স্বপ্না আরাফার ময়দানে হারিয়েছিল

স্বপ্না আরাফার ময়দানে হারিয়েছিল
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

স্বপ্নাকে সাথে নিয়ে হজ্জ করছিলাম ২০০৫ সনের জানুয়ারি মাসে। স্বপ্না আমার স্ত্রী। মোজদালিফায় পৌছলাম। সেখানে নিয়ম হলো খোলা মাঠে আকাশের নিচে ঘুমাতে হয়। খুবই ইন্টারেস্টিং ইভেন্ট। কাফেলার সবাই চাদর বিছিয়ে পাশাপাশি শুলাম আমরা। একদিকে ছেলেরা, একদিকে মেয়েরা। ছেলেদের পরনে ছিল দুই টুকরা সাদা কাপড়। একটুকরা শরীরের উপরের অংশে, আরেক টুকরা শরীরে নিচের অংশে। মনে হচ্ছিল যেন আমার পৃথিবীতে আর কিছু নেই। নি:শ্ব এক ফকির। আকাশের দিকে চেয়ে তারা দেখছিলাম। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি রহস্য নিয়ে ভাবছিলাম। ঘুম আসছিল না। গভীর রাত্রি। একসময় পায়ের দিকে আড়া আড়ি চেয়ে দেখি স্বপ্না আমার দিকে টেল টেলি চেয়ে আছে। দেখে খুব মায়া হলো। ইশারা ইংগিতে জিজ্ঞেস করলাম “ঘুম আসছে না?” সেও ইশারায় বুঝালো যে তার ঘুম আসছে না।

পরেরদিন ওখান থেকে চলে যাই মীনায়। সেখানে তাবুতে অবস্থান করতাম। তাবু থেকে যেতাম জামারায় শয়তানের তিনটি প্রতিকৃতিতে পাথর মারার জন্য। ইতিহাস থেকে জানা যায় আল্লাহ্‌ নবী ইব্রাহিম (আঃ)- কে পরীক্ষা করার জন্য তার প্রিয় সন্তান শিশু ইসমাইল (আঃ)-কে কুরবানি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কুরবানি দেয়ার জন্য ময়দানে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শয়তান তাদেরকে ধোকায় ফেলে দেয় তিন বার তিন জায়গায়। অবশেষে যখন কুরবানি করেই ফেলেন দেখেন নিচে ইসমাইল (আঃ)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা জবাই হয়েছে। ইসমাইল (আঃ)-এর কিছু হয়নি। আল্লাহ এখানে পরীক্ষা করেছিলেন যে নবী তার প্রিয় বস্তু আল্লাহ্‌র নির্দেশে কুরবানি করেন কিনা। সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহন করার জন্য ঈদুল আযহার সময় আমাদের প্রিয় পশু কুরবানি দেয়ার বিধান হয়েছে। প্রতি বছর ঈদুল আযহা পালন করে আমরা সেই ঘটনা স্মরন করে ইমানি শিক্ষা অর্জন করি। শয়তানের প্রতি ঘৃনা ও খোভ প্রকাশের জন্য হজ্জের বিধান হলো জামারায় পাথর নিক্ষেপ করা, যে তিন জায়গায় শয়তান ইব্রাহীম (আঃ) কে তিনবার ধোকা দিয়েছিলো। পাথরগুলি খুব ছোট ছোট, বড় মটর দানার সমান। এগুলি নিজেরই সংগ্রহ করতে হয়। বাম হাতে নিয়ে ডান হাত দিয়ে দোয়া পড়ে পড়ে শয়তানের স্তম্ভের দিকে নিক্ষেপ করতে হয়। যারা কম বুঝে তারা মনে করে এইটাই শয়তান। জোড় খাটিয়ে বকাঝকা করতে করতে ঢিল ছোড়ে। এগুলি বিধান পরিপন্থী। বেয়াদবি। বিশেষ করে আফ্রিকানদের মধ্যে এমন করতে বেশী দেখা যায়।

 

