Category Archives: Writings

Dhandania Water Fall

জল প্রপাতের নামকরণ :

ঢ্নডনিয়া জলপ্রপাত (Dhandania Water Fall) মুলত প্রথম মিডিয়া জগতে প্রচার পায় বাশারচালা গ্রামের ধলা মিয়ার ফেইসবুক পোস্ট দেখে। তিনি সেখানে মাছ ধরতে গিয়ে তার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে ভিডিও ক্লিপ ফেইসবুকে পোস্ট দেন। এলাকার কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের নজরে আসলে ক্রমেই এটা নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হতে থাকে। যেহেতু এর নির্দিষ্ট কোন নাম ছিলো না, সেহেতু বিভিন্ন জন বিভিন্ন নাম দিয়ে প্রচার করেন। যেহেতু ছোট চওনা ব্রিজ হয়ে হেটে এই জায়গায় যেতে হয় সেহেতু অনেকেই এর নাম দিয়েছেন ছোট চওনা মিনি জলপ্রপাত। আশেপাশের সবুজের সৌন্দর্য সহ এর নাম দিয়েছেন মিনি সুইজারল্যান্ড। আমার মতে, যেহেতু এটা ঢ্ণডনিয়া বাইদে, ঢ্নডনিয়া মৌজার অন্তর্ভুক্ত তাই এর নাম “ঢ্নডনিয়া জল প্রপাত (Dhandania Water Fall)” হওয়াই ভালো।

আপনার কী মনে হয়?

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বড়বাইদপাড়া, সখিপুর, টাংগাইল।

১৫ জুলাই ২০২৬ খ্রি.

ঢ্নডনিয়া জলপ্রপাতের সৌন্দর্য – মিনি সুইজারল্যান্ড

(ভ্রমণ গাইড)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

টাংগাইল জেলার সখিপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের ঢনডনিয়া জল প্রপাতটি ঢ্নডনিয়া ও তৈলধারা পাহাড়ের উপত্যকায় অবস্থিত। এই সবুজ পাহাড়, উপত্যকার বাইদের সবুজ ঘাস ও ফসল এবং বাইদ চিড়ে প্রবাহমান পানির স্রোত – এসব মিলে এক অপরুপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি তৈরি করেছে। ভ্রমণ পিপাসুরা এর নাম দিয়েছে মিনি সুইজারল্যান্ড। পানির স্রোতের শব্দ, পর্যটকদের জল-কেলি ও কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠে এই পর্যটন কেন্দ্রটি।

ঢনঢনিয়া জল প্রপাতের পানির প্রবাহ

(ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার, বড়বাইদপাড়া, সখিপুর)

ঢনঢনিয়া জল প্রপাতের পানি আচড়ে পড়ে প্রথমে খাদের সৃষ্টি হয়েছে। এই পানি প্রবল বেগে ভাটির দিকে অর্থাৎ পূর্ব-পশ্চিম দিকে ন্যাচারাল খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ইন্দারজানী পাদদেশে বিরাট চাপড়া বিলে গিয়ে মিশেছে। এই খাল মান্দার (মান্দাইর) খাল নামে পরিচিত। শুধু জল প্রপাতের পানিই নয়, এই খালের দুই দিকের পাহাড়ি অঞ্চলের পানিও এই খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়। চাপড়া বিল এই এলাকার বিরাট এক জলাধার। বর্ষার শেষে চাপড়া বিলের পানি সাইল সিন্দুর খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মরিচার কাছে গিয়ে বংশী নদীতে গিয়ে পড়ে। বর্ষাকালে এই খাল দিয়ে নৌকা নিয়ে ছোট চওনা ঘাটে এসে নৌকা ভিড়ে। এই খালের পানি স্বচ্ছ। মান্দার খাল, চাপড়া বিল, সাইল সিন্দুর খাল ও বংশী নদীর মাছ সুস্বাধু হয়। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষের দিকে যখন প্রচুর বৃষ্টি হওয়া শুরু হয় তখন মান্দার খালে প্রবল স্রোত থাকে। এই স্রোতের ভিতর দিয়ে চাপড়া বিল থেকে প্রচুর ডিমওয়ালা দেশীয় মাছ উজাতে থাকে। বিভিন্ন বাইদে প্রবেশ করে বিভিন্ন ডোবায় এসে ডিম ছাড়ে। ডিম থেকে মাছের পোনা বড় হলে আষাঢ় -শ্রাবনের ঢলের পানির সাথে মিশে মান্দার খাল দিয়ে চাপড়া বিলে আশ্রয় নেয়। সেখানে গভীর পানিতে মাছ বড় হয়। পাহাড়ের ঢলের পানিতে মাছের জন্য প্রাকৃতিক খাদ্যও চলে যায় এই চাপড়া বিলে। এই জন্য চাপড়া বিলের মাছ হৃষ্টপুষ্ট ও সুস্বাদু হয়। বর্ষার শেষে পানি যখন সাইল সিন্দুর খাল দিয়ে বংশি নদীতে নামতে থাকে তখন বড় বড় বোয়াল, চিতল, আইড়, শোল, গজার ইত্যাদি মাছও বংশী নদীতে চলে যায়। সেখানে গিয়ে আরও বড় বড় হয়।

এই পানির গতি পথ দিয়ে আগের দিনে নৌকা যোগে অনেক পন্য আনা নেয়া হতো।

শীত-বসন্তের দিনে এগুলোর পানি অনেক কমে যায়। পানি যেটুকু থাকে শান্ত ও স্বচ্ছ থাকে।

১৮/৬/২০২৬

ময়মনসিংহ

#জল_প্রপাত#ঢ্নডনিয়া#water_fall

ঢনডনিয়া জল প্রপাতে যাওয়ার রাস্তা

(ভ্রমণ গাইড)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ঢ্নডনিয়া জলপ্রপাত দেখতে যাওয়ার পাকা রাস্তা আছে। ভ্রমণ স্পটের তিন শত মিটার উত্তরে ছোট চওনা ব্রিজ। এখানেই গাড়ি থেকে নামবেন। এখান থেকে পায়ে হেঁটে ভ্রমণ স্পটে যাবেন। এখানে থাকা-খাওয়ার তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই। তবে ফুস্কা, ঝাল মুড়ি জাতীয় স্ট্রিট ফুড পাওয়া যায়। যেহেতু এটা স্থানীয় জনগনের জমির উপর প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি হয়েছে, সেহেতু এর কোন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নাই। নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। তবে এলাকার লোকজন ভালো। রাত্রি যাপন করতে হলে জেলা শহরে চলে যাওয়াই ভালো।

ছোট চওনা ব্রিজটি বড় চওনা – কালিহাতী রাস্তায় মান্দার খালের উপর অবস্থিত। ব্রিজ এলাকাও বেড়ানোর জন্য উপযুক্ত স্থান। এই সড়কে বাস চলাচল করে না। সি এন জি চালিত অটোরিকশা চলে বড় চওনা থেকে পারখী চৌরাস্তা এবং এখান থেকে কালিহাতী। বাংলাদেশের যেখান থেকেই আসবেন হয় বড় চওনা দিয়ে প্রবেশ করবেন নায় হয় কালিহাতী দিয়ে। মোটর বাইক অথবা প্রাইভেট কার নিয়ে এলে সরাসরি ছোট চওনা ব্রিজে পৌছুতে পারবেন। বড় চওনা থেকে ছোট চওনার দূরত্ব ৪.৬ কিলোমিটার এবং কালিহাতী থেকে ছোট চওনার দূরত্ব প্রায় ১৯ কিলোমিটার। দূর থেকে আসতে হলে কালিহাতী অথবা বড় চওনা যেতে গুগল ম্যাপে সার্চ দিবেন। এখানে পৌঁছে ছোট চওনার পথ ধরবেন। বিকেল ৬ টার মধ্যেই ভ্রমণ স্পট ত্যাগ করবেন।

একটা কথা মনে রাখতে হবে, যেহেতু পাহাড়ি বৃষ্টির পানির ঢল থেকে সৃষ্টি হয় এই জল প্রপাত, সেহেতু জল প্রপাত দেখতে হলে বৃষ্টির মাসগুলোতে যেতে হবে এই ভ্রমণ স্পটে।

২০ জুলাই ২০২৬

ঢ্নডনিয়া জলপ্রপাত রিসোর্ট

(প্রস্তাবনা, পরিকল্পনা ও ডিজাইন)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের ঢনডনিয়া জলপ্রপাতকে কেন্দ্র করে এই এলাকার ভূমি-মালিক ও পর্যটন করপোরেশন অথবা পর্যটন শিল্পের উদ্দোক্তাদের নিয়ে একটা রিসোর্ট নির্মানের আমি কল্পনা করে এআই টুল দিয়ে একটা ছবি একেছি, যেটা এখানে শেয়ার করা হলো।

রিসোর্টের মাঝখানে থাকবে ১০ ফুট উচু জল প্রপাত। জল প্রপাতের দক্ষিণ পাশে উজানে থাকবে একটা লেক।এখানে বোটিং করা হবে। উত্তরে থাকবে জল প্রপাতের পানি। সেই পানি সরু হয়ে মান্দার খালে প্রবাহিত হবে উত্তর দিকে।খালের পাড় দিয়ে ছোট সাইজের সবুজ গাছ পালা থাকবে। খালের দুই দিকে সমতল ভুমিতে বাগান থাকবে। রিসোর্টের দুই দিকে ঢালু পাহাড়। সেখানে বড় বড় পাহাড়ি গাছ। তার নিচ দিয়ে বেড়ানোর পরিবেশ থাকবে। পুর্ব পাহাড়ের ঢালে রিসোর্টের টাওয়ার। এতে থাকবে রিসেপশন, রেস্টুরেন্ট, হোটেল ইত্যাদি। পাশে একটা অবজারভেশন টাওয়ার। রিসোর্টের পুর্ব ও পশ্চিমে দিগন্তজোড়া সবুজ বন। পূর্ব – দক্ষিন কোণ থেকে উত্তর -পশ্চিম কোণ পর্যন্ত লিপলাইন দিয়ে ঝুলে ঝুলে যাবে পর্যটকরা। দৃশ্যগুলো দারুণ হবে।

এই ভুমি থেকে ভুমি তেমন কিছু পান না। তখন অনেক লাভবান হবেন।

আপনি কী মনে করেন? কমেন্ট বক্সে লিখুন। শেয়ার করে জানিয়ে দিন।

২১ জুলাই ২০২৬ খ্রি.

