আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমাদের ঘোনারচালা প্রাইমারী স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতে দেখি নি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেছি হাই স্কুলে গিয়ে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অটোপ্রমোশন নিয়ে ক্লাস সিক্স-এ ভর্তি হই কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে ১৯৭২ সনের প্রথম দিকে। বাংলা পড়াতেন মাওলানা সালাউদ্দিন স্যার। তিনি ধর্ম বিষয়ে লেখাপড়া করলেও ধর্ম বিষয় পড়াতেন না। ধর্ম বিষয় পড়াতেন ইনসান স্যার এবং আব্দুল্লাহ স্যার। মাওলানা স্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পছন্দ করতেন। স্কুলে ছাত্র সংসদ ছিল। ছিল ভিপি, জিএস, সাংস্কৃতিক সম্পাদক। প্রতি বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টার পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। ক্লাস রুমের পার্টিশন খুলে দিয়ে রুম বড় করে হল রুম বানিয়ে আমরা অনুষ্ঠান করতাম। প্রতি বুধবার সাংস্কৃতিক সম্পাদক একটা হাফ খাতা হাতে নিয়ে ক্লাসরুমের সামনে এসে বলতেন
– ম্যা আই কাম ইন, স্যার?
– কাম ইন।
– স্যার, একটা নোটিশ পড়ে শুনাবো।
– পড়।
– এত দ্বারা কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলের সকল ছাত্রছাত্রীদের জানানো যাচ্ছে যে আগামী বৃহস্পতিবার সকাল ১১ ঘটিকায় অত্র স্কুলে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। উক্ত অনুষ্ঠানে সকলকে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করা হল।

শুনে আমরা উৎফুল্ল হতাম। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম আমার চাচাতো ভাই মোয়াজ্জেম হোসেন দুলাল ভাই তখন ক্লাস নাইনে পড়তেন। সেই সময় তিনি সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ইলেকশন করেছিলেন। আমরা রাত জেগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রদের কাছে দুলাল ভাইর জন্য ভোট চাইতাম। দুলাল ভাইর চেহারা নায়করাজ রাজ্জাকের মত ছিল কিছুটা। নায়ক রাজের কোকরা চুল ছিল। খারা করে আচরাতেন। দুলাল ভাইর চুল কোকরা না হলেও হাতের তালু দিয়ে ঘষে কোকরা করে খাড়াভাবে আচরাতেন। নায়ক রাজের মতো সাদা খাটো পাঞ্জাবী পড়তেন। তাই অনেকের কাছে প্রিয় ফিগার ছিলেন দুলাল ভাই। নিজের ভাই ইলেকশনে দাঁড়িয়েছেন। উঠতে পাড়লে সাংস্কৃতিক সম্পাদক। অন্যরকম অনুভুতি ছিল আমার। দুলাল ভাই বিপুল ভোটে জিতে গেলেন। জি এস হলেন কালিয়ার হাসমত ভাই। ভিপি কে হলেন মনে করতে পারছি না।

দেশ স্বাধীন হয়েছে মাত্র। সবার মনে দেশ প্রেমের গান। ছিল মুক্তি যুদ্ধের গান। ছিল বীরত্বের কবিতা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন সাংস্কৃতিক সম্পাদক। মাওলানা স্যার সার্বিক দেখাশুনা করতেন। সভাপতি হিসাবে প্রধান শিক্ষক আব্দুল আজিজ স্যার চেয়ারে বসে মুস্কি মুস্কি হেসে অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন। অনুষ্ঠানের শেষে তিনি সংস্কৃতি নিয়ে জ্ঞান-গর্ভ আলোচনা করতেন। প্রশংসা করতেন যারা ভালো পারফর্ম করেছে তাদের। যারা যেখানে উচ্চারণ ভুল করেছে সেখানে উচ্চারণ কি হবে তা বুঝিয়ে দিতেন। যেমন “মনে” উচ্চারণ হবে না, হবে “মোনে।”

আমাদের ক্লাসে ফার্স্টবয় ছিল ফজলু। আমার সাথেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ভর্তি হয়েছিল। মেডিকেল লাইফ তার ভালো লাগে নি। পরের বছর সে বুয়েটে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হয়। এখন সে ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল হক । ঢাকায় থাকে। ফার্স্টবয়কে সবাই বেশী গুরত্ব দিতো। তাই সবাই ফার্স্ট হতে চাইতো। চাইতে চাইতেই সবাই ভালো ছাত্র হয়ে যেতো। ফার্স্টবয়রা যাই করতো তাই ভালো লাগতো সবার কাছে। ফজলু মোটামুটি ভালো ফুটবল খেলতে পাড়তো। তার চেয়েও ভালো খেলোয়ার ছিল স্কুলে। কিন্তু ফজলুর পায়ে বল গেলেই দর্শকরা “ফজলু ভাই, ফজলু ভাই” বলে তালি দিতো। তালি পেয়ে ফজলু জীবন মরন ত্যাগ করে বল নিয়ে দৌঁড়াতো। ফজলুর গানের কন্ঠটা ভাল ছিল। গলাটা আরেকটু ঘাঢ় করে শিল্পী  আব্দুল জব্বার হতে চাইতো। গাইতো “সালাম, সালাম, হাজার সালাম। শহীদ ভাইয়ের স্মরণে আমার এ গান রেখে যেতে চাই তাদের স্মৃতির স্মরণে।।” আমরা বলতাম “ওয়ান মোর, ওয়ান মোর।” উৎসাহ পেয়ে ফজলু গাইত জাতীয় সংগীত গান হিসাবে। এই সংগীত ফজলুর কন্ঠে খুব ভালো লাগতো।

