পায়খানা পরীক্ষা

পায়খানা পরীক্ষা

(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

পায়খানার সাথে কৃমির ডিম, ডাইরিয়ার ও আমাশয়ের জীবাণু যায় কিনা এবং পরিপাক তন্ত্রে ইনফেকশন হয়ে পাস সেল যায় কি না এগুলো জানাই পায়খানা পরীক্ষার মুল উদ্দেশ্য । খাবার হজম হবার পর খাদ্যের অপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলো পরিপাকতন্ত্রের শেষ অংশ রেক্টামে জমা থাকে বেশ কয়েকঘন্টা । এই জমা থাকা খাদ্যের অপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলোকে বলা হয় মল। ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় স্টুল । রেক্টাম মলে ভরে গেলে পায়খানার বেগ হয় । রেক্টামের পরের অংশকে বলা হয় এনাল ক্যানাল । এর মুখকে বলা হয় এনাস । সুবিধামত সময় ও জায়গা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা পায়খানার বেগ হলেও ধরে রাখি । এটা সম্ভব হয় এনাল স্ফিংটার থাকার জন্য । এটা মাংসপেশি দিয়ে তৈরি । এটা যত শক্তিশালী হবে পায়খানা ধরে রাখার ক্ষমতাও তত বেশী হবে । যাদের কোন কারনে এই মাংসপেশী দুর্বল হয়ে যায় তারা পায়খানা ধরে রাখতে পারে না । প্যারালাইসিস তার অন্যতম কারন । পায়খানা নরম বা পিছলা হলেও এনাল স্ফিংটার তা ধরে রাখতে পারে না । ডায়রিয়া ও ডিসেন্ট্রি (আমাশয়) হয়ে এমন হয় । পায়ুপথ (এনাল ওরিফিস বা এনাস), যৌনাংগ ও স্তনকে মানুষ লজ্জা স্থান হিসাবে গণ্য করে । তাই, বিশেষ করে কমপক্ষে এতটুকু জায়গা মানুষ ঢেকে রাখে । এসব লজ্জাস্থানের নাম মানুষ মুখে আনতেও লজ্জাবোধ করে । ডাক্তারের কাছে গিয়ে কোলাশা করে না বললে ডাক্তারও ঠিক মতো বুঝতে পারে না । ডাক্তার ঠিক মতো না বুঝলে চিকিৎসাও ঠিক মতো হয় না । বলতে লজ্জা বোধ করার কারনে এসব অংগের বিভিন্ন নাম দিয়েছে মানুষ । আমাদের গ্রামের কিছু কিছু মুরুব্বিরা পায়ু পথের নাম দিয়েছে মারগ । বলে “রাতে আমার মারগ দিয়ে গুড়া কৃমি বাইরয় ।“ এটাকে পায়খানার রাস্তাও বলে অনেকে । যেমন বলে “আমার পায়খানার রাস্তায় জ্বালাপোড়া করে।” যেঘরে মল ত্যাগ করা হয় তাকে বলা হয় পায়খানা ঘর (লেট্রিন)। কিন্তু মানুষ এটাকে সংক্ষিপ্ত করে বলে পায়খানা । যেমন বলে “আমাদের পায়খানাটা বাড়ির উত্তর পাশে।” আবার মলকেও পায়খানা বলে। যেমন বলে “আমার পায়খানা একদম কষা।” অথবা “আমার পায়খানা পরীক্ষা করাতে হবে।” ডাক্তাররা বুঝে নিতে পারেন রোগী কী বলতে চাচ্ছে । কিন্তু রোগী অনেক সময় বুঝতে পারে না ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী কি বলতে চাচ্ছে । আমি আমার দুটি বাস্তব ঘটনা দিয়ে ব্যাপারটা বুঝাতে চাচ্ছি ।

 

আমি এমফিল ভর্তি হবার পুর্বে জানুয়ারি ১৯৯২ থেকে জুন ১৯৯৩ পর্যন্ত এই দেড় বছর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রভাষক ছিলাম। তখন নিজের ল্যাবরেটরি ছিল না। একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার মালিকানায় চরপাড়ায় একটা প্রাইভেট প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে আমি রিপোর্ট করতাম। পাশের চেম্বারে মেডিসিন বিভাগীয় প্রধান প্রাক্টিস করতেন। তার রেফার্ড করা অধিকাংশ পরীক্ষাই আমি করতাম। তিনি অনেক রোগীর স্টুল (মল) পরীক্ষা করাতেন। আমি বলতাম
– আপনি এত স্টুল পরীক্ষা করান কেন, স্যার?
– তাতে আপনার কি সমস্যা? আপনার ইনকাম তো তাতে বেশী হয়।
– না, মানে, অনেক রোগীর দেখা যাচ্ছে পায়খানা অত্যন্ত কষা। অথচ আপনি তাকে এডভাইস করেছেন পরীক্ষা করার জন্য। তাতে অনেকে এখানে পায়খানা করতে না পেরে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে চলে যায়। মনে করে যে পায়খানাই পরীক্ষা করাতে পারলাম না, চিকিৎসা দিবেন কিভাবে।
– আপনাকে দিয়ে পায়খানা পরীক্ষা করা আমার উদ্দেশ্য না। রোগী কমপ্লেইন করে তার পায়খানা হয় না । আমার উদ্দেশ্য হলো রোগীর পায়খানা হয় কি না তা পরীক্ষা করা। সন্ধ্যার সময় আপনার ল্যাবে এসে পায়খানা হলে তো রোগী ভালো। তার পায়খানা হয়।