#রিসোর্ট#ঢ্নডনিয়া#resort#Dhandania

ঢনডনিয়া জলপ্রপাত এলাকায় আমার শৈশব

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সনে ৭ম ও ৮ম শ্রেণীতে পড়তাম কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে। স্কুল থেকে এসে সাধারণত পাড়ার বন্ধুরা খেলতে যেতো। আমি ছিলাম ব্যতিক্রমী। আমি মাছ ধরার ছলে ঢনডনিয়া জলপ্রপাত এলাকা থেকে শুরু করে মাহা সরকারের বাঁধ, হাজীর বাঁধ, ছোট চওনা ঘাট, ভুয়াইদের ক্ষেত এবং এর ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সর্পিল মান্দার খালে মাছ ধরতে ধরতে এই পাহাড়ি এলাকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতাম। যেতাম ঢনডনিয়া বংশী পাড়া হয়ে। ফিরতাম ছোট চওনা, জিতাশ্বরি হয়ে। মাছ যাই ধরতাম, সেটা বড় কথা না, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করাই আমার আসল উদ্দেশ্য ছিলো।

গ্রামের ছেলে। লুংগি ও সেন্ডো গেঞ্জি গায়ে মাছেরে যেতাম। মাছ ধরতে যাওয়াকে আমরা মাছেরে যাওয়া বলতাম। ঘাস কাটতে যাওয়াকে বলতাম ঘাসেরে গেছে। একেক সিজনে একেক রকম মাছ পাওয়া যেতো। পাহাড়িয়া ছোট মাছ। খুব স্বাদের হয়। টাকি মাছকে বলতাম ছাইতান মাছ। চিংড়ি মাছকে বলতাম ইচা মাছ। চিরকা মাছকে বলতাম বাইং মাছ। আসল বাইম মাছকে বলতাম নাইয়া বাইং। ইচা মাছ ধরার জন্য ব্যবহার করতাম খুইয়া জাল ও জাহইর। জাহইর বাঁশ দিয়ে বুনানো তিন কোনা একটা ডিভাইস। পানির নিচ দিয়ে ঠেলে সামনের দিকে নিয়ে খালের পাড়ে নিয়ে ঠেকিয়ে পাড়ের গর্তের ভিতর হাত দিয়ে খাবলা খাবলা করলে ইচা মাছ জাহইরে অথবা খুইয়া জালে উঠে আসতো। কোমড়ে মাছ রাখার খালই বাঁধা থাকতো। মাছ ধরে ধরে খালইতে রাখতাম। বেলা ডোবার আগে ডান কাঁদে খুইয়া নিয়ে এবং বাম হাতে খালই ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরতাম। পথে মুরুব্বিদে সামনে পড়লে “দেহি গেদা কতোরি মাছ ধরছ” বলে খালইর মুখে উকি দিয়ে বলতেন, ভালাই ধরছ।”

কোন কোন সময়, বিশেষ করে মান্দার খালে পানি কমে গেলে হাতিয়ে মাছ ধরতাম। আঞ্চলিক ভাষায় বলতাম য়াতাইয়া মাছ ধরা। পানির স্তর কমে গেলে মাছগুলো পানির তলায় মাটির সাথে মিশে বিশ্রাম নিতো। দু’হাত ডুবিয়ে মাটি ছইয়ে হাঁস যেভাবে শামুক ঝিনুক খুঁজে, সেইভাবে হাত দিয়ে খাবলা খাবলা করতাম। মাছের স্পর্শ অনুভূত হলে মাছের ঘারে ঘরে তুলে আনতাম। এভাবে বড় বড় টাকি মাছ, সরপুঁটি, নোন্দা জাতীয় ঝড়ঝড়া মাছ ধরা যেত।

মান্দার খালের পাড় দিয়ে মাঝে মাঝে হিজল গাছ ছিলো। আর ছিলো বড় বড় ঝোপঝাড়। এগুলো দেখতে খুব ভালো লাগলো আমার। মাছ ধরা বাদ দিয়ে এদের দিকে চেয়ে থাকতাম অপলক দৃষ্টিতে। আশে পাশে থেকে সাদা বক মাছ ধরে এনে এসব গাছের উপর বসতো। হাট টিমা টীম পাকিকে আমরা হটেট্টি পাখি বলতাম। মান্দার খালের দুপাশের শস্য ক্ষেতগুলোতে অনেক হটেটটি পাখি বিচরন করতো। ওড়া উড়ে কিন্তু গাছে বসে না। উড়ে উড়ে চিল্লা চিল্লি করে এভাবে “হ টি টি, হ টি টি, টি টি হট, টি টি হট।” আমার এগুলো শুনতে ভালো লাগতো। মাঝে মাঝে বিড়াট বিড়াট সাড়স পাখি ক্ষেতের উপর দিয়ে হেটে হেটে সাপ বেঙ ধরতো। আমি যেনো এখনো ময়মনসিংহ বসে কল্পনার জগতে প্রবেশ করে সেগুলো দেখতে পাই।

একবার মাছ ধরার আরেক পদ্ধতি আবিষ্কার করলাম। তখন পানি কমে গিয়েছিলো মান্দার খালে। পায়ের নিচে ছিলো পিচ্ছিল কাদা। মাঝে মাঝে পায়ের নিচে কাদার ভেতরে মাছের অনুভুতি টের পেতাম। এগুলো ছিলো চিরকা মাছ, আমরা বলতাম বাইং মাছ। আর ছিল টাকি মাছ, আমরা বলতাম ছাইতান মাছ। যে পায়ের তলায় মাছে উপস্থিতি অনুভূত হতো সেই পায়ের দুপাশ দিয়ে দু’গাত প্রবেশ করিয়ে কাদাসহ মাছ এনে খালের পাড়ে ডাংগায় ছুড়ে মাড়ছিলাম। কাদা থেকে মাছ বেড়িয়ে এসে হাটিহুটি পারছিলো, আর ধরে ধরে খালইয়ে ভরছিলাম। এক সময় কাদার সাথে বিড়াট এক টাকি মাছ উঠছিলো। আকাশেই হাটিহুটি করে মান্দার খালের পাড়ে ঝোপের ভিতর গিয়ে পড়লো। এত বড় মাছটা নিয়ে যেতে হবে বলে আমি ঝোপের ভিতর প্রবেশ করলাম। অবাক হয়ে দেখলাম অনেক গুলো আস্ত মানুষের কংকাল স্তুপ করা আছে। ভয়ে গা শিউরে উঠলো। খালই হাতে নিয়ে দুরু দুরু বুকে বাড়িতে ফিড়লাম। মাছ দেখে মা খুশি হলেন। কিন্তু যতই রাত গভীর হতে লাগলো কংকাল দেখার ভয় আমার বাড়তে লাগলো। বাবা আমার আচরণ বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন, “বাজান, শরীর খারাপ?”

– না, আইচকা ডরাইছি।

– কী দেইখা ডরাইছ?

আমি কংকাল দেখার বর্ননা করলাম বাবার কাছে?

জিজ্ঞেস করলাম

– ইন্নাকি হাছাই মাইন্সের কংকাল? নাকি আমারে কিছুইয়ে ধরছে?

– না, বাজান। ডরাইয়ো না। উন্না বংশি-মান্দাইগ কংকাল। ওগো ধর্মে আছে যে কলেরা, বসন্ত মহামারী য়ইয়া মইরা গেলে হেন্নারে না পুইড়া চাপড়া মাটি দিয়া ফালায়। হেইন্না তিগা মোনয় কংকাল য়ইছে। ডরাইয়ো না।

গ্রাম থেকে যত দুরেই থাকি সদা গ্রামের শৈশবের স্মৃতি মনে পড়ে। কিন্তু কংকালের রহস্য আমার রইয়েই গেছে। ইদানিং ঢ্নডনিয়া লেভেলের জল প্রপাতটি সোসাল মিডিয়ার মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওগুলো দেখে আমার শৈশবের স্মৃতি বেশী বেশী মনে পড়ছে। আমিও ওগুলো শেয়ার করছি। নিজের মতামত ব্যক্ত করছি। জল প্রপাত দেখতে আমাদের দেশের ভ্রমণ পিপাসুরা সিলেট যায়। অথচ বাংলাদেশের মাঝখানে সখিপুরের ঢনঢনিয়া গ্রামেই সুন্দর জল প্রপাত আছে। পর্যটন শিল্পের আওতায় এনে জল প্রপাতকে কেন্দ্র করে দুই পাহাড়ের এই উপত্যকায় পরিকল্পনা করে আকর্শনীয় এক রিসোর্ট তৈরি করা যায় – এমন একটা ফেইসবুক পোস্ট আজ আমি দিয়েছি। তার একটা কাল্পনিক ছবিও পোস্ট করেছি। সন্ধায় স্থানীয় তৈল ধারা গ্রামের সাইদ মেম্বার ভাইকে ফোন করে অনেক আলাপ করলাম এব্যাপারে। তাকে শেষে কংকালের র্‌হস্যাটা কী জিজ্ঞেস করলে বললেন, “আপনার আব্বা যেটা বলেছেন, সেটাই ঠিক। এক সময় গুটি বুসন্ত হয়ে অনেক বংশী-মান্দাই মারা যায়। ঐসময় নাকি পুজায় তারা কি যেন ভুল করেছিলো, তাই প্রচুর লোক মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।”

আমি বললাম, “পুজার ভুলের জন্য নয়, পুজার সময় সবাই কাছাকাছি আসাতে ছোয়া ছুয়ি হয়ে বেশী আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। দেখেননি, করোনার সময় মানুষকে কিভাবে লক ডাউন করে আটকিয়ে রাখা হয়েছিলো যাতে মহামারী না ছড়ায়।” তিনি বললেন, “এলাকায় বেড়ায়ে আসেন। জল প্রপাত দেখে যান। অনেক দূর থেকে জল প্রপাত দেখতে আসে।”

২১ জুলাই ২০২৬ খ্রি.

