বুলবুল হায়দারের সমাজ উন্নয়ন

বুলবুল হায়দারের সমাজ উন্নয়ন

(কল্প কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

বুলবুল ভাইকে যখন আমি প্রথম দেখি তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়তাম। গাছের শিকরে বসে গাছের সাথে হেলান দিয়ে পড়ার অভ্যাস ছিলো আমার। বাংলা পাঠ্যবই থেকে সত্যেন্দ্র নাথ দত্তের কবিতা পরছিলাম ছন্দে ছন্দে শরীর দুলিয়ে। পড়ছিলাম

“ছিপ খান তিন দার

তিন জন মাল্লা

চৌপর দিন ভর

দেয় দৌড় পাল্লা।।”

মাথা উচু করে চেয়ে দেখি একজন শুকনো চেহারার লম্বা লোক দাঁড়িয়ে আমার পড়া শুনছেন। আমি লজ্জা পেয়ে চুপ করে গেলাম। তিনি বললেন “খুব ভালোই তো আবৃতি করছিলে। আবার পড়।” আমি লজ্জায় কথা বলতে পারছিলাম না। তিনি আবার বললেন “তোমার কবিতা আবৃত্তি আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। তুমি আবার শুনাও।” কিছুতেই শুনাচ্ছিলাম না। বারবার অনুরোধ করাতে আমি আবার কবিতা আবৃত্তি করলাম। কিন্তু আগের মতো হলো না। তিনি বললেন “আগের মতো শরীর দুলিয়ে পড়। কিন্তু আমি আর আগের মতো শরীর দুলিয়ে পড়তে পারলাম না। তিনি বললেন “আমার নাম বুলবুল হায়দার। তুমি আমাকে চেনো?” আমি মাথা নাড়িয়ে বুঝালাম যে চিনি না। তিনি বললেন

– আমার বাড়ি জিতাশ্বরি। মসজিদের দক্ষিণের বাড়িটাই আমাদের। আমার বাবার আজান হয়তো তুমি শুনেছ। খুব জোড়ে শব্দ করে সুর করে আজান দেন মসজিদে। তুমি শুননি?

– একটা আজান পশ্চিম দিক থেকে শুনা যায়। তবে ভোরে ফজরের আজান এবং রাতের ঈশার আজান শুনা যায়। অন্যসময় শুনি না। খুব সুন্দর সেই আজানের আওয়াজ।

– আমার বাবা নামাজের ৫ ওয়াক্তই আজান দেন। দিনের বেলায় অন্যান্য শব্দের জন্য হয়তো তুমি দিনের আজান শুনতে পাওনা।

– তা হতে পারে।

– তুমি কোন ক্লাসে পড়?

– আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি।

– কোন স্কুলে যাও?

– কাইলা স্কুলে।

– ওভাবে বলে না। বলতে হয় ‘ঘোনারচালা ফ্রি প্রাইমারি স্কুল।’

– তোমাদের হেড স্যারের নাম কি?

– খোরশেদ স্যার।

– অভাবে বলতে নেই। বলতে হয় “জনাব খোরশেদ আলম।”

– আপনে কোন ক্লাসে পড়ুন?

– আমি এবার এসএসসি পরীক্ষা দেব।

– মানে মেট্রিক পরীক্ষা?

– হ্যা, মেট্রিক পরীক্ষাও বলে।

– আমাগ ভুলু ভাই গতবার সেকেন্ড ডিভিশনে মেট্রিক পাশ করছে । আপনের নাম কি ভাই?

– আমার নাম বুলবুল হায়দার। বুলবুল বলেই ডাকে।

এভাবে কথা বলে পরিচয় হয় বুলবুল ভাইর সাথে। আরেকদিন আমি পড়ছিলাম গাছের ডালে বসে। গাছের বড় ডালটার দু’শে দু’পা ঝুলিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বসার মতো করে বসে গাছের কান্ডে হেলান দিয়ে পড়ছিলাম নিঃশব্দে। আমি বেশী সময়ই নিঃশব্দে পড়তাম। গাছে বসে পাখির ডাক শুনতাম। পাখি কিন্তু সুরে সুরে ডাকে। একেক পাখির সুর একেক রকম। কোন কোন পাখি এমন ভাবে ডাকে যেনো মনে হয় কথা বলছে। বুলবুল ভাই পশ্চিম দিক থেকে এলেন। গাছের নিচে এসে দাড়ালেন। আগেরবার আমি শিকরে বসে পড়ছিলাম সেখানে কিছুক্ষণ চোখ রাখলেন। আমি উপর থেকে বলে উঠলাম “ভাই কি আমাকে খুজছেন?” বুলবুল ভাই উপর দিকে তাকিয়ে আমাকে দেখতে পেয়ে বললেন “তুমি গাছে বসে পড়ছ?”

