংগে পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জন্য কচুয়ায় একটি নতুন থানা হবে। আমি যখন কচুয়া পাব্লিক হাই স্কুলে স্কুলে ক্লাস সেভেনে বা এইটে পড়ি তখন আমাদের স্কুল মাঠে বিরোধী দলের একটা জনসভা হয়েছিল। সেই জনসভায় মেজর এম এ জলিল, আ স ম রব ও শাজাহান সিরাজ এসেছিলেন। এই তিন নেতাকে এক সাথে বলা হতো ‘মেজর জলিল-রব-সিরাজ ‘। সেই জনসভায় এলাকার এক নেতা বক্তব্য দেয়ার সময় বললেন “আমরা ক্ষমতায় গেলে কচুয়াকে থানা ঘোষণা করা হবে।” শুনে জনতা উল্লসিত হলো। আমিও খুশী হলাম। এরপর এলাকার আরেক বক্তা বললেন “আমরা ক্ষমতায় গেলে সখিপুরকে জেলা ঘোষণা করা হবে। ” শুনে আমি ফিক করে হেসে ফেলেছিলাম। ” বক্তার মুখের যোষ কত!”

তারপর ১৯৭৫ সনের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে সরকারের প্রয়োজনেই তাড়াতাড়ি থানা ঘোষনা দিতে হলো। সরকার বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য সখিপুরে পুলিশ স্টেশন করে। সখিপুর নতুন থানা হিসাবে যাত্রা শুরু করে উনিশ শত ছিয়াত্তুর সালে। শুধু পুলিশ ষ্টেশন ছিল তখন। প্রশাসনিক থানা হিসাবে যাত্রা শুরু করে ঊনআশি সালের পহেলা জুলাই (সুত্র: দেলোয়ার হোসেন, গোহাইলবাড়ি)।
আমাদের আগের থানা ছিল কালিহাতি । কালিহাতি থানার ৩ ইউনিয়ন ও পার্শবর্তী বাশাইল থানার ৩ ইউনিয়ন নিয়ে নব গঠিত সখিপুর থানা তার যাত্রা শুরু করে। আমাদের কাকরাজান ইউনিয়ন পরে সখিপুরের অংশে ।

একদিন আমরা ৩ বন্ধু সকালের নাস্তা খাওয়ার পর বাড়ি থেকে বেড়াতে বের হলাম। আমাদের বাড়িটা করেছে ঢ্নডনিয়া গ্রামের বড়বাইদ পাড়ায়। কিশোর বয়স। নানারকম গল্প করতে করতে বেড়ালাম। চটানবাইদ পাড়ি দিয়ে সারাসিয়ায় প্রবেশ করলাম। ভানু আপাদের বাড়ি গেলাম। সেখান থেকে দক্ষিণ দিকে হাটা দিলাম। রাম খা পাড়ি দিয়ে সানবান্ধা ও কাহার্তা পাড়ি দিলাম। এরপরই সখিপুর। আমি প্রস্তাব দিলাম “সখিপুরে নতুন থানা হয়েছে, চল, সখিপুর দেখে যাই। ” বন্ধুরাও রাজি। পথচারিদের কাছ থেকে সখিপুরের রাস্তা জেনে নিলাম। খুব সম্ভব চৈত্রমাস ছিল সেসময়ে। দাবদাহে শরীর জ্বলে যাচ্ছিল। শার্টের বোতাম খুলে বুকে বাতাস লাগিয়ে হাটছিলাম। দুপুর হয়ে খাবারের সময় হয়ে গেল। খুব পিপাসার্ত ছিলাম। অবশেষে সখিপুর বাজারে গিয়ে পৌছলাম। বাজারের উত্তর পাশে একটা ছনের ঘরে একটা চা স্টল দেখলাম। টেবিলে জগ ও গ্লাস ছিল। গ্লাসে পানি ভরে ঢক ঢক করে খেয়ে পেট ভরালাম। ক্লান্ত হয়ে বেঞ্চিতে বসলাম। বুকে কয়েকটা ফু দিলাম। পানি খেয়ে শরীর ঘামতে লাগলো। দোকানে মধ্যবয়সী একজন দোকানী ছিলেন। তিনি বললেন
– টোস্ট দিব?
– না, দিয়েন না।

লোকটি তিনজনের জন্য তিন কাপ গরম দুধ-চা এনে আমাদের সামনে রেখে চলে গেলেন। আমি অন্য দুই বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম “এই কারো কাছে কোন টাকা পয়সা আছে?” মাথা নেড়ে দুইজনই বুঝালো “নাই।” আমি বললাম “আমার কাছেও নাই।তাইলে?” আমার মনে হলো গরমের মধ্যে গরম চা খেলে আরো গরম ধরবে। তাই বললাম
– চাচা, গরম লাগছে। গরম চা খেলে আরো গরম ধরবে। চা খাব না।
– গরম চা খেলে শরীর ঘেমে গিয়ে ঠান্ডা হবে। তখন ভালো লাগবে। মাথা ব্যাথা থাকলে কমে যাবে। খাও।
– এগুলি নিয়ে যান।
– গরুর খাটি দুধের চা। খাও ভালো লাগবে।
– চাচা, আসলে আমরা তো ছাত্র মানুষ, চা খাওয়ার অভ্যাস নাই। এগুলি নিয়ে যান।

