উদ্দেশ্য ভালো থাকলে সমস্যা হবে না

উদ্দেশ্য ভালো থাকলে সমস্যা হবে না
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগের কথা। তখন ময়মনসিংহে কম্পিউটারের দোকান ছিলো না। ঢাকার কলাবাগানের সুপার কম্পিউটার শপ থেকে ১৯৯৮ সনে একটি ডেস্কটপ কম্পিউটার কিনেছিলাম। বই পড়ে মেডিকেলের ছাত্রদের জন্য কম্পিউটারে টাইপ করে ক্লাস নোট তৈরি করতাম। ট্রান্সপারেন্ট সীটে প্রিন্ট করে ওভারহেড প্রজেক্টরে ক্লাস নিতাম। এটাই ছিলো আমার কম্পিউটার কেনার আসল উদ্দেশ্য। কিছু কিছু বিষয় ড্র করে প্রেজেন্ট করতে হয়। কম্পিউটারে এটা আমার জন্য একটি সমস্যা ছিলো। আবুল মনসুর ভাই থেকে জানতে পেলাম স্ক্যানার নামে একটি কম্পিউটার ডিভাইস আছে, সেটা দিয়ে বইয়ের পাতা হুবহু ফটো আকারে কম্পিউটারে সেইভ করা যায়। এটাকেই স্ক্যান করা বলা হয়। আমি চলে গেলাম ঢাকায় এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন প্লাজায় কম্পিউটারের দোকানে। ইতিমধ্যে ইস্টার্ন প্লাজায় অনেক কম্পিউটারের দোকান বসে গেছে। আমার মামাতো শ্যালক শিপনও ওখানে কম্পিউটারের দোকান দিয়েছিল। তার দোকানে স্ক্যানার ছিলো না। তাই আমাকে অন্য দোকানে নিয়ে গেলো। সেই দোকানের প্রোপাইটার ছিলেন একজন ইয়াং মেয়ে, শ্যালকদের বয়সের। শিপন আমাকে মেয়েটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ভালো একটা স্ক্যানার দিতে বললো। আট হাজার টাকা দিয়ে একটি ক্যানন ব্রান্ডের স্ক্যানার কিনলাম। তখনকার আট হাজার এখনকার ৪০ হাজারের সমান হবে। ফেরার সময় মেয়েটিকে বললাম “কোন সমস্যা হবে না তো?” অনেকেই কোন যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ কেনার সময় এমন কথা জিজ্ঞেস করে থাকে। আমিও তাই করেছিলাম। উত্তরে দোকানিরা সাধারণত বলে “সমস্যা হবার কথা না। যদি হয়েই যায় তবে নিয়ে আসবেন। ঠিক করে দেবো।” অথবা বলে “এক বছরের ওয়ারেন্টি আছে।” কিন্তু মেয়েটি আমাকে তা না বলে বললেন “উদ্দেশ্য ভালো থাকলে সমস্যা হবে না।” কথাটি বেয়াদবির মতো মনে হলো। আমি আর কোন কথা না বলে স্ক্যানার নিয়ে চলে এলাম। বইয়ের ছবি স্ক্যান করে কম্পিউটার কম্পোজ করলাম আমার ক্লাস প্রেজেন্টেশন। কি মজা! আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন আমাদের স্যারগণ বইয়ের পাতা প্রজেক্ট করে পর্দায় ফেলতেন। আমিও স্যার হয়েছি। আমি বইয়ের পাতা প্রজেক্ট না করে স্ক্যান করে প্রথম দিকে ট্রান্সপারেন্ট পেপারে প্রিন্ট করে প্রোজেক্ট করতাম, পরে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন করে প্রোজেক্ট করতাম। এখনো সেই স্ক্যানার আছে আমার ড্রয়ারে। ভালোই আছে। কিন্তু প্রয়োজন পড়ে না। কোন কিছু স্ক্যান করতে হলে মোবাইলের সিম্পল স্ক্যানার (simple scanner) এপ দিয়ে স্ক্যান করে ফেলি নিমিষেই। আমার মৃত্যুর পর ঐ স্ক্যানারের স্থান কোথায় হবে জানি না।
একদিন মনসুর ভাইর চেম্বারে বসেছিলাম। ভাই বললেন “সাদেক ভাই, টাকা বানিয়ে দেখাবো?”
– কিভাবে?
– স্ক্যানার দিয়ে।
– দেখি।
তিনি একটি কাগজের এপিঠ-ওপিঠে ৫০০ টাকা নোট স্ক্যান করে প্রিন্ট দিয়ে অবিকল নকল নোট তৈরি করলেন। আমি দেখে আশ্চর্য হলাম। তিনি বললেন “ফান করলাম।” আমি মনসুর ভাইর কাছে বললাম “স্ক্যানার কেনার সময় বিক্রেতা মেয়েটি বলেছিলেন উদ্দেশ্য ভালো থাকলে সমস্যা হবে না। আমার মনে হয় তিনি টাকা বানানোর খারাপ উদ্দেশ্যর কথাই বুঝিয়েছেন।” তিনি বললেন “ঠিক তাই। কেউ কেউ এই কাজ করে।”
গতকাল টিভি নিউজে দেখলাম এক লোক ল্যাপটপ ও কালার প্রিন্টারের সাহায্যে ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট প্রডাকশন করছে ভাড়া বাসায় বসে নিজের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। সারা দেশে এই নকল টাকা সরবরাহের জন্য ফিল্ড ওয়ার্কার রেখেছেন। তিনি দুইটি কম্পিউটার ব্যবহার করে প্রতিদিন ৫ লাখ টাকা প্রডাকশন করেন। ধরা পড়ে জেলও খেটেছেন। জেল হয় মাত্র দেড় বছর। দেখতে দেখতে দেড় বছর কেটে যায়। বর্তমানে তিনি জামিনে বের হয়েছেন। আবার প্রোডাকশনে নেমেছেন। কত সহজ ইনকাম! মাসে ২০-৩০ হাজার টাকা কামাই করার জন্য আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরা বছরের পর বছর প্রবাসে কাটিয়ে দিলেন। শ্রমিক ভাইয়েরা অল্প বেতনে দেশের ইন্ডাস্ট্রিতে হাড়ভাংগা পরিশ্রম করে কোন রকমে সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন। রিক্সা ওয়ালা ভাইয়েরা অল্প টাকার বিনিময়ে আমাদেরকে বয়ে বেড়াচ্ছেন। কি আর বলবো? আমার কথাই ধরুন। সকালে সরকারি চাকরি করে অল্প কিছু মাইনে পেলাম। বিকেল ও রাতটুকু বিশ্রাম ও উপভোগ না করে প্রাইভেট প্রাক্টিস করলাম। কি আর কামাই করলাম তাতে? আর ওরা অল্প পরিশ্রমে ঘরে বসে প্রতিদিন প্রডাকশন দিচ্ছে ৫ লাখ টাকা। ওদের উদ্দেশ্য ভালো না। ওরাই সমস্যায় পড়ছে ইহকালে। পরকালেও সমস্যা আছে ওদের। আর আমাদের উদ্দেশ্য ভালো। আমাদের সমস্যা নেই কোন কালেই, ইনশাআল্লাহ।
২০/১০/২০২০ খ্রি.
ময়মনসিংহ