– আমার গাছে বসে পড়তে ভালো লাগে। পড়তে পড়তে পাখির গান শুনি।

– আজ স্কুলে গিয়েছিলে?

– গিয়েছিলাম।

– ঠিক আছে, পড়।

বুলবুল ভাই পুর্ব দিকে চলে গেলেন। এরপরও বুলবুল ভাইর সাথে আমার অনেকবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। আমার পড়াশোনার খোজখবর নিতেন সবসময়। বুলবুল ভাই সবসময় সাদা পাঞ্জাবী ও সাদা পাজামা পরতেন। সাথে স্পঞ্জের সেন্ডেল পা দিতেন। হাটার সময় সেন্ডেলের ধুলা লেগে পাজামার নিচের অংশ ময়লা হয়ে থাকতো। পাহাড়িয়া লালমাটির ধুলায় ঘাম লেগে লালচে দাগ হতো।

১৯৭১ সনের স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় বুলবুল ভাইকে দেখেছি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করতে। প্রত্যেক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর হাতে একটা করে বেত থাকতো। তার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধার খাবার যোগান দিতো। এলাকার সকল অন্যায়ের বিচার করতো। কেউ যাতে না খেয়ে না থাকেন তার দেখাশোনা এই বাহিনী করতো। ধনীদের থেকে শস্য নিয়ে গরীবদের মাঝে বন্টন করে দিতেন বুলবুল ভাই।