চাচা চা নিয়ে গেলেন। তিন কাপ গরম দুধ নিয়ে এলেন। টেবিলে রেখে বললেন
– দুধ খাও। গরম খাটি দুধ।

চাচা দেখছি নাছোড়বান্ধা। ঝামেলা যাতে আর বেশী না হয় সে জন্য আমি চাচার কাছে বিনয়ের সাথে বললাম
– চাচা, আসলে আমরা এমনি বেড়াতে বেড়াতে ক্লান্ত ও পিপাসার্ত হয়ে পানি খাওয়ার জন্য এখানে এসেছিলাম। আমরা অন্য কিছু খেতে আসি নি। আমরা বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে বের হই নি। আমরা চা, দুধ এগুলি খেতে পারব না। আসি।
– আরে, বেটা, আমি কি টাকা চাইছি। তোমরা আমার ভাতিজা। আমি ভাতিজাদেরকে দুধ খাওয়াচ্ছি। টাকা লাগবে না। খাও।

আমরা কিছুতেই খেতে পারব না বলে চাচার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাচলাম।

তারপর সখিপুরের আর যা যা আছে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। চায়ের স্টল আর একটাও দেখতে পেলাম না। বড় দোকানের মধ্যে খুব সম্ভব দুইটা হাফ নিল্ডিং গোলাঘর দেখলাম। একটা হাই স্কুল দেখলাম। আর একটা সরকারী ডাক্তারখানা কাম ডিসপেনসারি। তুলনা করে দেখলাম আমাদের কচুয়াই এর চেয়ে বেশী উন্নত। কচুয়াই ভাল ছিল থানার জন্য। আফসোস করলাম “কচুয়া থানা হলে আমাদের বাড়ির কাছে হতো!”

ছিয়াত্তুর সনে সখিপুর প্রথম গেলেও সখিপুরের অতি নিকটের কাদের নগরে আমি এর আগে বেশ কয়েকবার গিয়েছিলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই যখন বংগবীর কাদের সিদ্দিকীকে গণসম্বর্ধনা দেওয়া হয় কাদের নগরে সেই সভায় যোগ দিতে আমি প্রথম কাদের নগর যাই। এরপর কলেজ ক্যাম্পাসে থিয়েটার ও সংগীতানুষ্ঠান উপভোগ করতেও কয়েকবার কাদের নগর যাই। সখিপুর শহরে বেশী যাওয়া হয় না। ঘন ঘন বাড়ি যাই বাড়ির টানে। নাড়ির টানে। বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা নাই কোন দিক দিয়ে। কষ্ট করে বাড়ি গিয়ে বাড়িতেই সময় কাটাই। পাড়া বেড়াই। সখিপুর যেতে হলে আবার কষ্ট করে রোড পর্যন্ত যেতে হয়। তাই, যাওয়া হয় না। সখিপুরের প্রতি অভিমান করে কর্মস্থলে ফিরে আসি। সখিপুর শহর এখন অনেক উন্নত হয়েছে। শহরের আসেপাসের রাস্তাও উন্নত হয়েছে। উন্নত হয় নাই শুধু আমাদের বাড়ি যাওয়ার রাস্তা। দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অথবা উন্নত জীবন যাপনের জন্য গ্রামের অর্ধেকেরও বেশী পরিবার সখিপুর গিয়ে বাড়ি করেছে। যারা গ্রামে আছে তারা এখন রেগুলার চা খায়। যারা সখিপুর শহরে আছে আমার মনে হয় তারা রেগুলার কফি খায়। সেদিন আমাদের এলাকার এক মহিলা এসেছিলেন আমার চেম্বারে। তিনি এখন সখিপুর শহরে বহুতল ভবন নির্মান করে বসবাস করছেন। প্রাইভেট কারে চলাফেরা করেন। তিনি ড্রাইভার দিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে কফি আনিয়ে আমার ওয়েটিং রুমে বসে খাচ্ছিলেন। এমন উন্নত মানুষে ভরে গেছে সখিপুর। সখিপুরে এমন বহুতল ভবন এখন অনেক। কত কত প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনোস্টিং সেন্টার হয়েছে! কত কত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়েছে! আরো কত কি যে হয়েছে! কয়টা বলব? আহ হা রে! এই থানাটি যদি আমাদের কচুয়ায় হতো! কত কিছু বাড়ির কাছেই পেতাম! নিশ্চয়ই আমাদের বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটিও পাকা হতো! ধুলিময় বা কর্দমাক্ত থাকতো না।

৮/৭/২০১৯ ইং
ময়মনসিংহ