ময়মনসিংহ

#স্মৃতি#শৈশব#জলপ্রপাত

seminar-hall

প্রথম দেখা সেমিনার হল

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৭৭ সন। মার্চ মাসে এসএসসি ফাইনাল পরীক্ষা দিতে করটিয়া গিয়েছিলাম। আমাদের স্কুল ছিলো ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বাটাজোর গ্রামে বাটাজোর বি এম হাই স্কুল। পরীক্ষার কেন্দ্র ছিলো টাংগাইলের বাসাইল উপজেলার করটিয়ায় জমিদার বাড়ি সংলগ্ন মরহুম ওয়াজেদ আলী খান (চান মিয়া) প্রতিষ্ঠিত হাফেজ মাহমুদ আলী ইনস্টিটিউটে। পরীক্ষা উপলক্ষে আমি ভাতকুরা গ্রামে এক বাড়িতে পেইং গেস্ট ছিলাম। পাশের বাড়িতে আমার ফুফাতো ভাই মরহুম আসাদুজ্জামান তালুকদার (জিয়াউল) ভাই লজিং থেকে করটিয়া সাদত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স পড়তেন। তিনিই আমাকে ২০ দিনের জন্য পেয়েইং গেস্টের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। পাশের বাড়িতে খেলেও আমি থাকতাম জিয়াউল ভাই থাকার বাংলাঘরে। পড়ার ফাকে ফাকে ভাইর সাথে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতাম। তিনিই আমাকে করটিয়া নিয়ে যেতেন এবং নিয়ে আসতেন। তিনি আমার থেকে প্রায় চার বছরের বড় ছিলেন। একদিন বললাম, “ভাই ছোট বেলা থেকেই করটিয়া কলেজের নাম শুনি। কাজেম উদ্দিন নানাও এই কলেজ থেকে বিএ পাস করেছিলেন। আমাকে আপনার কলেজটা একদিন ভালো করে দেখাবেন।” জিয়াউল ভাই পরীক্ষার অফ ডে-তে একদিন আমাকে কলেজ দেখাতে নিয়ে গেলেন।

এসএসসি পাস করার পর হয়তো এই কলেজেই পড়তে হবে, এই স্বপ্ন নিয়ে ভাইর সাথে কলেজ দেখতে গেলাম। জীবনে আমি প্রথম কলেজ দেখেছি তথকালীন মুজিব মহাবিদ্যালয়, তথকালীন কাদের নগর, সখিপুর। বর্তমানে যার নাম সখিপুর সরকারি মহাবিদ্যালয়। ওটা তখন একটা টিনশেড ঘর ছিলো। এরপর দেখি ভালুকার বাটাজোর গ্রামের সোনার বাংলা মহাবিদ্যালয়। ওটাও টিনের ঘর ছিলো। তারপর দেখি কালিহাতির আউলিয়াবাদ গ্রামের আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ।

ওটাও টিনের ঘর ছিলো।

করটিয়ায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী সরকারি সা’দত কলেজ ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয। করটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী তাঁর পিতামহ সাদাত আলী খান পন্নীর নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। সাদত কলেজ ছিলো বিল্ডিং। উন্নত কলেজ। ভবিষ্যতে হয়তো এই কলেজেই পড়তে হবে এই চিন্তাভাবনা ধারণ করে ভাইর সাথে ঘুরে ঘুরে কলেজ দেখলাম। বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে গিয়ে সেই কক্ষে কি ধরনের ক্লাস তা বলে দিচ্ছিলেন। বিজ্ঞানের প্রতি আমার খুব আগ্রহ ছিলো। ভাইকে বললাম, “বিজ্ঞান ভবন দেখালেন না?” তিনি বিজ্ঞান ভবন দেখালেন। একটা বড়সড় কক্ষে নিয়ে গিয়ে বললেন, “এটা সেমিনার হল। এখানে সেমিনার হয়।”

আমি “সেমিনার” কী, “সেমিনার হল” কী, কিছুই বুঝলাম না । ভাইর কাছে ভয়ে জিজ্ঞেস করারও সাহস পেলাম না। ভাই যদি আমাকে বোকা মনে করে বলে ফেলেন, “এই পাহাইড়া, এখন পর্যন্ত সেমিনার কী তা জানো না?”

সেমিনার কী, কিভাবে হয় তা ভালো করে দেখলাম এবং বুঝলাম এইচ এস সি পাস করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ভর্তি হয়ে পড়ার সময়। আমি ছাত্র অবস্থায়ই নিয়মিত সাপ্তাহিক সেমিনারে শিখার জন্য উপস্থিত থাকতাম। পোস্ট গ্রাজুয়েট করার পর শিক্ষকতা করার সময় জার্নাল প্রেজেন্টেশন সেমিনারের একটানা আমি ৫ বছর কো-অর্ডিনেটর ছিলাম। গত বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্স এর একটি সেমিনারে আমি চেয়ারম্যান ছিলাম। কে বলবে আমি পাহাইড়া! এই বয়সেও আমি কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ এর প্রতিটি সেমিনারে উপস্থিত থাকি। সেমিনারের ভিডিও রেকর্ড করে ইউটিউব ও ফেইসবুকে পোস্ট করি নিয়মিত। যারা বাস্তবে সেই সেমিনারে উপস্থিত হতে পারে না তারাও নেট থেকে আমার রেকর্ড করা সেমিনার দেখে নেয়। জিউউল ভাইকে মনে পড়ে।

২৯ জুন ২০২৬ খ্রি.

ময়মনসিংহ ছবি কাল্পনিক: এ আই দিয়ে তৈরি।

july3

জুলাই ৩

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮০ সনের জানুয়ারি মাসে আমাদের এমবিবিএস ক্লাস শুরু হয়েছিল। আমি ভর্তি হয়েছিলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। রেগুলার ব্যাচ হিসাবে ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল ১৯৮৫ সনের মে মাসে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা মে মাসেই হয়ে যায়। তারা পাস করে সরাসরি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মেডিকেল কলেজের ছাত্রগুলায় অতিরিক্ত রাজনীতি পছন্দ করতো। তারা সংগ্রাম করে পরীক্ষা পিছায়। তাই আমরা ফাইনাল পরীক্ষা দেই সেপ্টেম্বরে। নভেম্বরের ২০ তারিখে পাসের রেজাল্ট পাই এবং ২১ তারিখে ইন-সার্ভিস ট্রেইনি হিসাবে এক বছরের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগদান করি। সরকার সিদ্ধান্ত নেয় এবার আগের মতো ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং এর শেষে আমাদেরকে সরাসরি মেডিকেল অফিসার হিসাবে সরকারি অফিসার পদে নিয়োগ দিবে না। আমরা ট্রেইনিং করতে করতে সারা বছর সংগ্রাম চালিয়ে যেতাম। ট্রেইনিং শেষে আমরা হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেলেও সংগ্রাম চলতে থাকে। বে-উপায় হয়ে এরশাদ সরকার সাদা কাগজে স্বহস্তে চাকরির আবেদন করার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়। ইতিমধ্যে হতাস হয়ে প্রায় চার ভাগের একভাগ বেকার ডাক্তার দেশ ত্যাগ করে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকা পারি জমিয়েছে। সোনার দেশে আমরা যারা ছিলাম তারা স্বহস্তে দরখাস্ত করে একজন বাদে সবাই চাকরি পেলাম সরকারি মেডিকেল অফিসার হিসাবে। ডা: আব্দুর রহমান চাকরি পেলো না, আমি এক মাস পর জানতে পারলাম। জেনে আমি তাকে ঢাকায় গিয়ে ডিজি অফিসে খোজ নিতে বললাম কেন সে বাদ পড়েছে। এসে জানালো এক তাজ্জব কাহিনি। ডিজি অফিসের অফিস সহকারী তাকে জানায় আপনি স্বহস্তে না লিখে টাইপ করে দরখাস্ত দিয়েছেন। স্বহস্তে লিখার জন্য বিজ্ঞপ্তিতে লিখা ছিলো। তাই, আপনার দরখাস্ত গ্রহন করা হয়নি।

– আমি তো স্বহস্তেই লিখেছি।

– এই যে আপনার টাইপ করা দরখাস্ত।

– এটা তো টাইপ করা না, এটা আমার হাতের লেখা। আমি এমন করেই লিখি।

– তাই নাকি? এত সুন্দর আপনার হাতের লিখা! আহারে, এক মাস পার হয়ে গেলে নিয়োগ বাতিল হয়ে যায়। আপনার জন্য করার কিছু নাই। দু:খিত।

