থাপ্পড় দিয়ে ঠিক করা

থাপ্পড় দিয়ে ঠিক করা

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কোন কিছু নষ্ট হলে মেরামত করতে হয়। কম্পিউটারের সফটওয়্যার প্রোগ্রামও নষ্ট হলে মেরামত করতে হয়। ইংরেজিতে বলা হয় ফিক্স করা। আমাদের গ্রামে ছোট বেলায় দেখেছি কোন পোলাপান দুষ্টুমি করলে বড়রা ভয় দেখায়ে বলতেন “থাপ্পড় মাইরা সই কইরা ফালামু।” এখানে সই করা মানে হলো ঠিক করে ফেলা। থাপড়াইয়া অনেক কিছু ঠিক করা যায়। আমরা যখন নতুন ডাক্তার হয়েছি তখন দেখেছি সন্তান জন্মগ্রহণের পর পরই নবজাতককে কাঁদাতে। যেসব বাচ্চা কাঁদতে দেরি করতো তাদের দু’পা ধরে মাথা নিচুর দিকে দিয়ে পিঠের উপর হালকা থাপ্পড় মারতেন ডাক্তাররা। এটাই নিয়ম ছিলো। বাচ্চাকে থাপড়াইয়া কাঁদাতে হবে। বাচ্চা কাঁদা মানে তার স্বাস নালী পরিস্কার আছে। এখন নাকি এই পদ্ধতি নেই।

খুব ছোট বেলা থেকেই আমরা রেডিও শুনতাম। ড্রাই সেল ব্যাটারি দিয়ে রেডিও বাজানো হতো। ব্যটারির মাথা ঠিক মতো না বসালে অথবা ভেতরে স্পিকারের সাথে তারের সংযোগের ত্রুটি থাকলে রেডিও বাজতো না। বাজলেও আবার ভেড় ভেড় ঘেড় ঘেড় শব্দ করতো। রেডিওর পেছনে থাপ্পড় দিলে অনেক সময় শব্দ পরিস্কার আসতো। বলা হতো “থাপ্পড় দিয়া রেডিও হজু কইরা ফালাইছি।” এখানে হজু করা মানে ঠিক করে ফেলা। রেডিও বাঁজিয়েছেন অথচ রেডিওকে থাপ্পড় দেন নাই এমন লোক কম আছেন। এখন রেডিও বাজাই না। থাপড়াইতেও হয় না।

আমি যখন মেডিকেলে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি তখন এক সন্ধায় স্টেশন রোডের দোকানে গিয়েছিলাম কিছু একটা কিনতে। সেখানে আমার আরও দু’জন বন্ধুও গিয়েছিলো কিছু কিনতে। দোকানে খুব ভির ছিলো। বন্ধু বার বার জিজ্ঞেস করছিলো “ভাই এটার দাম কতো।” দোকানী শুনতে পারছিলেন না। আরেক বন্ধু বললো “থাপ্পড় দিয়ে জিজ্ঞেস করো।” বলার সাথে সাথে সব দোকালিরা ক্ষেপে গেলো । বলতে লাগলো “এতো বড় কথা! থাপ্পড় মারতে চায়!” গন্ডগোল শুরু হয়ে গেলো। একসময় থেমে গেলে একজন জানতে চাইলেন যে থাপ্পড় মারতে চেয়েছেন কেনো। সে উত্তরে বললো “আমি কেন থাপ্পড় মারতে চাইবো? আমি বলতে চেয়েছিলাম দোকানীর দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য টেবিলে থাপ্পড় দিয়ে শব্দ করতে। আপনারা না বুঝেই হই চই শুরু করে দিলেন।”

একবার জোবেদ ভুইয়া বিল্ডিংয়ে একজন নাম করা ডাক্তার এসে চেম্বার নিয়ে বসলেন। তার একজন চেম্বার এসিস্ট্যান্ট প্রয়োজন হলো। কয়েকজন ছেলে আগ্রহ প্রকাশ করলো এসিস্ট্যান্ট হতে। কিন্তু একজন নাছোড়বান্দা ছেলে বেঁকে বসলো যে তাকেই এসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। ভুইয়া সাব রাজি না হওয়াতে ছেলেটি প্রতিদিন বিকেলে এসে চিল্লাচিল্লি করতো চেম্বারের সামনে। এভাবে তাকে পরপর তিন দিন ডিস্টার্ব করতে দেখেছি। তাকে আর না আসতে দেখে আমি ভুইয়া সাবকে জিজ্ঞেস করলাম

– ঐ ছেলেটির কি হলো। আর যে আসতে দেখি না?

