আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা

আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি মেডিকেল কলেজে পড়তাম ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সন পর্যন্ত। তখন আমি আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষার মেশিন দেখিনি। বইয়ে দেখেছি আলট্রাসনোগ্রাফি ইমেজ। ভালো করে বুঝতাম না সে ছবি। শুনতাম জাপানে এই পরীক্ষা খুব বেশি হয়। সেই পরীক্ষা দেশে এসে দ্রুত প্রসার লাভ করেছে। এখন এই পরীক্ষার প্রসার এমন হয়েছে যে আল্ট্রাসনোগ্রাফি না করলে সাধারণ রোগী তৃপ্তিই পায় না। এখন গ্রাম এলাকাতেও আলট্রাসনোগ্রাফি হচ্ছে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবার কারনে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি কথাটা এসেছে আল্ট্রাসাউন্ড থেকে। আর আল্ট্রাসাউন্ড এসেছে সাউন্ড বা শব্দ থেকে।

শব্দ ধরা-ছোয়া যায় এমন কোন বস্তু না। এটা এক প্রকার শক্তি। তাই একে দেখাও যায় না ছোয়াও যায় না। কোন বস্তুতে কম্পন হলে আমরা শব্দ শুনতে পাই। সব শব্দ সব প্রানী শুনতে পায় না। যখন কোন বস্তুতে কম্পন সৃষ্টি করা হয় তখন তার সাথের কঠিন, তরল ও বায়বীয় মাধ্যমে তরঙ্গ বা ঢেউ তৈরি হয়। এই ঢেউ শব্দ তরঙ্গ আকারে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেই তরঙ্গ এসে আমাদের কানের টিম্ফেনিক পর্দায় বারি খেয়ে পর্দায়ও কম্পন সৃষ্টি হয়। সেটা ওখান থেকে ব্রেইন বা মস্তিষ্কে পৌছে আমাদেরকে শুনিয়ে দেয়। আমরা পানিতে ঢিল ছুড়ে তরঙ্গ সৃষ্টি করে দেখেছি। ঢেউ একবার উচু হয়, একবার নিচু হয়। উচু-নিচু হতে হতে আগাতে থাকে। একবার নিচু থেকে উচু হয়ে নিচুতে নেমে আসাটাকে বলা হয় তরঙ্গের ফ্রিকুয়েন্সি। সেকেন্ডে যতটা ফ্রিকোয়েন্সি দেয় সেটাকে বলা হয় হার্জ। শব্দ তরঙ্গ ঢেউ খেলে মিডিয়াতে সঞ্চারিত হতে থাকে। ঢেউয়ের এক উচু মাথা থেকে আরেক উচু মাথার দূরত্বকে ওয়েভলেংথ বা তরঙ্গধৈর্ঘ্য বলে। আমরা যখন গাছে ঝুলনা বেঁধে ঝুলন খেলি, একজন পেছন থেকে ঝুলনে ধাক্কা দেয়। ঝুলন কিছুদূর গিয়ে আবার আগের যায়গায় ফিরে আসে। এটার ফ্রিকুয়েন্সি আছে। এর কোন তরঙ্গ নাই। কারন এ আগের যায়গায়ই ফিরে এসেছে। ঝুলন যদি আসা আসা যাওয়ার সময় সামনের দিকের পয়েন্টে আগাতো তা হলে তরঙ্গ সৃষ্টি হতো এবং এর একটা তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকতো। গিটারের কর্ড বা তারে টোকা দিলে কম্পন করে শব্দ তৈরি হয়। কর্ড যত চিকন হবে শব্দ তত কনকনে হবে। চিকন তারের শব্দের ফ্রিকুয়েন্সি বেশি। তাই চিকন শব্দ হয়। আমাদের স্বাস নালীতে ভোকাল কর্ড নামে দু’টি তার আছে। কথা বলার সময় বা গান গাওয়ার সময় আমরা ফুসফুস থেকে বাতাস ছেড়ে গলার মাংস সংকুচিত প্রাসারিত করে ভোকাল কর্ড শক্ত ও নরম করি। ভোকাল কর্ড কম্পন করে শব্দ হয় এবং শব্দের ফ্রিকুয়েন্সি কম বেশি হয়। মেয়েদের ভোকাল কর্ড ছেলেদের থেকে চিকন। তাই তাদের শব্দের ফ্রিকুয়েন্সিও বেশি। ফলে, তাদের আওয়াজ চিকন। মিডিয়াতে শব্দতরঙ্গ থাকলে আমরা শব্দ শুনতে পাই। সব তরঙ্গের শব্দ মানুষ শুনতে পায় না। মানুষ শুনতে পায় ২০ থেকে ২০ হাজার হার্জের শব্দ। এর নিচের শব্দকে বলা হয় ইনফ্রাসাউন্ড। ২০ হাজার হার্জের উপরের সাউণ্ডকে বলা হয় আল্ট্রাসাউন্ড। অর্থাৎ ইনফ্রাসাউন্ড ও আল্ট্রাসাউন্ড আমরা শুনতে পাই না। কোন কোন প্রাণী, যেমন, কুকুর এমন সাউন্ড শুনতে পায়। এই আল্ট্রাসাউন্ডকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি নামের এই পরীক্ষা পদ্ধতি । যাকে সাধারণ রোগীরা অতি সংক্ষেপে আল্ট্রা পরীক্ষাও বলে থাকে।

আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন, কোলাহলমুক্ত ভোরবেলা মাইকে আজান দিলে সেই আজানের ধ্বনি দূরের বড় বড় বিল্ডিংয়ে বাধা পেয়ে আবার আপনার কানে ফিরে আসে। এটাকে বলা হয় ইকো। তার মানে সাউন্ডওয়েভ নরম মিডিয়া থেকে শক্ত মিডিয়াতে প্রবেশ করতে বাধা পেয়ে প্রতিসরিত হয়। শব্দের এই প্রতিসরণ টেকনোলজি কাজে লাগানো হয়েছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষায়। মনে করুন, রোগীর পেটের লিভারটা দেখতে হবে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে। রোগীকে বেডে শোয়ানো হলো। পেটের জামা শরীয়ে চামড়ার উপর আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিনের প্রোব বসানো হল। প্রোবটা গোলাকার, মাইকের মাউথপিসের মতো। এর উপর জেল লাগিয়ে দেয়া হয়। মেশিন অন করলে প্রোবের ভেতর আল্ট্রাসাউন্ড তৈরি হয়। প্রোবটা পেটের চামড়ার উপর লিভার বরাবর ঘুরানো হয়। জেল, চামড়া ও মাংসের ভেতর দিয়ে আল্ট্রাসাউন্ড লিভার পর্যন্ত গিয়ে বাধা পেয়ে ইকো হয়ে ফিরে আসে প্রোবে। এটাকে ইলেট্রোমেগ্নেটিক সিগনালে রূপান্তরিত করে পাঠিয়ে দেয়া হয় মেশিনের প্রসেসর সেকশনে। সেখান থেকে সিগনালের গ্রাফ তৈরি হয়ে মনিটরে প্রদর্শিত হয় ছবি আকারে। এইজন্য বলা হয় আল্ট্রাসনোগ্রাফি। ডাক্তার সাহেব প্রোব ঘুরাতে থাকেন, গ্রাফ বা ছবি দেখে বিশ্লেষণ করে লিভারের সাইজ, সেইপ, ও এর ভেতর কোন টিউমার / ক্যান্সার আছে কিনা তা রিপোর্ট আকারে লেখেন। মনিটর থেকে দু’একটা ছবি প্রিন্ট করে রিপোর্টের সাথে গেঁথে দেন।

মনিটরে আপনি গ্রাফ থেকে বুঝার কথা না। এটা বুঝবেন তিনি, যাকে এই ব্যাপারে শেখানো হয়ে। যিনি বেশি শিখেছেন তিনি বেশি বুঝবেন। যিনি কিছুই শিখেন নাই তিনি কিছুই বুঝবেন না। কাজেই, বিদ্যুৎ এসে গেছে, হাতে টাকা আছে, কিনে ফেললাম একটা আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন। খুলে ফেললাম একটা আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেন্টার আলানে-পালানে, তা নয়। এটা চালাতে গেলে একজন এমবিবিএস পাস, তারপর আল্ট্রাসনোগ্রাফির ভালো প্রশিক্ষণ অথবা ডিপলোমা অথবা ডিগ্রি থাকতে হবে। ডিগ্রি যত বড় হবে অথবা অভিজ্ঞতা যত বেশি হবে রিপোর্ট তত ভালো হবে। কমজানা রিপোর্টকারী কিছুই পাবেন না। লিখে দেবেন সব সাভাবিক। অথবা পাথরকে লেখবেন টিউমার বা টিউমারকে লেখবেন পাথর। কাজেই, শুধু মেশিন দেখলেই হবে না মানুষটাকে দেখতে হবে পরীক্ষা করানোর আগে।

