জামান সাহেবের ক্যান্সার

জামান সাহেবের ক্যান্সার
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমার রুমের দরজাটা খোলা ছিল। একজন ভদ্রলোক দরজায় এসে দাঁড়ালেন। আমি মাইক্রোস্কোপ থেকে চোখ তুলে তার দিকে তাকালাম। তিনি আমার দিকে না তাকিয়ে আমার রুমের সবকিছু চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিলেন। আমিও তার চেহারাটা ভালো করে দেখে নিচ্ছিলাম। সম্ভ্রান্ত পরিবারের কেউ মনে হলো। মধ্য বয়সে কিছু কিছু ছবিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে যেমনটি দেখা যেতো। আমি বললাম “প্লিজ, ভিতরে আসুন। বসুন এই চেয়ারে।” লোকটি ধীরে এসে আমার সামনের চেয়ারে বসলেন। বললাম “বলুন, আপনার জন্য কি করতে পারি?” মনে হচ্ছিল আমার কক্ষ ও ঘরের পরিবেশ তার কাছে তেমন ভালো লাগেনি। তারপরও বসে বসে তিনি এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলেন। আমি মাইক্রোস্কোপে ক্যান্সারের টিস্যু পরীক্ষা করছিলাম। বললাম “আপনি বসুন, আমি একটা ক্যান্সারের টিস্যু পরীক্ষা করছি। যেটাকে আমরা বায়োপসি বা হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করি। স্লাইডটা দেখা শেষ করে আপনার সাথে কথা বলি।” তিনি বললেন
-আপনি বায়োপসি পরীক্ষা করেন?
– জি, আমি মুলত হিস্টোপ্যাথলজিস্ট। আমি পিজি থেকে ১৯৯৫ সনে প্যাথলজিতে এম ফিল পাস করেছি। আমি আমার ল্যাবে হিস্টোপ্যাথলজি ও সাইটোপ্যাথলজি পরীক্ষা করি।
স্লাইডটা দেখা শেষ করে আমি বললাম
– বলুন এখন।
– আমি একটা পরীক্ষা করাতে এসেছি।
– দেখি কাগজটা।
কাগজটা দিয়ে বললেন
– এটা কি রক্ত পরীক্ষা?
– না এটা রক্ত পরীক্ষা না।
– তাইলে কি পরীক্ষা?
নাক কান গলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ আব্দুর রশিদ স্যার এডভাইস লিখেছেন “এফএনএসি অব সারভাইক্যাল লিম্ফ নোড।” আমি বললাম
– আপনার গলায় একটা গোটার মতো হয়েছে। ওখান থেকে এফএনএসি পরীক্ষা করতে হবে।
– মানে?
– এটাতে কি রোগ আছে জানার জন্য এটা থেকে এক সুই পরিমান সেম্পল (নমুনা) নিয়ে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখতে হবে।
-কি ভাবে নিবেন?
– ইনজেকশন দেয়ার সিরিঞ্জ-এর সুই দিয়ে সামান্য একটু রস নিতে হবে।
– ব্যাথা হবে না?
– না, এই সামান্য পিপড়া বা মশার কামড়ের মতো লাগতে পারে।

লোকটির সেম্পল রেখে দিলাম। গলার এক পাশে মার্বেলের সমান একটা শক্ত গুটি ছিল। তাতে তার তেমন সমস্যা ছিল না। গলার ভিতরে একটু ব্যাথা ছিল তার। এক ঘন্টা পর টেকনিশিয়ান স্লাইড তৈরি করে আমার টেবিলে দিলেন। আমি মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করে ডায়াগনোসিস লিখলাম “মেটাস্টেটিক স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা।” অর্থাৎ গলার ভিতর কোথাও ক্যান্সার আছে। সেই ক্যান্সার গলার লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থিতে চলে এসেছে।

