ইয়াদ আলীর স্বপ্ন

ইয়াদ আলীর স্বপ্ন
(গল্প)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ইয়াদ আলী বাইরে বেশী বেড়ুতে চান না। ঘরের বাইরে গেলেই তার কাছে কেমন অস্বস্তি অনুভব হয়। গলির মাথায় ৫/৭ জনের একটি কিশোরের দল সারাক্ষণ আড্ডা দেয়। সিগারেট খায়। একে অপরের সাথে এমন আচরণ করে যেন মনে হবে মারামারি করছে। আসলে তা না। ওদের স্বাভাবিক আচরণই মারামারির মতো মনে হয় ইয়াদ আলীর কাছে। ওদের হাতে থাকে টাচ মোবাইল। কি যেন দেখে আর নানা রকম অংগভংগি করে। মহল্লার স্কুল পড়ুয়া মেয়েদের জন্য রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ায় না। তাদের পোশাক আশাক ও চুলের স্টাইল ইয়াদ আলীর কাছে উদ্ভট মনে হয়। কারো হাতে রাবারের বালা। ছেলে মানুষ কেন রাবারের বালা পরে এটা ইয়াদ আলীর মাথায় ধরে না। একদিন রাবারের বালা বিক্রেতাকে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন এই বালার কোন উপকারিতা আছে কি না। বিক্রেতা জানিয়েছিলেন এর কোন স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নেই। তাহলে এই বালা ছেলেরা পরে কেনো? উত্তরে বিক্রেতা বলেছিলেন “ভাব ধরার জন্য। ” সেদিন রিক্সা নিয়ে বাজার করতে যাচ্ছিলেন তিনি। পথিমধ্যে দেখলেন এক যুবক আরেক কিশোরকে এলোপাথাড়ি ছুরি দিয়ে খুচাচ্ছে রাস্তায় ফেলে। পথচারীরা দেখেও না দেখার ভান করছে। ইয়াদ আলীও ভয় পেয়ে পাশ কেটে চলে গেছেন। টেলিভিশনে খবরে দেখেছেন কয়েক যুবক মিলে শত শত পথচারীর সামনে কুপিয়ে হত্যা করছে আরেক যুবককে। কেউ এগুচ্ছে না। দূরে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ তামাশা দেখছে। আবার কেউ কেউ মোবাইল উচিয়ে ছবি তুলছে বা ভিডিও করছে। পাড়ার এক ছেলেকে রাস্তায় থেকে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিলো কারা কেউ বলতে পারছে না। তার খোজ কেউ দিতে পারছে না।

ইয়াদ আলী ফ্যান ছেড়ে দিয়ে বালিশের উপর দুইহাত বিছিয়ে হাতের তালুর উপর মাথা রেখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়া এইসব নিয়ে ভাবেন। ভাবেন ঐসব উদ্ভট সিগারেট পায়ী ছেলেদের মা বাবা নেই কি নেই। তারা নিজের সন্তানকে এভাবে গলির মাথায় দেখে কি লজ্জা পান না? আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যারা কি রাস্তাঘাটে যারা ছুরি দিয়ে আঘাত করে তাদেরকে দেখেন না? তাদের কি চিনেন না? যারা প্রকাশ্যে কুপিয়ে মানুষ খুন করে তাদের নিবৃত্ত করার কোন ব্যবস্থা নেই? তারা এই সাহস কোথা থেকে পায়? এমন ভাবনা ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়েন ইয়াদ আলী।