১৯৭৪ সনের এক বিকেলে বুলবুল ভাই আমাদের এলাকার সব ছাত্রদের ডেকে জিতাশ্বরির এক বাচ্রাক্ষেতে বসে মিটিং করলেন। সে বছর দেশে খুব আকাল পড়েছিল। সবাই অভাবে পড়ে যায়। অনেকে কষ্ট করে ভাত হয়তো যোগার করতে পারতো কিন্তু তরকারি যোগার করতে পারতো না। রান্না করে গরম ভাতে পানি দিয়ে পান্তাভাত বানিয়ে লবন মরিচ দিয়ে খেতো। সেই লবনও বাজারে পাওয়া যেতো না। পাওয়া গেলেও দাম ছিল খুব চড়া। দাম বাড়তে বাড়তে একবার ৬০ টাকা শের (প্রায় এক কেজি) হয়েছিল লবনের দাম। তখনকার এক টাকা এখনকার ১৫-২০ টাকার সমান। এমন অভাবের সময় কেউ পরনের নতুন কাপড় কিনতে পারতো না। আমরা ছিলাম গ্রামের ছাত্র। প্রায় সবাই লুঙ্গি পড়তাম। জহিরুল ভাইকে দেখেছি ফুল প্যান্ট পরতে। বুলবুল ভাইর ডাকা সেই মিটিংয়ে ছত্তর ভাই এসেছিলেন এমন একটা ছেড়া লুঙ্গি পরে যে সামনে পেছনে ডানে বামে সব দিকেই ফুটা ছিল। ফুটা দিয়ে তার থোরার ফর্সা চামড়া দেখা যাচ্ছিলো। সবচেয়ে বেকায়দায় ফেলেছিলো তার পেছনের ছিদ্রটা। বুলবুল ভাই ছত্তর ভাইকে বললেন লুঙ্গিটা ঠিক করে পরতে। ছত্তর ভাই লুঙ্গি যেদিকেই ঘুরান তার পিছনে একটা ছিদ্র পড়ে। বুলবুল ভাই বললেন লুঙ্গিটাকে উল্টিয়ে দুই ভাঁজ করে পড়তে। ছত্তর ভাই লুঙ্গি ভাঁজ পরলেন। এবার লুঙ্গির দুই পারই উপর দিকে পরা হলো। ছেড়া ছিদ্র ঢাকা পড়লো। কিন্তু লুঙ্গি শর্ট হয়ে হাটু পর্যন্ত উঠে এলো। ছত্তর ভাই মাঠে লেটা দিয়ে বসে পরলেন। মিটিং শুরু হলো। মিটিংয়ের বিষয়বস্তু ছিল পাড়ায় ছাত্রদের নিয়ে সমিতি করা। ছাত্রদের কল্যাণ করা ও সমিতির দ্বারা এলাকার উন্নয়ন করাই সেই সমিতির উদ্দেশ্য ছিল। সবাই সমিতি করার পক্ষে কথা বললো। কিন্তু ছত্তর ভাই রাজি হলেন না। কেনো হবেন না তার কোন ব্যখ্যা দিলেন না। বুলবুল ভাই সমিতির নাম প্রস্তাব করলেন “জোনাকি ছাত্র সংঘ।” মুকুল ভাই জিজ্ঞেস করলেন “ভাই, জোনাকি ছাত্র সংঘ নাম দেয়ার ব্যখ্যা কি?” বুলবুল ভাই ব্যাখ্যা দিলেন “জোনাকি পোকা অন্ধকারে ঝোপঝাড়ে থাকে। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে জোনাকি পোকা নিজের শরীর থেকে আলো জ্বালায়। অনেকগুলো জোনাকি যখন একসাথে আলো জ্বালায় তখন ঝোপঝাড়ের অন্ধকার দুর হয়ে আলোকিত হয়। আমাদের এই পাহাড়ি এলাকা অনুন্নত। অন্ধকারে পড়ে আছে। আমরা ছাত্ররা এই অন্ধকারের একেকটা জোনাকি পোকা। আমরা একসাথে শিক্ষার আলো জ্বালবো। আমাদের এলাকায় শিক্ষায় আলোকিত হবে। ছাত্রসংঘ করে আমরা সেই আলোর পথে এগিয়ে যাবো।” সবাই রাজি বুলবুল ভাইর প্রস্তাবে। একমাত্র ছত্তর ভাই রাজি হলেন না। সমিতির কর্মকাণ্ড দেখে পরের বছর ছত্তর ভাই সমিতিতে ভর্তি হন। সবাই সমিতিতে কিছু কিছু চাঁদা দিতো। সমিতির কর্মকান্ড দেখে খুশী হয়ে এলাকার মুরুব্বিরা বেশী পরিমানে চাঁদা দেন। তাতে বুলবুল ভাইর হাত শক্তিশালী হয়। বুলবুল ভাই সমিতির মাধ্যমে গ্রামে একটা পাঠাগার গড়ে তুলেন। প্রচুর বইয়ের কালেকশন আছে সে পাঠাগারে। এলাকার ছাত্র যুবা মুরুব্বি সবাই সে পাঠাগারে বসে বই পড়ে। বইয়ের মাধ্যমে এলাকা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে পড়ে। সমিতির মাধ্যমে বুলবুল ভাই প্রতি বছর দু’বার আনন্দ উৎসবের আয়োজন করেন। সেই উৎসবে এলাকার ছোট বড় সবাই আনন্দে মেতে উঠে। সারাদিন দেশীয় খেলাধুলা চলে। সন্ধায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। চলে গান বাজনা ও সাহিত্যের আসর। পুরুস্কার বিতরনি হয়। মেধাবী ও গুণিজনদেরকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হয় সবার সামনে। সব শিশু স্কুলে গেলো কি না সেটা বুলবুল ভাই দেখভাল করেন।

 