আমার কোথায় পোস্টিং হয়েছে জানিনা। আমি ও নজরুল ঢাকায় গিয়ে জানতে পারলাম আমাদেরকে খুলনা বিভাগে বিভাগীয় পরিচালকের কাছে ন্যাস্ত করেছে পোস্টিং দেয়ার জন্য। ১ জুলাই আমরা দুজন খুলনা রওনা দিলাম টাংগাইল থেকে। রাতে খুলনায় পৌঁছে ডাঃ নাসিম কাকার বাসায় খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম । ২ তারিখ সকালে বিভাগীয় পরিচালকের অফিসে গিয়ে দেখি পোস্টিং অর্ডার হয়ে গেছে। নজরুলকে দিয়েছে খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার একটা সাবসেন্টারে। আমাকে দিয়েছে বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। দুইজন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। রাতে সাতক্ষিরায় সুলতানের বাসায় খেয়ে পিরোজপুর শহরে হোর্ডিংএ রাত্রিযাপন করলাম। ৩ তারিখ সকাল ৬ টায় হুলারহাট থেকে লঞ্চে উঠলাম, ৯ টায় গিয়ে বরিশাল পৌছলাম। এটাই আমার জীবনে প্রথম লঞ্চে জার্নি। তখন ডেপুটি সিভিল সার্জন ছিলেন চরামদ্দির ডা: জাহাঙ্গীর স্যার। তিনি আমাকে পেয়ে খুশি হলেন। সিভিল সার্জন থেকে কমিউনিকেশন লেটার নিয়ে বাস যোগে বাকেরগঞ্জ পৌছলাম দুপুরের দিকে। ডা: হুমায়ুন কবীর ভাই ছিলেন টিএইচএ। তিনি আমার যোগদান পত্রে সই করলেন। আমি চরামদ্দি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দায়িত্ব ভার গ্রহন করলাম ডা: সহিদুর রহমান ভাই থেকে। অর্থাৎ আমি ১৯৮৮ সনের ৩ জুলাই সরকারি মেডিকেল অফিসার হিসাবে প্রথম চাকরিতে যোগদান করলাম। আজ সেই ৩ জুলাই। এই তারিখ এলেই সেই তারিখ মনে পড়ে। এখনে চরামদ্দি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট রোস্তমকে পেলাম। তার সাথে চারামদ্দি রওনা দিলাম বিকেলে। বাস যোগে বরিশাল গিয়ে রাতে গেস্ট হাউজে রাত্রিযাপন করলাম। ৪ তারিখ সকাল ৬ টায় বরিশাল থেকে ছোট লঞ্চে করে চরামদ্দির কাছে কাটাদিয়া ঘাটে গিয়ে নামলাম। সেখান থেকে নৌকা যোগে চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে পৌছলাম সকাল ১০ টায়। সবার সাথে পরিচয় হলো। বিকেলে রোস্তমের বাসায় গিয়ে রাত্রিযাপন করলাম। ৫ তারিখ দুপুরে খেয়ে ছোট লঞ্চে করে বরিশাল চলে গেলাম। বিকেল ৬ টার লঞ্চে উঠলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। ৬ তারিখ সকালে ঢাকায় সদরঘাট নামলাম। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে বাসে উঠে টাঙ্গাইল চলে এলাম। তখন টেলিফোন ছিলো না। এই কয়দিন কী হয়েছে কেউ জানে না। দুপুরের দিকে টাংগাইলের বাসায় পৌছলে স্ত্রী স্বপ্না অধীর আগ্রহে জানতে চায়, “কী খবর?”

৩ জুলাই ২০২৬ খ্রি.

ময়মনসিংহ

ছবি তৈরি করেছি এ আই এর সাহায্য নিয়ে।

golam-kibria

প্রিন্সিপাল এএফএম গোলাম কিবরিয়া

(স্মৃতিকথা)

এএফএম গোলাম কিবরিয়া স্যার ছিলেন আমার শিক্ষক। তিনি আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। ১৯৭৩ সনে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী স্যার কলেজটি তার গ্রামের বাড়ি ছাতিহাটির কাছে আউলিয়াবাদে প্রতিষ্ঠা করে তার দাদার নামে নামকরন করেন আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ। কলেজ প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পরই আব্দুল লতিফ সিদ্দকী স্যার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব নেন। সেই সময় ভোলা জেলা নিবাসী এএফএম গোলাম কিবরিয়া নামে একজন সমাজ কল্যাণ বিষয়ের প্রভাষক ছিলেন। তিনি লতিফ সিদ্দিকী স্যারের একজন অন্যতম পছন্দের মানুষ ছিলেন। কলেজটি আবাসিক ছিল। ছাত্রদেরকে করা শাসনের ভিতর রাখা হত। তাই, তাদের রেজাল্ট ভাল হত। কলেজের সাথে একটি কৃষি খামার ছিল। ছাত্রদেরকে রুটিন অনুযায়ী দিনের কিছুক্ষণ কৃষিকাজ করতে হত। এলাকার জনগনের কাছে কলেজটির বেশ কদর ছিল।

১৯৭৫ সনের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর লতিফ সিদ্দিকী স্যার অনেক বছর ভারত ও রাশিয়া অবস্থান করেন। নয় মাস কলেজ বন্ধ থাকার পর প্রবাস থেকে স্যারের নির্দেশনায়, স্যারের চাচা জনাব ওয়াদুদ সিদ্দিকী (হুদ্দু মিয়া) সাহেবের তত্বাবধানে কলেজটি আবার চালু হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল হন বল্লার মোসলেম উদ্দিন স্যার। সব স্যারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কলেজটির লেখাপড়ার পরিবেশ আগের মত রাখার চেষ্টা করা হয়।

এই কলেজে আমি ভর্তি হই ১৯৭৭ সনে। ছাত্র সংখ্যা কম থাকাতে এবং সরকারী অনুদান কম আসাতে কলেজটি আর্থিক সংকটে পড়ে। কয়েকজন টিচার চলে যান। আমি দেখেছি কলেজ ক্যাম্পাসের ইট টুকিয়ে টুকিয়ে বিক্রি করে সেই টাকায় স্যারদের বেতন দিতে হতো। আমরা কলেজের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। ডিসেম্বরের দিকে স্যারদের কাছে শুনলাম কিবরিয়া স্যার নামে আগে এক প্রভাষক ছিলেন । তিনি প্রিন্সিপাল হয়ে আসছেন। তিনি এলে অবস্থার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি জানুয়ারির দিকে এলেন। দেখলাম অদ্ভুত এক ধরনের মানুষ তিনি।

তিনি সব সময় খাকি রংগের কুরতা পরতেন। দেখতে ঠিক যুবক বয়সের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছবির মত। মাথায় ঠিক জাতীয় কবির মত ঝাকরা চুল। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। স্বল্পভাষী। মৃদুভাষী। কথা বলার সময় মনে হয় যেন অনেক্ষণ মন খারাপ করে ছিলেন। কান্না কান্না গলার স্বর। অল্প বলতেন। কিন্তু মূল্যবান কথা বলতেন। সব টিচার তাকে পীরের মত মানতেন। আমরা ভয়ে ভয়ে থাকতাম।

২১ শে ফেব্রুয়ারি ও ২৬ মার্চের অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে স্যারের পারদর্শিতার বেশ কিছু প্রমাণ পেলাম। আমাদের কলেজের পিছনে বাঁশের তৈরি এক লাইনে ১০-১২টি কাঁচা লেট্রিন ছিল। ৮-১০ দশ ফুট উপর থেকে খোলা গর্তে পায়খানা পরত। ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে এগু্লো ব্যবহার করতে হতো। কিবরিয়া স্যার প্রথমেই এগু্লোর পরিবর্তে ১০-১২টি পাকা সেনিটারি লেট্রিন তৈরি করলেন এবং কয়েকটি টিউবওয়েল বসালেন সরকারী অনুদান এনে। অল্পদিনের মধ্যে কয়েক লাখ টাকা সেংশন করিয়ে টিচারদের জন্য ডর্মেটরি বিল্ডিং নির্মান করালেন। পুকুর সংস্কার করে খেলার মাঠ সমতল করালেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বোর্ডের চেয়ারম্যানকে এনে কলেজ পরিদর্শন করালেন। ছাত্রশিক্ষকদের কর্মস্পৃহা দেখে চেয়ারম্যান স্যার মুগ্ধ হলেন। ফিরে গিয়ে কলেজের জন্য অনেক সরঞ্জামাদি বরাদ্দ দিলেন। প্রিন্সিপাল স্যারের অনুরোধে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজকে এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র হিসাবে অনুমোদন দিলেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এসেছিলেন কালিহাতি হাই স্কুল মাঠে জন সভায়। বিরাট এক ব্যানার নিয়ে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে আমাদের সব ছাত্র পাঠিয়েছিলেন উক্ত সভায়। মাঠের মাঝখানে এতগুলি ছাত্রের মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রেসিডেন্ট-এর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। তিনি কয়েকলাখ টাকা কলেজের জন্য মঞ্জুরি দিতে নির্দেশ দেন। এরপর কলেজের অবস্থা অনেক পাল্টে যায়।

ফেব্রুয়ারি বা মার্চের দিকে কিবরিয়া স্যার আমাদের ব্যাচের হোস্টেলে থাকা ছাত্রদের নিয়ে বিকেলে ছাতিহাটি গেলেন। কলেজের নামে এলাকায় অনেক ধানী জমি ছিল। সেই জমিতে ইরি ধানের জালা বা গাছি ফেলা ছিল। স্যার আমাদের নিয়ে সেই জালা তুলতে বসলেন। আমরা ছাটা কামলার মত স্যারের সাথে লাইন ধরে বসে জালা তুললাম। এক সময় আমি, নজরুল বেলায়েত, কাদের, বুলবুল সবাই মিলে ছাটা কামলাদের মত আঞ্চলিক ভাষার গান গাইলাম। স্যার নিরবে উপভোগ করছিলেন। আমরা স্যারকে ভয় বা লজ্জা পেলাম না। স্যার বললেন “উন্নত দেশে কোন কাজকে কেউ ছোট করে দেখে না। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে তারা কাজ করে।” এভাবে আমরা মাঝে মাঝেই এক ঘন্টা বা আধ ঘন্টা কাজ করতাম। কাজের শেষে বিস্কুট খেতাম। স্যার আমাদেরকে হোস্টেলে করা শাসনের ভিতর রাখতেন। বেলা ডোবার সাথে সাথে রুমে ফিরতে হত। রাত ১২টার মধ্যে লাইট নিভিয়ে ঘুমিয়ে পরতে হত। শিক্ষকগণও স্যারকে পীরের মত মানতেন। তিনি দৈনিক তিন-চারটি করে ডিম পুচ করে খেতেন। তাই স্যার একটু মোটাসোটা ছিলেন। ঢিলেঢোলা কুরতা পরাতে বিসাল আকৃতির পেটটা তেমন বুঝা যেত না।

