পরীক্ষার জন্য কোন সময়ের প্রস্রাব নিবো?

পরীক্ষার জন্য কোন সময়ের প্রস্রাব নিবো?
(স্বাস্থ্য কথা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আপনারা যারা ডাক্তারের কাছে গিয়েছেন চিকিৎসার জন্য ডাক্তার আপনার শরীর পরীক্ষা করেই দেখবেন কিছু ইনভেস্টিগেশন করার জন্য লিখে দেন। এর মধ্যে থাকে রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা, পায়খানা পরীক্ষা বা অন্য কোনো পরীক্ষা – যেমন এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজি, সিটিস্ক্যান ইত্যাদি। তবে প্রস্রাব পরীক্ষাটা দেখবেন প্রায় সবার ক্ষেত্রেই দেওয়া হয়। বিশেষ করে প্রস্রাবের রুটিন এক্সামিনেশন পরীক্ষা। রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রস্রাবের রুটিন টেস্ট হলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির অবস্থা জানা যায়, ইউরিনারি ট্রাক্ট ইনফেকশন বা অন্য কোনো সমস্যার কথা জানা যায়, শরীরের অন্যান্য অংগের রোগের খবরও জানা যায়। সেসব রোগে প্রস্রাবের যে পরিবর্তন হয় সেগুলি প্রস্রাবের রিপোর্টে পাওয়া। প্রস্রাবের বিভিন্নরকম পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন সময়ের সেম্পল বা নমুনা নিতে হয়। পরীক্ষার জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে সকালের প্রস্রাব বা মর্নিং সেম্পল নিতে হয়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ফ্রেশ সেম্পল বা যেকোন সময়ের প্রস্রাব নিতে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সারাদিন রাতের ২৪ ঘন্টার প্রস্রাব পরীক্ষা করা হয়। অর্থাৎ ২৪ ঘন্টায় যতোটুকু প্রস্রাব হয় তার সম্পুর্ন পরীক্ষা করাতে হয়।

সবচেয়ে বেশী পরীক্ষা লেখা হয় ইউরিন রুটিন এক্সামিনেশন বা আর ই। আর ই পরীক্ষায় মূলত প্রশাবের কালার বা রঙ, এলবুমিন, সুগার, অতিরিক্ত ফসফেট, পাস সেল, ইপিথেলিয়াল সেল, আরবিসি এবং বিভিন্ন রকম ক্রিস্টাল-এর রিপোর্ট দেওয়া হয়। বিভিন্ন রোগে বিভিন্ন কালার হয়। প্রস্রাবের সাথে এলবুমিন গেলে সাধারণত কিডনির সমস্যা আছে ধরে নেয়া হয়। সুগার যায় সাধারণত ডায়াবেটিস মেলাইটাস রোগে। কিছু কিছু রোগে অতিরিক্ত ফসফেট যায় প্রস্রাবের সাথে। প্রতি হাই পাওয়ার ফিল্ডে ৫ টার বেশী পাস সেল পাওয়া গেলে ইউরিনারি ট্রাক্টে ইনফেকশন হয়েছে সন্দেহ করা হয়। কিডনির রোগে প্রস্রাবে আরবিসি পাওয়া যায়। আর ই পরীক্ষার জন্য প্রস্রাব যত ফ্রেস হবে তত ভালো। ল্যাব খোলা থাকা কালীন এক টেস্ট টিউব পরিমান অথবা একটা ইউনিয়ন কালেকশন বোতলে প্রস্রাব দিতে হয়। বাসায় কালেকশন না করে ল্যাবের টয়লেটে গিয়ে কালেকশন করা উত্তম। যাদের প্রস্রাবে ইনফেকশন হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয় তাদেরকে ইউরিন কালচার ও সেনসিটিভিটি বা সিএস পরীক্ষা করতে পরামর্শ দেয়া হয়। সিএস করতে জীবাণুমুক্ত টেস্ট টিউবে প্রস্রাব কালেকশন করতে হয়। এজন্য ল্যাব থেকে এই ধরনের টেস্ট টিউব সংগ্রহ করতে হয়। এই পরীক্ষার জন্য যেকোন সময়ের প্রস্রাব নিলেও চলে। তবে সকালের প্রথম প্রস্রাবটা বেশী ভালো হয়। কারন, সকালের প্রস্রাবে জীবাণুর ঘনত্ব বেশী থাকে।

