সাইফুল ইসলাম স্মরণে

সাইফুল ইসলাম স্মরণে

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

সাইফুল ইসলাম তালুকদার আমার চাচাতো ভাই ছিলো। বাবার চাচাতো ভাই রিয়াজ উদ্দিন তালুকদার ওরফে রেজু কাক্কুর ছেলে। রেজু কাক্কুর ছেলেমেয়েদের নাম হুমায়ুন, জামাল, জিন্নাহ, সাহেরা, আয়েশা, সাইফুল, রানী ও মিন্টু। হুমায়ুন ভাইকে আমি দেখিনি। আগেই মারা গেছে। রেজু কাক্কুর বাড়ি আমাদের বাড়ির সাথেই পূর্ব পাশে। আমার বড় আকবর ভাই যখন জামাল ভাইর সাথে খেলতে যেতেন তখন বলতেন হুমায়ুন ভাইগ বাড়ি যাই। এবার মারা গেলো সাইফুল। গত ৬ অক্টোবর ২০২০ খ্রি.। আরেক চাচাতো ভাই মুকুল মারা গেলো সাইফুল মারা যাওয়ার মাত্র চারদিন পরে। এমন দুজন খুব কাছের ভাই মৃত্যুবরণ করাতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। গতকাল রাত দেড়টার সময় তাদের মনে করে দীর্ঘক্ষণ আমাকে বিছানায় ছটফট করতে হয়েছে। সাইফুল মারা যাবার পরদিন মুকুলের সাথে আমার মোবাইলে কথা হয়েছিলো। মুকুল হার্ট এটাক করে ঢাকায় হাসপাতালে কেবিনে ভর্তি ছিলো। সাইফুল মুকুলের খুব প্রিয় ছিলো। তাই তার মৃত্যু সংবাদটা মুকুলকে দিতে ইচ্ছে হলো। দিলাম না। শুনে যদি আবার হার্ট এটাক করে মারা যায় ! আমার দুইজন প্রিয় মানুষ মাত্র ৪-৫ দিনের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করে। তারাও একে অপরের কাছে প্রিয় ছিলো। তারা জানতে পারলো না তার প্রিয় মানুষ মারা গেছে বা যাবে। আল্লাহ এই দুইজনকে তুমি তোমার বিশেষ ক্ষমায় ক্ষমা করে দিয়ে ওপারে সাক্ষাৎ করার ব্যবস্থা করে দাও।

 

জন্মগত ভাবেই সাইফুল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছিল বা কম বুদ্ধি সম্পন্ন ছিল। ডাক্তারি জ্ঞানে আমি মনে করি ডাউন সিন্ড্রোম ছিলো সাইফুলের। বয়স্ক মায়েদের ডাউন সিন্ড্রোম নিয়ে বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবণা বেশী থাকে। ওর জন্ম হওয়ার সময় কাক্কির বয়স একটু বেশীই ছিলো। ছোট বেলায়ই লক্ষ্য করা গেছে ওর কথা স্পষ্ট হয় না। অযথা হাসে। সামান্য অসাভাবিক আচরন করে। বয়স বাড়ছে। সে তুলনায় বুদ্ধি বাড়ছে না। তাই তাকে অনেকে তাচ্ছিল্য করে ডাকতো – সাইফুল পাগলা, সাইকুল, সাইকল। অনেকে তাকে ব্যবহার করে দুষ্টামি করাতো। কারন, পাগলের দুষ্টামি মাফ। তাকে কানে কানে বলা হতো “সাইফুল, অমুকের পিছনে গিয়ে লুঙ্গি উচা করে ধরগা।” সাইফুল তাই করতো। অন্যকেউ এমন কাজ করলে থাপ্পড় খেতো। সাইফুল পাগলা বলে তার গায় কেউ হাত তোলেনি। তালুকদার বাড়ির সবাই সাইফুলকে আদর করতো। বেশী সময় সে শান্ত হয়ে বসে থাকতো। সবাই যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। আমি কাজ করতাম না। বই নিয়ে বসে থাকতাম। আমার পড়ার স্টাইল ছিল অন্য রকম। ঘরের ভেতর বসে না পড়ে বারান্দায় জলচৌকিতে বসে, উঠানে পাটি বিছিয়ে, গাছের নিচে ঘোড়া কাঠে, গাছের শিকরে বসে বা শুয়ে, গাছের ডালে বসে বা শুয়ে, অথবা বাছ্রা ক্ষেতে শুয়ে শুয়ে পড়তাম। সাইফুল আমার পাশেই নিটালে বসে থাকতো। কোন কোন সময় বইয়ের পাতা উল্টিয়ে ছবি দেখতো। আমার সাথে কোনো আকাম করতো না। ধরতে গেলে সাইফুল আমার নিত্য দিনের সঙ্গী ছিলো। আমি আমার সমস্ত দরদ ঢেলে দিয়ে সাইফুলকে আদর করতাম।