১৯৭৫ সনে বুলবুল ভাই বিয়ে করেন। তার শশুর বাড়ি গোবর চাকা গ্রামে। রোকন বিএসসি স্যার তার চাচাশ্বশুর। বুলবুল ভাই নতুন নতুন শশুরবাড়ি গিয়েছিলেন। রাতে শশুরবাড়ি নতুন বউকে নিয়ে ঘুমিয়েছিলেন। রাত দুইটার পর পুলিশ তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে এরেস্ট করে নিয়ে যায়। ধরতে এসেছিলো রোকন বিএসসি স্যারকে। তিনি ছিলেন গণ বাহিনীর সদস্য। বিএসসি স্যার ছিলেন খুব চালাক লোক। তিনি রাতে নিজ বাড়িতে থাকতেন না। পুলিশ রোকন স্যারকে না পেয়ে বুলবুল ভাইকে ধরে নিয়ে যান। বুলবুল ভাই পুলিশকে বুঝাতে চান যে তিনি গণবাহিনীর সদস্য না, তিনি শশুরবাড়ি এসেছেন। কিন্তু পুলিশ সন্দেহ করেন যে বুলবুল ভাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এই বাড়িতে অবস্থান করছেন। এভাবে আরও ৩০/৪০ জন লোককে রাতের বেলায় ধরে এনে বর্গা বাজারে এনে জড়ো করে। কাইলার মহশিন ভাই যাচ্ছিলেন টাঙ্গাইলের উদ্দেশ্যে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে। বর্গার গুদারা (খেয়া) পার হবার সময় পুলিশ তাকেও গণবাহিনীর সদস্য বলে এরেস্ট করলো। দুইজন ভালো মানুষ ধরা পরলো গণবাহিনীর সদস্য সন্দেহ করে। শোনা যায় কিছু লোক পুলিশকে গোপনে টাকা দিয়ে ছাড় পেয়ে যায়। বুলবুল ভাইর মামাশ্বশুর ছিলেন একজন আর্মির লোক। সেসয় আর্মি শাসিত সরকার ছিলো। তিনি ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছিলেন। আর্মিতে চাকরি করা অনেকেই বাড়ি এসে একটা বেত হাতে নিয়ে ঘুরাফেরা করতেন। বেত হাতে থাকা লোককে গ্রামের মানুষ ভয় পেতো। বুলবুল ভাইকে ছাড়িয়ে রাখার জন্য মামাশ্বশুরকে অনুরোধ করলে তিনি বর্গার পুলিশ ক্যাম্পে গিয়ে পরিচয় দিয়ে বেত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন “বুলবুল অত্যন্ত ভালো ছেলে। তাকে কেনো ধরে এনেছেন।” উত্তরে পুলিশ বলেন “আপনি আর্মির লোক। আমি পুলিশের লোক। এলাকার ক্রিমিনাল কেইস আপনার চেয়ে আমি বেশী বুঝি।” পুলিশ ক্ষেপে গিয়ে বুলবুল ভাইকে অন্যান্য গণবাহিনীর সদস্যের সাথে টাঙ্গাইল জেল হাজতে চালান দিয়ে দেন। সাথে অগণবাহিনী মহসিন ভাইও জেলে ঢোকেন। এভাবে জেলে ২৯ দিন কাটে গণবাহিনীর সদস্যদের সাথে বুলবুল ভাই ও মহসিন ভাইর। আমি ঘটনা শুনে খুবই ভেঙ্গে পড়েছিলাম। শুনেছি একই জেলে এলাকার বাহিনীর মুক্তি বাহিনীর একজন কমান্ডারও ছিলেন। তাকে জেল কর্তৃপক্ষ সমিহ করে চলতো। তার নির্দেশে বুলবুল ভাই ও মহসিন ভাই বিশেষ সুবিধা পান খাওয়া দাওয়া ও কম্বল পাওয়ার ব্যাপারে।

 

আমি তখন ছোট ছিলাম। ১৯৭৪ সনে ক্লাস এইটে পড়তাম। একদিকে দেশে অভাব অনটন লেগে আছে অন্যদিকে আইন শৃঙ্খলার ব্যপক অবনতি ঘটছে। খুনাখুনির ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে। বিচার আচার তেমন হচ্ছে না। গণবাহিনী নামে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড বাহিনী গঠিত হয়েছিল। তাদের সদস্যরা বেশী ভাগ নাইন টেন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র ছিল। কেউ কেউ বলতো সর্ব হারা পার্টি। তারা মানুষ মারতো দিনে দুপুরে গুলি করে। কি ভয়াবহ অবস্থা দিয়ে দিন যাচ্ছিল। এলাকার প্রভাবশালী কয়েকজন লোক তাদের দ্বারা খুন হয়। ১৯৭৫ সনে সরকার এদেরকে কঠোর হস্তে দমন করে। তারই ধারাবাহিকতায় বুলবুল ভাই ভুল ক্রমে জেল খেটেছিলেন। আমি বড় হয়ে একজন গণবাহিনীর প্রক্তন সদস্যকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তারা এমন করছিলেন কেন। উত্তরে তিনি বললেন “আমাদের উদ্দেশ্য ভালো ছিল। আমরা দেশে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলাম। সেটা করতে গেলে শ্রেণীশত্রু খতম করতে হবে। সমাজে গুটিকয়েক সুবিধাবাদি শাসনকারী ও শোসনকারী লোক আছে তাদের খতম করতে হবে। সেজন্য আমরা সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে অস্ত্রও সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু আমাদের বাহিনীর তরুন ও যুবকরা এই অস্ত্রের অপব্যবহার করতে থাকে। তাতে আমাদের বাহিনী সফল হতে পারেনি।