ব্লাড সুগার পরীক্ষার সাথে সাধারণত করোসপন্ডিং ইউরিন সুগার (CUS) করতে বলা হয়। অর্থাৎ যে সময়ের রক্ত সুগার লেভেল দেখার জন্য নেয়া হলো তখন প্রস্রাবে সুগার এসেছিলো কি না। কাজেই আগে থেকে পেটের ইউরিনারি ব্লাডারে জমে থাকা ইউরিন প্রস্রাব করে ফেলে দিতে হবে। তার ১৫/২০ মিনিট পর প্রস্রাব দিতে হবে। সিইউএস দেখার জন্য এক এমএল প্রস্রাবই যথেষ্ট। আগে থেকে জমে থাকা প্রস্রাবে যখন তার সুগার লেভেল বেশী ছিলো তখনকারটা দেখাতে পারে।

চব্বিশ ঘন্টার প্রস্রাবের পরীক্ষার মধ্যে সবচেয়ে বেশী করা 24 hours urine protein বা urinary total protein (UTP) বা ২৪ ঘন্টার প্রস্রাবের প্রোটিন। দিনে রাতে একেক সময় একেক পরিমাণে প্রোটিন যায় প্রস্রাবের সাথে। তাই একবারের নমুনা দেখে কি পরিমাণ প্রোটিন যায় তা বলা মুশকিল। এইজন্য ২৪ ঘন্টার প্রস্রাব কালেকশন করে সম্পুর্ন প্রস্রাব ল্যাবে জমা দিতে হয়। এটা করতে গিয়ে অনেকেই উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে। তাতে পরীক্ষার রিপোর্ট ভুল আসে। কেউ কেউ ২৪ ঘন্টার প্রস্রাব কালেকশন করে ভুল করে সেখান থেকে মাত্র এক বোতল প্রস্রাব ল্যাবে জমা দেয়। বিশেষ করে খিটখিটে মেজাজের রোগী হলে বলেই ফেলে “ডাক্তারের কি মাথা খারাপ হইছে নাকি যে জগ ভইরা প্রস্রাব দিতে হইবো?” ল্যাব যদি জানতে না পারে যে কম পরিমান সাপ্লাই দিয়েছে তবে প্রোটিনের হিসাব ভুল হবে। ২৪ ঘন্টার হিসাব নিয়েও খটকা আছে। কেউ কেউ মনে করেন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রস্রাব করে ধরে, সারাদিন ও রাতের প্রস্রাব ধরে পরদিন সকাল পর্যন্ত প্রস্রাব করে বৈয়ামে কালেকশন করতে হবে। এই ভুলটা সচরাচর করে থাকে রোগীরা। হিসাব করে দেখুন এক্ষেত্রে কয় ঘন্টা হয়েছে। মনে করুন, রাত ১০ টায় রোগী টয়লেটে প্রস্রাব করে ফেলে দিয়েছে। সকাল ৬ টায় প্রথম প্রস্রাব করে বৈয়ামে রেখে দিলো। সারাদিন রাতে যা হলো তাও রেখে দিলো। পরদিন সকালেরটা ধরে শেষ করলো। কয় ঘন্টা হলো? রাত ১০ টা থেকে সকাল ৬ টা পর্যন্ত ৮ ঘন্টা সকাল ৬ টা থেকে পরদিন সকাল ৬ টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টা। মোট ৩২ ঘন্টার প্রস্রাব দিয়েছে রোগী। রিপোর্টে প্রোটিনের পরিমাণ বেশী আসবে। এটা ভুল রিপোর্ট। চিকিৎসাও ভুল হবে এই রিপোর্ট দেখে। সঠিক নিয়মটা হলো এরকম। রোগী যে কোন সময় থেকেই প্রস্রাব ধরা শুরু করবেন। মনে করুন বিকেল ২ টা থেকে। এই সময় তিনি টয়লেটে প্রস্রাব করে ফেলে দেবেন। তারপর থেকে যতবার প্রস্রাব হবে সব বোতলে ধরবেন এবং পরিস্কার বৈয়ামে রাখবেন। প্রিজার্ভেটিভ হিসাবে বৈয়ামে এক দুই এমএল টলুইন, না পাওয়া গেলে ফরমালিন দেয়া যেতে পারে। ল্যাব থেকে এটা সাপ্লাই দেয়া হয়। পরদিন বিকেল ২ টার সময় শেষ প্রস্রাব করে বোতলে নিতে হবে। প্রস্রাবের চাপ না থাকলেও নির্দিষ্ট শেষ সময়টায় প্রস্রাব ধরতে হবে, এক দুই ফোটা যাই হোক। যদিও আগের দিন ২টার সময় প্রস্রাব করে ফেলে দেয়া হয়েছে তবু সেই সময় থেকেই গণনা শুরু করতে হবে। কারন, সেই সময় থেকেই প্রস্রাব থলিতে জমা হইতে থাকে। হিসাব করে দেখুন এবার ২৪ ঘন্টার প্রস্রাবই পাওয়া গেছে। শুধু ২ টা থেকে নয় যখন পরীক্ষার জন্য লেখা হলো তখন থেকেই শুরু করা যায় টয়লেটে প্রস্রাব করে। তাতে সময় বাচবে। এজন্য রোগীকে আগেই বলে দেয়া ভালো যে কখনকার প্রস্রাব কিভাবে কালেকশন করবেন এবং পরীক্ষার জন্য ল্যাবে জমা দেবেন। সঠিক চিকিৎসার জন্য চাই সঠিক ল্যাবরেটরি ইনভেস্টিগেশন।

