শিক্ষার্থীদেরকে কোন কিছু শিখাতে গেলে তার বয়সের দিকে একটু খেয়াল রাখতে হয়। আমি একদিন এই রকম একটা সমস্যায় পড়েছিলাম। ঈদের ছুটিতে কয়েকজন বাচ্চা ছেলে ও মেয়ে একজায়গায় বসে গল্প করছিলো । আমি ভাবলাম এই সুযোগে তাদেরকে একটু ধর্মীয় জ্ঞান দেই। আমি মানব সৃষ্টির শুরুটা কেমন ছিল বুঝাতে গিয়ে আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়া (আঃ) এর সৃষ্টির কাহিনী বললাম। বিবি হাওয়ার অনেক সন্তান হলো বললাম। এরপর বলতে চেয়েছিলাম “যেহেতু সেই সময় আদমের সন্তান ছাড়া আর কোন মানুষের সন্তান ছিলনা, তাই ভাই-বোনের মধ্যেই বিয়ে সম্পাদন হয়। তারপর বিয়ের মাধ্যমে সন্তান জন্ম হয় এবং এভাবে মানব সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন এই অবস্থা হয়েছে।” এর আগেই এক শিশু আমার গল্পে বাধা দিয়ে বলল “তখন তো আদম ও হাওয়া ছাড়া আর কেউ ছিলনা। তাইলে সিজার অপারেশন করে দিলো কোন ডাক্তারে?
– সিজার ছাড়াই হইছে।
– সিজার ছাড়াই বাচ্চা হয়? আমরা এখানে সবাই সিজার অপারেশন হয়ে মায়ের পেট থেকে জন্মেছি। আদমের সন্তানরা সিজার ছাড়াই জন্মিল কেমনে?
আমি ভেবাচেকা খেয়ে গল্প বাদ দিয়ে অন্য ঘরে চলে গেলাম
গ্রামে আমরা কেউ ঘাস কাটতে গেলে তারে কইতাম ঘাসেরে গেছে। আর কেউ মাছ ধরতে গেলে কইতাম মাছেরে গেছে। চেংরাকালে আমি মাছেরে গেতাম। আংগ বাড়ি সখিপুরের পাহার অঞ্চলে। উনা মাসে পাহারে পানি থাকত না। তাই মাছও পাও যাইত না। ভর অঞ্চলে হারা বোছরই পানি থাকত। মাছও মারন গেত হারা বোছর। উনা মাসে পাহাইরারা য়াটে তিগা মাছ কিন্যা আইন্যা খাইত। ১৫/২০ মাইল দূরে তনে মাঝিরা মাছ কান্দে কইরা নিয়া আইত পাহারে য়াটের দিন অইলে। এতদুর আনতে আনতে মাছ কুইয়া বকবকা অইয়া গোন্দ উইঠা যাইত। হেইন্যা ফালাই দিয়ন নাগত। তাই উনা মাসে জিওল মাছ, মাগুর মাছ, কই মাছ, ছাইতান মাছ, টেংরা, বাতাসি, গুইটা বাজাইল ছাড়া আর কিছু পাও গেত না। পাহাইরা মাইনষে জিওল মাছ, মাগুর মাছ, কই মাছ, ছাইতান মাছ বুরকা- পাইল্যায় পানি দিয়া জিয়াইয়া য়াকত। কয়দিন ভইরা য়াইন্দা খাইত। পঁচা মাছ গুলাইনের পাতা দিয়া য়াইন্দা খাইলে গোন্দ করতো না। ইন্যা খাইয়া পেট ভাটভুট করলে গোন্দবাদাইলের পাতা দিয়া হাক য়াইন্দা খাইত। বাইস্যা মাসে পাহারের ধাইরা দিয়া য়াট বইত। হেনু ভৌরারা নানান জাতের মাছ নিয়াইত বেচপার নিগা। বেশিরভাগই ছিল নোরাফেকা মাছ। পদ্মা নদীর ইলসা মাছও এই সব য়াটে নিয়াইত নাইয়ারা।
আমি যেবা কইরা মাছ মারতাম হেইন্যা হুইন্যা আন্নের মোনয়ব আমি বোধকরি বালা ছাত্র আছিলাম না। আমি খুব বালা ছাত্র আছিলাম। হেসুমকার দিনে বাটাজোর বি এম হাই স্কুল অত্র অঞ্চলের মদ্যে সব তিগা বালা স্কুল আছাল। হেই স্কুল তিগা এস এস সি পাস করছি য়েকর্ড ভাইঙ্গা, মানে আগে যারা পাস করছাল তাগ চাইতে বেশি নম্বর পাইছিলাম, জামাল স্যার কইছেন। এহন পর্যায়ের নিহি কেউ আমার নাগালা বালা এজাল্ট করপায় নাই।
আমি স্কুল তিগা আইয়া চাইরডা খাইয়া মাছেরে গেতাম। পুশ মাস তিগা জৈস্টি মাস পর্যন্ত পাহারে পানি থাকত না। তাই মাছেরে যামু কুনু? পাহারে পানি আইলে পানির নগে মাছ আইত। মাছ আইলে মাছেরে গেতাম। জৈস্টি মাসের হেষের দিকে যেদিন বেশি বিস্টি অইত হেদিন চালার বেবাক পানি ঘোনা ঘুনিতে নাইমা বাইদ ভইরা গেত। বাইদের পানিতে জোরা ভইরা গেত। জোরা অইল বাইদের মইদ দিয়া চিকন খালের নাগালা। জোরার পানি গিয়া নামত চাপরাবিলে। চাপরা বিল পানি দিয়া ভইরা গেত। চাপরা বিল উনা মাসেও হুকাইত না। হেনুকার মাছ বেশি পানি পাইয়া উজাইতে উজাইতে আংগ বাইদে আইয়া পড়ত আন্ডা পারনের নিগা। চলাচলা পুটি, হেলাম পুটি, টেংরা, গোলসা, নোন্দা, হৈল, বোয়াল, পাত্যা, ছাইতান, আগ্যা, ইচা, নোন্দা, বাইং, এবা নানান জাতের মাছ পেট ভর্তি আন্ডা নই আইত পাহাইরা হোতের মইদ্যে আন্ডা পারনের নিগা। আমরা বিস্টিত ভিজা, ছাতি মাথায় দিয়া, কলাপাতা পাথায় দিয়া, নয় মাতইল মাথায় দিয়া মাছেরে গেতাম। ক্ষেতের বাতর যেনু পানি যাওনের নিগা কাইটা দিত হেডা কইত জোর। আমরা জোরের হোতের পানিতে জালি পাইত্যা খারই থাকতাম। পানির নিচে জালির নগে ঠ্যাং ঠেহাই য়াকতাম। জালিতে মাছ ঢুইকা যেসুম ঠ্যাংগের মদ্যে গুতা মারত হেসুম জালি উচা করতাম। জালি তিগা মাছ ধইরা খালুইর মদে য়াকতাম। খালুই ভইরা যাইত মাছে। হেই মাছের পেট বোজাই আন্ডা থাকত। হেই জোরের মইদ্যে য়াইতে ঠুই পাইত্যা য়াকতাম। সক্কালে বেলা ওঠনের সোম গিয়া ঠুই চাইতাম। ঠুইয়ের আগায় হেই মাছগুনা বাইজা থাকত। ক্ষেতের বাতরে ঠুই উল্টাইয়া মাছ বাইর করতাম। খালুই ভইরা যাইত। মাছের নগে চেকমেকা, কাকরা, কুইচ্যা, টেপা, হামুক, ইন্যাও বাজত। ইন্যা বাইচ্যা পানিত ঢেইল মাইরা ফালাই দিতাম। জৈস্টি মাসে জাংলাভর্তি জিংগা, পোড়ল অইত। বাড়ির পালানে ডাংগা অইত নশনশা। মা হেইন্যা দিয়া মাছ য়ান্না করতেন। ঢলের মাছ নতুন তরিতরকারি দিয়া এবা মজাই যে নাগ ত গো, খাইয়া পেট ডিগ ডিগ করত।
আষাঢ়, শাওন, ভাদ্দর মাসে খালি বিস্টি অইত। বাইদ বোজাই পানি থাকত। পাহারের পাগার, পুস্কুনি, কুয়া, জোরা পানিতে ভইরা থাকত। এইসুম মাছগুনা বাইদে ছড়াই ছিটাই থাকত। আর মাছের পোনা গুনা বড় অইতে থাকত। হেসুম খালি ঠুই পাইত্যা মাছ ধরতাম। ভাদ্দর মাসের হেষের দিকে যখন বিস্টি কইমা যাইত হেসুম বাইদের জমিতে আমন ধানের গোছা নাগাইত। আর আগে এই জমিগুনাতে ছিল আউশ ধান। বেশি ভাগই ছিল ভাতুরি ধান। ভাতুরি ধান কাটার পর ক্ষেতে য়াল বাইয়া কেঁদা বানাইহালত। ধানের গোছা দেওনের আগে মই দিয়া ক্ষেত হোমান করন নাগত। কেঁদা ক্ষেতে মই দেওনের সূম চংগের পাছের পানি হইরা গিয়া মাছ বাইরইয়া দাফ্রাইতে থাকত। এইন্যা ধইরা ধইরা আমরা খালই বোজাই করতাম। কোমরের পিছনে খালই ঝুলাইয়া বাইন্ধা নিতাম। দুই য়াত দিয়া ধরতাম, আর খালই মইদ্যে য়াকতাম। কই মাছ গুনা কেঁদার উপর কাতাইতে থাকত। কি মজাই যে নাগত! আমি, মজি ভাই, জিন্না ভাই, সিদ্দি ভাই, এবা অনেকেই দল ধইরা হেইন্যা ধরতাম। মজি ভাই মইরা গেছে গাড়ি এক্সিডেন্ট কইরা। পাহাইরা বাইদের মাটি খুব সারিল মাটি। কয়দিনেই ধানের গোছা মোটা য়ই গেত। ক্ষেতে হেসুম টলটলা পানি থাকত। হেই পানি দিয়া নানান জাতের মাছ দৌড়াদৌড়ি করত। দেহা গেত। আমরা ক্ষেতের বাতর কাইটা জোর বানাইয়া হেনু বাইনাতি পাইত্যা য়াকতাম। বাইনাতি বাঁশের বেতি দিয়া বুনাইয়া বানান নাগত। বাইনাতির সামন দিয়া ভাটার মাছ ঢোকার পথ আছে, আবার পিছন দিক দিয়া উজাইন্যা মাছ ঢোকার পথ আছে। মাছ ঢোকপার পায়, বাইরবার পায় না। দিনাপত্তি সকালে বাইনাতি চাওয়া য়ইত। বাইনাতি পাতার সুম মুখ কাঠের, নইলে বাঁশের কচি দিয়া বন্ধ কইরা দেও য়ইত। হেইডা খুইলা মাছ খালইর মদ্যে ঢাইল্যা দেও য়ইত। বেশি ভাগ বাইনাতিত গুত্তুম আর দারকিনা মাছ বাজত। ইন্যা পিয়াজ কাঁচা, মইচ, হৌষার তেল দিয়া ভাজা ভাজা কইরা খাইলে কিবা মজাই যে নাগত গ! যেনুকার বাতর মোটা আছাল, হেনুকার বাতর ভাঙ্গাও বড় বড় আছাল। হেনু বাইনাতি না পাইত্যা বড় বড় দোয়ারি পাতন নাগত। দোয়ারি বাইনাতির নাগালা দুইমুরা চোক্কা না। দোয়ারি অইল বাসকর মোত। ইন্যাও বাঁশের হলা দিয়া বুনাইয়া বানায়।
