রেডিও

রেডিও
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি প্রথম রেডিও দেখি একদম ছোট বেলায়। সন্ধার সময় আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে রেডিও হাতে নিয়ে ছোট চওনার শওকত ডাক্তার সাহেব হেটে যাচ্ছিলেন। ঘাড় কন্ঠের কথা শুনে আমরা বিস্মিত হই। এগিয়ে গিয়ে দেখি একজন হাতে করে একটা বাক্স নিয়ে যাচ্ছেন। সেখান থেকেই কথা বের হচ্ছে। আমি, ভাই ও বুবু এগিয়ে গেলাম ছোট কাক্কু সালাম তালুকদারের ঘরে। ছোট কাক্কু শওকত ডাক্তার সাহেবের বন্ধু ছিলেন। তিনি রেডিও কিনে বন্ধুকে দেখানোর জন্য নিয়ে এসেছিলেন। রেডিওতে প্রোগ্রাম চলছিল খবর, গান, নাটক ইত্যাদি। আমি ওসব বুঝি নাই। বুঝবার চেষ্টাও করি নাই। শুধু বুঝবার চেষ্টা করেছিলাম “এত গুলি মানুষ এত মিউজিক্যাল যন্ত্রপাতি নিয়ে এত ছোট একটা বাক্সে ঢুকলো কেমন করে?” রেডিওর পিছনের বোর্ডের কভারে কয়েকটা গোল গোল ছিদ্র ছিল। আমি ঐ ছিদ্র দিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম কে গান গায়? আরো কিছু বাচ্চা মানুষ ছিল তারা আমার মতোই করছিল। সবার কৌতূহল ভাংগানোর জন্য ডাক্তার সাহেব ব্যাক কভার খুলে ভিতরের জিনিস আমাদেরকে দেখালেন। দেখলাম ভিতরে অনেকগুলি তাবিজ। এই তাবিজ দিয়ে গান বাজনা হয় কেমনে বুঝলাম না। রেডিওতে একটা কথা বার বার বলতে শুনছিলাম “রেডিও পাকিস্তান,ঢাকা। ” তখন ইন্ডিয়ার কলকাতা কেন্দ্রও এই রেডিওতে শোনা যেতো। সেখান থেকে ঘোষনা আসতো “আকাশবাণী, কোলকাতা।” যাহোক, প্রথম রেডিও দেখার অভিজ্ঞতাটা এমনই ছিল।

এর কয়েকদিন পর ছোট কাক্কুও শওকত ডাক্তার সাহেবের অনুরূপ একটি রেডিও কিনে নিয়ে এলেন টাংগাইল থেকে। আমরা মজা করে রেডিও শোনা উপভোগ করতে লাগলাম। আব্দুল আলীম ও আব্বাস উদ্দিনের পল্লী গীতি, পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের মধুমালা ও বেদের মেয়ে নাটক এবং প্রতিদিন বিকাল ৫টায় কৃষি বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠান ‘আমার দেশ’ গ্রামের সবাই উপভোগ করতো। আমার দেশ অনুষ্ঠানে মজিদের মা (আয়েশা আক্তার), নানী, নানা ও আছাফ ভাইয়ের (সাংবাদিক আসাফুদ্দৌলা রেজা) চরিত্র আমাদের কাছে ভালো লাগতো। ১৯৬৫ সনে পাক-ভারত যুদ্ধ বাধে। বাবা চাচারা সন্ধায় ছোট কাক্কুর ঘরে জড়ো হতেন রেডিওতে যুদ্ধের খবর শোনার জন্য। যেহেতু সেই সময় আমাদের দেশের নাম পাকিস্তান ছিল সেহেতু মুরুব্বিরা যুদ্ধের খবরে পাকিস্তানের সাফল্যের কথা শুনলে খুশী হতেন। সেই কথা আমার মনে আছে। তোয়াজ হাজী দাদার কাছ থেকে শুনেছি বাবা কালিহাতির ভিয়াইল গ্রাম থেকে আমাদের সখিপুরের ঢ্নডিয়ায় এসে বাড়ি করেন। সেটা ছিল ১৯৫৮ সন। মা বলেছেন তিনি আমাকে পেটে নিয়ে এসেছিলেন ঢ্নডনিয়ায়। সেই বছরই আমাদের নতুন বাড়িতে আমার জন্ম হয়। কাজেই ৬৫ সনের কথা আমার মনে থাকাটা স্বাভাবিক।