আমাদের এক বছরের বড় কালিয়ার বাকী ভাই খুব ভালো পল্লীগীতি গাইতেন। অনুষ্ঠানের শেষের দিকে বাকী ভাইকে গাইতে দেয়া হতো। বাকী ভাই আব্দুল আলীমের পল্লিগীতির বই মুখস্থ করে ফেলেছিলেন। তিনি এক নাগারে ১০-১২ টা পল্লীগীতি গাইতেন। কেউ বিরক্ত হতো না। বাকী ভাইর বড় ভাই বারী স্যার তখন চাকরি করতেন না। তিনি আমাদের অনুষ্ঠানে এসে হারমোনিয়াম বাজাতেন। বেশ কয়েকজন হার্মোনিয়াম বাজাতে পারতেন। আমি অনেক গান গাইতে পারতাম। কিন্তু বেশী লোকের সামনে পারতাম না। বনে জংগলে ও নির্জনে অনেক গান গাইতাম। তাই, হাই স্কুলে আমার গান গাওয়া হয় নি। তবে কলেজে গিয়ে আমি গান গেয়ে ৪টি বিষয়ে পুরস্কার পেয়েছিলাম। তার মানে গানে আমার প্রতিভা ছিল।

ক্লাস সেভেন থেকেই ফজলু হাটাজোর বিএম হাই স্কুলে চলে যায়। আমি যাই ক্লাস নাইনে উঠে। ওখানেও প্রতি বৃহস্পতিবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। ফজলু গান, কবিতা ও সংবাদপাঠ করতো। ওখানে বিল্লাল স্যার আমাদের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পড়াতেন। স্যারের ইংলিশ উচ্চারণ ভালো ছিলো। ফজলুরও উচ্চারণ ভালো ছিল। চিবিয়ে চিবিয়ে ইংলিশ উচ্চারণ করতো। তাই, বিল্লাল স্যার ফজলুকে বেশী স্নেহ করতেন। আমার তাতে খারাপ লাগতো। ফজলু অনুষ্ঠানে ইংলিশে সংবাদ পাঠ করতো। ভালো লাগতো কিন্তু বুঝবার চেষ্টা করতাম না। মনে হতো যেনো রেডিওতে সংবাদ পাঠ হচ্ছে। ওখানে গিয়ে আমিও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা শুরু করলাম। আমি বাংলায় সংবাদ রচনা করে অনুষ্ঠানে পাঠ করতাম। বাংলায় হওয়াতে আমি ভালো তালি পেলাম। আমার আগ্রহ বেড়ে গেলো। তখন খুব রেডিও শুনতাম। রেডিওর সংবাদ নকল করতাম। রেডিওতে নিখোঁজ সংবাদ পাঠ করা হতো। আমি সেটা নকল করে অনুষ্ঠানে নিখোঁজ সংবাদ পাঠ করতাম। হারানো ছেলে হিসাবে আমাদের বন্ধুর নাম বলতাম। বলতাম এই ভাবে “একটি নিখোঁজ সংবাদ। খোরশেদ নামে ১৪ বছরের একটি ছেলে বাটাজোর বিএম হাই স্কুলের পিছন থেকে হারিয়ে গেছে। তার পরনে ছিল আকাশী রংগের হাফ শার্ট। হাসলে তার গালে টোল পড়ে। তার কোন সন্ধান পেলে তার ক্লাসমেট সাইফুল্লাহ ওরফে আছিরের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।” শুনে দর্শক শ্রোতারা খুব হাত তালি দিতো। আমি আরও কিছু উপহার দিতে আগ্রহ বোধ করতাম।