আশ্বিন মাসে বেশি বিস্টি অইত না। ধানের গোছাগুনাও মোটা মোটা অইত। হেইন্যার ভিতর দিয়া মাছ কপ কপ করত। য়ইদের তাপে ক্ষেতের পানি ততা অই গেত। মাছগুনা যেম্মুরা গাছের ছেওয়া পড়ত হেম্মুরা আই পড়ত। আমরা স্কুল তিগা আইয়া বশ্যি নিয়া মাছেরে গেতাম। বশ্যির আধার গাত্তাম খই, কুত্তাডেউয়ার আন্ডা, নয় চেরা দিয়া। চেরাগুনারে জির কিরমিরমির নাগালা দেহা গেত। উন্যারে গাছতলের ভিজা মাটি তিগা কোদাল দিয়া কোবাইয়া বাইর কইরা ছেনি দিয়া টুকরা টুকরা কইরা কাইট্যা নিতাম। বড় বড় পিপড়াগুনারে আমরা ডেউয়া কইতাম। কুত্তার মোত অইলদা য়োংগের ডেউয়ারে কইতাম কুত্তাডেউয়া। গজারি গাছের আগায় পাতা পেঁচাইয়া কুত্তাডেউয়ায় বাহা বানাইয়া আন্ডা পারত। হেই আন্ডা দিয়া বশ্যি হালাইলে বেশি মাছ ধরত। তরুই বাঁশ দিয়া বশ্যির ছিপ বানাইতাম। না পাইলে বৌরাবাঁশের কুইঞ্চা দিয়া ছিপ বানাইতাম। খালই বুনাইতাম তল্যা বাসের বেতি দিয়া। গোছা ক্ষেতে বশ্যি ফালাইলে বড় বড় আগ্যা মাছ ধরত। পানির মদ্যে বশ্যি নাচাইলে আগ্যা মাছ ফালাই ফালাই আইয়া বশ্যির আইংটায় বাইজা পড়ত। খোট্টা দিয়া টানে তুইল্যা হালাইতাম। কোন কোনডা ছুইট্টা গিয়া আড়া জোংগলে গিয়া পইরা হাটি পারতে থাকত। পাতা খুচখুচানির শব্দ হুইন্যা আগ্যা মাছের ঘারে ধইরা খালইর মইধ্যে ভইরা ফালাইতাম। মাছ যাতে তাজাতুজা থাহে হেইজন্য জগের মইদ্যে নয় বদনার মইদ্যে পানি দিয়া জিয়াই য়াকতাম। আগ্যা মাছ জাইরা আছে৷ বদনায় য়াকলে আগ্যা মাছ হাটি মাইরা বাইরই গেত দেইখা হিসার জগে য়াকতাম। শিক্ষিত মাইন্সে আগ্যা মাছরে রাগা মাছ কইত ফ্যারাংগি দেহাইয়া। ভৌরা মাইনষে আগ্যা মাছ খাইত না। তারা গুত্তুম মাছও খাইত না। বংশি-মান্দাইরা চুইচ্চা খাইত। তারা কাছিমও খাইত। কাছিম জোংগলেও থাকত। ইন্যা খুব বড় বড় ছিল। ইন্যারে কইত দুরা।
বাইদের পানির টান পরলে মাছগুনা পাগার, জোরায় গিয়া জরা অইত। আমরা হেইন্যারে খুইয়া, জালি, জাহি জাল, নয় ছিপজাল দিয়া মাইরা খাইতাম। বিষগোটা ছেইচ্ছা পাগারে ছিটাই দিলে মাছ গাবাই উঠতো। গাবাইন্যা মাছ ধইরা আরাম পায়ন গেত। পাগারের মাছ, জোরার মাছ ইন্যা পালা মাছ আছাল না। তাই যে কেউ ইন্যা মারতে পারত। আমরা চন্দের জোরা, আলম ঠাকুরের জোরা, ওহা বেপারির জোরা, খাজাগ জোরা, নাটুগ পাগার, কলুমুদ্দি তাওইগ পাগার তিগা ভরা মাছ মারছি। ঘাট চওনার জোরায় তনে ভরা ইচা মাছ মারছি খুইয়া দিয়া দোয়াইয়া। এনুকার পানি কইমা গেলে কেঁদার নিচে বাইং মাছ বই থাকত। কেঁদা পারাইলে পায়ের নিচে পিচলা নাগত বাইং মাছ। পায়ের নিচ দিয়া য়াত দিয়া কেঁদা হুইদ্যা বাইং মাছ টানে মেইল্যা মারতাম। য়াত দিয়া ধরতে গেলে বাইং মাছ পিচিল্যা যায় গা। একবার করছিলাম কি, এবা কইরা এডা মাছ কেদাসুদ্যা মেইল্যা মারছি, হেডা গিয়া পড়ল এডা ঝোপের ভিত্তরে। আমি ঝোপের ভিতর ফুস্কি দিয়া দেহি মেলা মাইনষের কংকাল, এহেবারে ঠেংগি দিয়া য়াকছে। ডরের চোটে তাত্তারি মাছ মারন বাদ দিয়া বাইত আই পরছি। য়াইতে হুইয়া হুইয়া বাবার নগে হেই কতা কইছি। বাবা কইল যে বংশি – মান্দাইরা কলেরা-বসন্ত হইয়া বেশি মানুষ মইরা গেলে চিতায় না পুইরা এবা ঝোপের মইদ্যে পালা দিয়া য়াকত। হেইন্যা মোনয় হুকাইয়া কংকাল অইছে।
কাতিমাসে বেশি মাছ মারন গেত। বাইদের ছোট ছোট গাতায় ভরা মাছ থাকত। টিনের থালি দিয়া হেই পানি হিচ্চা মাছ ধরতাম। এলকা পানি হিস্তে কষ্ট অইত। হেইজন্যে হাজা ধইরা হিচা মাছেরে গেতাম। পানি হিচা যে যেডি ধরাহারি হেডি ধইরা নিয়াইতাম। শাজাহান ঠিকমোত চোহে দেকত না। কেঁদার মইদ্যে খালি আতাপাতা করত। এই জন্যে যদি কইতাম “শাজাহান, হিচা মাছেরে যাবি নিহি?” শাজাহান কইত “ভাগে নিলে যামু।” আমি যে বোছর সেভেনে পড়ি, হেই ১৯৭৩ সোনে, হে ট্রাক্টরের চাকার নিচে পইরা মইরা গেছে। অহনো তার নিগা আমার পরণ পোড়ে। কেঁদার মইদ্যে মাছ ধরতে গেলে শইলে কেদা নাগত। যতই বালা কইরা গোসল করতাম কানের নতির পাছে কেদা নাইগাই থাকত ধলা অইয়া। খাবার বইলে পড়ে মা হেই কেঁদা আচল দিয়া মুইছা দিত।
কাতিমাসে পাহারের পানি হুকাই গেলে সব মাছ গিয়া চাপরাবিলে জরা অইত। মাছে বিল কপকপ করত। হুনিবার মোংগলবারে চাপরাবিলে মাছ মারনের নিগা মানুষ পিল্টা পরত। হেইডারে কইত বাওয়ার মাছ। বেশি মানুষ একবারে পানিত নামলে মাছ গাবাই উঠতো। তাই ধরাও পড়ত বেশি বেশি। এই জন্য সবাই বিলে মাছেরে যাওনের নিগা ডাহাডাহি পারত। অনেকে পরভাইত তিগাই শিংগা ফুয়াইত। শিংগার ফু হুইন্যা পাহাইরা মানুষ গুনা যার কাছে যেডা আছে হেডা নিয়া ভাইংগা চুইরা আইত চাপরা বিলে। এক নগে জাহইর দিয়া বিলে নামত নানান ধরনের জিনিস নিয়া। হেন্যা অইল মোন করুন চাবি, পলো, টেপারি, ফস্কা, কোচ, খুইয়া, জালি, ছিপজাল, ঝাকিজাল, চাকজাল আরও কত কী! ইলশা মাছ ছাড়া আর যত ধরনের মাছ আছে সব পাও গেত এই বিলে। খালইর চাইরমুরা পাটখরির মোঠা বাইন্দা দিত যাতে খালই পানিত ভাইসা থাহে। বড় বড় খালই ভইরা মাছ আইন্যা উঠানে ঢাইল্যা দিত। মেওপোলা মাইনষে হেইন্যা দাও বটি দিয়া কুইটা পাট খরিতে গাইতা দড়ি দিয়া ঝুলাইয়া অইদে হুকাইয়া হুটকি কইরা য়াকত নাইন্দার মইদ্যে। খাইত কয় মাস ধইরা। চাপরা বিলের আশে পাশের পাহাইরা গ্রামের মানুষ তিগা নিয়া হেম্মুরা হেই আংগারগাড়া পর্যন্ত মানুষ চাপরা বিলের মাছ মারতে আইত। হেই গেরামের নামগুনা আমি কইতাছি হুনুন – গবরচাহা, বৈলারপুর, য়ামুদপুর, বাঘেরবাড়ি, বেড়িখোলা, আন্দি, হুরিরচালা, চেল ধারা, নাইন্দা ভাংগা, গড়বাড়ি, বুড়িচালা, ইন্দাজানি, কাজিরামপুর, আদানি, ভাতগড়া,, ভুয়াইদ, পোড়াবাহা, ছিরিপুর, খুইংগারচালা, চটানপাড়া, ছোট চওনা, বড় চওনা, ঢনডইনা, হারাইসা, বাহার চালা, কাইলা, কৌচা, আড়াই পাড়া, ধলি, জামাল আটখুরা, দাইমা, ডাকাইতা, আরও ভরা গেরাম যেগ্নার কতা অহন মোনাইতাছে না। আমি হুনছি ভৌরারা চাপরা বিলে মাছেরে আইত না। আব ক্যা, তাগ কি মাছের অভাব আছে?
