রোগীর পথ্যই খেয়ে ফেললেন

রোগীর পথ্যই খেয়ে ফেললেন

(হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

অনেক অনেক দিন আগের কথা। রহিম বকস ও করিম বকস নামে অত্যন্ত চালাক চতুর দু’জন লোক ছিলেন। তারা দু’জনই মেট্রিক পাশ করেছিলেন। কোথাও বেড়াতে গেলে পাজামা পাঞ্জাবি পরে বের হতেন। গ্রামের অনেকে ধুমপান করলেও তারা ধুমপান করতেন না। তাদের পান খাবার অভ্যাসও ছিলো না। তবে বিবাহের দাওয়াত বা ফয়তার দাওয়াত খাওয়ার পরে তাদেরকে পান খেতে দেখা গেছে। তারা মাঝে মাঝেই হাসির কান্ড করে বসতেন। এজন্য সাত গ্রামের মানুষ তাদের নাম জানতেন। তাদের মধ্যে খাতির থাকলেও তারা কিন্তু একই গ্রামের মানুষ নন। রহিম বকসের বাড়ি ছিলো আড়ইংগা চালা। করিম বকসের বাড়ি ছিলো অরতকি চালা। একজনের বাড়ি থেকে আরেকজনের বাড়ির দুরুত্ব ছিল প্রায় তিন মাইল। অর্থাৎ সারে চার কিলোমিটারেরও বেশী। তারা সংসারের কাজ কর্ম তেমন করতেন না। কামলা জামলারাই শুকধান আবাদ করতো। সময় কাটাতেন একজন আরেকজনের বাড়িতে গিয়ে গল্প করে। টাঙ্গাইল গ্যাঘের দালানের সাথের সিনেমা হলে গিয়ে এক সাথে টগি দেখতেন। একে অপরের স্ত্রীকে ভাবী ডাকতেন। তবে বয়সে কে বড় ছিলো আর কে ছোট ছিলো তা কেউ বলতে পারতেন না। তাদের মধ্যে এই খাতিরের কথা সবাই জানতেন। তাদের নিয়ে অনেক মজার ঘটনা আমাদের এলাকায় শুনা যায়। তারই একটা ঘটনা আমি এখানে উল্লেখ করছি।

 

একবার এক শীতের দিনে রহিম বকসের খুব বড় এক বেরামে ধরলো। শান্তিপাত জ্বর হয়েছিলো। জ্বর মাঝে মাঝে উঠতো আবার ছেড়েও যেতো। যখন জ্বর উঠতে থাকতো শরীর থৈরালে কাঁপতো। আবার যখন শরীর ঘেমে নিচুইটা জ্বর ছেড়ে ঠান্ডায় শান্যিক উঠে যেতো। তখন চামচে তেল রসুন গরম করে বুখে পিঠে ও হাতে পায়ে মালিশ করে দিতেন রহিম ককসের স্ত্রী। তবে তাদের সন্তানাদি কি ছিলো আমার জানা নেই। এমন যাওয়াদশা অসুখের কথা শুনে তার সব আত্নীয়স্বজন দেখে গেলেন। সবাই রোগীর জন্য কিছু না কিছু পথ্য নিয়ে এসেছিলেন। আগেরদিনে জ্বরের রোগীকে ভাত খেতে দিতো না। ভাতের পরিবর্তে সুজি, জাউ, আটার নুটানি, এবারুট বার্লি ইত্যাদি খেতে দিতো। রহিম বকসের আত্নীয়স্বজনরাও রোগী দেখতে এসেছিলেন এসব পথ্য নিয়ে। রোগীর শিতানে সব পথ্য সাজিয়ে রেখেছিলেন রহিম বকসের স্ত্রী। খবর পেয়ে করিম বকসও এলেন যোহরের নামাজের জের ওয়াক্তের সময়। দোস্তকে পেয়ে রহিম বকসের একটু ভালো লাগছিলো। খাটের পাশে শিতানের দিকে একটা কারুকাজ করা কাঠের চেয়ার ছিলো। সেই চেয়ারে বসে রহিম বকস করিম বকসের সাথে কেরাই করা শুরু করলেন। কেরাই করা দু’জনেরই অভ্যাস ছিলো। করিম বকস কেরাই করে রহিম বকসকে বললেন

– দোস্ত, তোমার কপালে হাত দিয়ে দেখলাম জ্বর নাই। তুমি কি ভাব ধরছ নাকি?

– ভাব ধরমু কেন?

– এই যে তোমাকে সবাই দেখতে আসবে পাকা পেপে, ডালিম, আতাফল, কমলা ইত্যাদি নিয়ে তুমি মজা করে খাবে। তাই তো দেখছি ফল ফলাদিতে ভরে গেছে তোমার শিতান।

– বসো এখানে। শরীর খুব খারাপ। শরীর ব্যাথা করছে।

– হ, ভাবীকে দিয়ে যেনো শরীর টেপানো যায় সেই ভাব ধরছো।

– শোনো, তুমি মাইনসের সাথে কেরাই করো করোগে। আমার সাথে কেরাই করবা না।

– কেরাইর কি দেখলা? যা সত্যি তাই বলছি।

– চুপ করে বসে থাকো। নাহলে ভালো ভালো কথা বলো। কেরাই শুনতে ভালো লাগছে না।

এমনতরো কথা বলতে বলতে বেলা ডুবে গেলো। রহিম বকস করিম বকসকে বললেন

– করিম, বেলা তো ডুবে গেলো। রাস্তা অন্ধকার হয়ে যাবে। জঙ্গইলা রাস্তা। আগে ভাগেই চলে যাও। থেকে গেলে ভালো হতো। কিন্ত থাকবা যে, খাবা কি? তুমি তো আমার জন্য কিছুই নিয়ে আসোনি যে তাই তোমাকে খাওয়ায়ে দেবো। তুমি তো আবার কৃপ্টে মানুষ।

– দোস্ত, খোটা দেও কেনো। আমি জানি খালি হাতে এলে তুমি কিছু মনে করবে না। দেখো, যারা ফলফলাদি নিয়ে এসেছিলেন তারা সবাই তোমাকে ফেলে চলে গেছে। আমিই একমাত্র ব্যক্তি যা তোমাকে সময় দিচ্ছি।

– তোমার ভাবী আমাকে নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত ছিলো। তোমার জন্য কিছুই রান্না করেনি। তুমি চলেই যাও।

– দোস্ত, তুমি আমার খাওয়া নিয়ে চিন্তা করোনা। আমি তোমার শিতানের কাছে বসে বসে কথা বলেছি আর তোমার জন্য আনা মেহমানদের ফল ফলাদি খেয়ে পেট ভরেছি। আর খেতে পারবো না আজ।

– দোস্ত, নিজে তো কিছু আনলেই না, বরঞ্চ আমার পথ্যগুলোও খেয়ে ফেললে?

২৬/১১/২০২০ খ্রি.

 

শব্দার্থঃ

হাস্তর – লোক মুখে শোনা টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক গল্প

কেরাই – হেয়ালিপনা

শিতান – বালিশের পেছনের দিক

ফয়তার দাওয়াত – মৃত ব্যক্তির দোয়ার জন্য দাওয়াত খাওয়া

শুকধান – শস্য

টগী – টকিজ বা সবাক চলচ্চিত্র

বেরাম – রোগ

থৈরালে – থরথরি

নিচুইটা – সম্পুর্ণ

শান্যিক – হিম

নুটানি – পেস্ট

জের – শেষ

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/