১৯৭৯ সনে আমাদের কলেজে প্রথম পরীক্ষার সেন্টার হল আমাদের এইচএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে। আমি পরীক্ষার্থী ছিলাম । ২৯ শে মে বৃ্হস্পতিবার বাংলা প্রথম পত্র, ৩১ মে শনিবার বাংলা দ্বিতীয় পত্র এবং ২ জুন সোমবার ইংলিশ প্রথম পত্র পরীক্ষা দিলাম । বিকেলে আমার মায়ের মৃত্যু সংবাদ এলে কিবরিয়া স্যার অখিল স্যারকে দিয়ে আমাকে বাড়ি পাঠালেন মায়ের মুখটি শেষ বারের মতো দেখার সুযোগ করে দিতে। অখিল স্যার আমাকে তার সাইকেলে বসিয়ে ডব্লিং করে চালিয়ে নিয়ে গেলেন । আমি নিরবে সাইকেলে  স্যারের সামনে নিরবে বসলাম। আমি তখন হাল্কা পাতলা হলেও ওজন আমার ৫৬ কেজির কম ছিল না। আমাকে নিয়ে অখিল স্যার সাইকেল চালিয়ে পাহাড়ের দুর্গম রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছিলাম। ভন্ডেশ্বর, খালুয়া বাড়ী, আওলাতৈল, মরিচা, বাঘেরবাড়ী, দেবলচালা, ঢডনিয়া, জিতাশ্বরি, নওপাড়া সুদীর্ঘ ১২-১৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাত ১০ টার দিকে বাড়ি পৌঁছলাম। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন জানাজার জন্য। আমি অজু করে জানাজায় শরীক হলাম। দাফন হল। এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

ভোরে অখিল স্যার বললেন “কিবরিয়া স্যার তোমাকে পরীক্ষা শুরুর আগেই ফিরিয়ে নিতে বলেছেন।” আমি বললাম “চলুন, স্যার।” আমি ভোরে আবার অখিল স্যারের সাইকেলে বসে কলেজে চলে গেলাম । পরীক্ষা শুরুর আধ ঘন্টা আগে গিয়ে পৌঁছলাম। মুখ ধুলাম। আবুল হোসেন তালুকদার স্যার এগিয়ে এলেন। বললেন “কিবরিয়া স্যার তোমাকে পরীক্ষার হলে যেতে বলেছেন।” আমি নিরবে হলে গিয়ে বসলাম। হাতে খাতা ও প্রশ্ন পত্র দেয়া হল। দোয়া পড়ে লিখা শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ লিখার পর মায়ের স্মৃতি ভাসা শুরু হয়ে গেল। চোখ দিয়ে পানি ঝরা শুরু হল। কোন এক স্যার মাথায় হাত বুলালেন। আমি আবার লিখলাম। লিখে শেষ করলাম। রুমে ফিরলাম। সবাই পড়া নিয়ে ব্যস্ত। আমাকে শান্তনা দেবার মত সময় সবার হাতে কম। আমিও বুঝলাম। ভাগ্যের নির্মম অধ্যায় অতিক্রান্ত করছিলাম।

কয়েকদিন পর বাবা এলেন হাসেন কাক্কুকে সাথে নিয়ে। বাবার চেহারা দেখে আমি বিমর্ষ হয়ে গেলাম। বাবার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে। ভয় হল বাবাকেও হারাই নাকি। বাবা প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে দেখা করতে চাইলেন। আমি হাসেন কাক্কু ও বাবাকে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে নিয়ে রেখে এলাম। কয়েকদিন পর ভিয়াইল থেকে রশিদ কাক্কু এলেন বর্গার বছির মৌলভী স্যারকে নিয়ে আমাকে দেখতে। রশিদ কাক্কুও স্যারের সাথে দেখা করে স্যারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হাসেন কাক্কু, বাবা ও রশিদ কাক্কু কিবরিয়া স্যারের আতিথেয়তার প্রশংসা করতেন। এইচএসসি পাস করি আল্লাহর দয়ায় প্রথম বিভাগে ২টি লেটার নিয়ে। স্যারের সাথে দেখা করে কদম্বুচি করি। তারপর ১৯৯৪-এর আগ পর্যন্ত স্যারের সাথে দেখা হয়নি। এর মধ্যে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী স্যার দেশে ফিরে কলেজের দায়িত্ব হাতে নেন। কিবরিয়া স্যার এক সময় চাকরী ছেড়ে দেশে চলে যান। কিছুদিন ঢাকার কোন এক কলেজে শিক্ষকতা করেন। কিন্তু আবার চাকরি ছেড়ে চলে যান বোনের বাড়ী পটুয়াখালীতে।

১৯৯৪ সনে আমি এমফিল পড়াকালীন ঢাকার শাহবাগে পিজি হোস্টেলে থাকতাম। তিনি তার বোনের কাজের মহিলার চিকিৎসা করানোর উদ্দেশ্যে আমার রুমে এসেছিলেন এবং এক রাত আমার রুমে কাটিয়েছিলেন । আমাদেরকে নিয়ে অনেক স্মৃতিচারণ করেন।

এক সময় তিনি ঘাটাইল ব্রাম্মনশাসন মহিলা কলেজ  প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হন ।  সেখানে তিনি কয়েকবছর ছিলেন। একদিন দেশের বাড়ি বেড়ানোর কথা বলে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। তিনি বিছানাপত্র কাপড় চোপর কিছুই নেননি।

অনেকদিন পর জানা গেছে পটুয়াখালী বোনের বাড়ী অবস্থান কালে চিরকুমার, মৃদুভাষী, বিচক্ষণ, স্বাধীনচেতা, বুদ্ধিদীপ্ত সেই বড় মাপের মানুষটি ইহজগৎ ত্যাগ করেছেন।

প্রথম লিখনঃ ২১/১২/২০১৭ খ্রি.

সংক্ষিপ্তকরনঃ ১২/১০/২০২২ খ্রি.

bijoier-ager-mase

বিজয়ের আগের মাসে


(মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

যুদ্ধের শেষের দিকে নভেম্বর মাস। ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মার্চের ২৬ তারিখ থেকে। সখিপুর, কালিহাতি, ঘাটাইল ও ভালুকার বিরাট এক এলাকা মুক্তিযোদ্ধা কাদেরিয়া বাহিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীমুক্ত রেখেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনি জনগণের আইন সৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত আছে। চুরি, ঢাকাতি, জুলুম করলে সাথে সাথে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনি বিচার করে দিচ্ছে। কারো ঘরে খাবার না থাকলে, যার ঘরে খাবার আছে তার কাছে থেকে ধার হিসাবে নিয়ে দিচ্ছে এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনি। আমন ধান পাকা শুরু হয়েছে। যার ধান পাকেনি অথচ ঘরে তার ধান নেই, তাকেও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনি ধান ধার হিসাবে নিয়ে দিচ্ছে যার ক্ষেতের ধান পেকেছে তার থেকে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনির জিম্মায়। ধনিদের কাছ থেকে চাল, ডাল ও গরু /খাসি চেয়ে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের ব্যবস্থা করছে। এদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেওপাড়া ক্যাম্পে অবস্থিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের শহরে যাওয়ার সড়ক ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে। কালিহাতি থেকে টাঙ্গাইল এবং টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা যেতে গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজগুলো ডিনামাইট দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। ঢাকা থেকে স্থল পথে তাদের খাবার ও রসদ ক্যাম্পে আসতে পারছে না। এর আগে তারা গ্রামে হানা দিয়ে খাদ্য ও গরু ছাগল লুট করে নিয়ে খেয়েছে। এখন সেগুলোও প্রায় শেষ হয়ে গেছে। হেলিকপ্টার যোগে পাউরুটি জাতীয় ড্রাই ফুড নিয়ে যাচ্ছিল ধলাপাড়ায় অবস্থিতি হানাদার বাহিনীর সদস্যদের জন্য। বীর মুক্তিযোদ্ধারা বন থেকে লুকিয়ে ওটাকে গুলি করেছে। ভয়ে ওটা অনেক উপর দিয়ে চলে গেছে। অবস্থা বেগতিক থেকে তারা পা পথে হেটে ধলাপাড়া ছাড়ে। সাগরদিগী হয়ে কুতুবপুর পর্যন্ত এসে একটা সেল ছাড়ে সেটা এসে পড়ে বড় চওনা প্রাইমারি স্কুলের টিনের চালার উপর। টিন চিদ্র হয়ে সেটা মাটিতে পড়ে গর্ত হয়ে যায়। বড় চওনায় অবস্থানরত বীর মুক্তিযোদ্ধারা এই স্কুলেই অবস্থান করতেন এবং স্কুলের মেঝেতে গর্ত করে অস্ত্র সস্ত্র লুকিয়ে রাখতেন। সেল পড়ার আগেই অস্ত্র নিয়ে মুক্তিবাহিনী সরে পড়ে। এলাকার জনগণের ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি হবে মনে করে তারা প্রতিরোধ করেন নাই। হানাদার বাহিনীর পরিকল্পনা হচ্ছে হেটে সোজা ঢাকায় পৌছা। তাই তারা বড় চওনা থেকে ঘোনার চালা, আড়াইপাড়া, মুচারিয়া পাথার হয়ে, গাজীপুর হয়ে ঢাকায় চলে যায়।

এদিকে হানাদার বাহিনীর আগমন হচ্ছে শুনে বড় চওনা, কালিয়া, কচুয়া থেকে সবাই বাড়িঘর ছেড়ে পশ্চিম দিকের বনাঞ্চলের গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে। টাঙ্গাইল শহর ছেড়ে যারা ঐসব গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলো তারাও বনাঞ্চলের গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে। সাথে নিয়ে এসেছে চিড়ামুড়ি। যেহেতু শহরের শরনার্থীরা বনাঞ্চলের তেমন কারও আত্মীয় নন সেহেতু তারা বিভিন্ন গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।

মর্জিনাদের বাড়ি বনাঞ্চলে। কিন্তু মর্জিনার শশুর বাড়ি কালিয়া। ওখান দিয়ে হানাদার বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে। মর্জিনার বাবার গোলার ধান শেষ হয়ে যাবার পর বিছুন ধানও ভাঙিয়ে খেয়ে ফেলেছে। কিছু ধান ধারও করেছে। কুয়ারপাড়ের ক্ষেতের ধান আধাপাকা হতেই খাওয়ার জন্য কেটে ফেলেছে। ঘরে দুই এক কাঠা চাল আছে। দুই এক দিন চলতে পারে। এরমধ্যে মর্জিনার চাচাশশুর স্ত্রী ও পাচজন এন্দাগেন্দা পোলাপান নিয়ে হাজির শরনার্থী হয়ে। আসরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। দুপুরের খাবার এখনো দেয়া হয় নি। মর্জিনার চাচাশশুর মর্জিনাদের উঠানে একটা কাঠের গুড়ির উপর বসে নারিকেলের হুক্কা টানছে আর খুসখুসি কাসছে। মর্জিনা তার বাবাকে বললো, “বাজান, কাক্কুরে নইয়া খাবার বহুন।” মর্জিনার বাবা বললেন,
– বিয়াই,নইন, ভাত খাই।
– আরেক ছিলিম তামুক খাইয়া নই।
– ভাত খাইয়া হাইরা তামুক খাহাবাইন।
– বিয়াই, আন্নেরা কি নতুন চাইলের ভাত খাইন?
– হ, নতুন চাইলের ভাত।
– আমি ত নতুন চাইলের ভাত খাহাইনা। ঘরে পুরান চাইল নাই?
– পুরান চাইল নাই। আন্নে নতুন চাইলের ভাত এহেবারেই খাহারুইন না?
– না।
– তাইলে আমি পুরান চাইল নইয়াহি।
মর্জিনার বাবা প্রতিবেশির বাড়ি গিয়ে এক খাঠা পুরান চাইল ধার করে আনতে আনতে মনে মনে বললেন, “শালার ফেরাংগি কত, আইছে শরনার্থী য়ইয়া, আবার নতুন চাইলের ভাত খাহারেনা, পুরান চাইলের ভাত খাবো!
(স্মৃতিকথা ও কল্পনার মিশ্রনে লেখা)
১৯ মে ২০২৬ খ্রি.
ময়মনসিংহ
ছবি এ আই টুল দিয়ে তৈরি করেছি।
#স্মৃতি #গল্প #মুক্তিযুদ্ধ #সাদেকুল

26marcher-por

২৬ মার্চের পর

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৭১ সনে আমি মাত্র ৫ম শ্রেণীতে পড়ি। আমাদের স্কুল ছিলো মরহুম আফসার খলিফা বাড়ির সাথে ঘোনার চালা সরকারি ফ্রি প্রাইমারি স্কুল । ২৬ বা ২৭ মার্চ হবে হয়তো। খালিফা বাড়ির পশ্চিম পাশে হালট ঘেষে পুকুরের পাড়ে আম গাছের নিচে একটা কাঠের বেঞ্চ ছিল বসে বিশ্রাম করার জন্য। সেই বেঞ্চে বসে আমিনুল ভাই ও কাদের চাচা রেডিও শুনছিলেল। আমিনুল ভাই হলেন মরহুম মোসলেম চাচার ছেলে। মরহুম কাদের চাচা ছিলেন মরহুম আফসার খলিফার ছেলে। এই দুইজন হয়তো সমবয়সি। আমি রেডিও শুনতে খুব পছন্দ করতাম। তাই রেডিওর কাছে গিয়ে দাড়ালাম। দুজনাই মনোযোগ দিয়ে একটি ঘোষণা বার বার শুনছিলেন। ঘোষণাটি খুব সম্ভব এ রকম ছিল – শেখ মুজিবুর রহমানকে রাস্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। মাঝে মাঝে বলা হচ্ছে “রেডিও পাকিস্তান ঢাকা।” দেশাত্মবোধক গান বাজাচ্ছে আর ঘোষণা চলছে। আমিনুল ভাইরা উদগ্রীব হয়ে শুনছেন।

কিছুক্ষণ পর ধলী পাড়া নিবাসী ইয়াকুব আলী চাচা এলেন ঢাকা থেকে। তিনি ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল (ইপিআর) -এ চাকরি করতেন ঢাকায়। আমিনুল ভাই জিজ্ঞেস করলেন

– চাচা, কোথা থেকে এলেন?

– আমি ঢাকা থেকে এলাম।

– ঢাকার খবর কী?

– পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে। ইপিআর বিদ্রোহ করেছে। তারা আমাদের ইপিআর বাহিনীর সদস্যদের ধরে লাইনে দাড় করিয়ে ব্রাস ফায়ার করে হত্যা করছে। ঢাকায় যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমি নিরস্ত্র হয়ে ফিরে এসেছি। আমাদের মুক্তি যুদ্ধ করতে হবে।

তিনি বাড়িতে চলে যান। পরের দিন, বা তার পরের দিন দেখলাম ইয়াকুব আলী চাচা কিছু সংখ্যক যুবক নিয়ে খলিফা বাড়ির উত্তর পাশে গজারির বন বেষ্টিত খালি বাচ্রা ক্ষেতে সামরিক ট্রেনিং দিচ্ছেন। হাতে বাঁশ দিয়ে ডামি রাইফেল তৈরি করেছে। সবার হাতে ডামি রাইফেল। আমি গজাড়ি গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ উপভোগ করছিল। সেই খালি যায়গায় পরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আজকের কালিয়া বাজার।

পরবর্তীতে এই ট্রেনিং প্রাপ্ত যুবকরা কাদের সিদ্দিকী প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দেন। খুব সম্ভব সেই সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ইয়াকুব আলী চাচা। তাই তিনি ইয়াকুব কমান্ডার ওরফে অকু কমান্ডার নামে পরিচিতি পান।

২৬ মার্চ ২০২৬ খ্রি.

ময়মনসিংহ

ছবিটি এ আই দিয়ে তৈরি করেছি

#স্মৃতি#মুক্তিযুদ্ধ

Eadgar Imam

ছোট বেলার ঈদগাহর ইমাম

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমাদের ছোট বেলার ঈদের জামাত অনেক বড় হতো। বড় চওনা হাট সংলগ্ন পুকুরের পশ্চিম পাড়ের মাঠে আমাদের ঈদের নামাজ হতো।বড় চওনা গ্রামকে কেন্দ্র করে শ্রীপুর, বামমচালা, খুইংগারচালা, ভুয়াইদ, ছোট চওনা, পাইন্যারবাইদ, জিতাশ্বরি, ঢ্নডনিয়া, বড়বাইদপাড়া, সাড়াসিয়া, ধলিপাড়া, জামাল হাটকুরা, ইত্যাদি গ্রামের মুসুল্লি নিয়ে এই মাঠে ঈদের নামাজের মাধ্যমে মিলন মেলা হতো। এই জামাতের প্রভাবশালী সংগঠক ছিলেন বড় চওনার মরহুম মোকছেদ আলী পঞ্চায়েত। তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা লাল মিয়া চেয়ারম্যানের পিতা। একেক গ্রাম বা এলাকায় একেকজন প্রভাবশালী ব্যাক্তি ছিলেন। তাদের সাথে মোকসেদ পঞ্চায়েতের ভালো সম্পর্ক ছিলো। তাতেই ঈদের জামাতের একতার সম্ভব হয়। যেমন ছোট চওনার মরহুম শমসের হাজী, জিতাশ্বরির মরহুম রশিদ হাজী, বড়বাইদ পাড়ার আমার মেজ দাদা মরহুম মেসের উদ্দিন তালুকদার -এদের জন্যই জামাতটা মজবুত ছিলো। শমসের হাজীও পঞ্চায়েত ছিলেন।

এসব মুরুব্বিগণ ইন্তেকাল করার পর এই বন্ধন দুর্বল হতে থাকে। আমরা দলবদ্ধ হয়ে ঈদগাহর দিকে তাকবীর দিতে দিতে অগ্রসর হতাম। দুল্যাকালে, আমার মনে আছে, ঈদ উপলক্ষে বড় চওনা হাট থেকে আমরা কাগজের তৈরি রঙিন গোল টুপি কিনতাম। সেগুলো মাথায় দিয়ে মুরুব্বিদের পিছনে পিছনে আনন্দ করতে করতে তাকবীর দিয়ে অগ্রসর হতাম। আমাদের কাফেলার সামনে থাকতেন বড় কাক্কু মরহুম সোলাইমান তালুকদার। কাফেলার মুরুব্বিকে পেছনে ফেলে কেউ সামনে যাবার সাহুস পেত না। জিতাশ্বরিদের কাফেলার সামনে থাকতেন মরহুম আব্দুর রশিদ হাজী। ছোট চওনাদের সামনে থাকতেন মরহুম শওকত আলী চেয়ারম্যান।

