যেভাবে দাড়ি রাখলাম

যেভাবে দাড়ি রাখলাম
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

আমরা হজ্জ করার উদ্যেশ্যে বাংলাদেশ বিমানে করে ঢাকা থেকে জেদ্দা বিমান বন্দরে গিয়ে নামলাম। সাথে আমার স্ত্রী স্বপ্নাও ছিল। এটা ২০০৪ সনের শেষের দিকে। আমাদের ৪৫ জনের কাফেলাটি একটা বাসে করে মদিনায় চলে গেলাম। মদিনায় গিয়ে অনেকগুলি উদ্যেশ্যের মধ্যে একটা উদ্যেশ্য ছিল ৮ দিন অবস্থান করে মসজিদে নববীতে  এক নাগারে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ পড়া। আমরা ভাড়া করা বাসায় পৌঁছার পরপরই যোহরের নামাজের আজান পড়ে গেলো। দ্রুত জামাত ধরার জন্য চলে গেলাম মসজিদে নববীর দিকে। দেখলাম নামাজ শুরু হয়ে গেছে। একটা জায়গা ফাকা পেয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে তকবিরে তাহরিমা দিয়ে হাত বেঁধে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলাম। হঠাৎ এক পুলিশ আমার ডান বাহু ধরে টান মেরে জায়নামাজ থেকে সরিয়ে দিয়ে আরেক হাতে আমার জায়নামাজ নিয়ে বললেন “ইয়া হাজ্জ, তরিক, তরিক!” আমি কিছুই বুজলাম না । পুলিশ আমার জায়নাজটা ছুড়ে মারলেন অনেক দূরে । তিনি আরবী ভাষায় কি যেনো বলছিলেন এবং যেভাবে হাত ঘুরালেন তাতে আমি বুঝে নিলাম “এটা রাস্তা। রাস্তায় নামাজ পড়া নিষেধ।”

আমি ভাবলাম আমাদের দেশে হলে পুলিশকে বলতাম “তোর এত সাহস, নামাজে থেকে টান মারস?” নামাজ পড়ে বাসায় ফিরে এলাম। বাসায় এমনভাবে এরাঞ্জ করা ছিল একেক রুমে পাশাপাশি কয়েকটি করে স্টিলের বেড ফেলে মহিলা ও পুরুষ পৃথক রুমে রাখা হয়েছিল। আমাকে এবং সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ডাঃ নুরুল ইসলাম স্যারকে শুধু স্পেশাল এক রুমে রাখা হয়েছিল। এই রুমের সুবিধা ছিল এই যে এই রুমের লেট্রিনে কমোড ছিল। লেট্রিনের দরজা এত ছোট ছিল যে নুরুল ইসলাম স্যার প্রবেশ করার সময় সোজা প্রবেশ করতে পারতেন না। কাত হয়ে কষ্ট করে প্রবেশ করতে হতো। বাইরে যাওয়ার সময় আমি স্বপ্নার রুমের সামনে গিয়ে দরজা নক করতাম। তারপর দুইজনে এক সাথে যেতাম। মসজিদে নববীতে নামাজ পরতাম। তসবি পাঠ করতাম। নবীজীর রওজা মোবারকের কাছে গিয়ে বসার চেষ্টা করতাম। আসহাবে সুফফায় গিয়ে বসতাম। রিয়াজুল জান্নাতে গিয়ে নামাজ পরতাম। কখনো বা বাইরে যেতাম হযরত আলী, হযরত আবুবকর (রাঃ) এর বাড়ি দেখতে ও অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান জিয়ারত করতে। মদিনায় ৮ দিন থেকে মক্কায় চলে এলাম। এখানে এসে হারাম শরীফের কাছে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) রোডের একটি হোটেলে উঠলাম। এটা এত কাছে ছিল যে হারাম শরীফের জামাত আমাদের হোটেলের নিচ পর্যন্ত এসে যেতো।

 