– আর আসবে না। একটা থাপ্পড় মাইরা ঠিক কইরা ফালাইছি। তিন দিন ধৈর্য্য ধইরা দেখলাম। ঠিক হইলো না। শেষের দিন আমাকে দেখিয়ে চিল্লাচিল্লি করে আর বিল্ডিংয়ের ওয়ালে লাথথি মারে। আমার হাতের নাগালেই ছিলো। গালের মধ্যে এমন জোরে একটা থাপ্পড় মারছি যে ঘুরতে ঘুরতে ওয়ালে বারি খাইয়া পইরা গেছে। তারপর উঠে চইলা গেছে। আর আইবো না। এক থাপ্পড়েই ঠিক অইয়া গেছে।

কয়েক বছর আগে একটি এইচ পি ব্রান্ডের প্রোবুক ল্যাপটপ কিনেছিলাম। অপারেটিং সিস্টেম দেয়া হয়েছিল উইন্ডোজ ১০। কিন্তু প্রথম থেকেই ল্যাপটপ প্রোগ্রামে ডিস্টার্ব দিতে থাকে। নিজে ঠিক করতে না পেরে কম্পিউটার মেরামতের দোকানে নিয়ে গেলাম। সেখানকার নিয়ম হলো কেউ রুমের ভেতর প্রবেশ করতে পারবে না। তারা স্লিপ দিয়ে ল্যাপটপ জমা রাখবে। মেরামত করা হয়ে গেলে ফোন করা হবে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বড় টেনশনের কাজ। কম্পিউটারে কত কি প্রাইভেট জিনিস থাকে। সেগুলো যদি তারা কপি করে রেখে দেয়? তারপরও নিরুপায় হয়ে তাদের হাতে ল্যাপটপ দিয়ে এলাম। দুই ঘুরানি খাওয়ালো, টাকাও নিলো কিন্তু ল্যাপটপ হজু হলো না। শেষে বললো যে এটাতে উইন্ডোজ ১০ চলবে না। দিয়ে দিলো উইন্ডোজ ৮। এটা দিয়েই এতদিন চালালাম। সম্প্রতি বড় ঝামেলা শুরু করলো আমার কম্পিউটারে। কাজ করছি, কাজ করছি, হঠাৎ উইন্ডোজ হেল্প ফাইল অটো ওপেন হতে লাগলো শত শত বার। শেষে হ্যাং হয়ে থাকে কম্পিউটার। কি কারনে এমন হয় তা খুঁজে গুগল থেকে বের করে পড়তে লাগলাম এবং ইউটিউব থেকে দেখতে লাগলাম। অনেক ঘন্টা নষ্ট করলাম। কিন্তু হজু করতে পারলাম না। শপে নিয়ে গেলাম না, যদি তারা কিছু কপি করে নিয়ে রাখে? আমি সাক্কেস কম্পিউটারের জাকিরকে বিশ্বাস করি। টুকটাক সমস্যা হলে তার কাছেই যাই। ফোনে আমার সমস্যাটা জানালে তিনি উইন্ডোজ ১০ ইন্সটল করতে বললেন। আমি কয়েকঘন্টা চেষ্টা করে ইউন্ডোজ ১০ ইন্সটল করলাম। কম্পিউটার আরও ফাস্ট হলো কিন্তু আবার আগের সমস্যাটা দেখা দিলো। এই কাজটা জাকির বা অন্য কেউ করে দিলে হয়তো আমি তাদেরকে দোষারোপ করতাম। আমি জাকিরকে ফোনে জানালাম “এতো সময় ব্যয় করে উইন্ডোজ পাল্টালাম সমস্যাটা রইয়াই গেলো।” জাকির বললেন “স্যার, আমার মনে হয় আপনার ল্যাপটপের কিবোর্ড-এ ময়লা ঢুকেছে। একটু থাপ্পড় দিন ঠিক হয়ে যাবে। অনেক সময় কি বোর্ডের ফাঁক দিয়ে ময়লা ঢুকে বাটন শর্ট হয়ে থাকে। ফলে বার বার কি বোর্ড থেকে সিগনাল গিয়ে কমান্ড চলতে থাকে। একটু থাপ্পড় দিয়ে দেখুন, স্যার। ঠিক হয়ে যাবে।” আমার ছোট বেলার রেডিও থাপড়ানির কথা মনে পড়লো। ল্যাপটপের কি বোর্ড উপুর করে ধরে ডান হাত দিয়ে কয়েকটা থাপ্পড় মারলাম। তারপর থেকেই ঠিক। কাজ করেও আরাম পাচ্ছি আগের থেকে। ইচ্ছা করলে জাকির তার শপে নিয়ে আমার ল্যাপটপটাকে কয়েকটা থাপ্পড় দিয়ে ঠিক করে আমার থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু জাকির তা করবে না। জাকিরের জীবন সাক্কেস ফুল হউক। সাক্কেস কম্পিউটারের জাকির।

৬/১১/২০২০

ময়মনসিংহ

 

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/