 

ছোট ছোট পোলাপান, যারা মোটামুটি হাটতে শিখেছে তাদেরকে বাড়ির সবাই কোলে কাকে নিতো। মোতালেব ভাই, বাশার ভাই আমার ৮-১০ বছরের বড়। তারা পোলাপান নিয়ে মজা করতেন। কাধে নিয়ে ঘ্যাগ ঘ্যাগ করতেন। হাতের তালুতে দাড় করিয়ে মাথার উপর ধরে বলতেন “থির থির (স্থির স্থির)।” মাথার দুপাশে দু’হাতে চেপে ধরে উচু করে পোলাপানের নানির বাড়ির দিকে ঘুরে বলতেন “ঐ যে দেখো তোমার নানির বাড়ি।” সাইফুলের নানির বাড়ি বইলারপুর। আমাদের বাড়ি থেকে পশ্চিম দিকে। সাইফুল তখন হাটে। আমি বাইরবাড়ির কাঁঠাল গাছ তলার ঘোড়া কাঠে বসে পড়ছিলাম। সাইফুল হাটতে হাটতে আমার কাছে এলো আমি তাকে ঘোড়া কাঠের উপর দাড় করালাম। খুশিতে হেসে দিলো। আমি ঘোড়া কাঠের উপর দাড়ালাম। সাইফুলের মাথার দু’পাশে দু’হাতে চেপে ধরে উচু করে পশ্চিম দিকে মুখ করে বললাম “ঐ যে দেহ তোমার নানি বাড়ি।” কিছুক্ষণ ধরে নানিবাড়ি দেখানোর পর মাটিতে দাড় করিয়ে দিলাম। সাইফুল মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে উঠে পড়লো। হেসে দিলো। আমি বেঁচে গেলাম। তারপর থেকে কেউ কাউকে নানিবাড়ি দেখাতে দেখলে আমি খুব রাগ করি। এবং এর ক্ষতিকর দিক বুঝিয়ে বলি।