এর কয়েকদিন পরেই ছোট দাদার একমাত্র ছেলে খসরু কাক্কু (আ: হামিদ তালুকদার)-ও অনুরূপ একটা রেডিও কিনে নিয়ে এলেন টাংগাইল থেকে। কাক্কুর বাড়ি আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশেই। রেডিওর শব্দে দৌড়িয়ে গেলাম। বাড়ির সামনে ইন্দিরা (ইঁদারা) কুয়ার পারে হরতকি গাছের নিচে নরম ঘাসের উপর পাটি বিছিয়ে পাটির মাঝখানে রেডিওটা রেখে দিয়েছিলেন। আনন্দের মাত্রা একটু বেড়ে গেল। কারন এই রেডিওটা আগেরটার থেকে একটু কাছে এসে গেলো। আমরা পাটিতে বসলাম। খসরু কাক্কু সাদা শার্ট সাদা পাজামা পরে টাংগাইল গিয়েছিলেন। তিনি শার্ট খুলে পাজামা পরে পা ছোড়া ছুড়ি করে পাটির চারিদিকে হাটছিলেন আর টাংগাইল রেডিওর দোকান্দারের সাথে কি কি কথা হয়েছিল তাই বলছিলেন আনন্দের অভিব্যক্তি নিয়ে। মাঝে মাঝে গেঞ্জি উচু করে বুকে ফু দিচ্ছিলেন এবং বিচুন (হাত পাখা) দিয়ে বাতাস নিচ্ছিলেন। কি তার তৃপ্তি! খুব সম্ভব সেই রাতেই ১০ টায় মধুমালা নাটক হয়েছিল রেডিওতে। মদন কুমার যখন সপ্তডিংগা মধুকর সাজিয়ে নৌকা নিয়ে মধুমালার দেশের দিকে রওনা দিচ্ছিলেন তখন বেদার উদ্দিনের কন্ঠে মাঝিরা গাইছিল “হেইয়ারে হেইয়া, হেইয়ারে হেইয়া”। তখন যেন মনে হচ্ছিল রেডিও ভেংগে যাবে। ছোট দাদীতো বলেই ফেললেন “রেডিও ভাইংগা ফালাব না কি রে?”

এর কয়েকদিন পর দেখি আমাদের পুবের বাড়ি থেকেও রেডিওর আওয়াজ আসছে। দৌড়িয়ে গিয়ে দেখি রিয়াজ উদ্দিন কাক্কু অনূরূপ একটা রেডিও চৌকির উপর রেখেছে। গান বাজছিল “ও আমার দরদী আগে জানলে, আগে জানলে তোর ভাংগা নৌকায় চরতাম না।” গানের শিল্পী ছিলেন মোস্তফা জামান আব্বাসী। কাক্কু গান শুনছিলেন আর কলম দিয়ে গানের কথা খাতায় লিখছিলেন। গান শেষে জানতে পারলাম রেডিওটা ভিয়ায়াইলের ছোট কাক্কু (নুরু কাক্কু/ নুরুল ইসলাম তালুকদার/নুরু মাস্টার) এই রেডুওটা কিনেছিলেন। রেজু কাক্কু কয়েকদিন বাজানোর জন্য নিয়ে এসেছিলেন। বাহ! তিনটি রেডিও পেয়ে গেলাম তালুকদার বাড়িতে। এরপর মার সাথে রৌহা নানাবাড়ি নাইয়র গিয়ে দেখি ছোট নানা কাজেম উদ্দিন মাস্টারও অনুরূপ একটা রেডিও কিনেছেন। ছোট নানীর ভাই পাইলট ছিলেন। তিনি বিমান দুর্ঘটনার মারা যান। সেই সংবাদ রেডিও পাকিস্তান, ঢাকার খবরে পাঠ করায় সাথে সাথে নানী জেনে কেঁদে ফেলেন। সেই দৃশ্যটা আমি দেখেছি। সাভাবিক মাধ্যমে খবর এলে হয়ত একদিন লেগে যেতো। খেয়াল করে দেখেছি বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই বাড়ির ছোট ছেলে রেডিও কিনেছেন। সেই সময় প্রতি বাড়িতে গড়ে ৪/৫ জন করে ভাই থাকতো। অধিকাংশ পরিবারের ছেলেরা অল্প কিছু লেখা পড়া করে কৃষিকাজে লেগে যেতো। ছোট ছেলেগুলি সাধারণত মায়ের খুব আদরের হতো। তাই তারা কৃষিকাজে অলস হতো। তাদেরকেই পড়ালেখা করায়ে যতদূর নেয়া যায় নিতেন। বেশীর ক্ষেত্রেই ক্লাস এইট, নাইন, বা টেন পর্যন্ত পড়ে ক্ষান্ত দিয়ে প্রাইমারী স্কুল টিচার বা গ্রাজুয়েট পাস করে হাই স্কুলের শিক্ষক হতেন। অল্প সংখ্যক মাস্টার ডিগ্রি পাস করে কলেজ টিচার বা বড় অফিসার হতেন। ছোট ছেলেগুলি একটু বেশী সৌখিন জীবন যাপন করতেন। তখন রেডিও কেনা একটু সৌখিনতার মধ্যেই পড়ত। ছোট কাক্কু বলতেন “আমি কিনেছি খবর শোনার জন্য।” খসরু কাক্কু বলতেন “আমি কিনেছি আব্দুল আলীমের গান শোনার জন্য। ” নুরু কাক্কু বলতেন খবর শোনার কথা। কাজেম উদ্দিন নানা বিছানায় বসে চা খেতেন স্টাইল করে আর রেডিও শুনতেন।

