রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনে

রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনে
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

সিদ্ধান্ত নিলাম আমি, দোস্ত ইকবাল ও আমিনুল ভাই এক সাথে দিল্লী, আগ্রা জয়পুর ভ্রমণ করব। ইকবাল মানে আমাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের আমাদের এম-১৭ ব্যাচের ইকবাল, বর্তমানে প্রফেসর ডাঃ এ এফ এম সালেহ, এই মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান।

আমিনুল ভাই এই মেডিকেল কলেজেরই খুব সম্ভব এম-১৩ ব্যাচের বড় ভাই। ১৯৯২ সনে যখন আমি প্যাথলজি বিভাগে প্রভাষক হয়ে আসি তখন তিনি কিউরেটর ছিলেন। তাই বড় ভাই হিসাবে ভাই ডাকতাম। পরে তিনি আমাদের কলেজের অধ্যক্ষ হন। তারপর থেকে ভাই না ডেকে স্যার সম্বোধন করি। আমিনুল ভাই মানুষ হিসাবে খুব ভালো । অমায়িক। ভাবীও তাই। দোস্তো হিসাবে ইকবাল একজন ভালো দোস্তো। ইকবালকে নিয়ে ১৯৯৯ সনে নেপাল ভ্রমণ করেছিলাম। ওর সাথে ভ্রমণ করতে মজা আছে। ২০০৬ সনে একবার আমিনুল ভাই আর আমি কলকাতা ও শান্তিনিকেতন ভ্রমণ করি। আমি আবিষ্কার করি ভ্রমণ সংগী হিসাবে আমিনুল ভাই খুবই ভালো। এদিকে দিনাজপুরের আমার বিভাগীয় প্রধান রুহিনী দাদা এক সময় ইকবালের পোস্ট গ্রাজুয়েট ব্যাচমেট ছিলেন। দাদা গত বছর অবসরে যাবার আগে প্রফেসর হয়েছেন। ইকবাল তাকেও নিয়ে নিলেন আমাদের সাথে। তাই, আগ্রা-দিল্লী-জয়পুর ভ্রমনের জন্য এই তিনজনকে সংগী হিসাবে পছন্দ করলাম। এটা ছিল ২০০৯ সনের জানুয়ারি মাস। আমার পোস্টিং ছিল দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে। আর দুইজন ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত হবার পর ভিসা ও টিকিট করার দায়িত্ব আমার উপর ছেড়ে দেয়া হল। আমি আমার স্ত্রী স্বপ্নাকে সাথে নিতে ইচ্ছা করলাম। সে মহিলা হিসাবে একা যেতে একটু ইতস্তত করল এবং অন্য ভাবীরা সাথে যাবে কিনা জানতে চাইল। আমিনুল ভাবী সাথে যেতে রাজি হলেন। যাক, আরেকজন মহিলা পাওয়া গেলো। আগ্রাতে হিস্টোপ্যাথলজিস্টদের একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন ছিল। এই সম্মেলনের প্রধান আকর্ষণ ছিল রবিন্স প্যাথলজিক বেসিস অব ডিজিজ পাঠ্য বইয়ের প্রধান এডিটর ভিনয় কুমার। ২০০৬ সনের কলকাতার আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রধান আকর্ষন ছিলেন হিস্টোপ্যাথলজির উপর প্রধান পাঠ্য বই একারম্যান্স সার্জিকেল প্যাথলজি-এর প্রধান এডিটর জন রোজাই। আমি তার সাথে শ্রোতার সারিতে বসেছি। ভিনয় কুমারের সাথে দাঁড়িয়ে কফি খেয়েছি। এইগুলি করে বেস আনন্দ পাই।