সাইফুল ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। কাজ কর্ম তেমন করতে পারেনা। নিজে বুদ্ধি করে কিছু করতে পারে না। বড়রা কেউ ফরমায়েশ দিলে কোন সময় করে, কোন সময় করে না। যদি কাক্কু বলেন “সাইফুল বাজান, গরুগুলারে হাচার দেও ছে।” তাইলে সে হাচার দেবে। যদি বলেন “সাইফুল, গরুর জন্য চারডা ঘাস কাটোছে।” তাইলে সে ঘাস কাটবে। সাইফুল শরীরের যত্ন তেমন নিতো না। দাঁত মাঁজতো না। জামা গায় বেশী দিতো না। দিলেও উচু নিচু করে বোতাম লাগাতো। অল্প বয়সেই বিড়ি খাওয়ার নেশা হয় তার। বড়দের বিড়ির পুটকি তুলে খেয়ে তার বিড়ির নেশায় ধরে। পড়ে কাক্কু তাকে বিড়ি কিনে দিতে বাধ্য হন। সবার যত্নে সে বড় হতে হতে যৌবনপ্রাপ্ত হয়। কাক্কু তার জন্য একটা বউ এনে দেন। অল্পদিন পরই সেই বউ তাকে ছেড়ে চলে যায়। এমন বোকা স্বামীর সাথে কে সংসার করবে? কাক্কু সাইফুলের জন্য গরীব ঘর থেকে আরেকটি বউ এনে দেন। আমি শুনেছি কেউ কেউ এই বউয়ের সমালোচনা করতে। আমি তাদের বুঝিয়েছি “দেখ, বউয়ের বাপ নিশ্চয়ই অভাবী। তা না হলে এমন বোকা সোকা পোলার কাছে কেউ মেয়ে বিয়ে দেয়? সাবধান, সাইফুল ছেলে মানুষ। ওর একটা বউ লাগবেই। এক বউ চলে গেছে। এই বউ যাতে চলে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বউ খুব অসহায় মেয়ে। ছোট খাটো দোষ থাকলেও তা না ধরে তাকে পাগলার সাথে সংসার করতে দাও। আলহামদুলিল্লাহ, সেই বউ টিকেছে। তিনজন বাচ্চা উপহার দিয়েছে। সাইফুলের ছোট ভাই মিন্টু বিদেশে চাকরি করে বেশ টাকা কামিয়েছে। মিয়া কাক্কু মাদবরি করে মিন্টুকে দিয়ে সাইফুলের জন্য চার ভিটায় চারটি টিনের ঘর বানিয়ে পৃথক বাড়ি করে দিয়েছে। বউটা ভালোই সংসার করছে। তার প্রথম ছেলে হয়। নাম রাখে ইব্রাহিম। আমি ইব্রাহিমকে আদর করতাম। বাড়িতে গেলে ইব্রাহিমের জন্য আলাদা করে কিছু নিয়ে যেতাম। দেখতে সুন্দর ছিল। ভাবতাম এই ছেলের উছিলায় বউটা টিকে যাবে। একটু বড় হলেই সংসারের হাল ধরতে পারবে। মায়ের সুখ হবে। আল্লাহর কি ইচ্ছে হলো, ইব্রাহিমকে নিয়ে নিলো। নানার সাথে মাছ ধরতে গিয়ে পুকুরের পানিতে পড়ে মাত্র তিন-চার বছর বয়সে মারা গেলো। সেই ছেলেকে মুকুলও খুব স্নেহ করতো। মৃত্যু সংবাদ শুনা মাত্র মুকুল আমাকে ফোন দেয়। ছুটে আসে ঢাকা থেকে ইব্রাহিমকে দাফন করতে। সবাই মিলে চান্দা তুলে তার জন্য খরচ করে দেয়। আমি খুব সম্ভব দিবাজপুর ছিলাম। আসতে পারিনি। ইব্রাহিমের জন্য মুকুলকে অনেকদিন আফসোস করতে শুনেছি। ইব্রাহিম মারা যাবার পর সাইফুলের স্বাস্থ্য ভেংগে পড়ে। তাকে আমাদের কাঠাল গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে আকাশের দিকে হা করে বিমর্ষ হয়ে অনেকদিন বসে থাকতে দেখেছি। আমি বুঝতে পারতাম পাগলা তার ছেলে ইব্রাহিমকে মিস করছে। বেঁচে থাকলে আজ সাইফুলের কাধের উপর দিয়ে শরীর ঘষাঘষি করতো। আমার দুই কারনে কষ্ট হতো। এক ইব্রাহিমকে মিস করতাম বলে। দুই, ইব্রাহিমকে হারিয়ে সাইফুল যে কষ্ট পাচ্ছে তার জন্যে। এখন রইলো শুধু তার মেয়ে সাদিয়া। সাদিয়া দেখতে সুন্দর হয়েছে। কিছুদিন পর সাইফুলের আরেক ছেলে হয়। আল্লাহ যেনো ইব্রাহিমের পরিবর্তে আরেক ছেলে দিলেন। এই ছেলেও বেস চটপটে হয়েছে। আল্লাহ যদি মানুষ করে এই ছেলের উছিলায় সাইফুলের বউ সুখ পাবে। এই ছেলেটাও এখন বেশ বড় হয়েছে, ৮-৯ বছর বয়স তো হবেই। কাক্কু বেঁচে থাকতেই একবার দুই চোখে ছানি পড়ে অন্ধ হয়ে গেছিলো সাইফুল। ডাউন সিন্ড্রোম রোগীদের অল্প বয়সেই চোখে ছানি পড়তে