আংগ খালাগ বাড়ি মাইজ বাড়ি, আর বুগ বাড়ি অইল আমজানি। দুইডাই গাংগের পারে। বংশি নদীডারে আমরা গাং কই। আপারে আমরা বু ডাকতাম। জৈস্টি মাসের হেষের দিকে গাং পানিতে ভইরা যাইত। আমি বুগ বাইত গেলে, খালাগ বাইত গেলে বশ্যি নইয়া গাংগে মাছেরে গেতাম। আমজানির এবাদত ভাই, য়শি ভাই, হায়দার ভাই, আর মাইজ বাড়ির ইয়াছিন, ইসমাইল ভাইর নগে বশ্যি বাইতাম। ইয়াসিন ক্যান্সার অইয়া মইরা গেছে। তার নিগাও পরণ পোড়ে। আমার খালাত ভাই। বড় বড় নাইয়া বাইং, গুজা মাছ, হেলাম পুটি, বাইলা মাছ ধরত বশ্যিতে। ধরার আগে মাছে আধার ঠোকরাইত। হেসুম পাতাকাটি পানিতে নাচন পারত। তা দেইখা মোনের মইদ্যেও নাচন আইত। পাতাকাটি তল অইলে খোট্টা দিয়া মাছ তুইল্যা ফালাইতাম। বশ্যির মইদ্যে আটকাইয়া মাছ দাফরাইতে থাকত। কান্তা তিগা বশ্যি খুইলা মাছ খালইর মইদ্যে য়াকতাম। বুগ পাট ক্ষেতে চলাচলা পুটি মাছ দৌড় পাড়ত। হেইন্যা য়াত দিয়াই ধইরা ফালাইতাম। খালুই ভইরা যাইত পুটি মাছে। একটা আগ্যা মাছ ধরছিলাম দেইক্যা য়শি ভাই কয় “শালার পাহাইরায় আগ্যা মাছ ধরছে। আগ্যা মাছ মাইনষে খায়?” অশি ভাই দুলাভাইর চাচত ভাই। হেও মইরা গেছেগা। আগন পুষ মাসে গাংগের পানি কুইমা যাইত। কয়জনে মিল্যা গাংগে ঝার ফালাইত। হেই ঝারে বড় বড় বোয়াল মাছ, আইর মাছ, চিতল মাছ জরা অইত। ডল্যা জাল, নয় ঝাকি জাল, নয় চাক ঝাল দিয়া হেইন্যা ধরত। দুলাভাইরা কয়জনে ভাগে গাংগে ঝার ফালাইছাল। হেই ঝার তনে একটা মস্ত বড় পাংকাশ মাছ
ধরছাল। হেইডা কাইটা ভাগ কইরা নিছাল দুলাভাইরা। হেসুম বু আংগ বাইত্যে আছাল। দুলাভাই হেন তিগা এক ভাগা আংগ বাইত্যে নিয়াইছাল। আমি হেসুম দুল্যা আছিলাম। পাংকাশ মাছের নাম হেদিন হুনলাম। হায়রে মজা নাগছাল হেইডা!
আংগ নানিগ বাড়ি অইল ভরে, য়ৌয়া গেরামে। শিক্ষিত মাইনষে কয় রৌহা। হেনু গিয়াও মাছেরে গেছি। য়াইত কইরা আন্ধাইরের মইদ্যে বোরো ধান ক্ষেতের বাতর দিয়া আইটা যাওনের সোম হলক ধরাই যাইতাম। হলকের আলো দেইখা হৈল মাছ আইগাই আইত। কাছে আইয়া চাই থাকত। হেসুম ফস্কা দিয়া ঘাও মাইরা ধইরহালতাম। যাগ ফস্কা না থাকত তারা পাট কাটনের বাগি দিয়া কোপ মাইরা হৈলের ঘার কাইটাহালত। হৈল মাছ, সাইতান মাছ এক ঝাক পোনা নিয়া ঘুরাঘুরি করত। হেই পোনা খুইয়া দিয়া খেও দিয়া মারতাম। পোনামাছ ভাজি খুব বাসনা করত। এহন বুঝি উগ্না মারন ঠিক অয় নাই।
বাইস্যা মাসে আমি, ফজু ভাই, কাদে ভাই, নজু ডিংগি নাও নিয়া হুক্নি বিলের মইদ্যে গিয়া বশ্যি ফালাইতাম। বড় বড় ফইল্যা মাছ ধরত। নজু আমার তিগা এক বোছইরা ছোট আছাল। হে ছোট বালাই য়ক্ত আমাশা অইয়া মইরা গেছে। আশিন মাসে পানি নিটাল অইয়া গেত। চামারা ধান ক্ষেতের ভিতর হল্কা মাছ খাওয়া খাইত। হেসুম পানিত ছোট ছোট ঢেউ উঠত। আমি আর ভুলু ভাই ডিংগি নাও নিয়া যাইতাম মাছেরে। আমি পাছের গলুইয়ে বইয়া নগি দিয়া নাও খোজ দিতাম। ভুলু ভাই সামনের গলুইয়ে কোচ নইয়া টায় খারই থাকত। বিলাইর নাগালা ছপ্পন ধইরা। মাছে যেই য়া কইরা কান্তা নড়াইত অবাই ভুলু ভাই কোচ দিয়া ঘাও দিয়া ধইরা ফালাইত। আমি পৌকের নাগাল পাছের গলুইয়ে বই থাকতাম। ভিয়াইল আংগ ফুবুগ বাড়ি। হেনু গিয়াও এবা কইরা মাছ মারতাম গিয়াস ভাই, মতি ভাই, সূর্যভাই, সামসু ভাই, জিয়াবুল ভাই, চুন্নু ভাইগ নগে। চুন্নু ভাই, জিয়াবুল ভাই মইরা গেছে। ভিয়াইল আংগ কাক্কুগ বাড়িও। হায়দর ভাইর নগেও এবা কইরা মাছ ধরছি। ভৌরা মাইনষে আশিন মাসে পানির দারার মইদ্যে বড় বড় খরা পাইত্যা নোড়া ফেকা মাছ মারত। ফুবার নগে গিয়া ভরা নোড়া ফেকা মাছ কিন্যা আনছি নায় চইরা। কাতি মাসে তালতলাগ বোগল দিয়া যে বিলগুনা আছাল হেইগ্নার যত মাছ গোলাবাড়ির খাল দিয়া আমজানির গাংগে গিয়া নামত। আংগ গেরামের মাইনষে হেই খালে ছিপ জাল পাইত্যা হেই মাছ ধরত। খালের পাড়ে মাচাং বাইন্দা বইয়া বইয়া ছিপজাল বাইত। এহাকজোনে বাইক কান্দে নইয়া এক মোন দের মোন গোলাবাড়ি তিগা মারা পুটিমাছ আইন্যা উঠানে ঠেংগি দিয়া ঢালত। এত মাছ কিবা কইরা মারে ইডা দেকপার নিগা আমি আর জিন্না ভাই এক নগে গোলাবাড়ি গিয়া য়াইতে মাচাংগে হুইছিলাম। যাওনের সুম দেহি হাইল হিন্দুইরা খালে গুদারা নাই। অহন পাড় অমু কিবায়? ঘাটে কোন মানুষ জোনও আছাল না। জিন্না ভাই কইল “তুই অম্মুহি চা।” আমি চাইছি। ঘুইরা দেহি জিন্না ভাই এক য়াতে কাপর উচা কইরা ধইরা আরেক য়াত দিয়া হাতুর পাইরা খাল পাড় অইতাছে। দিস্ কুল না পাইয়া আমিও কাপড় খুইলা এক য়াতে উচা কইরা ধইরা হাতুর পাইরা পার অই গেলাম। য়াসুইন না জানি। হেসুম পোলাপান মানুষ আছিলাম। কেউ ত আর আংগ দেহে নাই। শরমের কি আছে? গোলাবাড়ি গিয়া দেহি হারা খাল ভর্তি খালি ছিপ জাল। ষাইট সত্তুরডা জাল পাতছে ছোট্ট এডা খালে, ঘোন ঘোন, লাইন দইরা। বেক্কেই য়াইত জাইগা জাল টানে। দিনে বেশি মাছ ওঠে না। য়াইতে নিটাল থাকে দেইখা মাছ খালে নামতে থাহে। দিনে বেক্কেই ঘুমায়। আমি আউস কইরা কয়ডা খেও দিছিলাম। অত বড় জাল আমি তুলবার পাই নাই। তাত্তারি মাচাংগে গুমাই পড়ি। হেষ আইতে ঘুম ভাইংগা যায় জারের চোটে। কাতি মাস অইলে কি অব, য়াইতে জার পড়ত। দেহি য়াত পাও টেল্কায় শান্নিক উইঠা গেছে গা। বিয়ান বেলা কোন মোতে কোকাইতে কোকাইতে বাইত আই পড়লাম। এন্তিগা এবা সর্দি নাগল গ, এক হপ্তা পর্যন্ত সর্দি জ্বর বাইছিল। জ্বর নিয়া কাতি মাসে বিয়ানবেলা য়ইদ তাপাইতে বালাই নাগত। এক নাক ডিবি ধইরা বন্ধ অই থাকত। নজ্জাবতি ফুলের বোটা ছিড়া নাকে হুরহুরি দিলে বাদা আইত। হাইচ্চ দিলে নাক বন্ধ খুইলা গেত। জোড়ে জোড়ে নাক ঝাইরা পরিস্কার করতাম। আমি গোলাবাড়ি একবারই গেছিলাম।
গোলাবাড়ির মাছ মারা নিয়া এডা মজার কতা কই। একবার এডা মেওপোলা য়োগী নিয়া আইল এক বেটা আংগ এলাকা তিগা। কাগজপাতি ঘাইটা দেকলাম সখিপুর আর টাঙ্গাইল তিগা ভরা টেহার পরীক্ষা করছে। খালি টেহাই গেছে। আমি কইলাম “ভরাইত পরীক্ষা করছুইন।” বেটাডায় য়াগ কইরা কই উঠলো “আন্নেরা সখিপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিং য়োগীগ কাছ তিগা টেহা নিয়নের নিগা গোলাবাড়ির খালের মতো জাল ফালাইছুন ক্লিনিক কইরা। গোলাবাড়ির খালে যেবা উজান ভাটি সব জালেই হোমানে মাছ বাজে, হেবা আন্নেগ বেবাক ক্লিনিকেও গেরামের মাইনষের টেহা বাজে। বেটা মাইনষে বিদেশে কষ্ট কইরা টেহা কামাই কইরা দেশে পাঠাইতাছে, আর হেই টেহা আন্নেরা জাল পাইত্যা ছাইব্বা তোলতাছুইন। য়োগী বালা অওনের নাম নাই। খালি টেহা নিতাছুইন। ” আমি কইলাম “য়োগী ডাকতরেরা বালা করবার পাবনা। বেটির জামাইরে দেশে নিয়াই পড়ুন। দেকবাইন এবাই বালা অই যাবো গা। “
