শেষ দেখা মুখ

শেষ দেখা মুখ

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

মানুষ মানুষকে অনেকদিন পর্যন্ত মনে রাখে। মনে রাখে তার কথা, তার কাজ, তার মুখ, তার চেহারা। কেউ কেউ বেশী দিন মনে থাকে, কেউ কেউ মন থেকে হারিয়ে যায়। বা ভুলে যায়। দীর্ঘদিন না দেখতে দেখতে ভুলে যায়। দীর্ঘদিন নাম না ডাকতে ডাকতে নাম ভুলে যায়। এমনও আছে চেহারা মনে আছে কিন্তু নাম মনে নেই। নাম মনে আছে কিন্তু চেহারা মনে নেই। আমি আমার এক আত্নীয়কে দীর্ঘদিন না দেখতে দেখতে সে যে আমার কেউ ছিলো সেটাই ভুলে গিয়েছিলাম। হটাৎ এক অনুষ্ঠানে তাকে দেখে মনে পড়লো এ তো আমাদের আত্নীয়। আমি ভুলে গিয়েছিলা! আমি যখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়তাম তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া কচুয়ার সামাদ ভাই আমাদের স্কুলে বেড়াতে এসে অফ পেরিয়ডে ক্লাসে আমাদের সাথে গল্প করতেন। তিনি আমাকে বেশ স্নেহ করতেন। আমাদের স্কুলের একজন শিক্ষক ক্লাসে সামান্য একটু ভুল গ্রামার শিখিয়েছিলেন। আমি শুদ্ধ সেন্টেন্স বললেও স্যার ভুল ধরছিলেন। সেই কথাটা সামাদ ভাইকে বলেছিলাম। তিনি বললেন “তোমারটাই সঠিক। কিন্তু তুমি সেটা তোমার স্যারকে বলবে না। স্যার ইজ অলওয়েজ রাইট। স্যার যা বলেন তাই ঠিক। স্যারের ভুল ধরবে না।” আমি তার এই শিক্ষাটুকু সারাজীবন মনে রেখেছি। আমিও মেডিকেল কলেজে ২৮ বছর শিক্ষকতা করেছি। আমিও হয়ত অনেকবার ভুল পড়িয়েছি। আমার ছাত্ররা হয়তো সেই ভুল ধরতে পেরেছে। তারা আমাকে শ্রদ্ধা করে বলেই হয়তো আমার ভুল আমাকে শুধ্রে দিতে চায়নি। ক্লাস সেভেন অর্থাৎ ১৯৭৩ সনের পর থেকে আর সামাদ ভাইকে কোনদিন দেখিনি। প্রায়ই সামাদ ভাইকে মনে পড়তো। এভাবে না দেখতে দেখতে আমি সামাদ ভাইকে ভুলে যাই এক সময়। সামাদ ভাই চাকরি থেকে অবসরে গিয়ে কিছুদিন আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে কি একটা পদে যেন কাজ করেন। প্রাক্তন ছাত্র হিসাবে তিনি একদিন আমাকে মোবাইল করেন অফিসের নাম্বার থেকে। আমি তার সাথে অনেক কথা বললাম অতীতের অনেক কথা স্মরণ করে। কিন্তু আমি সামাদ ভাইর মুখ মনে করতে পারলাম না। তারপর পেরিয়ে গেছে কয়েক বছর। অনেক চেষ্টা করেও সামাদ ভাইর মুখ মনে করতে পারছি না। এজন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। এত প্রিয় একটা মুখ ভুলে গেলাম!

 

নাটকে-সিনেমায় বিচ্ছেদের নাটকে দেখেছি শেষ দেখার দিন একজন আরেকজনকে বলছে “এটাই হয়তো আমাদের ভাগ্যে ছিলো। আমাকে মনে করে কষ্ট পেয়ো না। যেখানেই থাকো ভালো থেকো। আমার সব কিছু ভুলে যেয়ো।” তারপর থেকে কেউ কাউকে ভুলে যেতে পারে না সারাজীবন। প্রতি রাতে ঘুমাবার আগে তাদের শেষ ডায়ালগটার কথা মনে করে ভুলে যেতে চায়। কী কী জিনিস ভুলে যেতে হবে তার একটা হিসাবও করতে থাকে। তাই, প্রতি রাতেই তাকে মনে করে ভুলে যাওয়ার জন্য। ভুলে আর যাওয়া হয় না। শেষবার দেখা মুখটি ভেসে আসে তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখের সামনে।

 