আমি অনলাইন যোগাযোগে খুব এক্সপার্ট ছিলাম। দিনাজপুরে বসেই অনলাইনে ঢাকা টু কলকাতা বাসে এবং কলকাতা টু দিল্লী রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনে টিকিট করলাম। ট্রেনে ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতা আমার খুব কম ছিল। কেউ কেউ বলেছিল এয়ারে ভ্রমণ করতে। আবার মনে হলো রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনে ভ্রমণ করার একটু অভিজ্ঞতা হোক। সমস্যায় পড়ে গেলাম টায়ারে সীট নিয়ে। একটা কামড়ায় ছয়টা সীট শুয়ে শুয়ে যাওয়ার। আমরা ছিলাম ৬ জন। পাশাপাশি ২ সারিতে ৪ জন আর আরা আরি সারিতে ২ জন। আমি ইন্টার্নেট থেকে টায়ার বুঝার জন্য ছবি ও ভিডিও দেখে নিলাম। নানীর কাথা রাখার তাকের মত উপরে নিচে তিন তাকের টায়ার। আমাদের সীটগুলি দোতালায় আর উপরের তালায়। স্বপ্নাকে কিভাবে উপরে উঠাব এনিয়ে আমি চিন্তিত হলাম। কিন্তু স্বপ্নাকে জানালাম না। জানালে যদি না যেতে চায়!

মাঝখানে অনেক কথা। ওগুলো বাদ দিলাম। আমার আর রুহিনী দার বহিঃ বাংলাদেশ ছুটির কাগজ পাই নি। তারপরও রওনা দিলাম নির্দিষ্ট দিনে। কারন আমাদেরকে সম্মেলন ধরতে হবে। দাদাকে পাঠালাম মন্ত্রণালয়ের ভিতর। দাদা মোবাইলে জানালেন “ছুটির ব্যাপারে কোন পদক্ষেপই নেয়া হয় নাই। কি করবেন?” আমি জানালাম “কাউকে দায়িত্ব দিয়ে আসুন যেন আজই মঞ্জুর করায়ে আমার ইমেইলে পাঠিয়ে দেন। আমি বেনাপোল থেকে ইমেইল কপি প্রিন্ট করে নেব। দরকার হলে বেনাপোলে রাত্রিযাপন করব।” দাদা তাই করে ফিরে এলেন। আমরা রাতের শ্যামলী বাসে রওনা দিলাম। ভোরে বেনাপোল সীমান্তে পৌছলাম। ইমিগ্রেশন ক্লিয়ার করার জন্য বাসের হেল্পার সবার পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে চেক করিয়ে আনতে বললেন। আমি ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে আমাদের ৬ টি পাসপোর্ট তার হাতে দিয়ে বললাম “আমাদের ঘুম পাচ্ছে, তুমিই এগুলি চেক করিয়ে আনো।” যেই কথা সেই কাজ। ইমিগ্রেশন ক্লিয়ার। মাঝখানে সামান্য কিছু লিখতে বাদ পড়ে যেতে পাড়ে। অনেক আগের কথা তো! বর্ডার পাড়ি দেবার পর মোবাইলে খবর পেলাম ছুটির কাগজ ইমেইলে পাঠানো হয়েছে। থাক, ওটা ইমেইল ইনবক্সেই থাক। আগে ঘুরে আসি। বোর্ডারে টীম লিডার হিসাবে আমিই সব করছিলাম। সবাইকে আগে আগে পাঠিয়ে দিলাম। শেষে আমরা দুজন। স্বপ্নাকে আমার আগে দিলাম। ইন্ডিয়ায় প্রবেশ করার পর আমাকে তাড়াতাড়ি গিয়ে যে বাস ধরতে হবে সে খেয়াল হল না। আমি নাস্তা করলাম। ডলার ভাংগালাম। তারপর এগুলাম। দেখি বাসের জানালা দিয়ে ইকবাল ডাকছে “এই তো, এই তো, আমাদের লোক এসে গেছে। রুখো, রুখো।” আমরা দৌড়িয়ে গিয়ে ইন্ডিয়ান অংশের শ্যামলী বাসে উঠলাম।