জারের দিনে নানিগ বাড়ির চহের পানি হুকাই গেত। পাগারের পানি পানায় ঢাইকা গেত। আমি আর ফজু ভাই হেই পানিত তিগা খুইয়া দিয়া দোয়াইয়া মাছ মারতাম। ফজু ভাই পানার নিচ দিয়া খুইয়া ঠেইল্যা দিত। পানা হুইদ্যা খুইয়া উচা কইরা ধরত। আমি খাবলাইয়া পানা হরাইয়া দিতাম। হেই খুইয়ায় খইলসা মাছ, চাটা মাছ, কই, জিওল, মাগুর মাছ উঠত। চাটা মাছ খইলসা মাছের নাগালা দেখতে, তে একটু ছোট। আমি চাটারে খৈলসা কইছিলাম দেইকা ফজু ভাই কইল “এই শালার পাহাইরা, চাটা মাছ চিনে না!” তিন আংগুল দিয়া মাথা আর ঘার পেইচা ঠাসি মাইরা ধরন গাগত জিওল মাছেরে। কাতা দেয় দেইকা আমি ডরে জিওল মাছ ধরহাইতাম না। একদিন সায়স কইরা ধরবার নিছিলাম। অবাই একটা কাতা খাইলাম। হায়রে বিষান নইল! বিষের চোটে উজা নাফ পারন নইলাম। কানতে কানতে নানিগ বাইত গেলাম। মামানি কাতা দিওন্যা যাগায় চুনা নাগাই দিলে বিষ কিছুডা কমল। তারপর বিষ নামাইন্যা ঝারা দিল এবা কইরা
আউরা জাউরা বিষের নাম,
কোন কোন বিষের নাম।
অ বিষ ভাটি ছাইড়া যাও।
যুদি ভাটি ছাইরা উজান ধাও,
মা পদ্মার মাথা খাও।
অ বিষ ভাটি ছাইরা যাও।
ঝারা দেওনের ভরাক্ষোন পরে বিষ কোমলে ঘুমাই পড়ি। আমি আর কূন্দিন কাতা খাই নাই। কাতা খাইয়া এডা উপুকার অইছে। য়োগিরা যেসুম কয় “য়াত পাও এবা বিষায় জানি জিওল মাছে কাতা দিছে। ” হেসুম আমি বুঝি কিবা বিষায়।
শাওন ভাদ্দর মাসে আমজানি দুলাভাইগ পালানের পাট কাটার পরে কোমর তুরি পানি থাকত। হেই পানিত চেলা, মলা, ঢেলা, বাতাসি, তিতপুটি, এবা ভরা মাছ থাকত। দুলাভাইর নগে মুশুরি টাইনা হেইন্যা ধরতাম হিসার পাইল্যা বোজাই কইরা। হিসার পাইল্যা পানিত ভাইসা থাকত। মাছ ধইরা পাইল্যায় য়াকতাম।
চৈত বৈশাখ মাসে পানি হুকাই যাইত। নানিগ বোরো ক্ষেতে হিচা দিয়া পানি হিচপার নিগা গাড়া কইরা মান্দা বানাইত। হেই মান্দা হিচা মাছ ধরতাম। অইদের তাপিসে কাঠের নাও হুকাইয়া বেহা ধইরা গেত দেইখা ইন্যারে পুস্কুনির পানিতে ডুবাই য়াকত। নায়ের পাটাতনের নিচ দিয়া মাছ পলাই থাকত। আমরা দুই তিন জোনে মিল্যা ঝেংটা টান মাইরা নাও পারে উঠাই ফালাইয়া নাও তিগা মাছ ধরতাম। মামুরা পুস্কুনিতে ডল্যা জাল টাইনা বড় বড় বোয়াল মাছ ধরত। জালে মইদ্যে বাইজ্যা হেগ্নায় হাটিহুটি পারত। মামুগ কান্দের উপুর দিয়া নাফ দিয়া যাইত গা বড় বড় বোয়াল। পুস্কুনির পাড়ে খারইয়া আমরা তামসা দেখতাম।
মাছ মারনের এবা ভরা কতা লেহন যাবো। কিন্তু এত সোময় আমার নাই। আন্নেরা ত জানুইনই আমি একজোন ডাকতর মানুষ। ডাকতরে গ কি অত সোময় আছে? একটা হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান আমি। দিনাপত্তি বিয়ানবেলা সারে আটটা তিগা বিকাল আড়াইডা পর্যন্ত হেনু কাম করন নাগে। বৈকাল চাইরডা তিগা য়াইত নয়ডা পর্যন্ত নিজের প্রাইভেট ল্যাবরেটরিতে কাম করি। হেনু গেরামে তিগা মেলা লোক আহে। তাগ নগেও কতা কওন নাগে। শুক্কুরবারে বন্ধ থাহে। হেদিন য়াবিজাবি কাম করি। চাইরডা মেডিকেল জার্নাল সম্পাদনা করন নাগে আমার। বই লেহি। কম্পিউটারের সফটওয়্যার বানাই বিক্রি করি। ছাদবাগান করি। অনলাইনে ক্লাস নেই। জুমে মিটিং করি। ইউটিউব ভিডিও বানাই। মেয়াগ নগে, নাতি নাত্নিগ নগে, বন্ধুগ নগে, শালা সুমুন্দি গ নগে ভিডিও কলে কতা কইতে য়য়। এবা আরবিলের মইদ্যে থাকি। আন্নেগ নগে মাছ মারা নিয়া আর লেহনের সোময় নাই। অহন চেম্বারে যামু, থাইগ্যা। দোয়া করুইন জানি।
১৩/৭/২০২১ খ্রি.
ময়মনসিংহ
দিন চারি ঠিকানা সখিপুরের ঢনঢইনা গেরামের বড়বাইদ পাড়ার তালুকদার বাড়ি।
আমি বুঝমান হয়েই দেখেছি আমাদের বড়বাইদপাড়া গ্রামের আজিম উদ্দিন সিকদার বাড়ির কেন্দ্রীয় মসজিদটি। আমরা বলতাম জুম্মাঘর। এটার চালের ছাউনি ছিলো ঢেউ টিনের। বেড়া ছিল চেপটা টিনের। মেঝে ছিল কাঁচা। চট বিছিয়ে নামাজ পড়তাম। ঐ বাড়ির মানুষ জুম্মা ঘরে পাঞ্জেগানা নামাজ আদায় করতেন আজান দিয়ে। গ্রামের মুছুল্লিরা শুধু শুক্রবার জুম্মার নামাজ জামাতে আদায় করতেন। প্রতি বৃহস্পতিবার কাক্কী (জয়নাল ভাইর মা) জুম্মাঘরের মাইঝাল (মেঝে) ও পিড়া (ডোয়া) হাইল মাটি (বাইদের মাটি) দিয়ে লেপে দিতেন।
আজিম উদ্দিন সিকদার দাদা বহরমপুর থেকে এসে এখানে বাড়ি করে একটা পুকুর খনন করেন সেই ব্রিটিশ আমলে। পুকুরের পশ্চিম পাশে তিনি এই জুম্মাঘর নির্মাণ করেন গ্রামের মানুষের নামাজ আদায় করার জন্য। উত্তর পাড়া, পশ্চিম পাড়া, পূর্বপাড়া, তালুকদার বাড়ি, নওপাড়া ও চনপাড়ার সব মুছুল্লিরা এই মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করতেন। এই মসজিদকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষের মিলন মেল হতো। মসজিদ প্রাঙ্গণে বড় আম গাছ ছিলো। সেই আমগাছের নিচে একটা বাঁশের মাচাং ও দুইটা ঘোড়া কাঠ ছিলো। নামাজ শুরুর আগে ও পরে এখানে বসে যুকক ও কিশোর বয়সের মুছুল্লিরা খোস গল্প করতো। গ্রামের মানুষের সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে বড়রাও আলাপ আলোচনা করতেন। গ্রামের মাতবর ছিলেন কোরবান আলী সিকদার কাক্কু ও কাশেম তালুকদার কাক্কু (মিয়াকাক্কু)। মাতবরের মুখের উপর কেউ কথা বলতে পারতো না।
এই মসজিদের ইমাম ছিলেন শিরিরচালার হাছেন ক্কারীসাব। তিনি শুক্রবারের জুম্মার নামাজে ইমামতি করতেন। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত খেয়ে মিলাদ পড়ে দোয়া করে বখসিয়ে দিতেন। আমাদের শমে কাক্কুও মিলাদ পড়াতেন। আমাকেও সাথে নিয়ে যেতেন তালেবে ইলিম হিসাবে।
আমগাছ তলায় মাঝে মাঝে মাসআলা নিয়ে অল্প বয়সের যুবকদের মধ্যে তর্ক লেগে যেতো। মিয়া কাক্কু এগিয়ে এসে থামিয়ে দিয়ে সঠিক মাসআলা কি হবে বলে দিতেন। মিয়া কাক্কুর উপরে কেউ কোন মাসআলা বলতে সাহস পেতো না। মাসআলা বলার পরে এটা পাকাপোক্ত করার জন্য ইমাম সাবকে জিজ্ঞেস করতেন “তাই না হুজুর?” হুজুর ইতস্তত করে গোল টুপিটা ডান হাত দিয়ে হালকা ঘুরান মেরে বলতেন “ঐত্য।” তারপর টুপিটা মাথা থেকে খুলে ফু দিয়ে গোল করে আবার মাথায় পরে দ্রুত চলে যেতেন জুম্মা ঘরের ভিতর। ‘ঐত্য’ কথাটি একটি হালকা সম্মতিসরূপ একটি শব্দ। আমার মেয়ে দুটি যখন ছোট ছিলো তখন দুজনে মাঝে মাঝে তর্কে করে কার কথা ঠিক এটির সমাধান নিতে আমার কাছে এলে আমিও বলে দিতাম “ঐত্য। তোমাদের জন্য আজ কি যেনো আনত হবে?”