মানুষ যখন একজন আরেকজনকে স্মরণ করে তখন প্রথমেই তার শেষ দেখা মুখটি ভেসে উঠে কল্পনায়। তারপর চেষ্টা করে করে অতীতের আরও কিছু মুহুর্তের মুখ ভেসে উঠতে পারে। মুখের মধ্যে সবচেয়ে বেশী মনে দাগকাটে রাগান্বিত মুখটি। রাগান্বিত মুখটি মানুষ বেশীদিন মনে রাখে। এজন্য আমাদেরকে সদা হাস্যজ্বোল মুখ নিয়ে থাকতে হবে। যেনো কেউ আমাকে মনে করলে তার কাছে আমার সুন্দর মুখটিই ভেসে উঠে। ক্রোধান্বিত মুখ কুতশিত দেখায়। তাই ক্রোধ পরিহার করে থাকা ভালো। আমি পারতপক্ষে কারো সাথে রাগারাগি করি না। আমাকে যখন শেষে দেখেছেন তখন আমাকে ক্রোধান্বিত দেখেছেন এমন কেউ থেকে থাকলে জানাবেন আমি তার সাথে আবার হাসিমুখে দেখা করে আসতে চাই যেন তিনি আমার হাসিমুখটাই মনে রাখে।

 

মানুষ দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যু চিন্তা এসে যায়। মারা যাওয়ার আগে সব প্রিয়মুখ তিনি দেখে যেতে চান। তাই সবাই তাকে দেখতে যান। রোগীকে দেখতে যেতে হয়। আপনজনদের মুখ দেখে রোগী মনে প্রশান্তি পায়। সাথে করে কিছু ফল মুল ও পথ্য নিয়ে যেতে হয়। আগের দিনে রোগীর জন্য বেদেনা, আতাফল, ডালিম পেপে, আনারস, ডাব, মিশ্রি, দুধ ইত্যাদি নিয়ে যেতো। এখন রোগী দেখতে যাওয়ার প্রচলন প্রায় উঠেই গেছে। গেলেও দুই হালি মালটা নিয়ে যায়। মালটা যেনো রোগীদের জাতীয় ফল হয়ে গেছে। খেতে লাগে পানসে। রোগী খেতেও চায় না। এত মাল্টা দিয়ে কি করবে? অনেকেই কেউ অসুস্থ হলে ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেয় অমুকের জন্য দোয়া করতে। সেই স্যাটাসে অনেক লাইক পড়ে। এত লাইক দিয়ে রোগী কি করবে তা আমি জানি না। অসুস্থ অবস্থার ছবি দিয়েও কেউ কেউ স্ট্যাটাস দেয়। আমি মনে করি তাও ঠিক না। সবাই চায় তার সুন্দর ছবিটি সবাই দেখুক। অসুস্থ খালি গায় অথবা লুঙ্গি পরা গেঞ্জি গায়ের ছবি সামাজিক মিডিয়ায় দেখাতে পছন্দ করেন না। অনেকে দেখতেও পছন্দ করেন না। হাতে সেলাইন লাগানো, নাক দিয়ে নল লাগানো ছবি দেখানো আমি ভালো মনে করি না। হ্যা, কেউ মারা গেলে স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়ে দেয়া যায় জানাযায় শরীক হওয়ার জন্য অথবা দোয়া করার জন্য অথবা মৃত্যু সংবাদটা জানিয়ে দেয়ার জন্য। কেউ কেউ এমনও করেন যে লাশের ছবি দিয়ে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করেন। তা ঠিক না। ছবি দিতে হলে সুস্থ্য কালের সুন্দর একটা ছবি দিন যে ছবিতে মানুষ তাকে বেশী চেনে। মানুষ মারা যাবার পর শেষ দেখা দেখানো হয় মুখ বের করে। অনেকেই আছেন মারা যাবার পরের মুখ দেখতে পছন্দ করেন না। অনেকেরই মুখ বিকৃত হয়ে যায়। আমি একজনের মুখ দেখেছিলাম হা করে রয়েছে। তারপর থেকে আমি যখন তাকে মনে করি তার ঐ হা করা মুখ মনে পরে। কারন, হা করা মুখই ছিল আমার কাছে তার শেষ দেখা মুখ। সেদিন ইউটিউবে পিলখানা হত্যাকান্ডে নিহত এক আর্মি অফিসারের স্ত্রীর সাক্ষাৎকার শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন যে তিনি তার স্বামীর লাশটি ইচ্ছে করেই দেখলেন না। কারন, তিনি মনে করেছেন গলিত অবস্থায় লাশ নিশ্চয়ই বিকৃত হয়ে গেছে। শেষ দেখা মুখটি তার সারাজীবন মনে পড়বে। তিনি চান তার স্বামী তার আগের সুন্দর চেহারা নিয়ে তার স্মৃতিতে থাকুক। মারা যাবার পর লাশের ছবি মিডিয়ায় দিলে একজন না দেখতে চাইলেও তার চোখের সামনে পড়ে যাবে সেই মুখটি। সারাজীবন মনে পড়ে থাকবে সেই শেষ দেখা মুখটি।

১৯/১১/২০২০ খ্রি.

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/