টিউমার ও ক্যান্সার

টিউমার ও ক্যান্সার
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

রুগীরা শরীরের কোথাও বল আকারে ফুলে উঠলে টিউমার মনে করে। টিউমার কথাটা এসেছে টিউমর থেকে। যার অর্থ ফুলে উঠা। আগের দিনে গলার থায়রয়েড গ্লান্ড বড় হয়ে গেলে গ্রামের মানুষ বলতো ঘ্যাগ। ডাক্তাররা বলেন গলগণ্ড রোগ। ইংরেজিতে বলা হয় গয়টার। খাবার পানিতে আয়োডিনের অভাব হলে সাধারণত গলগণ্ড রোগ হয়। এই গলগণ্ড রোগকেও এখন রুগীরা টিউমার মনে করে। শরীরের কোথাও জীবাণু আক্রান্ত হলে সেখানকার লিম্ফ নোড বা লসিকাগ্রন্থি রিয়েকশন করে বড় হয়ে যায়। রুগীরা এটাকেও টিউমার মনে করে। আসলে ফুলে উঠলে বা চাক্কা হলেই টিউমার না। টিউমার হলো বিশেষ ধরনের রোগ। টিউমারের ডাক্তারি ভাষার উপযুক্ত শব্দ হলো নিউপ্লাজম।

আমাদের শরীরের প্রত্যেকটি অংগ টিস্যু বা কলা দিয়ে তৈরি। আর প্রতিটি কলা অসংখ্য ছোট ছোট কোষ দিয়ে তৈরি। একটা বিরাট বিল্ডিং তৈরি করতে যেমন অসংখ্য ইট প্রয়োজন হয়, তেমনি আমাদের শরীর গঠন করতে অসংখ্য কোষ প্রয়োজন পড়ে। কোষের ভিতর থাকে ২৩ জোড়া করে ক্রমোজম। প্রতি জোড়া ক্রমোজমের একটি পিতা থেকে এবং একটি মাতা থেকে আসে। পিতার স্পার্মাটোজোয়া থেকে ২৩ টা ও মাতার ওভাম থেকে ২৩ টা ক্রমোজম একত্র হয়ে প্রথম ২৩ জোড়ার একটি কোষ তৈরি হয় সন্তান সৃষ্টির প্রারম্ভে। তারপর কোষ বিভাজন হয়ে কোষের নাম্বার বেড়ে বেড়ে সন্তানের আকারে বড় হতে থাকে। শুধু নাম্বারই বাড়ে না শরীরের একেক অংশের কোষগুলি একেক রেটে বৃদ্ধি পেয়ে মানবের আকৃতির রূপ নেয়। কোষ শুধু নাম্বারে বাড়েই না, বেশ কিছু কোষ মারাও যায়। কোন কোন কোষ মারা যেতে হবে, কোন কোন কোষ নতুন করে তৈরি হতে হবে, কি পরিমাণে তৈরি হতে হবে তার একটা নিয়ম আছে। এই নিয়মের ব্যত্যয় হলে মানুষ রোগাক্রান্ত হয়। কারন ছাড়া কোন কিছুই হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই কারন জানা যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রেই আমরা কারন জানতে পারি না বা আবিষ্কার করতে পারি নাই। যাহোক, যে কারনেই হোক শরীরের কোন একটি কোষ নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে পেতে একটা চাক্কা বা বলের মতো হয় যায়, যাকে ডাক্তারি ভাষায় মাস অব টিস্যু বলা হয়।

ডাক্তারি ভাষায় একটা মাস অব টিস্যু যার বৃদ্ধি কিছুতেই থামানো যায় না, এমনকি যেকারনে বৃদ্ধি হওয়া শুরু হয়েছিল, সেই কারনও এখন নেই, তারপরও বৃদ্ধি পেতেই আছে, এইটাই হলো নিউপ্লাজম বা টিউমার। আয়োডিনের অভাবে গলার থায়রয়েড গ্লান্ড বৃদ্ধি পেয়ে গলগণ্ড হয়েছিল। আয়োডিনের ঘাটতি পুরণ করা হলে থায়রয়েড গ্লান্ড বৃদ্ধি পাওয়া বন্ধ হল বা স্বাভাবিকে ফিরে এলো। কাজেই এটা নিউপ্লাজম বা টিউমার না। জর্দা খাওয়ার জন্য দাতের মাড়িতে একটা মাস বা চাক্কা হল। জর্দা খাওয়া বাদ দেওয়া হল। কিন্তু মাড়ির চাক্কা বেড়েই চললো। থামলো না। থামানো গেলো না সহজে। কাজেই এটা নিউপ্লাজম।