অল্পদিনের ভিতরেই শিক্ষিত অশিক্ষিত অনেকেই রেডিও কেনা শুরু করে। বিয়েতে ছেলেকে রেডিও উপহার দেওয়া একটা রেওয়াজে পরিণত হয়ে যায়। সাথে একটা সাইকেল। রেডিও প্রিন্টের কাপড়ের থলেতে রেখে কাঁধে ঝুলিয়ে বাজাতে বাজাতে জামাই সাইকেল চালিয়ে শশুর বাড়ি যেতো। বউ তার স্বামীর এহেন প্রেস্টিজ দেখে আনন্দিত হতো। নিজ হাতে গোল চাকতি ঘুরিয়ে সাউন্ড বাড়াত কমাত অথবা সেন্টার চেঞ্জ করতো।

এরপর আসা শুরু হয় এক ব্যাটারির ছোট রেডিও ও পেন্সিল ব্যাটারির পকেট রেডিও। জনে জনে গ্রামের মানুষ রেডিওর মালিক হয়ে যায়। যতই দিন যায় ততই দাম কমতে থাকে রেডিওর। প্রথম দিকে রেডিও ছিল মিডিয়াম ওয়েভ এক ব্যান্ড -এর। এরসাথে শর্ট ওয়েভ যুক্ত হয়ে দুই ব্যান্ড বা তিন ব্যান্ড হয়ে যায়। তাতে দিদেশী অনুষ্ঠান যেমন বিবিসি ও ভয়েস অব এমেরিকা শোনা যায়। দেশের সংবাদের প্রতি আস্থা না পেলে মানুষ এই সব কেন্দ্রের খবরের উপর নির্ভর করত। এদিকে আশির দশকে দেশে ক্যাসেট প্লেয়ারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। রেডিও ফ্যাক্টরি রেডিওর সাথে ক্যাসেট প্লেয়ার যুক্ত করে নাম দেয় টু-ইন-ওয়ান। এটা খুব জনপ্রিয়তা পায়। ক্যাসেটে নিজেদের গানও রেকর্ড করা যেতো। আমি আমার বাচ্চাদের ছোটবেলার ভাংগা ভাংগা মিষ্টি কথাগুলি ক্যাসেটে রেকর্ড করে রেখেছিলাম। ছুটির দিনে বাজাতাম। নব্বইয়ের দশকে কম্পিউটার কেনার পর সেগুলি সিডিতে কনভার্ট করি। সেই সিডি এখন বাজানো যাচ্ছে না।

বর্তমানে মোবাইল ফোন ডিভাইসে সব সুবিধা এসে যাওয়াতে টু ইন ওয়ানগুলির ব্যবহার নেই। অযত্নে অবহেলায় ঘরের কোন নির্জন অন্ধকার জায়গায় সেগুলির স্থান হয়েছে। মোবাইলে নেট কানেকশন অন করে পছন্দমত রেডিও প্রোগ্রাম বের করে শোনা যায় পৃথিবীর হাজারো দেশের হাজারো রেডিও অনুষ্ঠান। এখন কেউ জামাইকে রেডিও, টু-ইন-ওয়ান উপহার দেয় না।

১৫/৭/২০১৯ ইং