বিভিন্ন কারনে এই একতার বন্ধন ভেঙে গিয়ে গ্রামে গ্রামে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতে থাকে। কেন এমন হয়, সেটা নিয়েই এখন লিখবো।

আমি বুঝমান হয়েই দেখেছি আমাদের বড় চওনা মাঠের ঈমাম প্রায় শতববর্ষী মাওলানা মরহুম হাতেম আলীকে। অত্যন্ত সুন্দর তার চেহারা ছিলো। তার বাড়ি ছিলো বাশাইল উপজেলায়। ঈদের আগের দিন এসে পঞ্চায়েত বাড়িতে অবস্থান করতেন। নামাজের আগে বাংলায় সুন্দর সুন্দর বয়ান করতেন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স:) এর জীবনের ঘটনাগুলো এমন অংগ ভংগী করে বলতেন, আমার মনে হতো এই হুজুরের মতই হয়তো আমাদের মহানবী ছিলেন। নামাজ ও দোয়া শেষে ছাত্র ও যুবকরা হুজুরের কাছে গিয়ে দোয়া চাইতেন। হুজুর মাথায় হাত বুলিয়ে, পিঠে আদর করে কথা বলতেন, উপদেশ দিতেন, খুশী খুশী ভাব নিয়ে কথা বলতেন। ঈদের নামাজ শেষে আমার চাচারা হুজুরকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতেন। এই রেওয়াজ বহু বছর আগে থেকেই চলে আসছিলো। দুপুরের খাবার খেয়ে তিনি বিশ্রাম নিতেন। রাতে তাকে ডিস্টার্ব করতাম না। সকালে ফজরের নামাজের পর আমরা সব বয়সী মানুষ কাচারি ঘরে হুজুরের কাছে গিয়ে বসতাম। হুজুর চায়ের চুমুক দিতে দিতে সুন্দর সুন্দর ইসলামি গল্প বলে শুনাতেন। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।

বয়সের ভাড়ে শেষ বয়সে প্রায়ই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তার পরিবর্তে তার ছেলেকে পাঠাতেন। ছেলেও মাওলানা ছিলেন। আধুনিক মাওলানা। তিনি বাবার মতো অত নরম ছিলেন না। রাজনৈতিক নেতাদের মতো আংগুল নেড়ে নেড়ে রাগান্বিত হয়ে বয়ান করতেন। পর পর কয়েক বার প্রক্সি দিতে দিতে তিনিই বাবার পরিবর্তে স্থায়ী ইমাম হয়ে যান। আমরাও ধীরে ধীরে বড় চওনা যাবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।

একবার আমাদের বড়বাইদ পাড়ার কাফেলা বড় চওনা ঈদের নামাজ ধরতে পারি না। আমাদের রেখেই নামাজ পড়ে ফেলাতে আমাদের মুরুব্বিরা মনখুন্ন হয়। বড় চওনার ইদ্রিস মামারা দু:খ প্রকাশ করেন। আমরা ফিরে এসে আমাদের বাড়ির দক্ষিণে চালা, যেখানে জিন্নাহ ভাই বাড়ি করেছেন, সেই বাছ্রা ক্ষেতে ঈদের নামাজ পড়ি। পরের বছর ঘটে আরেক ঘটনা। যেদিন চাঁদ উঠার কথা, তার আগের দিনই রেডিওতে ঘোষণা দেয় যে পবিত্র শাওয়াল মাসের ঈদের চাঁদ দেখা গিয়েছে। গ্রামের আমরা কেউ চাঁদ খুজে পেলাম না। ছোট কাক্কু মরহুম আব্দুস সালাম তালুকদার বললেন, “আমরা রেডিওর কথা বিশ্বাস করি না। আমরা কেউ চাঁদ দেখি নাই। আমরা আজ ঈদ করবো না।” এদিকে বড় চওনারা রেডিওর কথায়ই ঈদের নামাজ পড়ে ফেললো। আমরা পড়লাম পরের দিন। এভাবে প্রতিছর আমরা আমাদের গ্রামেই ঈদের নামাজ পড়তে থাকলাম। বড়বাইদপাড়ায় হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হবার পর থেকে মাদ্রাসা সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠেই আমরা নিয়মিত ঈদের নামাজ পড়ি।

আহারে, আগের সেই দিন নেই। নেই আমাদের মুরুব্বিরা। নেই সেই মাওলানা হাতেম আলী। যার কাছ থেকে শিখেছি কিভাবে সবাইকে ভালোবেসে নরম আচরণ করে সবার ভালো বাসা পাওয়া যায়। আমার জীবনে মাওলানা হাতেম আলী প্রভাব প্রবাহিত হোক বাকী জীবন।

৮ মার্চ ২০২৬

ময়মনসিংহ

#স্মৃতি#স্মৃতিকথা#গল্প#বাংলাগল্প#সাদেকুল

ছবিটি কাল্পনিক।

এ আই দিয়ে তৈরি করেছি।

computer die rogidekha

কম্পিউটারে রোগী দেখা


(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডাঃ আবুল মনসুর ভাই কমিউটার দিয়ে রোগী দেখেন এটা আমি শুনেছি। ১৯৯০ দশকের কথা। তখন আমার জানামতে মনসুর ভাইর কাছেই কম্পিউটার ছিলো। তিনি এটা দিয়ে রোগী দেখেন। এবং বেশীভাগ রোগীই নাকি মানসিক রোগী। তাই মনসুর ভাইগে রোগীর লোকেরা পাগলের ডাক্তার বলেই জানতেন। আসলে তিনি হচ্ছেন ফরেনসিক মেডিসিনের ডাক্তার। যারা অসাভাবিক মৃত্যু হলে কাটাছিড়া ও কেমিক্যাল টেস্ট করে মৃত্যুর কারন নির্ধারণ করে দেন। এই বিভাগের ডাক্তারগণ সাধারণত প্রাইভেট প্রাক্টিশ করেন না। কিন্তু আমাদের মনসুর প্রচুর রোগী পান মানসিক রোগীর।

যাহোক, আমার খুব দেখতে ইচ্ছে হলো মনসুর ভাইর চেম্বার। আমি শুক্রবার ল্যাবরেটরি বন্ধ রাখি। এক শুক্রবার সকালে মনসুর ভাইর চেম্বারে গেলাম। বললাম, “ভাই, আমি কিছুক্ষণ আপনার চেম্বারে বসবো। আপনি কিভাবে রোগী দেখেন তার একটা অভিজ্ঞতা অর্জন করবো।” মনসুর ভাই মুসকি হেসে বললেন, “ও সিউর, বসুন, সাদেক ভাই।”

মনসুর ভাইর সামনের টেবিলটা বেশ বড়। টেবিলে হাতের বাম পাশে একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার রেখেছেন। উল্টো দিকে রোগী বসেছেন। আমি মনসুর ভাইর সামনাসামনি বসেছি। মহিলা রোগী। মনসুর ভাই জিজ্ঞেস করলেন, “মা, আপনার নাম কী?” রোগী নাম বললেন। মনসুর ভাই কি বোর্ড দিয়ে টাইপ করলেন রোগীর না। মনিটরে ডং করে শব্দ হলো, হাজির হলো ঝাকড়া চুলওয়ালা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মতো একটা কার্টুন। চোখ বড় বড় করে রোগীর দিকে তাকালেন, মাঝে মাঝে চোখ মিট মিট করলেন। মাউস নাড়ালে তিনিও নড়াচড়া করতে লাগলেন। রোগী দেখে অবাক হলেন। বয়স জিজ্ঞেস করলে রোগী বললেন ৪০ বছর। বাড়ি জামালপুর। গ্রামের মহিলা। রোগীর সব কম্পপ্লেইন শুনে শুনে শুনে কমিউটারে এন্ট্রি দিলেন। স্টেথোস্কোপ দিয়ে রোগী পরীক্ষা করলেন। শারীরিক পরীক্ষার ফাইন্ডিং তিনি কম্পিউটারে এন্ট্রি দিলেন। ডায়াগনোসিস টাইপ করলেন। প্রেস্ক্রিপশন টাইপ করলেন। তারপর কম্পিউটারে রিডিং কমান্ড দিলে লাউড স্পিকারে পড়ার সাউন্ড বের হতে থাকলো এভাবে, “ট্যাবলেট এভেলিন, ওয়ান ট্যাব থ্রি টাইমস ডেইলি………।” রোগী মনে করলেন, কম্পিউটারের সেই কার্টুন কথা বলছেন। জিজ্ঞেস করলেন, “ইডায়, কি কইলেন, বুঝলাম না।” মনসুর ভাই প্রেস্ক্রিপশন পড়ে পড়ে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শুনালেন। আরও বললেন, “মুরগির পাখনা খাবেন বেশী বেশী।”