আমরা দল বেঁধে পাথর নিক্ষেপ করার জন্য যাচ্ছিলাম। যতই কাছাকাছি যাচ্ছিলাম ততই লোকের ভিড় বাড়ছিল। একসময় লোকের চাপে হিসসিম খাচ্ছিলাম। স্বপ্না যাতে হারিয়ে না যায় সেজন্য তার হাত চেপে ধরলাম। জামারার কাছাকাছি আসতেই পিছন থেকে আফ্রিকান হাজীদের একটা দল শয়তানের প্রতি বিক্ষোভ দেখিয়ে প্রচন্ড বেগে ধেয়ে এলো। ধাক্কা খেয়ে স্বপ্নার হাত আমার হাত থেকে ছুটে গিয়ে জনসমুদ্রে হারিয়ে গেল। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। জন স্রোতের ধাক্কায় আমি সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম । দেখি সামনে জামারা। এই সুযোগে গুণে গুণে দোয়া পড়ে শয়তানকে উদ্যেশ্য করে পাথর নিক্ষেপ করলাম। তারপর সামনের দিকে জনসমুদ্রে সাতার কেটে স্বপ্নাকে খুঝতে থাকলাম বিভ্রান্তের মতো। নিজের স্ত্রী হারিয়ে গেলো আমার হাত থেকে ছুটে পড়ে। কি হবে এখন! যদি খুজে না পাই! সে আমাকে না পেয়ে ভয় পাবে না তো! হায় হায়! সমস্যা হলো সব মেয়েই তো বোরকা পরা। কোনটি আমার স্ত্রী বুঝা মুস্কিল ছিল। পিছন দিক থেকে যাদের একটু হাল্কা পাতলা গড়ন মনে হচ্ছিল তাদের সামনে গিয়ে মুখ দেখে চেনার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু অনেক্ষণ হয়ে গেলো। খুঁজে পেলাম না। নানান দুঃশ্চিন্তা করতে লাগলাম। স্বপ্না যখন আমাদের কাউকে খুঁজে না পাবে হয়ত পুলিশের সাহায্য চাইবে। পুলিশ নিয়ে গিয়ে হারানো মানুষের ক্যাম্পে বসিয়ে আসবে। যেখানে তাকে পাউরুটি খেতে দিবে। উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে থাকবে আমরা কখন তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি। সাথে আমির সাবকে নিয়ে যেতে হবে। কি হাস্যকর কথা! হঠাৎ সামনে এক মহিলাকে পিছন দিক থেকে দেখে চেনা চেনা মনে হল। খাটো মহিলা। বোরকার নিচের অংশ হাতে সেলাই করে খাটো করা হয়েছে। মনে করলাম এটা আমাদের কাফেলার নানী হবেন। নানী এর আগেও কয়েকবার হারিয়েছিলেন। সন্ধার পর গিয়ে হারানো মানুষের ক্যাম্প থেকে আনা হয়েছে। সামনে গিয়ে মুখ দেখে চিনে ফেললাম যে এটা আমাদের নানীই। বললাম
– নানী, হারিয়ে গেছেন নাকি?
– হ্যা, কাউকে খুঝে পাচ্ছি না।
– আমার সাথে আসেন। এবার নানীকে সাথে নিয়ে স্বপ্নার খুজে ঘুরাফিরা করতে লাগলাম।

 

কেওয়াতখালীর সরকার বাড়ির সরকার গ্লাস হাউজের মালিক নুরুল হক সরকার এবং তার স্ত্রী আমাদের কাফেলায় হজ্জে গিয়েছিলেন। তারা দুইজনই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ছিলেন। খুব মজার মানুষ ছিলেন। তাই আমরা নানা-নানী ডাকতাম। নানীকে নিয়ে উত্তর দিকে যাচ্ছিলাম। দেখি স্বপ্না হেসে হেসে আরেক ভাবীর সাথে কথা বলছে। তারা দুইজনই হারিয়েগিয়েছিল। একে অপরকে পেয়ে হাসাহাসি করছে। তাদের সাথে নানীকে নিয়ে আমিও যোগ দিলাম। সবাই মিলে আমীর সাবকে খুঁজতে থাকলাম। দূরে দেখলাম লাঠির আগায় একটা সবুজ চাদর ঝুলানো আছে। আমাদের জানা ছিল যে আমীর মোশারফ ভাই আমাদেরকে সিগনাল হিসাবে তার লাঠির মাথায় সবুজ চাদর ঝুলিয়ে রাখেন। আমরা সবাই সবুজ চাদর দেখে আমীর সাবের কাছে গিয়ে জড়ো হলাম। স্বপ্নাকে হারিয়ে আমি যে কি পরিমান উদ্বিগ্ন ছিলাম তা আমাকে ছাড়া আর কেউ জানে না। আমি এখনো সেই কথা ভুলতে পারি না। হাস্যকর ছিল যে স্বপ্নাকে খুজতে গিয়ে আমি নানীকে খুঁজে পেয়ে সাথে নিয়েছিলাম।

১৫/৬/২০১৯ খ্রি.

ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ জার্নি