হজ্জ করার আগে একটা কথা শুনতাম যে হজ্জে আন্তর্জাতিকতা শিক্ষা হয়। আগে এটা বুঝতাম না। গিয়ে বুঝলাম। সারা বিশ্ব থেকে নানান দেশের নানান কিসিমের মানুষ এসেছিল সেখানে নানা কিসিমের পোশাক পড়ে। তাদের নামাজ পড়ার ধরনও ভিন্ন ভিন্ন। সবই যেন ঠিক আছে। আমি দাড়ি রাখা নিয়ে দ্বন্দে ছিলাম। সবার গালের দিকে লক্ষ করছিলাম যে দেখি কত ভাগ পুরুষ দাড়ি নিয়ে এসেছে। দেখলাম অনেক হাজীর দাড়ি নেই। বিশেষ করে তুরস্ক ও মিশরের অনেকেরই দাড়ি নেই। তাই, দাড়ি না রাখাতে কোন সমস্যা নেই মনে করে নিলাম। আমাদের কাফেলার অনেকেই নতুন করে দাড়ি রাখা শুরু করলেন। আমাকেও রাখার জন্য তাকিদ দিলেন। বুঝালেন “হজ্জ করলেন, দাড়ি রাখলেন না?” আমি উলটা বুঝিয়ে দিতাম “হাজী হতে গেলে দাড়ি লাগে না। দেখছেন না আমাদের দেশ থেকেও বেশী ধার্মিক দেশের হাজীরাও দাড়ি রাখে নি। আমরা মনে করি দাড়ি রাখলেই বেশী ধার্মিক হয়ে গেলাম।”

 

মীনার তাবুতে বসে একদিন দুপুরে আমাদের দুই গ্রুপে দাড়ি নিয়ে তর্ক বেঁধে গেলো। আমি ছিলাম দাড়ি না রাখার দলের দলনায়ক। আকরাম স্যার ছিলেন দাড়ি রাখা পক্ষের দলনায়ক। আমাদের তর্ক চলার সময় দরজায় এসে দাড়ালেন অন্য কাফেলার একজন মোয়াল্লেম। তিনি দাঁড়িয়ে আমাদের সব যুক্তি তর্ক শুনছিলেন। পড়ে জেনেছি তিনি কিশোরগঞ্জ-এর একজন বড় আলেম। আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়লে তিনি ধীরে ধীরে দাড়ির ওয়াজ শুরু করলেন। অনেক হাদীস ও কোরআন-এর রেফারেন্স দিয়ে দিয়ে সুন্দর বয়ান করছিলেন। আমি বসে বলার অনুরোধ করলাম। তিনি বসলেন। তিনি শেষের দিকে আরো বললেন যে পৃথিবীর বড় বড় অমুসলিম মনিষিদেরও দাড়ি ছিল এবং আছে। সকল নবীর দাড়ি ছিল। হাসরের মাঠে নবীজীর উম্মত সবাই নবীজীর সাথে যখন দেখা করবে তকন দেখা যাবে নবীজীর দাড়ি আছে, সাহাবীদের দাড়ি আছে, তাবেঈন, তাবেতাবেঈন, পীর মাশায়েখগণের দাড়ি আছে। আপনার মুখে দাড়ি নেই। যদি নবীজী আপনাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেন! হায়! ভেবেছেন কখনো? কাজেই, তর্ক না করে ভেবে দেখুন। দাড়ি রাখবেন কি রাখবেন না।” আমি আস্তে করে হুজুরের কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বললাম “হুজুর, দোয়া করুন। আমি দাড়ি রাখলাম।” হুজুর কিছু না বলে বয়ান চালিয়ে নিলেন আরো কিছুক্ষণ । শেষে মুনাজাত ধরলেন আমাদের নিয়ে। মোনাজাতে তিনি এক সময় বললেন “হে আল্লাহ, তোমার এক বান্দা মীনায় বসে দাড়ি রাখার নিয়ত করেছে। তার দাড়ি তুমি কবুল কর।” সবাই “আমিন, আমিন” বললেন। আমার এই দাড়ি সেই দাড়ি। আল্লাহ আমার এই দাড়ি কবুল করুন। আল্লাহ কিশোরগঞ্জ-এর সেই হুজুরকে কবুল করুন।
১৪/৬/২০১৯ খ্রি.
কিশোরগঞ্জ -ময়মনসিংহ জার্নি