পারে। কাক্কু সাইফুলকে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করে অপারেশন করিয়ে আনেন। সবাই চিন্তা করতো কাক্কু মারা গেলে সাইফুলকে কে দেখবে? কাক্কু মরে গেলে সাইফুলের সমস্যা হয়নি। মিয়া কাক্কু মাদবরি করে সাইফুলের পাওনা অংশ জমি ভাগ করে দিয়েছেন। সাইফুলের বউ সেই জমিতে শস্য আবাদ করে খাওয়া খরচ চালিয়ে নিচ্ছে চার জনের সংসারের। মাটি কুপিয়ে হলুদ-কচু আবাদ করে। জমি বর্গা দেয়। টাকা জমিয়ে ব্যাবসায় খাটিয়েছে। একজনের কাছে তিন লাখ খাটিয়েছে। সংসারে খাবারের অভাব নেই। অভাব ছিলো শুধু সাইফুলের। ও, আরেকটা কথা। কাক্কু মারা যাওয়ার পর সাইফুল খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। তীব্র রক্তশুন্যতা হয়ে শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যায়। আমি মনে করেছিলাম ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। কারন, ডাউন সিন্ড্রোম রোগীদের ব্লাড ক্যান্সার হবারও সম্ভাবনা আছে। জামাল ভাই সাইফুলকে নিয়ে ময়মনসিংহ আসেন। পরীক্ষা করে দেখা গেলো পেপটিক আলসার হয়েছে। সেখান থেকে রক্তক্ষরণ হয়ে রক্ত শুণ্যতা হয়েছে। সেই থেকে সাইফুল পুরাপুরি অসুস্থ ছিলো। নিয়ম মতো খেতে পারতো না। নিয়ম মতো ঔষধ খেতে পারতো না। কামাই করতে না পারায় পরিবারেও হয়তো অবহেলিত ছিলো। আমরা যারা দূরে থাকি তারা দুচারদিন থেকেই চলে আসি। সাইফুলের জন্য তেমন কিছু করতে পারিনি। বাড়ি গেলে সাইফুলই প্রথম এগিয়ে আসতো। হা করে হাসি মুখে বলতো “ভাই, কিবা আছুন? কবে যাবাইনগা।” আমার স্ত্রী স্বপনা সাথে না নিয়ে গেলে বলতো “ভাবীরে নিয়া আইলান না?” সাথে তার বাচ্চারাও আসতো। আমি বাড়ির জন্য খাবার জিনিসের প্যাকেট নিয়ে যাই পোলাপানদের জন্য। পোলাপানরা এগুলোকে বলে মজা। বড়রা বলে আবিজাবি। আমি গুণে গুণে সব পোলাপানের জন্য আবিজাবি নিয়ে যাই। সাইফুলকেও পোলাপানের মধেই হিসাব করতাম। সাইফুলের হাতে এক প্যাকেট দিলে সে তার পোলাপানের নাম ধরে ধরে প্যাকেট নিতো অথবা পোলাপানের হাতে দিতো। যাবার সময় আরেক প্যাকেট চেয়ে নিতো তার বউয়ের জন্য। আমিও হিসাব করে কিনতাম তার বউয়ের জন্যও। জানতাম পাগলা তার বউয়ের জন্যও এক প্যাকেট নিবে। সাইফুল আমার আশপাশ দিয়েই ঘুরাঘুরি করতো যতদিন আমি বাড়ি থাকতাম। আমি বারান্দায় বসে পাড়ায় থেকে আগত রোগী দেখতাম। সাইফুল কাছেই বসে থাকতো কাঠাল গাছটার শিকরে। আকাশের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতো। মাঝে মাঝে ডাক দিয়ে উঠতো ছেলে মেয়েদের নাম ধরে। কখনো ডাক দিতো ইব্রাহিম বলে, কখনো সাদিয়া বলে আবার কখনো বা সুফল বলে ডাক দেয়। কখনো বা শুধু গেদা বা গেদি বলে ডাক দেয়। ইব্রাহিম মারা যাবার পর সাইফুলের স্বাস্থ্য একদম ভেংগে পরেছিলো। তখন তাকে বেশী আনমনা দেখেছি। মাঝে মাঝে বলে উঠতো “ভাই, আমগো ইব্রাহিমের জন্য নামাজ পইড়া দোয়া করবাইন।” আমি বুঝতে পারতাম ইব্রাহিমকে সে খুব মিস করে। মাঝে মাঝে দু’হাতে তার পেটের নাভির কাছে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করতে দেখেছি। আমি বুঝতে পারতাম তার পেটে পেপটিক আলসারের তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। আমি মান্নানকে দিয়ে ঔষধ আনিয়ে সাইফুলকে দিতাম। বউ বলতো পেটের ব্যাথায় সারারাত ছটফট করে। আপনের ঔষধ যতদিন খায় ততদিন চারডা চারডা খাবার পারে। পেটের ব্যথাও থাকে। যতবার বাড়ি যেতাম ততবারই কয়েক মাসের জন্য ঔষধ কিনে দেয়ার চেষ্টা করতাম।