ইমাম সাব ছিলেন ক্কারী। অল্প কিছু মাস আলা জানতেন। অল্প কিছু বয়ান করতেন খুতবার আগে অথবা নামাজের পর দোয়ার আগে। দোয়াকে মুছুল্লিরা খুব প্রয়োজন মনে করতেন। শেষ দোয়া না করে কেউ বের হতে চেতেন না। জুম্মার নামাজ শেষ হতে প্রায় দুটো বেজে যেতো। মুছুল্লিদের ক্ষুধা পেতো। হুজুর দোয়া করার আগে কিছুক্ষণ বয়ান করতেন। মুছুল্লিরা কেউ কেউ বলে উঠতেন “হুজুর, দোয়া কইরা দেইন।” হুজুর বলতেন “মুক্তাছার করতাছি। আর এটু বহুন।” মুক্তাছার মানে কি আমি জানি না। তবে বুঝে নিয়েছি ‘সংক্ষিপ্ত’। হুজুর হাছেন ক্কারী সাব ছিলেন মুক্তার আলী মাস্টার স্যারের বড় ভাই। উভয়ই খুব ভালো মানুষ।
আয়েন উদ্দিন সিকদার দাদার ছেলে হাছেন সিকদার কাক্কু খুব নিয়মিত মুছুল্লি ছিলেন। তিনি সবার আগে এসে প্রথম কাতারে ইমাম সাবের পিছনেই বসতেন। সবার শেষে তারাহুরো করে উপস্থিত হতেন ওহাদালী কাক্কু (ওয়াহেদ আলী)। ওহাদালী কাক্কু অল্প লেখাপড়া জানলেও সুর করে ভালো পুথি পড়তে পারতেন। আমি মাঝে মাঝে কাক্কুদের বাড়ি গিয়ে পুথি পড়তে বলতাম। কাক্কু বারান্দায় জলচৌকিতে বসে আমাকে পুথি পড়ে শুনাতেন। আমরা পুথিকে বলতাম কিতাব। এটা ছিলো জংগে কারবালার কিচ্ছা। কাক্কু চৌকিতে কিতাব খুলে রেখে সোজা হয়ে বসে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে অভিনয় করে কিতাব পাঠ করতেন। “ঘোরায় চড়িয়া মর্দ চলিতে লাগিলো ” বলার সময় মনে হতো যেনো কাক্কুই চড়ে তলোয়ার হাতে ছুটে চলেছেন। “শত শত মারা গেলো মর্দ কাতারে কাতার” শুনে মনে হতো কাক্কুর সামনেই শত শত সৈন্য শহীদ হয়ে পড়ে আছে। কিতাবের করুণ পংতিগুলো কাক্কু এক গালে হাত রেখে করুণ শুরে বিলাপ করে পড়তেন “ও সিমার সিমাররে……। “
জুম্মার নামাজের কোন টাইম টেবিল ছিলো না। সব মুছুল্লিরা চলে এলেই নামাজ শুরু হতো। সব মুছুল্লিরা চলে এলেও অনেক সময় মাদবর কাক্কুরা আসা পর্যন্ত হুজুর অপেক্ষা করতেন। ওহাদলী কাক্কু সবার শষে তারাহুরো করে এসে অজু করে টুপিটা মাথায় ঢুকাতে ঢুকাতে জুম্মাঘরে প্রবেশ করতেন। হাছেন সিকদার কাক্কু বলতেন ” হুজুর, নামাজ শুরু করুন। ওহাদালী আইপড়ছে।” হাছেন কাক্কু খুব ফক্কর ছিলেন। তিনি খালি হাসাতেন। একবার জুম্মায় আগে আসার গুরুত্ব নিয়ে মুক্তাছার বয়ান করছিলেন “জুম্মার নামাজে আগে আইলে বেশী লাভ। যেমন ধরুন, যে অজ প্রথম আইলো, হে পাইল একটা উট কোরবানি করার সমান ছোয়াব, যে তারপর আইল, হে পাবো একটা গরু কোরবানি করার সমান ছোয়াব, তারপর যে আইলো হে পাবো একটা ছাগল কোরবানি করার সমান ছোয়াব, এভাবে কমতে কমতে সবার শেষে যে আইলো হে পাইলো একটা মুরগি কোরবানি করার সমান ছোয়াব।” হাছেন কাক্কু হেসে বলেন “হুজুর, মুরগি কোরবানি করার ছোয়াবটা তাইলে ওহাদালী পাবো।” হুজুর বললেন “বয়ানের সোম কথা কইন না জানি কেউ।” আমি মনে করলাম “উট কোরবানি করার সমান ছোয়াবটা হাছেন কাক্কুই পেলেন।” অথচ ওয়াদালী কাক্কুর বাড়ি কিন্তু জুম্মাগরের কাছেই ছিলো। তারপরও উট কোরবানি করার সমান ছোয়াব কামাই করতে পারেননি।
আরেকদিন আল্লাহর নিয়ামত ও কুদরত নিয়ে হুজুর জুম্মাঘরে বয়ান দিতেছিলেন “আল্লাহ কত নিয়ামত আমাদেরকে দিয়েছেন! কত সুস্বাদু ফল দিয়েছেন আমাদের জন্য! কাঠাল, আম, জাম, কলা, লিচু, আনারস, এমন অনেক কিছু।” হাছেন কাক্কু খুশি হয়ে বলে উঠলেন “হুজুর, আর তেঁতুল। ঐডাই ত মজা বেশি। মনে অইয়াই জিলবায় পানি আই পড়ছে।” হুজুর বললেন “বয়ানের সোম কতা কইন না জানি।”
আমাদের বাড়ি জুম্মা ঘর থেকে বেশ দূরে ছিলো। প্রায় আধা কিলোমিটার হবে। পাঞ্জেগানা নামাজ জামাতে আদায় করা সম্ভব হতো না। বাড়িতেই পড়ে নিতাম। উট কোরবানি করার সমান ছোয়াব কামাই করার ইচ্ছা থাকলেও আগে যেতে পারতামনা। তালুকদার বাড়ির বড় ছোট সব মুছুল্লিরা একত্র হতে সময় লাগতো। দল বেধে মুরুব্বিদের পিছনে হেটে যেতে হতো জুম্মায়। তাই একটু দেড়িতে পৌছতে হতো জুম্মায়। রমজান মাসে তারাবি নামাজে যেতে হতো রাতের অন্ধকারে সরু পথ দিয়ে। বুইদ্যা চালা ও জুয়াদালী কাক্কুদের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। সাপ ও জংলী শুকুরের ভয় ছিলো রাস্তায়। তাই দলবেধে হারিকেন, চুঙ্গাবাতি (মশাল), দোয়াত (কুপি বাতি), বদনাবাতি, বা পাটখড়ির (সোলা) আগুন জ্বালিয়ে এই দুর্গম পথে যেতে হতো তারাবি নামাযে। এই পথে ৪ টা ঘোনাও পারি দিতে হতো। ঘোনার পিচলা বাতর (আইল) থেকে অনেকেই কাদা ক্ষেতে অন্ধকারে পড়ে যেতাম। এমন কষ্ট করে যেতে হতো আমাদের জুম্মায়।
আমাদের মক্তবে যারা প্রথম কোরআন পড়ার উপযুক্ত হতেন তারা জুম্মার দিন জুম্মায় গিয়ে সবার সামনে কোরআন হাতে নিতেন। সবাই দোয়া করতেন। মিষ্টি বিতরন করা হতো এ উপলক্ষে। আমি ও এছাক ভাই একসাথে এই জুম্মায় এসে সবার সামনে কোর আন হাতে নিয়েছিলাম। আমাদের শিক্ষক ছিলেন নোয়াখালী নিবাসী আব্দুল কদ্দুস ক্কারী সাব। তিনি পরে পাইন্নাবাইদ গ্রামে স্থায়ী হন। খুব ছোট ছিলাম। এত ছোট কাউকে কেউ কোরআন হাতে নিতে দেখেননি। তাই, সবাই আমার দিকে উৎসুক দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়েছিলেন।
জুম্মায় আনন্দও ছিলো। একবার সবে ক্কদরের রাত জেগে ইবাদত করতে আমরা জুম্মাঘরে একত্র হয়েছিলাম। মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাই এটার কো-অর্ডিনেটর ছিলেন। একটা খাসি জবাই করা হয়েছিলো। জুম্মাঘরের উত্তর পাশে মাটি কেটে চুলা করা হয়েছিলো। কয়েকজনে মিলে রান্না করছিলেন। বাকীরা জুম্মাঘরে বসে ইবাদতে মসগুল ছিলেন। আমার ভাগে পড়েছিলো দুই পাড়া কোরআন পড়া। একেক জনে একেক রকম ইবাদত করছিলেন। কোরআন পড়া শেষ করে আমি রান্না দেখতে গেলাম। এক জনে বললেন যে যারা রান্না করছে তারাও ইবাদতের ছয়াব পাবেন। ফিরে গিয়ে দেখি মাওলানা দুলাভাই বয়ান করছেন। আমি প্রবেশ করা মাত্রই দুলাভাই বললেন “এই যে, সাদেকই বলতে পারবে। সাদেক, বলতো চাঁদে কে কে পৌছেছিলো?” আমি একটু স্টাইল করে কথা বলে উত্তর দিলাম “নীল আর্মস্ট্রং, এড উইন ই অল্ড্রিন এন্ড মাইকেল কলিন্স।” তিনি বললেন “হে, সাদেক ঠিক বলছে। ও বিজ্ঞান জানে। কাজেই আমরা যে রকম দেখি চাঁদ সে রকম না। আল্লাহ চন্দ্র সূর্য গ্রহ নক্ষত্র সব সৃষ্টি করেছেন……….। “
আমাকে ১৯৭৫ সন থেকে পড়শুনা ও চাকরি করার জন্য গ্রামের বাইরে থাকতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে গ্রামে আরও দুটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। সেহেতু ঐ কেন্দ্রীয় মসজিদে আমার আর যাওয়া হয় না। নওপাড়া ও চনপাড়ার মুছুল্লিদের সুবিধার্থে দুইপাড়ার সংযোগ স্থলে একটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। তালুকদার বাড়ির মুসুল্লিদের সুবিধার্থে তালুকদার বাড়ির পারিবারিক গোরস্থানের পশ্চিম পাশে শিরিরচালা – সারাসিয়া রাস্তার ধারে আরেকটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। আমি বাড়ি গিয়ে তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদে জুমআর নামাজ পড়ি। ইচ্ছা থাকলেও কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও চনপাড়া জামে মসজিদে যেতে পারিনা। যদি যাই, তবে নিন্দুকেরা বলবে “ডাক্তরে নিজের বাড়ির মসজিদে না গিয়ে অন্য পাড়ার মসজিদে গেছে।” বস্তুত তিনটি মসজিদই আমাদের। তিনটি মসজিদেই গ্রামের মানুষের আর্থিক সহযোগিতা আছে। নামাজে মুছুল্লিদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই আরও দুটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। শুধু মসজিদ না, গ্রামের সবার সহযোগিতায় মাদ্রাসা, স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ইত্যাদি তৈরি হয়েছে। একটা জিনিসের অভাব আছে, সেটা হলো পাকা রাস্তা। পাকা রাস্তা করার এখতিয়ার গ্রামের মানুষের নেই। এটা সরকারি অর্থায়নের কাজ। সরকার দেশের মেঘা মেঘা রাস্তার প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত। একদিন হয়তো পাকা রাস্তা হবে। সেদিন হয়তো আমরা থাকবোনা। ঘুমিয়ে থাকবো চির নিদ্রায় রাস্তার ধারের তালুকদার বাড়ি পারিবারিক গোরস্থানে বাবা-মার পাশে আসাদুজ্জামান তালুকদার মুকুলের মতো। পথচারীরা সালাম দিয়ে যাবে। মসজিদের মুছুল্লিরা জুমআর নামাজ শেষে দোয়া করবে “ইয়া, আল্লাহ, মেহেরবানী করে করববাসীদেরকে মাফ করে দিন।”
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
বড়বাইদপাড়া, সখিপুর, টাঙ্গাইল।
১৮ নভেম্বর ২০২২ খ্রি.