প্রেগন্যান্সি হয়েছে কিনা দেখার জন্য প্রস্রাব পরীক্ষা করা হয়। বলা হয় প্রেগন্যান্সি টেস্ট। প্রেগন্যান্সিতে প্লাসেন্টার কোরিওনিক ভিলাই থেকে হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রোপিন (HCG) তৈরি হয়ে রক্তে প্রবাহিত হয়ে প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায়। এই হোরমোন তৈরি হয়ে প্রস্রাবে আসতে কয়েকদিন সময় নেয়। সাধারণত পেরিয়ড বা মাসিক যেদিন শুরু হবার সম্ভাব্য তারিখ ছিল তার ৪-৫ দিন পর থেকে প্রস্রাবে এই হরমোনের উপস্তিতি প্রেগন্যান্সি টেস্টের মাধ্যমে নির্ণয় করা যায়। প্রথমদিকে এই হরমোনের ঘনত্ব প্রস্রাবে কম থাকে। তাই সকালের প্রস্রাব নিয়ে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করতে হয়। মাসিক বন্ধের দুই মাস হয়ে গেলে সকালের প্রস্রাব প্রয়োজন পড়ে না। যে কোন সময়ের প্রস্রাব হলেই হবে।

প্রস্রাবের রিপোর্ট সঠিক পাওয়ার জন্য এবং রোগীর হয়রানি কমানোর জন্য চিকিৎসকের দায়িত্ব হলো পরীক্ষার নিয়ম কানুন একটু বলে দেয়া এবং রোগীর দায়িত্ব হলো তা বুঝে নেয়া। পরীক্ষার রেজাল্ট যেমন হবে, চিকিৎসাও তেমন হবে।
১৩/১১/২০২০
ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/