সব টিউমারই মারাত্মক না। যে সব টিউমার মারাত্মক সেগুলিকে ক্যান্সার বলা হয়। রুগীরা মনে করে টিউমার থেকে ক্যান্সার হয়। আসলে তা না। সব ক্যান্সারই টিউমার। যেটা ক্যান্সার, সেটা প্রথম থেকেই ক্যান্সার। কিছুদিন বা কয়েকমাস পর ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে, সাধারণত তা নয়। তবে শরীরের যে কোন অংগের যে কোন কোষ যেমনি ক্যান্সার কোষে রুপান্তরিত হতে পারে, তেমনি টিউমার বেনাইন বা অমারাত্মক থেকে ম্যালিগন্যান্ট বা মারাত্মক বা ক্যান্সার হতে পারে। এই জন্য টিউমার দুই রকম – বেনাইন ও ম্যালিগন্যান্ট। ম্যালিগন্যান্ট টিউমারগুলাকেই ক্যান্সার বলা হয়। বেনাইন টিউমার নিয়েও রুগী আমাদের কাছে পরীক্ষা করাতে আসে। কেন পরীক্ষা করাতে চান জিজ্ঞেস করলে বলেন যে শুনছি টিউমার থেকে ক্যান্সার হয়। পরীক্ষা করার পর যখন জানতে পারে যে তার ক্যান্সার নাই তারপরও সে চায় যে তার শরীরে বেনাইন টিউমার না থাকুক। কারন, তার ধারনা, টিউমার থেকে ক্যান্সার হয়। তবে কথাটা মিথ্যা না। কোন কোন ধরনের টিউমার আছে যেগুলি থেকে ক্যান্সার হবার প্রবনতা বেশী দেখা গিয়েছে।

ক্যান্সার কিন্তু লক্ষণ দেখেও কিছুটা আন্দাজ করা যায়। ক্যান্সার খুব গ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে। ক্যান্সারের চাক্কার মার্জিন পরিষ্কার না, এব্রোথেব্রো। ক্যান্সারের উপর আলসার বা ঘা দেখা দেয়। ঘা দেখতে বিদঘুটে হয়। পঁচা পঁচা থাকে। দুর্ঘন্ধ বের হয়। রস পড়ে, কস পড়ে। ব্যাথা, জ্বালা-যন্ত্রনা করে। প্যারাসিটামল ট্যাবলেটেও ব্যাথা কমে না। অল্প দিনেই শরীরের অন্যান্য অংগে ছড়িয়ে পড়ে। গলার, বগলের ও কোমড়ের পিচলির লিম্ফনোডে ছড়িয়ে পড়ে। যেটাকে রুগী ইলট বলে। ব্রেইনে ছড়িয়ে পড়লে প্যারালাইজড হয়ে যায় শরীর। ফুসফুসে ছড়িয়ে কাশি হয়। কাশির সাথে রক্ত পড়ে। লিভারে ছড়িয়ে পড়ে পেটে চাক্কা হয়। পেটে পানি জমে ক্যান্সার থেকে। বুকে পানি জমে ক্যান্সার থেকে। পরিপাকতন্ত্রে ক্যান্সার হলে বমির সাথে রক্ত পড়ে, পায়খানার সাথে রক্ত পড়ে। খাদ্যনালীতে ক্যান্সার হলে খাদ্য আটকে যায়। গলায় ক্যান্সার হলে স্বর বসে যায়। আরো নানাবিধ লক্ষণ আছে ক্যান্সারের। যতই সন্দেহ হোক ক্যান্সার পরীক্ষা না করে ঘোষনা দেয়া ঠিক না। সাইটোপ্যাথলজিস্ট ও হিস্টোপ্যাথলজিস্ট বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পরীক্ষা করে ক্যান্সার রোগ নির্ণয় করেন। প্রাথমিক পরীক্ষা হল ফাইন নিডল এসপাইরেশন সাইটোলজি (এফ এন এ সি) পরীক্ষা। টিউমার থেকে এক সুই পরিমাণ রস নিয়ে এক ঘন্টার মধ্যেই রিপোর্ট দিয়ে দিতে পারা যায়। সবচেয়ে কার্যকরী পরীক্ষা হল হিস্টোপ্যাথলজি বা বায়োপ্সি পরীক্ষা। কিন্তু এটা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ পরীক্ষা।

বিনাইন টিউমারই হোক, আর ম্যালিগন্যান্ট টিউমারই হোক, সব টিউমারই পরীক্ষা করে নেয়া ভালো। বলা তো যায় না কার ভিতরে কি আছে। বিনাইন মনে করে কোনো টিউমারই অপারেশন করার পর ফেলে দেয়া ঠিক না। ঠিক হলো, সম্পুর্ণ টিউমার হিস্টোপ্যাথলিস্ট দিয়ে পরীক্ষা করায়ে ডাক্তারকে দেখিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া। অন্যান্য দামী দলিলের মতই রিপোর্টটি আজীবন সংরক্ষণ করা। যতবার অসুস্থতাজনিত কারনে ডাক্তার দেখাবেন, ততবার ডাক্তার জানতে চাবেন আপনার আগের অপারেশন হয়েছিল কি রোগের কারনে। আরেকটা কথা মনে রাখতে হবে, এই দুইটি পরীক্ষায় শুধু টিউমার/ক্যান্সারই ধরা পরে না, অন্যান্য রোগ, যেমন, টিউবারকিউলোসিস বা টিবি রোগ ও ইনফেকশনও ধরা পড়ে।
৩০/৭/২০১৯ ইং