 

 

বেশ কয়েকবছর আগে থেকে সাইফুলের আচরণে নতুন একটি সিম্পটম দেখা দেয়। সাইফুল এদিকসেদিক তাকিয়ে কেউ যেন দেখতে না পায় এমন পরিবেশে ফিসফিস করে অথবা ইশারায় এক আঙ্গুল খারা করে বুঝায় “ভাই, একশ টাকা দেইন।”

– কি করবে?

– ঔষধ কিনমু?

– ঔষধ আমি কিন্না দিমু।

– মজা খামু।

– তোমার বউয়ে দেয় না?

– না, দেয় না।

 

 

আমি গোপনে সাইফুলকে টাকা দিতাম। দেখলাম টাকা নিতে তার আত্বসম্মানে লাগছে। তাই এভাবে টাকা চাচ্ছে। বেশ কিছু দিন আমি এভাবে টাকা দিতাম। আমি ভাবতাম মজা খেতে ইচ্ছে করে খাক। সবাই চৌরাস্তার মোড়ে বসে চা খায়, পাউরুটি খায়, গজা খায়, খোরমা খায়। সবার ছেলেপেলেরা বিদেশে চাকরি করে। বাবার জন্য টাকা পাঠায়। সেই টাকায় মজা খায়, চা খায়, গল্প করে। সাইফুলেরও মন চায় মজা খেতে, চা খেতে। তাই দেই। আমি একদিন লক্ষ্য করলাম সাইফুল মুকুলের সাথেও সেইভাবে ইশারায় কথা বলছে। আমার সন্দেহ হলো মুকুলও সাইফুলকে গোপনে টাকা দেয়। আমি মুকুলকে জিজ্ঞেস করলাম “সাইফুল কি তোমার কাছে টাকা চায়?”

– না, ভাই। কেন?

– আমার সন্দেহ হয়।

– কেন?

– কেমন যেনো ইশারায় কথা বলে।

– কেন, আপনের কাছে চায় নাকি?

– এই জন্যই তো আমার সন্দেহ হয়।

– ঠিকই ধরছুন, ভাই।

 