রিপোর্ট লিখে সেদিন চলে এসেছিলাম। এটা খুব সম্ভব ১৯৯৮ সনের ঘটনা। সেই সময় আমার ল্যাবরেটরিটা ছিল চরপড়া পুরাতন জনতা ব্যাংকের পিছনের গলির মাথায়। সামনের দিকে বাড়ী ভাড়া না পাওয়ায় পিছনের দিকে বাড়ী ভাড়া করে ল্যাবরেটরি দিয়েছিলাম। চাউলের আড়তদার আলী হোসেনের আবাসিক ভবন ভাড়া করে ল্যাব দিয়েছিলাম। তখন কম্পিউটার-এর যুগ ছিল না। প্রথম একটি সাধারণ টাইপ মেশিন দিয়ে রিবনের উপর টাইপ করে রিপোর্ট লিখতাম। প্রফেসর ডাঃ আজিজুল হক ভাই অস্ট্রেলিয়া মাস্টার ডিগ্রি করার সময় একটা ইলেকট্রনিক টাইপ রাইটার মেশিন কিনেছিলেন। তিনি সেইটা বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন। আমি ওটা নিয়ে নিলাম। ওটা দিয়ে রিপোর্ট টাইপ করে দিতাম। লোকে মনে করতেন কম্পিউটার দিয়ে কম্পোজ করা হয়েছে। এফএনএসসি-এর রিপোর্টটা সেই মেশিন দিয়ে টাইপ করে দেয়া হয়েছিল।

পরেরদিন বিকেলে ল্যাবে গিয়ে জানতে পারলাম রুগী এসে রিপোর্টটি নিয়ে গেছেন। ম্যানেজার বললেন “লোকটি খুব ভালো মানুষ। আমাদের সবার সাথে ভালো ব্যবহার করেছেন। আমাদের সবার প্রশংসা করেছেন। আপনার ব্যবহারে খুব মুগ্ধ হয়েছেন। আমাদের সবাইকে একটা করে চাবির রিং গিফট করেছেন।” আমি বললাম
– তিনি কি জানেন যে তার ক্যান্সার হয়েছে?
– না। তিনি রিপোর্ট কি তা জিজ্ঞেস করেন নাই। তিনি খুব খুশী ছিলেন।
– রশিদ স্যারের কাছে গেলেই বুঝবেন।

রাতে বাসায় ফিরলে আমার ল্যান্ড ফোনে মীর্জা হামিদুল হক স্যারের ফোন এলো। তিনি বললেন
– সাদেক, আপনি কি জামান সাবের এফ এন এসি করে রিপোর্ট দিয়েছেন?
– স্যার, আমি রশিদ স্যারের একজন রুগীর রিপোর্ট দিয়েছি “মেটাস্টেটিক স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা। ”
– ইনি জামান সাব। ওনার অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে ময়মনসিংহে। জামান স্টীম লন্ড্রি তারই। শহরের বড় বড় অনেকেই তার আত্বীয়। তার জন্য আমাকে অনেকেই ফোন করেছেন। সত্যি কি তার ক্যান্সার হয়েছে? আপনি কি সঠিক দেখেছেন। সবার ধারনা আমিই রিপোর্ট করেছি। আপনি কি ভালোভাবে দেখেছেন?
– স্যার, আমি ভালো ভাবেই দেখেছি।
– তাড়াতাড়ি আমাকে দেখান। আমি দেখলে তাদেরকে বলতে পারব যে আমি দেখেছি।
– ঠিক আছে স্যার। আমি আগামীকাল আপনাকে স্লাইড দেখাব।

পরেরদিন স্যারকে স্লাইড দেখালাম। স্যার সঠিক হয়েছে বললেন। ফোন করে জানিয়ে দিলেন যে রিপোর্ট সঠিক।

এরপর কি হয়েছে তার ভাগ্যে আমি জানতাম না। রিপোর্ট দেয়ার কয়েক বছর পর একবার ময়মনসিংহ শহরের আম পট্টির জামান স্টীম লন্ড্রিতে স্যুট ওয়াস করতে দিয়ে কর্মচারীর কাছে জামান সাবের খবর জানতে চাইলে তিনি বলেন “জামান সাবের গলায় ক্যান্সার হয়েছে। তিনি ইন্ডিয়া যান মাঝে মাঝে চিকিৎসার জন্য। ভালো আছেন। ” তারপর আমি আর জামান সাবের খবর নেই নি। বেঁচে আছেন কি না জানি না। ভালো মানুষ বেঁচে থাকুক দীর্ঘদিন।


তারিখ : ৪/৫/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