ইকবাল আমাদের জন্য দুইটি সীট ধরে রেখেছিল। আমরা দুইজন উঠে বসলাম। সবাই জানতে চাইল “কি হয়েছিল?” আমি বললাম “পড়ে বলব।” এর মধ্যে বাস ছাড়তে বাধা দিয়ে দুইজন পুলিশ উঠে আর কিছু চেক না করে আমার ট্রাভেল ব্যাগটা খুলে চেক করতে লাগলো। ধন্যবাদ দিয়ে নেমে পড়লো। ইকবাল বললো “কি ব্যাপার, আর কারওটা চেক করলো শুধু তোমারটা চেক করলো?” আমি বললাম “দৌড়িয়ে এসে উঠেছি তো, তাই তাদের একটু সন্দেহ হয়েছে।” যাহোক, কলকাতায় পৌছে হোটেলে উঠে বিশ্রাম নিয়ে সন্ধায় শহরে ঘুরলাম। পরদিন সন্ধায় শিয়ালদা থেকে রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনে ওঠলাম দিল্লীর উদ্দেশ্যে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেইন। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। কামরায় প্রবেশ করে দেখি দুই জন বসে আছে দুই টায়ারে নিচতলায় সামনাসামনি। দেখে মনে হলো স্বামী-স্ত্রী। আমাদের কথাবার্তা শুনে তারা টের পেল আমরা বাংলাদেশি। “দাদারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন বুঝি? ” বলে লোকটি কথা বলা শুরু করলো। ইকবাল দাদা ও বৌদির সাথে তার আপন বড় ভাই ভাবীর মত আলাপ জুড়ে দিলো। আমি জানালাম যে আমাদের সীট উপরের গুলি। দাদা বললেন “আপনারা এর আগে রাজধানী ট্রেনে ভ্রমণ করেন নি?” আমি বললাম “না, এবারই প্রথম।” দাদা বললেন “উপরেরগুলি গোছানো থাকে শোবার আগ পর্যন্ত। তার আগে সবাই হেলান দিয়ে নিচের টায়ারেই বসে গল্প করতে করতে যায়। বসেন, এখানেই।” দাদা-বৌদি, আমিনুলভাই-ভাবী, আমি-স্বপ্না এবং রুহিনীদা-ইকবাল জুটি বেধে বসে জমসে আলাপ করতে করতে ট্রেন চলতে লাগলো। বৌদি ও দাদা খুব আলাপী ছিলেন। জানা গেলো দাদা ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি চাকরি করতেন। অবসরে গেছেন। বয়স ৬০ এর উর্ধে। তাই সিনিয়র সিটিজেন। সিনিয়র সিটিজেন হিসাবে ভারতীয় নাগরীকদের জন্য বিবিধ সুবিধা আছে। ট্রেনে নিচের টায়ারে সীট রিজার্ভ রাখা ছিল তাদের সিনিয়র সিটিজেন হিসাবে সুবিধা। ট্রেনে উঠার কিছুক্ষণ পর থেকেই নানা রকম সুস্বাদু খাবার আসা শুরু হল। খেলাম খুব তৃপ্তি নিয়ে। রাতের খাবারের পছন্দে আমি ভেজ হিসাবে নাম লিখালাম। স্বপ্না আমাকে আসতে করে বলল “নিরামিষভুজিকে ভেজ বলে।” আমি চুপ থাকতে বললাম। আমি আজ ভেজই হব। যখন খাবার এলো তখন স্বপ্নাকে দেখালাম “দেখো, তোমাদের চেয়ে আমার খাবারই সুস্বাদু বেশী। এই জন্যই আমি ভেজ পছন্দ করেছি। ” আমার খাবার স্বপ্নাকে শেয়ার করলাম। স্বপ্না বলল যে নন-ভেজের চেয়ে ভেজেই স্বাদ বেশী। আমি বললাম যে এটা আমি আগেই শুনেছি। রাতের খাবার খেয়ে আমি ও স্বপ্না ওয়াস রুমে গেলাম। এসে দেখি সবাই আইস ক্রিম খাচ্ছেন। তারপর টায়ার খুলে শোবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমি চিন্তিত ছিলাম যে স্বপ্না উপরের টায়ারে উঠবে কিভাবে? দাদা ও বৌদি আমাদের অসুবিধার কথাটি বুঝতে পেরে বললেন “আপনাদের একজন নিচের টায়ারে শুতে পারেন। আমি উপরের টায়ারে উঠতে পারব।” আমি বললাম “দাদার কষ্ট হবে।” দাদা বললেন “না, আমি এখনো অমন ভেংগে পড়ি নি। বয়স হলে কি হবে।” তারপর নিচের তিন টায়ারে তিন মহিলা শুলেন। আমরা পুরুষরা উপরের টায়ারগুলিতে শুলাম। এসির হাওয়ায় শীত শীত লাগছিল। গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টেরও পাইনি। সকালে বেড টি-র জন্য ডাক দেয়াতে ঘুম ভেংগে গেল। বেড টি খাওয়ার অভ্যাস আমার নাই। বাসী মুখে আমি কিছু খাই না। সেদিন চাংগে বসে বেড টি খেতে ভালই লাগছিল। এরপর সকালের নাস্তা এসে গেল। হেভী নাস্তা। এই যে খাবারগুলি খাওয়াচ্ছেন না, এগুলি সবই কিন্তু টিকেটের টাকায়ই। হিসাব করে দেখলাম যে খাবার খেলাম তার দাম টিকিটের দামের চেয়েও বেশী। দাদা বললেন “এই খাবারগুলি রেলমন্ত্রী লালু প্রসাদের ফার্মের।” নাস্তার পর দাদার সাথে আবার আলাপ হলো বসে বসে। জানতে পারলাম তার বাড়ি পশ্চিম বংগে হলেও সরকারী চাকরি করার কারনে তাকে বিভিন্ন প্রদেশে থাকতে হয়েছে। শুনে আমি ভাবলাম ভালোই হয়েছে ছোট দেশের নাগরিক হয়ে। আমি টাংগাইলের মানুষ, ময়মনসিংহ থেকে বদলী করেছে দিনাজপুর। তাই বলি কত দূর। হুগলি জেলার বাসিন্দা হলে কাশ্মির বদলি করলে কি করতাম? ভেবে আশ্বস্ত হলাম। দাদা বললেন
– আপনারা দিল্লী স্টেশনে গিয়ে দেখবেন ইন্ডিয়ান গভমেন্টের ট্রাভেল এজেন্সি আছে। আপনারা গভমেন্ট এজেন্সি মাধ্যমে টোর করবেন, তাতে ঠকবেন না।

