সংক্রামক রোগ নির্ণয়ে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার গুরুত্ব

সংক্রামক রোগ নির্ণয়ে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার গুরুত্ব

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

জীবাণু দিয়ে যেসব রোগ হয় সেগুলিকে সংক্রমণ রোগ বলে। ইংরেজিতে বলা হয় ইনফেকশাস ডিসিজ। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, রিকেটশিয়া, প্রটোজোয়া, ফাংগাস ইত্যাদি দিয়ে সংক্রমণ রোগ হয়। রোগ জীবাণু একজন থেকে আরেকজনে সংক্রমিত হয়। কিছু কিছু রোগ জীবাণু সরাসরি একজন থেকে আরেকজনে সংক্রমিত হয়। আবার কিছু কিছু জীবাণু বহন করতে মাঝখানে ভেক্টরের প্রয়োজন পড়ে যেমন মশা, মাছি, পোকা ইত্যাদি। কিছু কিছু জীবাণু রোগীর হাঁচি-কাঁশি থেকে পড়ে গিয়ে জিনিসপত্রের উপর লেগে থাকে সেখানে হাত দিয়ে কেউ হাত মুখে বা নাকে দিলে সেই জীবনে তার শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করে। যেমন, করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯। রোগী বা বাহকের শরীরে জীবাণু আছে কিনা তা জানার জন্য প্যাথলজিক্যাল টেস্ট করা হয়।

কোন কোন পরীক্ষা রোগীর শরীরের করা হয়। সে গুলোকে বলা হয় ইন-ভিভো পরীক্ষা। ইন-ভিভো পরীক্ষা করতে শরীরের উপর ঝুঁকি থাকতে পারে। যেসব পরীক্ষা শরীর থেকে স্যাম্পল নিয়ে শরীরের বাইরে করা হয় এগুলোকে বলা হয় ইন-ভিট্রো পরীক্ষা। ইন-ভিট্রো পরীক্ষায় শরীরের উপর কোন ঝুকি বা রিস্ক নাই। যেমন, করোনাভাইরাস নির্ণয় করতে আর-টি পিসিআর পরীক্ষা করার জন্য রোগীর গলা থেকে লালা নিয়ে ল্যাবরেটরিতে প্রসেস করা হয়। এটা একটা ইন-ভিট্রো পরীক্ষা। এতে রোগীর শরীরের কোন রিস্ক নাই। তদ্রুপ, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হয়ে রোগীর শরীরে এন্টবডি তৈরি হয়েছে কিনা তা নির্ণয়ের জন্য রোগীর রক্তের সেম্পল নিয়ে কিট দিয়ে দ্রুত সহজে রেজাল্ট পাওয়া যায়। এটাও ইন-ভিট্রো পরীক্ষা। এখানেও রোগীর কোনো ঝুঁকি নাই।

রোগ নির্ণয়ের জন্য সব পরীক্ষাই সমান গুরুত্বের না। কোন কোন পরীক্ষা কোন কোনটির থেকে সুপেরিয়র বা ভালো মানের। পরীক্ষাটির মান কেমন তা নির্ণয় করা হয় তার সেনসিটিভিটি এবং স্পেসিফিসিটি দেখে। যেকোনো একটা পরীক্ষা পদ্ধতি আবিষ্কারের পর তার সেনসিটিভিটি এবং স্পেসিফিসিটি দেখা হয় গবেষণার মাধ্যমে। সেনসিটিভিটি এবং স্পেসিফিসিটি মোটামুটি ভালো মানের হলে এটা পরীক্ষার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোনো পরীক্ষা পদ্ধতি রোগ নির্ণয়ে ব্যবহার করা যাবে না। সেনসিটিভিটি এবং স্পেসিফিসিটি মাপা হয় পার্সেন্টেজ বা শতকরা হিসাবে। যেমন বলা হয় এই টেস্টের সেনসিটিভিটি ৯০%। এর মানে হলো, যদি ১০০ জন সংক্রমিত রোগীর পরীক্ষা করা হয় তবে ৯০ জনের মধ্যে পজিটিভ পাওয়া যাবে, ১০ জনের মধ্যে পজিটিভ পাওয়া যাবে না অর্থাৎ নেগেটিভ পাওয়া যাবে। তাহলে কেন এমন হয়? মনে করুন, ১০০ জন জানা টিবি রোগীর ফুসফুসে টিউবারকুলোসিস বা টিবির জীবাণু আছে কিনা নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা করা হলো মাইক্রোস্কোপ দিয়ে কফ দেখে। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা গেল ৭০ জনের কফে টিউবারকুলোসিস জীবাণু আছে অর্থাৎ পজিটিভ। ১০ জনের ফুসফুসের টিউবারকুলোসিস জীবাণু থাকাতেও তারা নেগেটিভ হলো। এখানে এই পরীক্ষা হলো ৭০ পার্সেন্ট সেনসিটিভ। কেন এমন হলো? সবক্ষেত্রেই জীবাণু স্পুটাম বা কফের সাথে আসে না। আবার জীবাণুর সংখ্যা কম থাকলেও সেটা মাইক্রোস্কোপে খুঁজে পাওয়া যায় না। কোন কোন রোগী ঠিকমতো কফ দিতে পারে না, শুধু তারা থুতু দিয়ে থাকে। কোন কোন মাইক্রোস্কোপিস্ট ভালো দক্ষ নাও হতে পারে।

অন্যদিকে, এই যে ৭০ জন রোগী পজিটিভ হলো এগুলো কি আসল(ট্রু) পজিটিভ, না নকল (ফলস) পজিটিভ, এটাও দেখতে হবে গবেষণা করে। অন্যান্য পরীক্ষার সাথে তুলনা করে গবেষণায় দেখা গেল ১০০ জন পজিটিভ কেইসের মধ্যে ৫ জন ফলস পজিটিভ, মানে অন্য জীবাণুকে টিউবারকুলোসিসের জীবাণু বলা হয়েছে, মানে ৯৫% ট্রু পজিটিভ। এইখানে এই পরীক্ষার স্পেসিফিসিটি হলো ৯৫%।

তাহলে কোন পরীক্ষাটি আমরা সংক্রমণ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহার করব? নিশ্চয়ই সে পরীক্ষাটি যার সেনসিটিভিটি এবং স্পেসিফিসিটি বেশি। কিন্তু আরও কিছু কথা আছে। সেই পরীক্ষা সহজলভ্য কিনা তাও দেখতে হবে। পরীক্ষার খরচ কেমন তাও দেখতে হবে। অতি অল্প খরচে যদি কম সেনসিটিভ ও কম স্পেসিফিক টেস্ট করানো যায় তাও ভালো।

মনে রাখতে হবে, রোগ নির্ণয়ের জন্য প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা একটি সহায়ক পদ্ধতি। মূলত রোগ নির্ণয় করতে হবে রোগের লক্ষণ দেখে। তার সাথে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার রেজাল্ট ও অন্যান্য পরীক্ষার রেজাল্ট যোগ করে ফাইনাল ডায়াগনোসিস করতে হবে।

২৮/০৪/২০২০ খ্রি.

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

এম ফিল (প্যাথলজি ১৯৯৫)

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (পি আর এল)

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ

 
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *