এক্স-রে পরীক্ষা

এক্স-রে পরীক্ষা

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

এক্স-রে পরীক্ষা হলো সর্বাধিক প্রচলিত রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা। আমরা যখন এমবিবিএস ছাত্র ছিলাম তখন শুধু রেডিওলজি বিভাগে এক্স-রে করা হতো। এরপর আসে আলট্রাসনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান ও এমআরআই পরীক্ষা এবং ডিপার্টমেন্টের নাম হয় রেডিওলজি এন্ড ইমেজিং। ছোট বেলায় দেখেছি টাঙ্গাইল শহরে গিয়ে আমাদের সখিপুরের এলাকার মানুষ এক্স-রে করিয়ে চিকিৎসা করাতো। যে কোন রোগই থাকুক না কেনো এক্স-রে না করা হলে রোগী তৃপ্তি পেতো না। প্রয়োজন না হলেও কেউ কেউ রোগীর সন্তুষ্টির জন্য নাকি এক্স-রে করাতো। কোন কোন রোগী এভাবে বলতো “টাঙ্গাইল গিয়া এক্সো করমু।” মানে “টাঙ্গাইল গিয়ে ডাক্তার দেখাবো।” মনে করা হতো এক্স-রে দিয়ে শরীরের ভেতরের সব দেখা যায়। কোন কোন মহিলারা বলতো আয়না পরীক্ষা। ডাক্তার সাব ভিউ বক্সে এক্স-রে ফিল্ম লাগিয়ে চেয়ে থাকতেন বুঝার জন্য। যেন তিনি আয়না দেখছেন। এই জন্যই বলতো আয়না পরীক্ষা। দেশে এক্স-রে পরীক্ষার প্রচলন হলে চিকিৎসা ব্যাবস্থার অনেক উন্নতি হয়। বিশেষ করে ফুসফুসের টিউবারকুলোসিস বা যক্ষা রোগ নির্ণয়ে। তখন ফুসফুসের ক্যান্সার নির্ণয় করার প্যাথলজিস্টের সংখ্যাও অপ্রতুল ছিল। তাই, শুধু বুকের এক্স-রে দেখে ফুসফুসের রোগ নির্ণয় করা হতো। তাতে বেশ কিছু ক্যান্সার রোগীকে হয়তো যক্ষা মনে করে ভুল চিকিৎসা করা হয়েছে। কাশির সাথে রক্ত পড়লে মনে করা হতো যক্ষা। ক্যান্সার রোগেও কাশির সাথে রক্ত পড়ে। দেবদাসের কাশির সাথে রক্ত পড়তো। সবাই জানে তার যক্ষা হয়েছিল। ক্যান্সারও তো হতে পারে।

এক্স-রের সবচেয়ে সুবিধাজনক দিক হলো এর মাধ্যমে শরীরের ভেতরে থাকা রোগাক্রান্ত স্থান, হাড়, মাংস ও নাড়িভুঁড়ির ছবি উঠানো যায়। কিন্তু থ্রিডি আলট্রাসাউন্ড ও এম আর আই-এর মতো অবয়ব পাওয়া যায় না। ১৮৯৫ সনে জার্মান বিজ্ঞানী রঞ্জন একটা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক আলোক রশ্নি আবিস্কার করেন যা মানুষের হাড়-মাংস ভেদ করে চলে যেতে পারে। এই রশ্মিকে শরীর ভেদ করে ফটোফিল্মের উপর ফেলা হয়। ফিল্মে কেমিক্যাল লাগানো থাকে। রশ্মি ফিল্মে পড়ে এক ধরনের বিক্রিয়া করে ফিল্মের উপর। ফিল্ম ডেভেলপ করে ফটো পাওয়া যায় সাদা কালো। শরীরের অংশ যত বেশি সলিড বা ঘন হবে এক্স-রে রশ্মি তত বাধাগ্রস্ত হবে। তাই ফিল্মের পড়ার সময় কেমিক্যাল রিয়েকশনের কমবেশি হয়। রশ্মি সলিড জিনিস ভেদ করে আসলে ফিল্মের এরিয়ায় সাদা হয়। বাতাস বা খালি যায়গা ভেদ করে আসলে ফিল্মের এরিয়ায় কালো হয়। সলিড যত বেশি হবে সাদা তত ঘাড় হবে। মাংস কম সাদা হয়। ফুসফুসে বাতাস থাকে তাই ফুসফুস কালো দেখা যায় এক্স-রে ফিল্মে। এইভাবে ডাক্তার সাব শরীরের ভেতর কোথায় কি সমস্যা হয়েছে ছবি দেখে বুঝার চেষ্টা করেন।

এক্স-রে পরীক্ষার সবচেয়ে কার্যকরী দিক হলো হাড়ভাংগা দেখা। হাড় ফেটে গেলেও এক্স-রে ফিল্ম-এ ফাটা দেখা যায়। হাড়ে টিউমার / ক্যান্সার হলেও দেখা যায়। পিত্তথলি, কিডনি, ইউরেটার, মুত্রথলি ইত্যাদিতে পাথর হলেও দেখা যায় এই পরীক্ষায়। সবধরনের পাথর কিন্তু এক্স-রেতে ধরা পরে না। কারন, সবধরনের পাথর একই জিনিস দিয়ে তৈরি হয় না। যে পাথর এক্স-রে ফিল্মে সাদা হয় তাকে রেডিও ওপেক স্টোন, না হলে রেডিও লুসেন্ট স্টোন। কাজেই রিপোর্টে পাথর নাই লেখা মানেই পাথর নাই বলা যাবে না।

সাধারণ ভাবে এক্স-রে করলে নাড়িভুঁড়ির ভেতরের দিক দেখা যায় না। মেরিয়ামের সরবত সাদা। এই সরবত পান করে এক্স-রে করলে নাড়িভুঁড়ির ভেতরের বেরিয়াম সরবত সাদা দেখা যায়। নাড়িভুড়ির ভেতরের আস্তর যেমন থাকবে বেরিয়াম সরবতের বাইরের আস্তরনও তেমন হবে। যেহেতু সরবতের নিজের কোন আকার নাই। যে পাত্রে রাখা যাবে সেই পাত্রের রং ধারন করবে। সেহেতু বেরিয়াম সরবত নাড়িভুঁড়ির ভেতরের আকৃতি ধারণ করবে। পাকস্থলী অথবা অন্ত্রে ক্ষত বা ঘা থাকলে সেখানে বেরিয়াম সরবত ঢুকে পড়বে। আর ক্যান্সার হয়ে উচু হয়ে উঠলে সেই অংশে বেরিয়াম সরবত দখল করতে পারবেনা। বেরিয়াম সোয়ালো, বেরিয়াম মীল ও বেরিয়াম এনেমা এক্স-রে পরীক্ষা করে পরিপাক তন্ত্রের আলসার ও ক্যান্সার নির্ণয় করতে সহায়তা হয়। সাইনাস ও ফিস্টুলা বা নালী ঘার দৈর্ঘ্য ও আকৃতি দেখতেও বেরিয়াম সরবত প্রবেস করিয়ে এক্স-রে পরীক্ষা করা যেতে পারে। বাচ্চারা কয়েন গিলে ফেললে এক্স-রে করে কয়েনের অবস্থান দেখা যায়। গর্ভবতী মায়ের সন্তানের সাইজ ও অবস্থান দেখতে আগের দিনে এক্স-রে করা হতো। আগের দিনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগী নিজের ইচ্ছায় মাথা ধরার কারনে মাথার এক্স-রে করাতো। রোগীর সন্তুষ্টির জন্য অনেক সময় মাথা ধরার কারনে মাথার এক্স-রে করাতো। নাকের আশেপাশে হাড়ের ভেতর বাতাসের কুঠুরি আছে। এগুলিকে বলা হয় সাইনাস। এদের আবরনে ইনফেকশন হলে বলা হয় সাইনুসাইটিস। সাইনুসাইটিস হলেও মাথা ব্যাথা করে। এক্স-রে প্যারানেজাল সাইনাস করালে সাইনাসগুলো হ্যাজি বা ঘোলা দেখা যায়। বুকের এক্স-রে করালে হার্ট ও লাংসের অবস্থা জানা যায়। লাংস বা ফুসফুসের ছবি কালো হয় বাতাস থাকার কারনে। কিছু হয়ে যদি কিছু অংশ সলিড হয়ে যায় তখন বলা হয় কনসালিডেশন। ইনফেকশন ও ক্যান্সার হলে কনসোলিডেন পাওয়া যায়। অর্থাৎ উক্ত অংশ সাদা হয়। কনসোলিডেশনের প্রধান কারন হলো টিউবারকুলোসিস (যক্ষা)। ভাড়ী বোঝা উঠানোর সময় অনেকের মেরুদন্ডের হাড়ের ডিস্ক (চাকতি) সরে যায়। এটাকে বলা হয় প্রলাপ্স ইন্ট্রাভার্ট্রিব্রাল ডিস্ক (পিএলআইডি)। মেরুদন্ডের এক্স-রে করে দেখা যায় মেরুদন্ডের হাড় বসে গেছে। হাড় ক্ষয় গেলেও বুঝা যায়, বৃদ্ধি পেলেও বুজা যায়।

উপরের আলোচনায় দেখা গেলো এক্স-রে পরীক্ষার বহুবিধ ব্যবহার আছে। মোটামুটি সস্তা এবং বহুল প্রচলিত পুরাতন একটা পরীক্ষা।

কিন্তু এক্স-রে পরীক্ষার কিছু খারাপ দিক আছে। এক্স-রে পরীক্ষার সময়ও অল্প কিছু আয়োনাইজিং রেডিয়েশন পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। রেডিয়েশনের কারনে মানুষের শরীরের কোষের ক্ষতি হতে পারে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারও হতে পারে। ছেলেদের অন্ডকোষের এবং মেয়েদের ডিম্বাধারের জার্ম সেল নষ্ট হয়ে যেতে পারে এক্স-রের কারনে। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী সন্তান হবার সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলে। তাই, সন্তান হবার আগে এক্স-রে পরীক্ষা যতদূর সম্ভব পরিহার করতে হবে।

এক্স-রে পরীক্ষা যতদূর সম্ভব পরিহার করাই ভালো। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ এক্স-রে করবেন না। এক্স-রে পরীক্ষার ব্যাপারে সিদ্ধান্তটা ডাক্তারকেই নিতে দিন। তিনিই বিবেচনা করে দেখবেন রিস্ক জানা থাকতেও এক্স-রে করাটা কতটুকু জরুরি।

৮/৯/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