ট্রেন পৌঁছে গেল দিল্লীতে দুপুর নাগাদ। দাদার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্লাটফরমে নেমে পড়লাম। মানুষ আর মানুষ। যেন ট্রেন থেকে ঢেলে দিয়েছে। সবাই চলেছে উত্তর দিকে। আমরাও চললাম উত্তর দিকে। দুই একজন ট্রাভেলের দালাল খাতির দিতে চাইল আমাদের সাথে। দাড়িওয়ালা দেখে আমার সাথে মুসলিম পরিচয় দিয়ে এক দালাল খাতির দেয়ার চেষ্টা করল। ময়মনসিংহ থেকে দালালদের চালচলন আমাদের আগে থেকেই জানা ছিল। তারপরও দালালের খপ্পরেই পড়লাম। একটা বিল্ডিং-এর ওয়ালজুরে ইয়া বড় করে ইংলিশে লিখা দেখলাম “ইন্ডিয়ান গভমেন্ট ট্রাভেল “। আমিনুল ভাই বললেন “পেয়েছি। ঐতো লিখা আছে।” দালাল বলল “আমি ওখানেই চাকরি করি।”

এরপর দেখলাম সে আমাদের চোখের সামনে দিয়েই বেশী ঘুরাফিরা করছে। সে আসলে সাইনবোর্ডটি মনোযোগ দিয়ে আমাদের পড়তে দিচ্ছিল না। সাইনবোর্ড-এ ছোট্ট করে লেখা ছিল ‘অনুমোদিত’। অর্থাৎ ইন্ডিয়ান গভমেন্ট অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্ট। ‘এজেন্ট’ কথাটাও ছোট্ট করে
লেখা ছিল। টাকা জমা দিয়ে রিসিট নেয়ার আগ পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারিনাই যে এটা একটা প্রাইভেট ট্রাভেল এজেন্ট। বুঝার পর আর বলার কিছু ছিল না। ম্যানেজারের মিষ্টি মিষ্টি কথার উপর আর কোন কথা চললো না। যাহোক, প্রাইভেট হলেও এই এজেন্সির মাধ্যমে দিল্লী, জয়পুর ও আগ্রার টোর খুব ভালোই হয়েছিল। ভালো ভালো হোটেলে রেখেছিল। সঞ্জয় নামের এক অমায়িক ড্রাইভার কাম গাইড আমাদের এই কয়দিনের সাথী ছিল। ৮ সিটের ট্রাভেল গাড়িটিও আরামদায়ক ছিল। সঞ্জয়কে আমরা ভুলবনা অনেকদিন। ভুলব না রাজধানী এক্সপ্রেসের খাবার, সহযাত্রী দাদাকে।
২৩/৭/২০১৯ ইং