 

জেল থেকে বেরিয়ে এসে বুলবুল ভাই আবার সামাজিক কাজে জড়িয়ে পরেন। ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বার পদে দাড়া করিয়ে দেয় গ্রামের সবাই। বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে বুলবুল ভাই মেম্বার হন। আনতে থাকেন সরকারি অনুদান গ্রামের উন্নয়নের জন্য। এর আগেও মেম্বাররা সরকারি অনুদান আনতেন। সেই অনুদান দিয়ে সড়ক ভাঙ্গায় মাটি ফেলতেন। তাতে ছয়মাস সড়ক দিয়ে গরুর গাড়ি ও সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করা যেতো। জ্যৈষ্ঠ -আষাড় মাসে পাহাড়ি ঢলের পানি বাইদ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সড়কে বাধা পেয়ে মেরামত করা স্থান ভেঙ্গে কল কলি পানি যেতো। স্রোতের পানিতে জালি, খুইয়া ও ছিপজাল ফেলে পড়ার মানুষ মাছ ধরতো। সড়কে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যেতো। মেম্বার সাব আবার অনুদান আনতেন বাঁশের সাঁকো তৈরি করার। তাতে সাঁকো দিয়ে মানুষ পারাপার করতে পারতো। গাড়ি পার করতে পারতো না। বছরে দুইবার সরকারি অনুদানের অপচয় হতো। বুলবুল ভাই মেম্বার হয়ে এই অপচয় বন্ধ করেন। তিনি মাটি দিয়ে বাইদের সড়ক ভাঙ্গা বন্ধ না করে একবারে কালভার্ট ও সিমেন্টের ব্রিজ করে ফেললেন। তিনি আমাদের ওয়ার্ডের সব সড়ক ভাঙ্গায় ব্রিজ ও কালভার্ট পূর্ণ করে দিলেন। পরের বার তিনি চেয়ারম্যান পদে ইলেকশন করে বিপুল ভোটে জয়ী হলেন। একবার না পরপর তিন বার ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হলেন। রাস্তা ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ব্যপক উন্নয়ন করলেন।

 