এবার দুজনই খোলাসা করে বললাম। জানা গেলো আমার চেয়ে মুকুলই বেশী দেয়। কারন মুকুল ঘন ঘন বাড়ি আসে। আমি আরও লক্ষ্য করলাম সাইফুল আমার স্ত্রী স্বপ্নার সাথে কিছুটা ইশারায় কথা বলে। আমি জিজ্ঞেস করলাম “সাইফুল কি তোমার কাছে টাকা চায়।” স্বপ্না কখনো মিথ্যা কথা বলে না। ইতস্তত করলো। আমি বললাম “আমি বুজতে পারছি সে তোমার কাছে টাকা চায়।” স্বপ্না বললো “তুমি আবার ওকে কিছু বলতে যেও না। পাগল হলেও ওর আত্বসম্মান আছে। ওর হয়তো হাবিজাবি খেতে ইচ্ছে করে। তাই ভাবীর কাছে চেয়ে নিয়েছে। তাকে কিছু বলো না।” এবার সব ফাস হয়ে গেলো। তিন চোরায়ই চুপি চুপি সাইফুলকে টাকা দিয়ে যাচ্ছি মজা খাওয়ার জন্য। যতই তিন যেতে লাগলো সাইফুলের টাকা চাওয়ার মাত্রা ও পরিমাণ বাড়তে লাগলো এই তিন জনের কাছেই। তিন জনই সাইফুলকে খুব ভালোবাসি। প্রথম দিকে বাড়িতে যেদিন যেতাম সেদিন টাকা চাইতো। তার পরের দিকে প্রথম দিন ও শেষের দিন। তারপরের দিকে অন্তত তিন চার বার। না দিলে পিছ ছাড়তো না। নুরুল আমিন বলে “মামু, আপনেরা মনে হয় পাগলারে টাকা দেইন। সেই টাকা যতক্ষণ শেষ না হয়, ততক্ষণ বিড়ি আর মজা খায় দোকানে বসে বসে।” আমি দেড়িতে বাড়ি যেতাম বলে ভাতিজা বউ হালিমার কাছে টাকা দিয়ে আসতাম কিস্তিতে সাইফুলকে টাকা দেওয়ার জন্য যাতে সে ঔষধ কিনে খেতে পারে। কিন্তু সে হালিমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঔষধ না কিনে মজা ও বিড়ি খেয়ে শেষ করতো। সাইফুল তার সব টাকা লুঙ্গির কোছে রাখতো। কোছে টাকা না থাকলে তার মাথা গরম হয়ে যেতো। একবার স্বপনা দিলো ১০০০ টাকার নোট। আমি দিলাম ৫০০ টাকার নোট। তার আগেরদিন দিয়েছিলাম ২০০ টাকা। সবাই বলতো সাইফুল একদিনেই সব টাকা খেয়ে ফেলে। সেটা টেস্ট করার জন্য দু’দিন পর আমি সাইফুলকে বললাম “তোমার কাছে একহাজার ও পাচশত টাকার নোট আছে। দোকানে মজা কেনার সময় অনেকে দেখে ফেলতে পারে। নোটগুলো দেও ভাংতি টাকা দেই।” সাইফুল কোছ থেকে নোট বের করার সময় দেখলাম আমাদের দেয়া নোটগুলো রয়ে গেছে। সাথে আরও অনেক টাকা আছে। আমি বললাম “এত টাকা কোছে রাখো?” সাইফুল বললো “জাউরাডায় নিয়া জায়গা।” আমি সুফলের হাতেও কিছু নগদ টাকা দিতাম নিজের পছন্দের কিছু খাওয়ার জন্য। সেই টাকাও সাইফুল কেরে নেয়ার চেষ্টা করতো। আমার মনে হয় মুকুল আমার চেয়েও বেশী দিতো। আমি গত ফেব্রুয়ারিতে বাড়ি গিয়েছিলাম এম পি জোয়ারের ভাইর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। সেবারই সাইফুলের সাথে আমার শেষ দেখা। সেবার খুব শুকিয়ে গিয়েছিল সাইফুলের শরীর। আমার আশংকা হয়েছিল সাইফুল হয়তো আর বাঁচবে না। তাকে খুব দুর্বল দেখেছি। দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আরেকবার এসে তাকে পাবো কিনা সন্দেহ হলো। এবার দুইদিনে সে তিনবার টাকা চেয়েছিলো। আমি তিনবারই একটু বেশী করে দিয়েছি। কে যেনো বলল “পাগলা তালুকদার বংশের ইজ্জত মাইরা ফালাইছে। প্যান্ট শার্ট পরা কোন আত্বীয় আসলে তার কাছে টাকা চেয়ে বসে।” শুনে আমি কোন মন্তব্য করিনি। বুকের ভেতর কষ্ট পেয়েছি। করোনাকালীন সময়ে বাড়ি যাইনি। সেই ফেব্রুয়ারিতে বাড়ি গিয়েছিলাম। মুকুল ঈদুল আজহায় গিয়েছিল। আমার যাওয়াও হয়নি। সাইফুলকে টাকা দেওয়াও হয়নি। গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬ টায় সাইফুল ইন্তেকাল করে। ১৭ মিনিট পরেই আমাকে ফোনে জানায়। আমি ফেইসবুকে তার মৃত্যু সংবাদ প্রচার করি। মুকুলকে জানালাম না। কারন, তার হার্ট এটাক করেছে। ঢাকায় হাসপাতালে ভর্তি। সেও ৪ দিন পর ইন্তেকাল করেছে। মৃত্যুর আগে সেও জেনে যেতে পারেনি যে তার প্রিয় সাইফুল ইসলাম তালুকদার ইন্তেকাল করেছে। আমি সাথে সাথে স্বপ্নাকে জানিয়েছিলাম। ৭ তারিখ সকালে সাইফুলকে দাফন করা হয়। সেদিন সকাল থেকে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। কবরে পানি উঠে পরেছিলো। জানাজায় কম লোক হয়েছিলো। বৃষ্টির দিনে আমাদের গ্রামের আঠালো কর্দমাক্ত রাস্তায় চলাচল করা যায় না। এই ভয়ে আমি বাড়ি যাইনি। এটা আমার জন্য কত যে কষ্টের! তবে মুকুল সুস্থ থাকলে মৃত্যু সংবাদ শুনে ঠিকই ছুটে আসতো। আমার প্রিয় এই দুই ভাই চার দিনের ব্যাবধানে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। আল্লাহ ওদেরকে আবার একাত্র করে দিন।

 