ময়মনসিংহ
এমন স্মৃতি কথা আরও পড়তে নিচের হ্যাস ট্যাগ শব্দের উপর ক্লিক করুন
ঢাকা থেকে বরিশাল যাচ্ছিলাম লঞ্চে ১৯৮৮ সনে। রাতের খাবার খেয়ে ডেকে বিছানার চাদর বিছিয়ে ব্রিফকেস মাথায় দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গভীর রাতে যাত্রীদের কোলাহল শুনে ঘুম ভেঙে গেলে চমকে গেলাম। তখন মাঝে মাঝে লঞ্চে ডাকাতি হতো যাত্রীদের মাথায় হাতুড়ি পেটা করে। সেই ইঞ্জুরির চিকিৎসা চরামদ্দিতে ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আমিই করেছিলাম। কি ভয়াবহ সেই হাতুড়ির আঘাত! তাই, ডাকাতির কথা মনে হলেই আমি আঁতকে উঠতাম। উঠে দাঁড়ালাম। না, এটা ডাকাতের ঘটনা নয়। দেখলাম সবাই লঞ্চের ডান কিনারে জড়ো হয়ে নদীর পানিতে কী যেনো দেখছে। আমিও দেখতে গেলাম। দেখলাম কেউ একজন শ্রোতোশ্বনি নদীর পানিতে ভেসে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে হাত উচু করে দেখাচ্ছে। দেখতে দেখতে সব যাত্রী যখন লঞ্চের ডান কিনারে জড়ো হলো লঞ্চ কাত হয়ে পানি প্রবেশের উপক্রম হলো। আমরা দৌড়ে এক যোগে বাম কিনারে চলে গেলাম। লঞ্চ বাম দিকে কাত হলো। ভয়ে দৌড়ে ডান কিনারে চলে গেলাম। এভাবে ডান-বাম খেলা চলো কয়েকবার। এবার মানুষটাকে লঞ্চের খালাসিরা নদী বক্ষ থেকে উঠাতে সমর্থ হলো। রাখা হলো ডেকের মাঝখানে। সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো। আমিও পেছন থেকে উকি দিয়ে দেখবার চেষ্টা করলাম। এক নজর দেখেই চোখ নত করে চলে এলাম। দেখলাম উদ্ধারকৃত মানুষটি একজন মধ্য বয়সি মহিলা, একজনে গরম কাপড় দিয়ে ঢেকে দিচ্ছেন। মহিলা মৃত মানুষের মতো পড়েছিলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে জীবন মরণ চেষ্টা করে বেচে ওঠা মানুষ উদ্ধার হবার পর এভাবেই সাধারণত অবসাদগ্রস্ত হয়ে নিস্তেজ পড়ে থাকে। সবাই যার যার বিছানায় ফিরে এসে নৌকাডুবি নিয়ে নানান কাহিনী বলতে লাগলো। শুনলাম মহিলা সুস্থ আছেন। এখান থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার উজানে তারা নৌকাডুবির কবলে পড়েন। তারা এক নৌকা ভর্তি করে আটরশির পীরের খানেকায়ে যাচ্ছিলেন। সেই নৌকা পদ্মা নদী বক্ষে ডুবে যায়। শ্রোতের টানে মহিলা ভাসতে ভাসতে এপর্যন্ত এসে পড়েছেন। হালকা সাতার কেটে তিনি পানির উপর ভেসে থাকেন। পাহাড়ি মানুষ হলেও আমি সাতার কাটতে জানি। যেভাবে লঞ্চ একবার ডান দিকে এবং বাম দিকে কাত হচ্ছিলো, যদি লঞ্চডুবি হতো আমাকেও হয়তো এভাবে ভেসে সাতার কেটে বরিশালের দিকেই যেতে হতো।
ঢাকা থেকে বরিশাল ফিরছিলাম লঞ্চে কর্মস্থল চরামদ্দি ইউনিয়ন হেলথ সাব-সেন্টারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রতিমাসেই একবার এভাবে লঞ্চে রাতে যাতায়াত করতে হতো বরিশাল-ঢাকা-বরিশাল ১৯৮৮-৮৯ সনে। সরকারি বেতন মাসে ছিলো ১৮৫০ টাকা। লঞ্চের কেবিন ভাড়া ছিলো ৬০০ টাকা। তাই, সবসময় কেবিনে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বেশি সময় লঞ্চের ডেকে শুয়ে যাতায়াত করতাম। ব্রীফকেসে একটা লুঙ্গি ও একটা তোয়ালে রাখতাম। বিকাল ৬ টা বা ৭টায় লঞ্চ ছাড়তো এদিকে ঢাকার সদরঘাট থেকে, ওদিকে বরিশাল সদরঘাট থেকে। সবাই একটা করে সিংগেল বিছানার চাদর সাথে রাখতো। এই চাদরে যতটুকু জায়গা দখল করা যায় ততটুকু জায়গা যাত্রীর অধীন ছিলো। ভাড়া ছিলো ৩০ টাকা। আমি ৩০ টাকার টিকিট কিনতাম। বরিশালের মানুষ আমাকে চিনত না। তাই, অতি সাধারণ ভাবে চলাফেরা করতে আমার লজ্জাবোধ হতো না। লঞ্চের হোটেলে ইলিশের ডিম দিয়ে পেট ভরে ভাত খেয়ে রাত আটটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তাম লুঙ্গি পরে, বিছার চাদর বিছিয়ে ব্রিফকেসের উপর মাথা রেখে। ব্রিফকেসের উপর তাওয়েল বিছাতাম। লঞ্চের ইঞ্জিনের শব্দে ভালো ঘুম হতো। ছেলে বা মেয়ে আগে উঠলে আগে যে যেখানে জায়গা পেতো সেখানেই চাদর বিছিয়ে জায়গা দখল করতো। পরিচয় যাতে কেউ জানতে না পারে সেজন্য সহযাত্রীদের সাথে তেমন আলাপ করতাম না। ব্রিফকেসের উপরের ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার লেখা নেইম কার্ডটি উল্টিয়ে রাখতাম। যখন বাসে যাতায়াত করতাম তখন নেইম কার্ডটি সোজা করে রাখতাম। কারন, ডাক্তার পরিচয় পেলে সহযাত্রীরা সম্মান করে ৩/৪ ইঞ্চি জায়গা ফাঁক করে দিতো। নিজের পরিচয় প্রকাশ করার জন্য আমি নিজেই সহযাত্রীকে জিজ্ঞেস করতাম “ভাই, কি করেন?” সহযাত্রী উত্তর দিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ করে উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করতেন “ভাই, আপনি কি করেন?” আমি ডাক্তার পরিচয় দিলে একটু নড়ে চড়ে বসে ৩/৪ ইঞ্চি জায়গা ছেড়ে দিতো। আমি কাছে এসে বসুন বললে আরও বেশি করে জায়গা ছেড়ে দিতো।
যাহোক, লঞ্চের কথায় আসি। মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা সাধারণত একটা নির্দিষ্ট এলাকা নিয়ে বিছানা পারতো। ঐ এলাকাটার চারিদিকে চাদর ঝুলিয়ে পর্দা করে দিতো। তারা ঘুমাতো কিনা জানি না। যতক্ষণ আমি চেতন থাকতাম তাদেরকে গল্পসল্প, হৈহল্লা করে কাটাতে শুনতাম। এদের সংখ্যা সাধারণত ১২/১৪ জন হতো। এমনি এক লঞ্চ জার্নির সময় আমার শিতানের দিকে শুয়েছিলেন এক ভদ্রমহিলা ও তার পাশের জায়গায় শুয়েছিলো এক যুবক ছেলে। গভীর রাতে হঠাৎ সেই যুবক ভদ্রমহিলার ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে মাঝ নদীতে ঝাপ দিলো। যাত্রীদের কোলাহল শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। লঞ্চ থামতে থামতে ছেলেটি অনেক দূরে পড়ে গেলো। লঞ্চ ছেলেটিকে ধরার জন্য পেছাতে লাগলো। ততক্ষণে ছেলেটি নদীর কিনারে কাঁশবনে উঠে পড়লো। ওখানে আগে থেকেই তার সহকর্মীরা তাকে রিসিভ করার জন্য অপেক্ষা করছিলো। তারা ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে কাঁশবনে হারিয়ে গেলো। আমার ব্রিফকেস কেউ ছিন্তাই করতে পারেনি। কারন, ওটা থাকতো আমার মাথার নিচে। নিলেও সমস্যা ছিলো না। টাকা রাখতাম আন্ডারওয়্যারের নিচের পকেটে।