এলাকার পাশকরা ডাক্তারদের দিয়ে ঘন ঘন ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্প করে স্বাস্থ্য সেক্টরে ব্যপক উন্নয়ন করলেন। সরকারি অনুদান এনে ইউনিয়নের প্রতিটা রাস্তা পাকা করেছেন। এই ইউনিয়নের কোন রাস্তা এখন কাঁচা নেই। সব পাকা। শুধু পাকা না, একদম তেলতেলে মসৃণ রাস্তা। সব রাস্তার দু’পাশে গাছ লাগিয়েছেন সারিবদ্ধভাবে। একেক রাস্তায় একেক রকম গাছ। কোন রাস্তার দুপাশে শুধু দেবদারু গাছ, কোন রাস্তার দু’পাশে কৃ্শ্মচুরা গাছ, কোন রাস্তার দু’পাশে শুধু ছেচড়া গাছ, কোন রাস্তার দু’পাশে শুধু তাল গাছ, কোনটিতে শুধু খেজুর গাছ, এমন রাস্তা। কিন্তু কোন একটা রাস্তার গাছের সাথে অন্য কোন রাস্তার গাছের মিল নেই। পূরা ইউনিয়নটাকে বুলবুল ভাই তার মনের মতো করে সাজিয়েছেন। ইউনিয়নের পশ্চিম অংশে নিচু বা ভর অঞ্চল। বর্ষাকালে পলাশতলীর পাদদেশে প্রচুর পানি থাকে। দেখে মনে হয় যেন সমুদ্র সৈকত। তিনি পলাশতলীকে এমন ভাবে সাজিয়েছেন যে প্রতিদিন শত শত পর্যটক বেড়াতে যায় পলাশতলীতে। দিঘীচালার বক্তার খা’র দিঘীর কাছে একটা সুন্দর মনোমুগ্ধকর রেসোর্ট বানিয়েছেন ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য। পুরা ইউনিয়নটাকে বুলবুল ভাইর স্বপ্নের রাজ্য বানিয়ে ফেলেছেন। মইলানি পুকুরটাতে শুধু পদ্মফুল লাগিয়েছেন। যেনো বুলবুল ভাইর স্বপ্নপুড়ী। আমি চাচ্ছিলাম যে অবসরে গিয়ে আমি বুলবুল ভাইকে সময় দেব। তাই, প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছিলাম। গত শীতে বুলবুল ভাইকে নিয়ে গ্রামের বাজারে বসেছিলাম জ্যোস্না রাতে। প্রায় তিন শত লোক জমায়েত হয়েছিল সেই মজলিসে। বুলবুল ভাইয়ের উত্থানের সেই সব গল্প আমি শুনালাম। বুলবুল ভাই মন্তব্য করলেন “তোমার দেখি অনেক কিছুই মনে আছে।” এপ্রিলে আবার যেতে চেয়েছিলাম গ্রামে, স্বপ্নের গ্রামে। কিন্তু করোনা ভাইরাস এসে সব পরিকল্পনা লন্ড ভন্ড করে দিয়েছে।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে সারাদেশ লকডাউন করে দেয়া হলে এলাকার কিছু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। ফেইসবুকে দেখলাম বুলবুল ভাই ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অনুদান বিতরন করছেন। সেই ফান্ডে আমিও বিকাশ করে কিছু টাকা পাঠালাম। বুলবুল ভাইর ফেইসবুক ঘেটে আমার মনে হলো তিনি বেশী কিছু লিখতে পারেন না। শুধু কিছু ছবি পোস্ট করেন। কারো পোস্ট পড়ে ইংরেজিতে শুধু কমেন্ট করেন “nice” অথবা “thanks”। আমি মোবাইল করে বললাম

– ভাই, আপনি ফেইসবুকে তেমন কিছু লেখেন না কেন?

– আসলে আমি তেমন কিছু লেখতে পারি না মোবাইল দিয়ে। তুমি তো দেখি বিরাট বিরাট একেকটা গল্প লেখ। কিভাবে লেখো?

– ভাই, আপনে মনে হয় মোবাইলে বাংলা টাইপ করতে পারেন না। বাংলা টাইপ করতে পারলে অনেক কিছু লেখতে পারবেন। বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা। মায়ের ভাষায় লেখা শিখুন।

– ইংরেজির চেয়ে বাংলাই কঠিন।

– কঠিন না। আমি আপনাকে শিখিয়ে দিচ্ছি। দেখবেন এখই লিখতে পারবেন।

আমি বাংলা লেখার সব কিছুই মোবাইল কলের মাধ্যমেই শিখিয়ে দিলাম। ঈদের পর থেকে প্রতিদিন দুই তিন জন করে ডাক্তার মারা যাচ্ছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে । ফেইসবুকে নিউজ ফিডে মৃত্যু সংবাদ আসছে। আমি সব নিউজ আমার টাইম লাইনে শেয়ার করছি করোনায় শহীদ ডাক্তারদের ছবি সহ। এখন এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে ফেইসবুকে কারো ছবি দেখলেই “ইন্না-লিল্লাহ ” লিখা শুরু করে দেয় কেউ কেউ। গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৪৩ জন ডাক্তারের করোনা হয়ে শহীদ জবার খবর জানা গেছে। এরমধ্যে হঠাৎ খবর এলো আমার স্বপ্নের বুলবুল ভাই আর নেই। মনে পড়লো সেই গাছটার কথা। সেই কাছটা এখনো সেখানেই আছে। আমিও আছি। নেই সেই বুলবুল ভাই। একজন ভালো মানুষ চলে গেলেন এই অসময়ে।

১৯/৬/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

[গল্পটা কাল্পনিক]

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

এখানে

#সাদেকুল #গল্প