যেভাবে সরকারি চাকরি পেলাম

যেভাবে সরকারি চাকরি পেলাম
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

যথাসময়ে পাস করা এবং যথাসময়ে চাকরি পাওয়া আমার জন্য খুব প্রয়োজন ছিল। তাই আমি কোন কারনেই পরীক্ষা পিছানো পছন্দ করতাম না। কিন্তু নেতৃস্থানীয় ক্লাসমেটদের ইচ্ছার বিরোদ্ধে কথা বলার সাহস আমার ছিল না। পরীক্ষা দেয়াটা সবার কাছে ভীতিকর ব্যাপার ছিল। সামান্য একটু অযুহাত দেখাতে পারলেই পরীক্ষা পিছানোর সংগ্রাম করতো। আর সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পারলে আরো বড় নেতা হওয়া যেতো। আমাদের চক্ষু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শামসুদ্দিন স্যার বলতেন “আমরা চাই তোমরা পরীক্ষা দিয়ে পাস করে ডাক্তার হয়ে চাকরি করে টাকা কামাও। আর তোমরা বল ‘পরীক্ষাই দিব না, দেখি স্যারেরা পাস করায় কেমনে?'” স্যারের এই কথাটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। আমরা যদি ১৯৮৫ সনের মে মাসের রেগুলার ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতাম তাহলে ঠিক ৫ বছরেই আমাদের এমবিবিএস কোর্স শেষ হয়ে যেতো। এবং তখনকার নিয়ম অনুসারে মেডিকেল অফিসার হিসাবে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং হিসাবেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশ হয়ে যেতো। যারা পরীক্ষা পিছায়নি তারা মে মাসেই চাকরিতে ঢুকে পড়েছে। যেমন রাজশাহী ও চিটাগাং ইউনিভার্সিটির আন্ডারের ছাত্ররা মে মাসেই ফাইনাল পরীক্ষা দেয়। তাদের বেকার থাকতে হয়নি। আমরা ঢাকা ইউনিভার্সিটির আন্ডারের ছাত্ররা সংগ্রাম করে পরীক্ষা পিছিয়ে সেপ্টেম্বরে নিয়ে যাই। পাস করে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং করাকালীন সরকার নিয়ম করে ফেলেন পাস করলেই চাকরি হবে না। ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শেষ করার পর পিএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে সুপারিশকৃত হয়ে মেডিকেল অফিসার হিসাবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে হবে। আমার মাথায় কাঠাল ভেংগে পড়লো। প্রচণ্ড খোভ হলো সরকারের প্রতি। প্রচণ্ড রাগ হলো বন্ধুদের প্রতি যারা পরীক্ষা পিছানোর সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলো। এর আগে সরকারকে ভালো লাগতো এই কারনে যে ক্ষমতায় এসেই সামরিক আইন জারি করে রাজনীতিকে স্তিমিত করে দেয়া হয়েছিল। ফলে কোন সংগ্রাম করার সুযোগ ছিল না। পরীক্ষা পিছানোর সুযোগ ছিল না। এই সুযোগে আমরা তরতড়ি ৫ বছরেই এমবিবিএস কোর্স শেষ করে ফেলেছিলাম। এর আগে ডিউ টাইমে কোর্স শেষ করা বিরল ব্যাপার ছিল। সেশনজট লেগেই থাকতো।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং সংগ্রাম পরিষদ ঘঠন করা হয়। প্রতিদিন সরকার বিরোধী মিছিল করা হতো সারা হাসপাতাল ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে। সংগ্রাম করতে করতেই আমাদের এক বছরের ইন-সার্ভিস কাল শেষ হয়ে যায়। চলে যেতে বাধ্য হই সাধের ক্যাম্পাস ছেড়ে। বন্ধুরা সিটকে পড়ি দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থানে। সেই ১৯৮৬ সালের ২১ শে নভেম্বরে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়েছিলাম। অনেকের সাথে আজও যোগাযোগ হয়নি । মাঝে মাঝে রিইউনিয়ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানেও সবাই উপস্থিত হতে পারে না।

 