 

ল্যাবের মালিক খুব সচেতন ছিলেন। একটা  রোগীও যাতে পরীক্ষা না করে চলে না যায় সেজন্য সহকারীদেরকে সতর্ক করে দিতেন । সহকারীরা জানতো যে রোগী পায়খানা পরীক্ষা না করে চলে গেলে খবর আছে। সহকারীরাও চালাক কম ছিল না। পায়খানা কষা রোগীদের ব্যাবস্থা দেন পায়ুপথে গ্লিসারিন সাপোজিটরী। পায়খানা করতেই হবে। তাতে আমার কি? আমি কাজ পেলেই হল।

একদিন সন্ধায় এক রুগী বললেন
– লেট্রিনের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
– কেন?
– লেট্রিনের সামনে লাইন পরে গেছে।

 

আমি গিয়ে দেখি লেট্রিনের দরজায় সামনে লেট্রিনের দিকে ঘুরে এক গ্রাম্য মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। আমি বললাম
-দড়জায় দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভিতরে ঢুকুন।
– পায়খানা তো ধরতাছে না।
– আপনার পায়খানা কেমন?
– আমরা গ্রামে থাকি, গরীব মানুষ। কেমন আর অইব, তিন মুরা হোলার বেড়া, সামনে চটের দরজা।
– তার মানে তিন দিকে শোলার বেড়া, সামনে চট। আমি সেই পায়খানার কথা বলিনি আপনার পেটের পায়খানা কি কষা না নরম?
– এবা, আমার পায়খানা কষা, লোয়ার মত শক্ত।
– আপনি পরে আসুন।
– তাইলে ঐডা কি করাম?

দেখলাম লেট্রিনের দরজার মাঝখানে একটা গ্লিসারিন সাপোজিটরি রাখা আছে।
– এটা কে রাখল?
– আমি রাখছি।
– কেন?
-আপনেগ লোকে কইল “এইডা পায়খানার দরজায় দিয়া কিছুক্ষণ দাড়াইয়া থাকলে পায়খানা ধরব। সেই কখন থাইকা খাড়াই আছি, পায়খানা ধরতাছে না। আমি কি করাম।
– এইটা পায়খানার রাস্তা দিয়া দিতে হবে।
– হেই রাস্তা কোন দিকে?

 

তারপরের ঘটনা ভাল মনে নেই। তাই আর বলতে পারলাম না।

 

যে কোন সেম্পলে অসাভাবিক কিছু থাকলে সহকারীদেরকে আমার নির্দেশ দেয়া ছিল যেন আমাকে দেখানো হয়। সহকারী একদিন একটা স্টুল সেম্পল দেখাল। দেখলাম ওতে কোন স্টুল নেই। আছে শুধু টাটকা রক্ত। আমি রোগীকে ডেকে জিগালাম
-আপনার পায়খানার সাথে সব সময় রক্ত আসে?
– না, কখনো আসে না।
– এতো দেখছি টাটকা রক্ত।
– রক্ত আসবে না মানে, আপনাদের দেয়া কাঠি মশৃন না। ওটা পায়খানার রাস্তায় ঢুকাতে আমার অনেক কস্ট হয়েছে।
– আপনি কি করেন?
– কলেজে পড়ি।
-কাঠি পায়খনার রাস্তায় ঢুকায়েছেন কেন?
-আপনার লোক বলল “এই কাঠি দিয়ে একটু পায়খানা নিয়ে এই পটে নিয়ে আসুন”। অনেক গুঁতাগুঁতি করেও পায়খানা আনতে পারি নি, এসেছে শুধুই রক্ত।

-আপনাকে বলা হয়েছিল প্যানে পায়খানা করার পর সেখান থেকে এই কাঠির আগা দিয়ে এক দানা পরিমাণ সেম্পল নিতে । আপনি পায়ু পথে খোচাখুছি করলে কি পায়খানা আসবে?

-অ বুঝছি ।
১৮/৬/২০১৭ খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (14 votes, average: 4.50 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

Leave a Reply

Your email address will not be published.