কম্পিউটারে রোগী দেখা
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
ডাঃ আবুল মনসুর ভাই কমিউটার দিয়ে রোগী দেখেন এটা আমি শুনেছি। ১৯৯০ দশকের কথা। তখন আমার জানামতে মনসুর ভাইর কাছেই কম্পিউটার ছিলো। তিনি এটা দিয়ে রোগী দেখেন। এবং বেশীভাগ রোগীই নাকি মানসিক রোগী। তাই মনসুর ভাইগে রোগীর লোকেরা পাগলের ডাক্তার বলেই জানতেন। আসলে তিনি হচ্ছেন ফরেনসিক মেডিসিনের ডাক্তার। যারা অসাভাবিক মৃত্যু হলে কাটাছিড়া ও কেমিক্যাল টেস্ট করে মৃত্যুর কারন নির্ধারণ করে দেন। এই বিভাগের ডাক্তারগণ সাধারণত প্রাইভেট প্রাক্টিশ করেন না। কিন্তু আমাদের মনসুর প্রচুর রোগী পান মানসিক রোগীর।
যাহোক, আমার খুব দেখতে ইচ্ছে হলো মনসুর ভাইর চেম্বার। আমি শুক্রবার ল্যাবরেটরি বন্ধ রাখি। এক শুক্রবার সকালে মনসুর ভাইর চেম্বারে গেলাম। বললাম, “ভাই, আমি কিছুক্ষণ আপনার চেম্বারে বসবো। আপনি কিভাবে রোগী দেখেন তার একটা অভিজ্ঞতা অর্জন করবো।” মনসুর ভাই মুসকি হেসে বললেন, “ও সিউর, বসুন, সাদেক ভাই।”
মনসুর ভাইর সামনের টেবিলটা বেশ বড়। টেবিলে হাতের বাম পাশে একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার রেখেছেন। উল্টো দিকে রোগী বসেছেন। আমি মনসুর ভাইর সামনাসামনি বসেছি। মহিলা রোগী। মনসুর ভাই জিজ্ঞেস করলেন, “মা, আপনার নাম কী?” রোগী নাম বললেন। মনসুর ভাই কি বোর্ড দিয়ে টাইপ করলেন রোগীর না। মনিটরে ডং করে শব্দ হলো, হাজির হলো ঝাকড়া চুলওয়ালা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মতো একটা কার্টুন। চোখ বড় বড় করে রোগীর দিকে তাকালেন, মাঝে মাঝে চোখ মিট মিট করলেন। মাউস নাড়ালে তিনিও নড়াচড়া করতে লাগলেন। রোগী দেখে অবাক হলেন। বয়স জিজ্ঞেস করলে রোগী বললেন ৪০ বছর। বাড়ি জামালপুর। গ্রামের মহিলা। রোগীর সব কম্পপ্লেইন শুনে শুনে শুনে কমিউটারে এন্ট্রি দিলেন। স্টেথোস্কোপ দিয়ে রোগী পরীক্ষা করলেন। শারীরিক পরীক্ষার ফাইন্ডিং তিনি কম্পিউটারে এন্ট্রি দিলেন। ডায়াগনোসিস টাইপ করলেন। প্রেস্ক্রিপশন টাইপ করলেন। তারপর কম্পিউটারে রিডিং কমান্ড দিলে লাউড স্পিকারে পড়ার সাউন্ড বের হতে থাকলো এভাবে, “ট্যাবলেট এভেলিন, ওয়ান ট্যাব থ্রি টাইমস ডেইলি………।” রোগী মনে করলেন, কম্পিউটারের সেই কার্টুন কথা বলছেন। জিজ্ঞেস করলেন, “ইডায়, কি কইলেন, বুঝলাম না।” মনসুর ভাই প্রেস্ক্রিপশন পড়ে পড়ে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শুনালেন। আরও বললেন, “মুরগির পাখনা খাবেন বেশী বেশী।”
রোগী বিদায় হবার পর আমি মনসুর ভাইকে বললাম, “আপনি আসলে কম্পিউটার দিয়ে কি করলেন?” ভাই বললেন, “আমি আসলে কম্পিউটার দিয়ে রোগীর ডাটা এন্ট্রি দিয়ে সংরক্ষণ করলাম খাতায় সংরক্ষণ করার পরিবর্তে। হাতে না লিখে প্রেস্ক্রিপশনটাও প্রিন্ট করে দিলাম। তাতে পরিস্কার হলো। আমার রোগী বেশী ভাগই মানসিক। তাই, ওরা মনে করে কম্পিউটারেই সব করে দিচ্ছে। মনোযোগ আকর্শন করার জন্য মনিটরে কার্টুন দিয়ে রাখি। মাউস ও কি বোর্ডে চাপ দিলে কার্টুনও নড়াচড়া করে। রোগীও মনে করে কম্পিউটারেরই কাজ।”
আমি বললাম
– ভাই, কম্পিউটারে আপনার প্রেস্ক্রিপশন পড়ে শুনালো, এটা কিভাবে হলো?”
– সাদেক ভাই, আপনার মাসে ইনকাম কত?
– কেন? বলবো না।
মনসুর ভাই কমিউটারে কিছু একটা টাইপ করলেন। বললেন
– আপনি আমাকে না বললে আমি কম্পিউটারকে জিজ্ঞেস করবো।
– করুন।
– এই, সাদেক ভাইর মাসে ইনকাম কতো?
কমপিউটার বললো
– ওয়ান মিলিয়ন ডলার অনলি।
আমি চমকে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম,
– কি করে বলে?
– আসলে, এটা হচ্ছে রিডিং সফটওয়্যার। আপনি কিছু লিখে সিলেক্ট করে রিডিং কমান্ড দিলে কম্পিউটার পড়ে শুনাবে। আপনাকে চমকে দেয়ার জন্য আগেই টাইপ করে রেখেছিলাম “ওয়ান মিলিয়ন ডলার”। আমি জাস্ট সময়মত এন্টার কমান্ড দিয়ে শুনিয়ে দিয়েছি।
– আচ্ছা ভাই, রোগীকে মুরগির পাখনা খেতে বললেন কেন? সবাই বলে গোস্ত খেতে, আপনি বললেন পাখনা খেতে, কারন কী?
– এটাই তো আমার কেরামতি। রোগীর সমস্যা বলেছে, ডেনায় বল পায় না। ডেনা মানে বাহু। বাহুতে শক্তি পায় না। মুরগির ডেনা বলে পাখনা। মুরগির পাখনায় শক্তি আছে বলেই শরীরের এত ওজন নিয়ে এক গাছ থেকে উড়ে গিয়ে আরেক গাছে গিয়ে বসে। কাজেই মুরগির পাখনা খেলে রোগীর ডেনায়ও বল আসবে। এগুলো তো মানসিক রোগী।
-মুরগির গোসত খেতে বললেই তো হতো।
-শুধু পাখনা খেয়ে মুরগির গোস্তো তো ফেলে দিবে না। পাখনা খেলে গোস্তোও খাবে।
আমি মুসকি হেসে বললাম, ” মনসুর ভাই, এই জন্যই আপনার কাছে এত মানসিক রোগী আসে।”
১০ মার্চ ২০২৬ খ্রি.
ময়মনসিংহ
#মনসুর #স্মৃতি #স্মৃতিকথা #গল্প
কাল্পনিক ছবি একেছি এ আই দিয়ে।