কে কী করছে আমার খোঁজ নেয়া সম্ভব ছিল না। বেকার হয়ে পড়ায় মহা বিপদে পড়ে গেলাম। কপালে থাপ্পড় দিয়ে প্রাইভেট প্রাক্টিস শুরু করলাম। টাংগাইল শহরের আকুরটাকুরপাড়ায় অবস্থিত একমাত্র প্রাইভেট হাসপাতাল নাহার নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ আমাকে থাকার সুবিধা করে দিয়ে মেডিকেল অফিসারের চাকরি দিলেন। আপাতত থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হলো। এদিকে কেন্দ্রীয় বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) আমাদের চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য সারাদেশব্যপী কর্মবিরতি প্রোগ্রাম শুরু করে। তাতে স্বাস্থ্য ব্যাবস্থা ভেংগে পড়ে। বাধ্য হয় সরকার আমাদের সকল বেকার চিকিৎসকদের এড-হক ভিত্তিতে মেডিকেল অফিসার হিসাবে চাকরি দেবার সিদ্ধান্ত নিতে। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয় আগ্রহী প্রার্থীদিগকে স্বহস্তে লেখা আবেদনপত্র ডিজিএইএস, মহাখালী অফিসে জমা দেয়ার জন্য। ইতিমধ্যে অনেকেই বিদেশ চলে যাওয়াতে মাত্র সাড়ে সাতশত দরখাস্ত জমা পড়লো। সেই সময় সাড়ে সাতশত কিন্তু একটা বিরাট সংখ্যা। এই বিপুল সংখ্যক চিকিৎসকের সবাইকে চাকরি দিলেন সরকার। শুধু একজনকে বাদ দেয়া হয়। সেটা আর কেউ না। আমাদের টাংগাইলের ঘাটাইলের বন্ধু ডা. আব্দুর রহমান মিয়া। সে কেন বাদ পড়লো তা সে জানতো না। বললাম “দোস্ত, কী জন্য তোমাকে চাকরি দেয়া হল না তোমার খোজ নেয়া উচিৎ।” এক-দুই মাস পর দোস্ত আব্দুর রহমান ডিজি অফিসে যায় খোজ নিতে। দেখতে পায় দরখাস্ত বাছাই করার রেজিস্টারে লেখা “আবেদন স্বহস্তে না লিখে টাইপ করে লিখেছেন। তাই, আবেদনটি বাতিল করা হলো। এমনকি তিনি নামের উপর স্বাক্ষরও করেন নাই।” ডা. রহমান যুক্তি দেখিয়েছিলেন “আমি নিজ হাতে দরখাস্ত লিখেছি কলম দিয়ে। কলম দিয়ে স্বাক্ষরও করেছি। আমার হাতের লেখা টাইপ রাইটারের টাইপ লেখার মতো। আপনারা মনে করেছেন টাইপ করেছি।” ডিজি অফিস জবাব দিয়ে দেন “দু:খজনক ব্যাপার। কিন্তু দেড়িতে এসেছেন। এখন করার কিছু নেই।”

সেই ডা. আব্দুর রহমান পরে যোগদেন ফ্যামিলি প্লানিং বিভাগে। এখনো তারাইল উপজেলার মেডিকেল অফিসার। যদি সেদিন তার দরখাস্ত বাতিল না হতো এখন সে স্বাস্থ্য বিভাগে কোন বড় পোস্টে থাকতো। সুন্দর হাতের লিখা তার ভাগ্যকে বিড়ম্বনা করেছে। কোন কোন সময় সব ভালোই ভালো হয় না।

 

এই সাড়ে সাত শত নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসারদের লিস্টে আমার নামও স্থান পেলো। আমি হলাম স্বপ্নের গ্যাজেটেড অফিসার। ১৯৮৮ সনের ৩ জুলাই আমি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপস্বাস্থকেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার হিসাবে যোগদান করলাম। চাকরিটা আমার খুব প্রয়োজন ছিল। তাই সরকারের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ না হয়ে পারি না। সরকারের চাকরি করা মানে জনগণের চাকরি করা। যেহেতু চিকিৎসা পেশায় সরকারি চাকরি করছি সেহেতু আমার দেশের জনগণেরই সেবা করছি। শিক্ষক হিসাবে জনগনের সন্তানদেরকেই চিকিৎসক বানানোর চেষ্টা করছি। মানুষ বানানোর চেষ্টা করছি। সেই থেকে এই পর্যন্ত সরকার তথা জনগণের জন্য চাকরি করলাম সুনামের সাথেই। আর ৮ মাস পর আমার অবসর নেয়ার সময়। বেঁচে থাকলে যেনো বাকী সময়টুকুও ভালো ভাবে কেটে যায়। আল্লাহ্‌ ভরসা। যেহেতু, অবসর নেয়ার পরও জনগণ তথা সরকার থেকে আমি অবসর ভাতা গ্রহণ করব তাই আমাকে আজীবণই জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।

১৪/৭/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