রুগীর প্রক্সি

রুগীর প্রক্সি
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ঘটনাটা অনেকদিন আগের। ১৩/১৪ বছর তো হবেই। আমাদের গ্রাম এলাকা থেকে ময়মনসিংহে একজন লোক এলেন আমার কাছে। আমি তাকে চিনতাম না। তিনি আমাকে চিনতেন। তার বয়স ২৫ কি ২৬ বছর হবে। তিনি বললেন “আমি সৌদিআরব যেতে চাই চাকরি করতে। মেডিকেল চেক আপ-এ যেন ধরা না খাই সেজন্য চেক আপ করতে যে সব পরীক্ষা করাতে হয় সেইগুলি পরীক্ষা করায়ে দেখতে চাই। পরীক্ষায় সমস্যা না থাকলে দালালকে টাকা দেব। ” আমি তার কয়েকটি রক্তের পরীক্ষা ও বুকের এক্সরে করাতে দিলাম। দুইঘন্টা পর সবগুলি রিপোর্ট নিয়ে আমার কাছে এলেন। রক্তের রিপোর্ট ভালো। বুকের এক্সরে রিপোর্টে লিখা “নন-স্পেসিফিক ইনফেকশন।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন
– কোন সমস্যা আছে?
– রক্তে কোন সমস্যা নেই। এক্সরেতে একটু সমস্যা আছে।
– কি সমস্যা? আমার বুকে তো কোন কষ্ট নাই।
– আপনার জ্বর, কাশি, শরীর দুর্বল, এগুলি আছে?
– আমার শরীরে কোন সমস্যা নাই। তাইলে কি করা যায়?
– মেডিসিন অথবা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
– আপনিই ঔষধ লিখে দিন।
– আমি আগে ঔষধ লিখতাম। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত খুব রুগী দেখতাম। ১৯৯২ সন থেকে প্যাথলজি প্রাক্টিস করায় রুগী দেখা বাদ দিয়েছি। তবে নিজেদের আত্বীয় স্বজন ও গরীব রুগীদের অন্য কিছু কিছু প্রেসক্রিপশন করে থাকি। ল্যাবরেটরির কাজে ব্যস্ত থাকায় প্রেসক্রিপশন করতে পারি না। এক সাথে দুই কাজ করা যায় না। আপনি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখান।

আমি একজন ভাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞের নাম লিখে দিলাম। তিনি চলে গেলেন। কয়েকদিন পর আরেক লোক এলেন সেই এক্সরে নিয়ে। বললেন
– আমি এই রুগীর বড় ভাই। আপনি বলেছিলেন এই এক্সরে রিপোর্টে লাংসে সমস্যা আছে। আমার ভাই মনে করেছে এই এক্সরে দেখালে মেডিকেলে আনফিট করে দেবে। তাই, দালালের বুদ্ধি নেয়। দালাল আমার বুকের এক্সরে করায়। আমার বুকের এক্সরে রিপোর্ট ভালো। আমার এক্সরে করার সময় আমার ছোট ভাইয়ের নাম লেখায়। সেই রিপোর্ট দেখায়ে ফিট লেখায়ে দালাল তাকে বিদেশ পাঠিয়েছে। কিন্তু বিদেশ গিয়ে ভাই আমার চিস্তায় আছে। সে আমাকে ফোনে জানিয়েছে আমি যেন ডাক্তারকে এক্সরে দেখিয়ে ঔষধ লিখিয়ে লোক মার্ফৎ ঔষধ পাঠিয়ে দেই। আপনি একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে চিঠি লিখে দেন যেন তিনি প্রেসক্রিপশন করে দেন। আমি তাকে ভিজিট দেব।
– প্রেসক্রিপশন করাতে হলে রুগী লাগবে। ডাক্তার স্টেথোস্কোপ দিয়ে রুগী বুক পরীক্ষা করবেন। আরও অনেক কিছু দেখার পর প্রেসক্রিপশন করবেন।
– রুগীর তো কোন অসুবিধা নাই। রুগী দেখার কি আছে। শুধু এক্সরে দেখেই যেন ঔষধ লিখে দেন তার একটা অনুরোধ আপনার কার্ডে লিখে দেন।
– আমি রুগী ছাড়া প্রেসক্রিপশন করার অনুরোধ করতে পারব না। ধন্যবাদ। এখন আসুন।

কয়েকঘন্টা পর সেই লোক আবার এলেন। বললেন
– আমনার পরমর্শের মেডিসিন বিশেষেজ্ঞকে দিয়েই প্রেসক্রিপশন করিয়ে নিয়ে এলাম।
– রুগী ছাড়াই তিনি ঔষধ লিখলেন?
– মজার এক কান্ড করেছি। আপনার এখান থেকে বের হয়ে সামনের রাস্তা দিয়ে ঘুরছিলাম আর ঐ ডাক্তারের ডিগ্রী পরছিলাম সাইনবোর্ড-এ। দুইতিন জন লোক আমার কাছে এসে জানতে চাইলেন আমার সমস্যা কি। আমার সমস্যার কথা বলার পর তারা বললেন ‘দুইশত টাকা আমাদের দেন আমরা প্রেসক্রিপশন করিয়ে দেই’। আপনার ভিজিট ডাক্তারকে দেবেন। তাদেরকে দুইশত টাকাই দিলাম। তারা আমাকে শিখিয়ে দিলেন ‘আপনি আজ আপনার ছোট ভাইয়ের অভিনয় করবেন। এক্সরেতে যে নাম আছে সেই নাম আজ আপনার। যে বয়স লিখা আছে সেই বয়স আপনার। এখন বুঝলেন?’। ঠিক তাই করে ভিসিট দিয়ে ডাক্তার দেখায়ে প্রেসক্রিপশন করিয়ে নিয়ে এলাম।
– যারা আপনাকে এই বুদ্ধি দিয়েছেন তারা রুগির দালাল- চিটার।
– দালাল -চিটার যাই হোক। আমার কাজ হলেই হলো। আমি সৌদি থেকে কেউ এলে তার কাছে এই ঔষধ পাঠিয়ে দেব।
– ঠিক আছে। আপনি এখন আসুন।

আমি থ মেরে বসে রইলাম। ক্লাসে ছাত্রদের প্রক্সি দিতে দেখেছি, টিচারদের প্রক্সি দিতে দেখেছি, আসামীর প্রক্সি দিতে শুনেছি, স্বাক্ষীর প্রক্সি দিতে শুনেছি, স্বামী-স্ত্রীর প্রক্সি দিতে দেখেছি সিনেমায়, অভিনেতা মারা গেলেও আরেকজন অভিনেতা দিয়ে প্রক্সি দিতে দেখেছি। আজ দেখলাম রুগীর প্রক্সি দিতে।
২৭/৮/২০১৯ খ্রী