সেকালে আমাদের এলাকার বনাঞ্চলে অনেক আদিবাসী উপজাতি বাস করতেন। বেশীভাগই ছিল বংশী ও মান্দাই সম্প্রদায়ের। বন্য পশু ও আলু তাদের অনেকের প্রধান খাদ্য ছিল। তারা দল বেঁধে বন্য আলু তোলতো। দল বেঁধে বন্য শুকুর শিকার করতো। রাতে ঝোপ ঝাড়ে ওৎ পেতে বসে নেট তিয়ে বন্য খরগোশ শিকার করতো। রেডিওতে আবহাওয়ার সতর্ক সংবাদ প্রচাতিত হতো এই ভাবে “একটি বিশেষ সংবাদ। বংগপোসাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টির কারনে কক্সবাজার ও দক্ষিনাঞ্চলের উপকুলীয় স্থানের উপর দিয়ে ১০০ মাইলের অধিক বেগে ঝড় ও দমকাহাওয়া বয়ে যেতে পাড়ে। এইসব অঞ্চলের নৌকা ও মাছ ধরার ট্রলার নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। এইসব নদী বন্দরগুলিতে আবহাওয়ার ৯ নম্বর সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।” আমি এই সংবাদ নকল করে অনুষ্ঠানের ফাঁকে ঘোষনা দিতাম “একটি বিশেষ ঘোষনা। বংগপোসাগরে নিম্নচাপের কারনে আজ রাতে অত্র অঞ্চলের উপর দিয়ে তীব্র ঝড় ও দমকা হাওয়া বয়ে যেতে পারে। অত্র এলাকার খরগোশ ধরার বংশী ও মান্দাইদিগকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে।” বলার পর অনেক হাত তালি পেতাম। আমাদের পাহাড়ি এলাকায় নদী, নৌকা, ট্রলার, জেলে এগুলো কিছুই ছিল না। তাই, নকল করে মান্দাই, বংশী ও খরগোশ ব্যবহার করেছি।

মাঝে মাঝে শ্রোতাদের চিঠিপত্রের জবাবের অনুষ্ঠান করতাম এভাবে “এখন শুরু হচ্ছে শ্রোতাদের চিঠিপত্রের জবাবের অনুষ্ঠান। কাঠেংগা গ্রাম থেকে ৭ম শ্রেণীর ছাত্র ফকরা মিয়া লিখেছে
– আমি রাতে পড়তে বসলে টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়ি। কি করলে ঘুমিয়ে পড়বো না অনুগ্রহপপুর্বক জানাবেন।
– ভাই ফকরা, আপনি ধর্নার সাথে রশি বেধে রশির মাথায় মাছ ধরার বর্শি লাগিয়ে চুলের সাথে আটকিয়ে রাখবেন। যখনি ঘুম এসে আপনাকে টেবিলের সাথে লাগিয়ে দিবে মাথার চুলে তখনি টান পড়বে। ঘুম আর আসবে না।

বাংলা সাহিত্য পড়াতেন জামাল স্যার। এত মজা করে পড়াতেন যে শুনতেই ইচ্ছা করতো। মজার মজার উপমা দিয়ে পড়াতেন। আব্দুর রহমান ও কিসমতের মধ্যে দোস্তের সম্পর্ক ছিল। স্যার তাদের সাথে খুব মজা করতেন ক্লাসে। স্যার এই দুইজনকে উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করতেন। বলতেন “এই, মনে করো এই আব্দুর রহমান……।” নাম শুনেই আমরা উৎফুল্ল হয়ে পরতাম। কিছু কিছু গল্পে হাল্কা প্রেম বা ভালোবাসার কথা ছিলো। স্যার বুঝাতেন যে গল্পে কিছু কিছু প্রেম ভালোবাসা বিরহ এগুলো থাকতে হয়। আমি এরপর থেকে গল্প রচনা করতে সিদ্ধান্ত নেই। সারাক্ষণ ভাবি কি নিয়ে গল্প লিখি। দপ্তরি ভাইর কাছে একটা বাস্তব গল্প শুনি একদিন। তার এলাকার এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে প্রেম হয়। কিন্তু বিয়ে না হয়ে বিচ্ছেদ হয়ে বিরহ হয়েছিলো। এই গল্প আমার মনে দাগ কাটে। আমি এই সত্য ঘটনা অবলম্বনে একটা প্রেমের গল্প লিখি। এবং সাপ্তাহিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্বরচিত গল্প হিসাবে পাঠ করি। সবাই শুনে তাজ্জব বনে যায়। অনুষ্ঠানের শেষে প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহমান স্যার আমাকে ডেকে বলেন
– তুমি এই গল্প বানিয়েছ?
– স্যার, আমি এক জনের মুখে এই রকম একটা সত্য ঘটনা শুনেছি। সেইটাকে গল্প আকারে লিখেছি।
– খুব সুন্দর হয়েছে। তুমি আমাদের স্কুলের জন্য দেয়ালিকা তৈরি কর। সেখানে এই গল্পটা লাগিয়ে দাও। পড়া শেষ হলে এই লেখাটা আমাকে দিবে।

আমি দেয়ালিকায় গল্পটি লাগিয়ে রেখেছিলাম বেশ কিছু দিন। আমার হাতের লেখা ছিল ছাপার অক্ষরের মতো। আমার লেখা দেখে আমি নিজেও মুগ্ধ হতাম। লেখাটি খুলে স্যারের কাছে দিয়েছিলাম। স্যার সেটা ভাঁজ করে পকেটে রাখলেন। স্যার সেটা দিয়ে কি করেছেন জানি না। সেই গল্পটিও আমি ভুলে গেছি। শুধু মনে আছে আমার সেই গল্পের নায়ক ছিল একজন মহিষ রাখাল। চুয়াল্লিশ বছর আগের কথা তো! মনে থাকে না।
২৩/১০/২০১৯ খ্রি.

 
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...