রোগী বিদায় হবার পর আমি মনসুর ভাইকে বললাম, “আপনি আসলে কম্পিউটার দিয়ে কি করলেন?” ভাই বললেন, “আমি আসলে কম্পিউটার দিয়ে রোগীর ডাটা এন্ট্রি দিয়ে সংরক্ষণ করলাম খাতায় সংরক্ষণ করার পরিবর্তে। হাতে না লিখে প্রেস্ক্রিপশনটাও প্রিন্ট করে দিলাম। তাতে পরিস্কার হলো। আমার রোগী বেশী ভাগই মানসিক। তাই, ওরা মনে করে কম্পিউটারেই সব করে দিচ্ছে। মনোযোগ আকর্শন করার জন্য মনিটরে কার্টুন দিয়ে রাখি। মাউস ও কি বোর্ডে চাপ দিলে কার্টুনও নড়াচড়া করে। রোগীও মনে করে কম্পিউটারেরই কাজ।”
আমি বললাম
– ভাই, কম্পিউটারে আপনার প্রেস্ক্রিপশন পড়ে শুনালো, এটা কিভাবে হলো?”
– সাদেক ভাই, আপনার মাসে ইনকাম কত?
– কেন? বলবো না।
মনসুর ভাই কমিউটারে কিছু একটা টাইপ করলেন। বললেন
– আপনি আমাকে না বললে আমি কম্পিউটারকে জিজ্ঞেস করবো।
– করুন।
– এই, সাদেক ভাইর মাসে ইনকাম কতো?
কমপিউটার বললো
– ওয়ান মিলিয়ন ডলার অনলি।
আমি চমকে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম,
– কি করে বলে?
– আসলে, এটা হচ্ছে রিডিং সফটওয়্যার। আপনি কিছু লিখে সিলেক্ট করে রিডিং কমান্ড দিলে কম্পিউটার পড়ে শুনাবে। আপনাকে চমকে দেয়ার জন্য আগেই টাইপ করে রেখেছিলাম “ওয়ান মিলিয়ন ডলার”। আমি জাস্ট সময়মত এন্টার কমান্ড দিয়ে শুনিয়ে দিয়েছি।
– আচ্ছা ভাই, রোগীকে মুরগির পাখনা খেতে বললেন কেন? সবাই বলে গোস্ত খেতে, আপনি বললেন পাখনা খেতে, কারন কী?
– এটাই তো আমার কেরামতি। রোগীর সমস্যা বলেছে, ডেনায় বল পায় না। ডেনা মানে বাহু। বাহুতে শক্তি পায় না। মুরগির ডেনা বলে পাখনা। মুরগির পাখনায় শক্তি আছে বলেই শরীরের এত ওজন নিয়ে এক গাছ থেকে উড়ে গিয়ে আরেক গাছে গিয়ে বসে। কাজেই মুরগির পাখনা খেলে রোগীর ডেনায়ও বল আসবে। এগুলো তো মানসিক রোগী।
-মুরগির গোসত খেতে বললেই তো হতো।
-শুধু পাখনা খেয়ে মুরগির গোস্তো তো ফেলে দিবে না। পাখনা খেলে গোস্তোও খাবে।
আমি মুসকি হেসে বললাম, ” মনসুর ভাই, এই জন্যই আপনার কাছে এত মানসিক রোগী আসে।”
১০ মার্চ ২০২৬ খ্রি.
ময়মনসিংহ
#মনসুর #স্মৃতি #স্মৃতিকথা #গল্প
কাল্পনিক ছবি একেছি এ আই দিয়ে।

alapsinga-goenda

Alapsinga Goenda

আলাপসিংগা গোয়েন্দা

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বিরাট এক রহুস্যের স্মৃতিকথা আজ শেয়ার করবো। ১৯৭৬ সনের কথা। তখন আমি বাটাজোর বি বিম হাই স্কুলে ১০ম শ্রেনীতে পড়তাম। থাকতাম বাংলা ঘরে। ঐ ঘরে চারটি চৌকি ছিলো। পশ্চিম পাশে পাশাপাশি দুইটি চৌকি ছিলো। একটিতে শুইতেন হাফিজ ভাই, আরেকটিতে শুইতাম আমি। আমারটার পাশে ছিলো আমার পড়ার টেবিল। হাফিজ ভাই ইন্টেরমেডিয়েট পাশ করে পড়ালেখা ক্ষান্ত দেন। সংসার দেখাশোনা করতেন আর শুয়ে শুয়ে গোয়েন্দার বই পড়তেন। মাঝে মাঝে সেই ঘটনা আমাকে শুনাতেন। ঘরের অন্য দিকের চৌকিতে আরফান ভাই থাকতেন। তিনি খুব একটা পড়াশুনা করেননি। কিন্তু খুব মার্জিত ছিলেন। সংসারের কাজকর্ম করতেন। তার পাশের চৌকিতে থাকতেন কামলারা। কৃষি শ্রমিকদেরকে গ্রামে কামলা বলা হতো। ময়মনসিংহের আলাপসিং পরগণা থেকে একজন কৃষি শ্রমিক এলেন এই বাড়ির কৃষি কাজ করতে। তিনি দুই সপ্তাহ ছিলেন এই কাছারি ঘরে।

আমি আলাপসিংগা ঐ কামলার চেহারা এবং আচার-আচরণে ভিন্নতা লক্ষ করি। তার থলেতে ছোট আয়না ও চিরুনি থাকতো। শরীরে মাখার তেল থাকতো। কাপড় চোপড় থাকতো পরিস্কার। আমার টেবিল থেকে বই নিয়ে নিরবে পড়তেন। আমি মাঝে মাঝে গুনগুনিয়ে গান গাইলে তিনি সেই গান নিয়ে মন্তব্য করতেন। এভাবে গল্প করতে করতে আমি তাকে একজন রুচিশীল মানুষ হিসাবে পছন্দ করতে থাকি।

এক রাতে তাকে বললাম, “আমাদের সখিপুর এলাকার একজন গানের শিল্পী আছেন খুব ভালো গান গায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। তাঁর নাম আবুল হোসেন তালুকদার। বাটাজোর সোনার বাংলা কলেজে শিক্ষক হয়ে এসেছেন। শুনলাম আজ প্রিন্সিপাল বানিজুর রহমান স্যারের বাসায় রাত ৯ টায় তিনি জলসায় গান গাবেন। তার গান আমার ভালো লাগে।” তিনি বললেন, “চলো যাই।” আমরা দুজনে চলে গেলাম গান শুনতে। গিয়ে দেখি গান শুরু হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা গান শুনলাম মুগ্ধ হয়ে। আবুল স্যার প্রিন্সিপাল স্যারকে বললেন, “স্যার, এতক্ষণ তো কঠিন কঠিন গান গাইলাম। এখন একটু পপ গান গাই।” প্রিন্সিপাল অনুমতি দিলেন। আবুল হোসেন স্যার পপ গুরু আজম খানের গান “ওরে মালেকা, ওরে সালেকা, ওরে ফুলবানু, পারলিনা পারলিনা বাচাতে…..। ” বানিজ স্যার বললেন, “আবুল, ভুলে যেয়ো না যে তুমি এখন কলেজের টিচার!” গানের সময় আবুল স্যারের ঠোটে হাসির ঢেউ খেলে গেলো।

আলাপসিংগা ভাইর একটা আন কমন নাম শুনেছিলাম। সেই নামটা এখন ভুলে গেছি। তিনি আমাকে ফিরে যাওয়ার সংকেত দিলেন। বিশাল পুকুর পাড়েই ছিল বানিজ স্যারের বাড়ি। পুকুর পাড় দিয়ে হেটে হেটে ফিরছিলাম। আকাশে ছিলো পুর্ণিমার চাঁদ। কি যে মিষ্টি ছিলো সেই জ্যোস্না! পানিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব পড়ে অপরুপ লাগছিলো। পুকুর পাড়ে বসতে ইচ্ছে হলো। তিনি বললেন, আসো কিছুক্ষণ এখানে বসি। বসে পড়লাম চাঁদ আর পুকুরের পানির দিকে মুখ করে। আলাপসিংগা বললেন, “নজরুল গীতি গাও, আমি বাঁশের বাঁশি বাজাই।” আমি পর পর অনেক গুলো নজরুল গীতি গাইলাম। প্রতিটিতেই তিনি বাঁশী বাজালেন মধুর সুরে।

আলাপসিংগা ভাইর প্রতিভা ও রুচি দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। এরপর তার সাথে উচ্চাংগ সুংগীত বাংলা গানের বিভিন্ন ধরণ নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। তিনি এখানে প্রায় দুই সপ্তাহ কৃষি শ্রমিকের কাজ করেছেন। একদিন সকালে দেখি তিনি শার্টের সাথে ফুল প্যান্ট পরেছেন। বললেন, “তোমার সাথে কয়েকদিন কাটিয়ে ভালো লাগলো। তোমার মধ্যে অনেক প্রতিভা আছে। ছাত্র হিসাবে তুমি খুব মেধাবী। তুমি লেখাপড়া চালিয়ে যাবে। অনেক বড় হতে পারবে, দোয়া করি। আমার যাবার সময় হয়ে গেছে। কাজ মোটামুটি শেষ হয়েছে। আসলে আমি কামলা না। আমি গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করি। আমার এখানে কিছুদিনের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। দায়িত্ব পালন করা হয়ে গেছে। আসি তাহলে, ভালো থেকো। গোয়েন্দা চলে গেলেন। আমি অবাক হয়ে ফেল ফেল করে তাকিয়ে দেখলাম। চোখের কোনায় পানি এসেছিলো কিনা মনে নেই। প্রায় ৫০ বছর আগের কথা তো।

তার আগে এই এলাকায় বড় বড় কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটে। কুতুবউদ্দিন মাস্টারের খুনের জের ধরে আবদুল হাকিম মন্ডল খুন হন। এর পর আরও খুনের আশংকা থাকে। তাই, এই এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা চলতে থাকে। তারই অংশ হিসাবে হয়তো আলাপসিংগা গোয়েন্দা এসেছিলেন এখানে।

আমার আজও তাকে মাঝে মাঝে মনে পড়ে। বিশেষ করে যখন পুর্ণিমার চাঁদ চোখে পড়ে। কত মার্জিত ছিলো সেই আলাপসিংগা গোয়েন্দা। সরকারি কাজের অংশ হিসাবে ডিউটি করতে এসে কৃষি শ্রমিক হতে হয়েছে।

২৮/২/২০২৬ খ্রি.

ময়মনসিংহ

#স্মৃতি #স্মৃতিকথা #গল্প #সাদেকুল