সবধরনের রোগ ডায়াগনোসিস করার জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাফি প্রজোজ্য নয়। বড়দের মাথায় কোন আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হয় না। তবে শিশুদের দেড় বছর বয়স পর্যন্ত মাথার আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হয়। বুকের ফুসফুসে বাতাস থাকে। বুকের আল্ট্রাসনোগ্রাফি সুবিধাজনক না। তবে বুকে থাকে হার্ট বা হৃদপিণ্ড। হার্টের এই রকম একটা পরীক্ষা আছে যাকে বলা হয় ইকোকার্ডিওগ্রাফি। আল্ট্রাসনোগ্রাফি অব হোল এবডোমেন বা সারাপেটের আল্ট্রাসনোগ্রাফি হলো খুবই কার্যকরী একটা পরীক্ষা। পেটের প্রায় সব অংগের যেমন, লিভার, গল ব্লাডার, পেনক্রিয়াস, সপ্লিন, কিডনি, ইউরিনারি ব্লাডার, প্রোস্টেট, ইউটেরাস, ওভারি ইত্যাদির সাইজ সেপ ও এর ভেতর থাকা পাথর, টিউমার/ক্যান্সার ইত্যাদি দেখা যায়। সব কিছু সাভাবিক থাকলে রোগীকে বুঝাতেও সুবিধা হয়। কোন কোন সহকারী কোন কোন অশিক্ষিত রোগীকে এভাবে বুঝিয়ে দেন “আপনার কলিজা, পিতের থলি, তিল্লি, পিলা, গুর্দা, জরায়ু, মুত্রথলির ছাকনি সব ভালো আছে।” রোগী শুনে সন্তুষ্ট হয়। ব্রেস্ট ও অন্ডকোষেরও আল্ট্রাসনোগ্রাফি হয় । মাংস পেশির রোগেও আজকাল অনেক আল্ট্রাসনোগ্রাফি হচ্ছে। রক্তনালী দেখার জন্য ডপলার আল্ট্রাসনোগ্রাফি নামে একরকম পরীক্ষা করা হয়। শুনেছি, মাথা খারাপ এক রোগী মাথার আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার জন্য খুব অনুরোধ করায় রোগীর সন্তুষ্টির জন্য কপালে প্রোব ঘুরিয়ে সান্তনামূলক আল্ট্রাসনোগ্রাফি করেছিলেন এক ডাক্তার । এমন অনেক রোগী আছে প্রয়োজন না থাকলেও তারা আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার জন্য পীড়াপিড়ি করে। অনেকে এটাকে কম্পিউটার পরীক্ষাও বলে কম্পিউটারের মনিটরের মতো দেখা যায় বলে। গ্রামের কোন কোন অশিক্ষিত রোগী আল্ট্রাসনোগ্রাফির মনিটর দেখে মজা পায়। বাড়ি গিয়ে ভাবী, ননদ ও জায়ের সাথে গল্প করে বলে “কম্পিউটারে পেটের ভেতরের সব দেখা যায়।” শুনে তারাও নিজের শরীরের আল্ট্রা বা কম্পিউটার পরীক্ষা করাতে আসে আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেন্টারে।

আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষার সুবিধা হলো এটা একটা নন-ইনভেসিভ পরীক্ষা। মানে, এখানে শরীরের ভেতরে কোন কিছু ঢুকাতে হয় না। তাই কোন ব্যাথা পাওয়ার প্রশ্ন আসে না। এখানে এক্স-রের মতো রেডিয়েশন হ্যাজার্ড নাই। কারন, এখানে ব্যাবহার করা হয় সাউন্ড। ভালো মেশিন ও ভালো ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করালে অনেক রোগ নির্ণয় করতে সহায়তা করে আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষায়।

১২/৯/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/