শ্বাস, শ্বাস, শ্বাস

শ্বাস, শ্বাস, শ্বাস
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আমরা এমবিবিএস পাস করার পর ১৯৮৬ সনে ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং করেছি এক বছর। এখন ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং না বলে ইন্টার্ন বলা হয়। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে বিভিন্ন মেয়াদে ট্রেইনিং করা হতো। একেকটা বিভাগের অধীন কয়েকটা করে ইউনিট থাকতো। প্রতি ইউনিটের প্রধান থাকতেন একজন প্রফেসর অথবা এসোসিয়েট প্রফেসর অথবা এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। প্রতি ইউনিটে একজন রেজিস্ট্রার থাকতেন। প্রতি ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকতেন একজন এসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার। এসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রারের নেতৃত্বে আমরা ১৫-২০ জন করে ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং করতাম। ওয়ার্ডের রোগীদের ফলো আপ দেয়ার জন্য আমাদের বেড নির্ধারণ করা ছিলো। আমরা প্রতিদিন সকালে এসে রোগীর সমস্যা, পালস, ব্লাড প্রেসার, স্বাস প্রশ্বাসের রেট, ইত্যাদি দেখে রোগীর ফাইলে লিখে রাখতাম। ইমপোর্টেন্ট ফাইন্ডিংগুলো নিয়ে সহকারী রেজিস্ট্রারের সাথে আলোচনা করতাম। সহকারী রেজিস্ট্রার রেজিস্ট্রারের সাথে আলোচনা কতেন। যাদের ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং শেষ হয়ে গেছে অথচ উপজেলা লেভেলের হাসপাতালে পোস্টিং হয়নি তারা সুপেরিয়র ডিউটি ডক্টর হিসেবে ওয়ার্ডে ডিউটি করতেন। সুযোগ পেলে আমাদের পড়াতেন। রেজিস্ট্রারগণ নিয়মিত ওয়ার্ডে ছাত্রদেরকে সকালে ও রাতে পড়াতেন। সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রারগণ প্রফেসরের সাথে অথবা স্বাধীনভাবে সহকারী রেজিস্ট্রার নিয়ে অপারেশন করতেন।
প্রফেসরগণ সকালে এসে গ্যালারিতে বড় বড় লেকচার ক্লাস নিতেন। ক্লাস না থাকলে লাইব্রেরিতে বসে বই ও জার্নাল পড়তেন। সকাল ১০ টায় দলবল নিয়ে ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতেন। এপ্রোন গায় দিয়ে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে হেলেদুলে হেটে হেটে রোগীর বেডের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন “চাচা আজ কেমন আছেন?” কথা বলতে বলতে রোগীর হাতের পালস গুনতেন। স্টেথোস্কোপ দিয়ে হার্টের সাউন্ড ও স্বাস প্রশ্বাসের সাউন্ড শুনতেন। প্রফেসর সব রোগী দেখতেন না। এসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার যেগুলি দেখার জন্য ইঙ্গিত করতেন সাধারণত সেগুলো দেখতেন।
রোগী দেখে কি কি পরীক্ষা করতে হবে, কি কি ঔষধ লিখতে হবে তা প্রফেসর বলতেন। আমরা হাতে থাকা প্যাডে শর্টহ্যান্ডে তা লিখে ফেলতাম। রাউন্ড শেষে ডক্টরস রুমে বসে সেগুলো ফ্রেস করে লিখে নার্সকে দিতাম। প্রেস্ক্রিপশন অনুযায়ী নার্স পরীক্ষা করানোর জন্য রোগী এক্সরে অথবা প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে পাঠাতেন এবং নিজ হাতে রোগীকে ঔষধ খাইয়ে দিতেন। পরীক্ষা তেমন কিছু ছিলো না। তখন আমরা আল্ট্রাসনোগ্রাফি দেখিইনি। শুনেছিলাম জাপান দেশে এটা আছে। প্রশ্রাব, পায়খানা ও দুয়েকটা রক্তের পরীক্ষা করানো হতো। রোগীর সমস্যা শুনে, রোগীর শরীরে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে, দুয়েকটা প্যাথলজি পরীক্ষা করে অথবা এক্সরে করেই রোগ ধরা হয়ে যেতো। হয়তো ভুলও হতো। হয়তো, লাংসের ক্যান্সারকে টিবি রোগ মনে করে টিবির চিকিতসা দেয়া হয়েছে।
একদিন শিশু ওয়ার্ডে রাউন্ড দেয়ার সময় প্রফেসর ডাঃ হামিদ্ শেখ স্যার বললেন “এই রোগীকে কৃমির ঔষধ লিখে দাও।” আমি ফাইলে কৃমির ঔষধ লিখে দিলে নার্স তাকে এক ডোজ কৃমির ঔষধ খাইয়ে দেন। পরেরদিন রোগীর পায়খানার সাথে ৮-১০’টা বড় কৃমি পড়ে। রোগীর বয়স ছিল ৬-৭ বছর। সাথে তার নানি থাকতেন। হামিদ শেখ স্যার পরেরদিন রাউন্ডে এসে জিজ্ঞেস করলেন “এই রোগীকে কৃমির ঔষধ খাওয়াছিলেন?” রোগীর নানি বললেন “কৃমির ঔষধ খাওয়ায় নাই, ডাক্তার সাব কৃমির ঔষধ লেখছিলেন। তাতেই এতুগুনা কৃমি পড়ছে।” শুনে হামিদ শেখ স্যার মুসকি হেসে বললেন “দেখছেন আমাদের এই ডাক্তার কেমন, ওষুধ লেখছেন, তাতেই কৃমি পড়ে গেছে।”
প্রফেসর রোগীর গায়ে হাত না দিলে রোগীরা সাধারণত সন্তুষ্ট হতেন না। তাই আমাদের একজন প্রফেসর সব রোগীর সাথেই অল্প কিছু কথা বলতেন এবং বুকের উপর, পেটের উপর একটু একটু করে স্টেথোস্কোপ টাচ করে বলতেন “শ্বাস, শ্বাস, শ্বাস।” আসলে যাকে ভালো করে দেখার দরকার তাকে ভালো করেই দেখতেন। যাকে দেখার দরকার নেই তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য শুধু স্টেথোস্কোপ টাচ করে বলতেন “শ্বাস শ্বাস শ্বাস।”
আমি শুনেছি, একদিন এই স্যার এমনভাবে একদিক থেকে শুরু করে ৪-৫ জন রোগী দেখে ফেলেছেন এবং প্রত্যেককেই বলেছেন “স্বাস, শ্বাস, শ্বাস।” পরের রোগীর কাছে গেলেই রোগী হেসে বলে উঠলেন “ডাক্তার সাব, স্টেথোস্কোপ দিয়ে কিভাবে শুনছেন, আপনি তো স্টেথোস্কোপ গলায় লাগিয়ে রেখেছেন, কানে লাগান।”
স্যার বললেন “ও তাই তো।” স্টেথোস্কোপ কানে লাগিয়ে বুকের উপর ধরে বললেন “শ্বাস, শ্বাস, শ্বাস।”
১৩/৬/২০২২
আরও স্মৃতি কথা পড়তে নিচের হ্যাস ট্যাগ এর উপর ক্লিক করুন।