সাইফুলের চাহনিটা ছিল বিশেষ রকম। সে হা করে হাসিমুখে আমার চোখের দিকে চেয়ে থাকতো। বাড়িতে প্রবেশ ককরার সাথে সে এসে হাজির হতো। বিদায়ের দময়ও সে হাজির থাকতো। আবার কবে আসবো তাও জানতে চাইতো।

 

মুকুলকে দাফন করতে গিয়ে আমি সাইফুলের করব জিয়ারত করি। তার মৃত্যু নিয়ে আমি কিছু তথ্য জানতে পাই নিম্নরূপ। সাইফুল এবার খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে সব বোনের বাড়ি যায় কষ্ট করে। শেষে যায় ছোট বোন গাঙ্গাইরের রানীদের বাড়ি। রানী তাকে বলে “আপনে এত অসুস্থ শরীর নিয়া আইলান কিবায়?” সাইফুল বলে “আমি আইছি তগ বাইত্তে আসের মাংস দিয়া চারডা ভাত খাইতে।” রানী তাকে রান্না করা গরুর মাংস দিয়ে পেট ভরে ভাত খাওয়ায়ে দেয়। আর হাসটি সাইফুল নিয়ে আসে বাড়িতে। বউয়ে রান্না করে দেয় সেই হাস। ৬ তারিখ বিকেলে হঠাৎ সাইফুলের বউ কান্নাকাটি করে বলে “দুধ নিয়া আহগো, সাদিয়ার বাপে কিবা জানি করতাছে। হালিমা চিন্তা করে গাই পানাইতে গেলে দেরী হয়ে যাবে। তাই, আফরাদকে পাঠায় ঐ বাড়ি থেকে পানাইন্না দুধ নিয়ে আসতে। হালিমা দৌড়ে সাইফুলের কাছে গিয়ে দেখে সাইফুল মরে যাচ্ছে। বড় বড় করে তাকাচ্ছে। সাইফুলকে কালেমা বলায়। তারপর সুরা হাসর পড়ে হালিমা। আফরাদ দুধ নিয়ে আসে। কয়েক ঢোক দুধ গিলে সাইফুল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। সাইফুল পাগলা হলেও সারাজীবন নামাজ পড়তো মসজিদে গিয়ে। কালেমা পড়ে আমাদের আদরের ভাইটির মৃত্যু হয়েছে।

এবারের বাড়ি যাওয়াটা আমার অন্য রকম হয়েছে। মুকুলের মৃত্যু উপলক্ষে বাড়ি যাওয়াতে পোলাপানের জন্য হাবিজাবি কিনতে ভুলে গেছি। বাড়ির উঠানে পাড়া দিতে যে সাইফুল হা করে হেসে এগিয়ে আসতো সেই সাইফুল নেই। সুফলও কাছে আসেনি। সাইফুলের বাড়ি গিয়ে সাদিয়াকে পেলাম। দেখলাম সেও বড় হয়ে গেছে। লজ্জা পাচ্ছে আমাকে দেখে। জিজ্ঞেস করলাম ” সাদিয়া, কোন ক্লাসে পড়ো।” অনেক্ষণ চুপ করে থেকে বলে “পড়া বাদ দিছি।” কেনো বাদ দিছে আর জিজ্ঞেস করবার সাহস পেলাম না। বয়স প্রায় ১৪ বছর। মায়ের সাথে হলুদ, মরিচ, বেগুন, কচু ক্ষেতে কাজ করে। মায় সুকধান আবাদ করে টাকা জমাইয়া ৩ লাখ টাকা শেয়ারে ব্যবসায় খাটায়েছে শুনলাম। ইনশা আল্লাহ চালিয়ে নিবে আল্লাহয়। সুফল এখন ৯ বছরের ডানপিঠে ছেলে। দেখলাম চিল্লাচিল্লি করে খেলা করছে। আল্লাহ এই ছেলের মাধ্যমে সাইফুলের সংসারে অভাব দূর করে সুখে রাখুন।

 

বিদায়ের সময় সাইফুলকে মিস করলাম। রাস্তায় বউকে পেলাম। বললাম “হালিমার কাছে কিছু টাকা দিয়ে গেছি সাদিয়া ও সুফলকে কিছু কিনে দিও। ধৈর্য ধরবে। আল্লাহ ভালো করবেন।” সাইফুলের বউ দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে কেদে ফেললো।

২৫/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/