সময়টা ১৯৮৮ সালের ২ জুলাই। পোস্টিং অর্ডার হাতে পেয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার পথ কী হবে তার খোঁজ নেয়া শুরু করলাম। এ ব্যাপারে সুলতান নামে আমার এক আত্মীয় তার সহকর্মীদের সাথে আলাপ করে একটা রোড ম্যাপ করে দিল। সে ওখানে চাকরি করত।
বাসে করে সাতক্ষীরায় তার বাসায় গেলাম। রাতের খাবার খেয়ে সেখান থেকে হুলার হাট গেলাম। একা জার্নি, খুব খারাপ লাখছিল। হুলার হাটে সস্তা একটা হোটেলে রাত্রি যাপন করলাম।
বাথরুমের অবস্থা ভাল না থাকায় পায়খানার কাজে ওটা ব্যাবহার করলাম না। পায়খানার বেগ নিয়েই ভোর ৫ টায় রিক্সা নিয়ে লঞ্চ ঘাটের দিকে রওনা দিলাম।
ছিনতাই হবার ভয়ে ভীত ছিলাম। ঘাটে গিয়ে বসলাম। একজন দুইজন করে যাত্রী এসে বসতে লাগল।
আমি জীবনে তখনো লঞ্চ দেখিনি। আজ প্রথম লঞ্চ দেখার অভিজ্ঞতা হবে। বাসের মত কি আগে টিকিট করতে হবে? না উঠে টিকিট করতে হবে? এনিয়ে ছিল নানা দুশ্চিন্তা।
স্থির করলাম আমার মত প্যান্ট-শার্ট পরা ভদ্র যাত্রীরা যা করবে আমিও তাই করব। দেখলাম দক্ষিণ দিক থেকে একটা বড় নৌযান আসছে। উপরে লিখা “এম ভি বাপ্পী”। বুঝতে পারলাম এটাই লঞ্চ। ঘাটে ভিড়ল। দেখলাম দোতলা-নিচ তলা আছে। আমি ভদ্র লোকদের দেখাদেখি দোতলায় গিয়ে বসলাম।
বোকার মত এদিক সেদিক তাকালাম। বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসলাম। লঞ্চ পূর্ব দিকে চলছিলো। পানি আর পানি। সীমাহীন পানি। জীবনে এত পানি দেখিনি। একটা লোক বেঞ্চে পা তুলে বেয়াদবের মত শুয়েছিলো। আমি তার প্রতি বেশ বিরক্ত বোধ করছিলাম। এক লোক ব্রিফকেসে সুই দিয়ে খোদাই করে নাম লিখে দিচ্ছিল। আমিও পাঁচ টাকা দিয়ে নাম লিখালাম ‘সাদেক’। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
পানি দেখে খুব ভাল লাগছিল। পানিতে অনেক মহিষ দেখতে পেলাম। মহিষ মাথা ডুবিয়ে ডুবিয়ে কী যেন খাচ্ছিল।
আমি জানতাম, মহিষ মাঠে ঘাস খায়। কিন্তু পানির নিচ থেকে কী খাচ্ছে সেটা বুঝতে পারছিলাম না। আমার পাশে দাঁড়ানো এক জনকে জিজ্ঞাসা করলাম “মহিষ পানির নিচ থেকে কি খাচ্ছে?”। লোকটি আমাকে অস্বাভাবিক মানুষ ভেবে উত্তর না দিয়ে সটকে পড়ল। বিপরীত দিকের বারান্দায় গিয়ে আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। সেও তাই করল।
আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। ভেতরে এসে একজনকে বিষয়টি বলার পর সে বলল ”কেন? ঘাস খায়।“
– টাঙ্গাইল জেলায় সখিপুরে, পাহাড় অঞ্চলে। পাশ থেকে একটু শিক্ষিত একজন বললেন -আপনি বুঝি জোয়ারভাটা দেখেননি। এখন জোয়ার। ভাটার সময় মহিষ ঘাস খাওয়া শুরু করেছিলো, জোয়ারের পানিতে মাঠ ভরে গেছে, এখনো মহিষ মাথা ডুবিয়ে ডুবিয়ে ঘাস খাচ্ছে। – এখন বুঝতে পেরেছি। বইয়ে পড়েছি। -আপনি কী করেন? কোথায় যাচ্ছেন? – আমি ডাক্তার। সরকারি চাকরি হয়েছে। যোগদান করতে যাচ্ছি। -এমবিবিএস ডাক্তার? – জ্বী।
সবাই নড়েচড়ে বসে আমার দিকে মনযোগী হল। আমিও সাচ্ছন্দ্যবোধ করা শুরু করলাম। একে একে অনেকেই টুকটাক অসুখের কথা জানাল। আমি সমাধান দিলাম। আমি ওখানকার মধ্যমণি হয়ে গেলাম। যে লোকটি পা তুলে শুয়ে ছিল সেও পা নামিয়ে বসল। বলল “ডাক্তার সাব, আমার সারাক্ষণ পায়ের তলা জ্বালাপোড়া করে। কেন এমন হয়?” এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলাম কেন সে বেয়াদবের মত পা তুলে শুয়েছিল।
এভাবে সবার সাথে গল্প করতে করতে সকাল ১০টার দিকে বরিশাল এসে পৌঁছলাম।
সিভিল সার্জন অফিস থেকে কমিউনিকেশন লেটার নিয়ে বাসে চড়ে বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলে গেলাম। ইউএইচএফ পিওর নিকট পরিচয় দিলাম। পাশে একজন পাজামা পাঞ্জাবি পরিহিত ৫৪/৫৫ বছর বয়স্ক লোককে বললেন, ‘এই যে আপনার মেডিকেল অফিসার এসে গেছেন। আর চিন্তা নাই।’
আমি যোগদানপত্রে সই করে অফিস ত্যাগ করলাম। ওই লোকটি ছিল আমার সেন্টারের মেডিকেল এসিস্টেন্ট। আমরা চরামদ্দি সাব সেন্টারের উদ্দেশ্যে বাসে রওনা দিলাম। বরিশাল গিয়ে রাত্রিযাপন করে ছোট লঞ্চে করে পরদিন চরামদ্দি যেতে হবে। বাসে যেতে যেতে আলাপ হলো। ওখানে স্টাফদের কথা জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘ওখানে আছে একজন পাগলা ফার্মাসিস্ট। কোথায় থাকে, কী খায়, কী পরে তার ঠিক নাই। দেখলেই বুঝবেন। আরেকজন পিওন আছে। তাকে দিয়ে কিচ্ছু করাতে পারবেন না। কিছু বললে উল্টা আপনাকেই ভয় দেখায়ে দেবে। আপনি তো অনেক দূরের মানুষ। আপনি সামলাতে পারবেন কিনা। আপনার তো আবার নতুন চাকরি। অসুবিধা হবে না, আমি আছি না?’ শুনে আমার শরীর শিরশির করে উঠল।
সন্ধ্যার সময় আমাকে একটি কমদামি বোর্ডিংয়ে নিয়ে উঠালেন। চলে গিয়ে আবার ফিরে এলেন দুইজন চোখে সুরমা দেয়া যুবক নিয়ে। বললেন, ‘পরিচয় করে দিচ্ছি, ইনি আমার বন্ধু ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার…..!’