ঘুমিয়ে এক সুন্দর স্বপ্ন দেখেন। তিনি চা পান করে সুন্দর সাদা ফকফকা পাঞ্জাবী পাজামা পড়ে রাস্তায় বের হয়েছেন। শহরকে কেমন যেনো অন্য রকম সুন্দর মনে হচ্ছে। গলির মোড়ে সেই বখাটে ছেলেগুলি নেই। রাস্তাঘাট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সবকিছু সুশৃঙ্খল ভাবে চলছে। কোথাও কোন ছোরা হাতে কাউকে দেখছেন না। কোথাও কোন মারামারি কোপাকোপি নাই। শান্তি আর শান্তি। খোজ খবর নিয়ে জানতে পারলেন থানায় এক নতুন অফিসার এসেছেন। তিনি এখানে এসে আইন শৃঙ্খলার জন্য এক অভিনব পদ্ধতি চালু করেছেন। তিনি হিসাব করে দেখেছেন, সমাজে মাত্র গুটিকয়েক দুষ্কৃতিকারী থাকেন, যাদের কাছে পুরা সমাজ জিম্মি হয়ে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণ কোন পদক্ষেপ নিতে সাহস পায় না। এই গুটিকয়েক দুষ্কৃতিকারীকে কন্ট্রোল করতে পারলেই তার আয়ত্বাধীন সমাজের জনগণ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। শান্তি রক্ষা করা আইন শৃঙ্খলা কর্মকর্তার প্রধান কাজ। তিনি মহাল্লার প্রধান মাস্তানের পিছনে তিনজন কন্সটেবল নিয়োজিত করে রেখেছেন। যিনি মহল্লার বড় ভাই। তিনজন কনস্টেবল পালা করে ২৪ ঘন্টা পাহারা দিয়ে রাখেন বড় ভাইকে। বড় ভাই সুবিধা করতে না পারলে ছোট ভাইরাও সুবিধা করতে পারেন না। এই ভাবে মহল্লায় মহল্লায়, পয়েন্টে পয়েন্টে কনস্টবল নিয়োগ করতে খুব বেশী সংখ্যক জনবল লাগে নি। তিনি আরো শুনেছেন এইভাবে অন্তত ৬ মাস পাহারা দিয়ে রাখলে বড় ভাইরা পেশা পালটিয়ে ভালো হয়ে যাবে। কলিং বেলের শব্দে ইয়াদ আলীর ঘুম ভেংগে গেলো। বোবা ভিক্ষুকটি অসময়ে এসে মাঝে মাঝে এভাবে কলিং বেল টিপে ইয়াদ আলীর ঘুম ভাংগিয়ে দেয়। বোবাকে বুঝিয়ে লাভ হয় না। সে কলিং বেল টিপবেই। ঘুম থেকে উঠে বাথ রুম সেরে কিছুক্ষণ পায়চারী করলেন। এ কেমন স্বপ্ন দেখলেন তিনি। ঘুম না ভাংলে হয়ত এমন সুন্দর স্বপ্ন আরো দেখা যেতো। ইয়াদ আলীর স্ত্রী এক চাপ চা আর তিন পিস বিস্কুট এনে দিলেন ইয়াদ আলীর সামনের টি টেবিলে। নিজেও এক কাপ নিলেন। বলেন
– তোমাকে মনে হচ্ছে যেন কোন কিছু নিয়ে ভাবছ।
– হে, ভাবছি।
– বেশী ভেবো না। ডাক্তার নিষেধ করেছে। টেনশন মুক্ত থাকতে বলেছে।
– বাইরে গেলেই আমার টেনশন হয়। টেলিভিশন ছাড়লেও আমার টেনশন হয়। চারিদিকে কেমন মারা মারি কোপা কোপি। সেই গুলি আবার ভিডিও করে আমাদেরকে দেখাচ্ছে। টেনশন না করে কি থাকা যায়? আজ ঘুমিয়ে একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখছিলাম। কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভেংগে গেছে। না হলে আরো কিছুক্ষণ দেখতে পারতাম। শোন সেই স্বপ্নের কথা।
– বাদ দাও। স্বপ্নের কোন ভিত্তি নেই। আমি কারো স্বপ্নের বিবরণ শুনি না। বাবা স্বপ্নের বিবরণ শুনতে মানা করেছে। স্বপ্নের কথা কারো কাছে বলতেও মানা করেছে।

ইয়াদ আলীর স্ত্রী স্বপ্নের বিবরণ শুনলেন না। রাতে ঘুমাবার আগে ভাবলেন তার এই স্বপ্নের কথা থানার অফিসারকে জানাবেন। পরদিন সকাল ১০ টার দিকে রিক্সা নিয়ে ইয়াদ আলী থানায় গেলেন। যেতে যেতে নানান ভাবনা ভাবলেন। ভদ্রলোক হয়ে থানায় যাওয়া কি ঠিক হবে? শোনা যায় থানার লোক ভালো না হলে নানা রকম জেরা করে কথার পেচে আটকিয়ে ফাসিয়ে হাজতে ঢুকিয়ে দেয়। এখানকার থানার লোকজন কেমন কে জানে? এমন ভাবনা ভাবতে ভাবতে ইয়াদ আলী পৌছে গেলেন থানায়। সেন্ট্রি জানতে চাইলেন কি চাই। তিনি জানালেন যে তিনি এসেছেন অফিসার সাহেবের সাথে দেখা করতে। সেন্ট্রি অফিসারের কক্ষে নিয়ে গেলেন। অফিসার মোবাইল টিপছিলেন। সালাম দিলেন ইয়াদ আলী। সালামের জবাব দিয়ে অফিসার ইয়াদ আলীকে সামনের চেয়ারে বসতে বললেন। মোবাইলে দুই তিনটা টোকা দিয়ে টেবিলের উপর উপর করে রেখে দিলেন। সেন্ট্রিকে দুই কাপ চা পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে বললেন “আপনার পরিচয় দিয়ে বলুন আপনার জন্য আমি কি করতে পারি।” ইয়াদ আলী নিজের পরিচয় দিয়ে, বর্তমান সামাজিক সমস্যাগুলি তুলে ধরে তার স্বপ্নের বিবরণ দিলেন অফিসারের কাছে। এর মধ্যে চা এসে গেলো। দুইজনে এক সাথে চা খেতে খেতে স্বপ্ন নিয়ে কথা বললেন। অফিসার ইয়াদ আলীকে ধন্যবাদ দিলেন এবং আশ্বস্ত করলেন। বললেন “আমি আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব। মহল্লার বড় ভাইর পিছনে পালাক্রমে পাহারা লাগিয়ে দেব কনস্টেবল দিয়ে। এর জন্য পর্যাপ্ত জনবলও আছেন। অল্প দিনেই আপনার স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে পাবেন। ”

একটা বিরাট সাফল্যের অনুভুতি নিয়ে ইয়াদ আলী থানা থেকে ফিরে এলেন বাসায়।

২/৭/২০১৯ ইং
ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ জার্নি