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! ভাবলাম এই ‘বন্ধুকে’ আমি নিয়ন্ত্রণ করব কীভাবে।
তাদের সাথে আলাপ হল। অনেক কথার পর তারা একটা কথা বলল, ‘আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা আছি না? অমুককে একটু ট্যাঁক্টফুলি ম্যানেজ করতে হবে।’
তারা চলে গেলে আমি একটু বারান্দায় বেরুলাম। দেখলাম তারা পাশের রুমে দুইটি মেয়ের সাথে কেমন কেমন যেন কথা বলছে। আমি লুঙ্গী পরে বাথরুমে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি এমন সময় বাইরে থেকে দরজার করা নাড়ল। – কে? – আমি বোর্ডিংয়ের লোক। কিছু লাগবে, স্যার? আমি সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিতে পারি। – আমার কিছু লাগবে না। আমি এখন ঘুমাব। ডিস্টার্ব করবেন না। আমার বুঝতে দেরি হল না পাশের রুমের বোর্ডারদের কারবার।
মেডিকেল এসিস্টেন্ট আমাকে রেখে তার ভাইয়ের বাসায় থাকতে গিয়েছে। আমি ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলাম। পায়খানার বেগ থেমে গেল। বের হবার সাহস পেলাম না। গত রাতেও পায়খানা করতে পারিনি। অমনি শুয়ে পরলাম। কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
সকাল সাড়ে পাঁচটায় মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টের ডাক শোনে ঘুম থেকে উঠলাম।
ছয়টায় বরিশাল থেকে ছোট লঞ্চে উঠলাম। নয়টার দিকে কাটাদিয়া ঘাটে নামলাম। ওখান থেকে ডিঙি নৌকায় উঠলাম। দুই কিলোমিটার যেতে হল নৌকায়। খালের ধারের মানুষ আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলো “সাহেব কে?” – সাহেব আমাদের চরামদ্দির নতুন ডাক্তার। এমবিবিএস। এর আগে কেউ এমবিবিএস ছিলেন না। – আমাদের সরকারি ডাক্তার? – জ্বী। -খুব ভাল।
দশটার দিকে নৌকা থেকে নামলাম। তিনি দেখিয়ে বললেন ‘এটাই আপনার হাসপাতাল।’ দেখলাম ডোয়াপাকা একটি পুরাতন টিনের ঘর। সামনে বারান্দা। হাসপাতালের সামনে প্রায় একশত জন লোক। একজন উস্কো খুসকো লোক কানে একটা বিড়ি আটকানো, গায়ে রান্নাকরার ছাই লাগানো শার্ট, মাঝে মাঝে বিড়ির আগুনে গোল গোল করে ছিদ্র করে পোড়া, পেছনে লুঙ্গীর কোছে বিড়ির প্যাকেট, আমার দিকে ইঙ্গিত করে জানতে চাইল ‘সাহেব কে?’ মেডিকেল এসিস্টেন্ট বললেন, ‘ইনি আমাদের নতুন অফিসার, ময়মনসিংহ বাড়ী।’ তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন
-আপনি এমবিবিএস? – জ্বী।
লোকটি লাফ দিয়ে দুই ফুট উঁচু জায়গায় উঠে দাঁড়ালেন। মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট বললেন,‘ইনিই আপনার ফার্মাসিস্ট’। ফার্মাসিস্ট নেতার ভঙ্গিতে জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দিতে লাগলেন- – ভাইসব, আপনারা শান্ত হউন। আমাদের এখানে জয়েন করতে এসেছেন যিনি তিনি এমবিবিএস, যা লন্ডন থেকে পাস করতে হয়! তিনি আগামীকাল থেকে আপনাদের দেখবেন। আজ তিনি বিশ্রাম নিবেন। এরপর সবাই শান্ত হলেন। তিনি সবাইকে বিদায় করে আমার কাছে আসলেন। আমি জানতে চাইলাম – আপনাদের লেট্রিন কোথায়? – আমাদের তো লেট্রিন নাই! -তাহলে আপনি কী ব্যবহার করেন? – আমি কলার পাতা দিয়ে একটু ঘেরাও করে বানিয়ে নিয়েছি। – এটা কী? – এটা ফ্যামিলি প্লানিং ভিজিটরের অফিস। – এখানে লেট্রিন নেই? – আছে। পাকা সেনিটারি লেট্রিন।
শোনে আমার তিন দিনের জমানো পায়খানার বেগ ফারাক্কা বাধের উজানের শক্তি নিয়ে নিচের দিকে ধেয়ে আসা শুরু করল। – লেট্রিনের চাবি দিন। – ওটা পিওনের কাছে। – পিওন কই? -বাজারে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। – ডাকেন তাকে।
তিনি দৌঁড়ে বাজারের দিকে চলে গেলেন। অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন- -পেলাম না। – ঠিক আছে, আপনারটাই ব্যবহার করব। এক বদনা পানি আনেন।
তিনি পানি আনতে চলে গেলেন। আশার আলো দেখে আমার ওইটার বেগ আরও তীব্র আকার ধারণ করল। তিনি খাবার পানির এক জগ পানি নিয়ে এলেন। আমি বললাম – আমি তো পানি খাব না, পায়খানায় ব্যবহার করব, বদনায় পানি আনেন। – স্যার, আমার এই জগ ছাড়া আর কিছু নাই। এইটা দিয়েই পানি খাই, এইটা নিয়েই পায়খানায় যাই।
আমার রাগে, দুঃখে বেগ নিস্তেজ হয়ে পরল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলাম। মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট মিটিমিটি হাসছিলো। আমি মেডিকেল এসিস্টেন্টকে বললাম “আমার ক্ষুধা পেয়েছে। খাব কই?” ফার্মাসিস্টকে বললাম,‘যান, আমার সামনে থেকে’। তিনি ইডিয়টের মত হেসে চলে গেলেন।
পরে মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট আমাকে বাজারে নিয়ে গিয়ে খাওয়ালেন। আমি বললাম,
-আমি এখানে থাকতে পারব না। – চলেন আমাদের বাড়ী। এখান থেকে ৩ কিলো দূরে হবে।
– চলুন তাই হউক।
বিকালে মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্টের বাড়ি গেলাম। তার গ্রামের নামটা এখন মনে করতে পারছি না। গিয়েই লেট্রিনের খোঁজ নিলাম। তিনি তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করে দিলেন। পাকা লেট্রিন। তিন দিনের জমা রাখা জিনিসগুলি ত্যাগ করতে পেরে গোপাল ভাঁড়ের মত প্রশান্তি পেলাম।
তিনদিন গোসল করিনি। অত্যন্ত গরম আবহাওয়া ছিল। গোসল করতে চাইলাম। তিনি আমাকে তার বাড়ির দক্ষিণ পাশে নিয়ে গেলেন। বিস্তীর্ণ এলাকা। পানি আর পানি। দখিনা মিষ্টি বাতাস আসছিল। আমি শার্ট গেঞ্জি খুলে কিছুক্ষণ গায়ে হাওয়া লাগালাম। অমন মিষ্টি হাওয়া আর কোথাও পাইনি।
বিকালে ঘুম দিলাম। রাতে তার ভাইয়ের সাথে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প হল। আবার ঘুমালাম রাতে।
দুপুরের খাবার পোলাও মাংস খেয়ে বরিশাল রওনা দিলাম। বিকেল ছয়টায় ঢাকার লঞ্চে উঠলাম। ঢাকা থেকে বাসে ফিরতে হবে বাসে। হিসাব করে দেখলাম টাকা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। তাই কেবিনে টিকিট না করে ৩০ টাকায় ডেকের টিকিট করলাম। ব্রিফকেস থেকে লুঙ্গী বের করে বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। কেউ যাতে চিনতে না পারে সেজন্য ব্রিফকেসের ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার লিখা কার্ডটা উল্টিয়ে লাগালাম। ব্রিফকেস মাথায় দিয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করলাম।
চারদিনের জার্নির ঘটনাগুলি মনে করতে করতে এক সময় কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
প্রথম পোস্টিং ছিল বরিশালের চরামদ্দি ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে। ১৯৮৮ সনে এক বছর সেখানে ছিলাম। প্রচুর মারামারির রোগী আসতো। তাদেরকে চিকিৎসা করে ইনজুরির সার্টিফিকেটও দিতে হতো। একবার এক রোগী এলো হাতুড়ি পেটা খেয়ে। বিস্তারিত শুনলাম রোগীর কাছ থেকে। ঢাকা থেকে লঞ্চ যোগে তারা আসছিলো বরিশালে। লঞ্চগুলো সাধারণত রাতে যাতায়াত করতো। বরিশালের অনেক যাত্রী রাতের লঞ্চে ঢাকায় গিয়ে দিনের বেলা অফিসের কাজকর্ম বা মার্কেটিং করে আবার রাতের লঞ্চে ফিরে আসতো। প্রায়ই পথিমধ্যে ডাকাতের কবলে পড়তো। এমনি একটা অভিজ্ঞ ডাকাত পার্টি ছিলো হাতুড়ি পেটা করার। গভীর রাতে ফেরার সময় যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়তো তখন চার পাঁচ জনের অল্প বয়সি ডাকাত পার্টি অতর্কিতে হামলা চালাতো হাতুড়ি দিয়ে। রাইফেল ওয়ালা আনসারের মাথার পেছনে হাতুরি দিয়ে পিটুনি দিলে আনসার অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতো। আনসারের রাইফেল কেড়ে নিয়ে লঞ্চের চালকের মাথার উপর তাক করে ধরে রাখতো ঠিকঠাক মতো চালিয়ে নিতে। অন্য ডাকাতরা সামনে যাকে পেতো তাকেই মাথার চান্দিতে হাতুড়ি পেটা করতো। দুই চার জনকে এভাবে মাথায় পিটুনি দিলে অন্য যাত্রীরা ভয়ে আতংকগ্রস্ত হয়ে মাথা নিচু করে লুকিয়ে উবুত করে বসে থাকতো। আশে পাশে কি হচ্ছে কেউ তা বুঝতে পারতো না। দুই চারজন যাত্রীর মাথায় পিটুনি দিয়ে শত শত যাত্রীকে অকেজো করে রাখতো কয়েকজন ডাকাতে। এ অবস্থায় যাত্রীদের কাছ থেকে নগদ অর্থ ও স্বর্নালংকার কেরে নিতো। কানের অলংকার খুলে না নিয়ে ঝেংটা টান মেরে ছিড়ে নিতো। লুট করা টাকা ও অলংকার পোটলায় ভরে সুবিধাজনক চর এলাকায় লঞ্চ ভিড়িয়ে নেমে দৌড়ে পালিয়ে যেতো কাঁশবনের ভেতর। এদিকে যাত্রীরা অনেক্ষণ পর্যন্ত মাথা নিচু করেই বসে থাকতো। লঞ্চের চালক এসে তাদেরকে ইনফরমেশন দিতো এই বলে যে ডাকাতরা চলে গেছে আপনারা মাথা তুলুন।
রোগীর মুখে এমন বিভৎস কাহিনী শুনে আমিও আতংকগ্রস্ত ছিলাম। কারণ, আমাকেও মাসে একবার এমন লঞ্চে রাতে আসা-যাওয়া করতে হতো। সরকারি বেতন মাসিক ১৮৫০ টাকা ছিলো। প্রথম চাকরি। প্রথম মাসের টাকা ঠিকই পেয়েছিলাম। দ্বিতীয় মাস থেকে আমাকে বেতন দেয়া হয় না। আমি ভাঙ্গা একটা ডোয়াপাকা টিনের ঘড়ে থাকতাম। অর্থ অফিসের দাবী ছিলো আমাকে নিয়ম অনুযায়ী ৩৫% বাড়ি ভাড়া কাটতে হবে। আমি ভাঙ্গা ঘরের ভাড়া কাটতে রাজি ছিলাম না। তাই, বেতন বন্ধ ছিলো। ২০ টাকা করে প্রাইভেট রোগী দেখে খাওয়া খরচ করে যা থাকতো তা থেকে বাবার জন্য কিছু টাকা মানি অর্ডার করে পাঠাতাম। আর যা থাকতো তা নিয়ে টাঙ্গাইল বাসায় আসতাম প্রতিমাসের প্রথম সপ্তাহে। যাহোক, চার মাস পরে এক সাথে বাড়ি ভাড়া সহ বেতন পেয়েছিলাম। সেই টাকায় বাবার ইচ্ছানুযায়ী বাড়ির পাশের ১২.৫ শতাংশ জমি কিনেছিলাম। লঞ্চে উঠে আতংকে মাথা হাতাতাম কখন এসে ডাকাতরা আমার মাথায় হাতুড়ি পিটায়। তারা তো আর আমি ডাক্তার কি না তা জিজ্ঞেস করে না। তখন, ডাকাতরা ডাক্তার ও পুলিশকে সমিহ করতো।