Category Archives: Writings

Biggan Melay Amar Krititto

বিজ্ঞান মেলায় আমার কৃতিত্ব

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৭৮ সন। প্রিন্সিপাল এ এফ এম গোলাম কিবরিয়া স্যার কেমিস্ট্রির স্যার আনন্দ মোহন, অংকের স্যার আবুল হোসেন স্যার এবং শরীর চর্চার স্যার অখিল চন্দ্রকে দায়িত্ব দিলেন আমাদের আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে কিছু সংখ্যক বিজ্ঞান বিভাগে পড়ুয়া ছাত্র নিয়ে টাঙ্গাইলে বিন্দু বাসিনী বয়েস স্কুলে অনুষ্ঠিত ৭ দিন ব্যাপী বিজ্ঞান মেলায় অংশ গ্রহন করতে। স্যারগণ এই টীমে আমাকে, কাজী সাফিউল্লাহ বুলবুল, নজরুল, বেলায়েত, ও কাদেরকে নিয়ে টীম গঠন করলেন মেলায় অংশ গ্রহন করতে। আমরা স্যারদের কাছ থেকে ৭ দিন ৭ রাত্রি হোটেলে থাকা ও খাওয়া এবং আনুসংগিক খরচের টাকা নিয়ে নিলাম। ভিক্টোরিয়া রোডের একটা হোটেলে থাকা ও খাওয়া হতো।মেলায় আমরা একেক জনে একেক প্রদর্শন করতাম।

টাঙ্গাইল জেলার সব স্কুল ও কলেজের যৌথ উদ্যোগে এই মেলার আয়োজন করা হয়েছিল।প্রতিটি স্কুল থেকে দল বেধে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রবেশ করতেন।বিজ্ঞানের নানান খুটিনাটি নিয়ে তারা প্রশ্ন করতেন। আমি দেখাতাম হাতে বানানো পেরিস্কোপ। পেরিস্কোপ সম্পর্কে পড়েছিলাম ক্লাস এলেভেনেই পদার্থ বিজ্ঞান বইয়ে। আয়নার মাধ্যমে আলোর প্রতিফলন এর তত্বকে কাজে লাগিয়ে পেরিস্কোপ বানানোর আইডিয়া আসে বিজ্ঞানীদের। পেরিস্কোপ মুলত: যুদ্ধের সময় ডুবু জাহাজে ব্যবহার করা হয়। ডুবু জাহাজ পানির নিচে ডুব দিয়ে থাকে। সমুদ্রের সারফেসে চলমান জাহাজ দেখার জন্য ব্যবহার করা হয় পেরিস্কোপ দিয়ে।

দর্শনার্থীরা আমার কক্ষে এলে প্রথমে তাদেরকে আমার বানানো পেরিস্কোপ দেখতে দিতাম। তারা দেয়ালের ছিদ্রে বসানো আয়নায় চোখ রাখলে শহরের নিরালার মোরে চলাচল রত পথচারী ও রিক্সা দেখতে পেতো। তার পর আমাকে জিজ্ঞেস করতো এটা কিভাবে সম্ভব হলো।

আমি পেরিস্কোপ সম্পর্কে বিস্তারিত বলতাম।

পেরিস্কোপ হলো একটি অপটিক্যাল যন্ত্র, যার সাহায্যে বাধার আড়াল থেকে কোনো বস্তু দেখা যায়। এটি আলোর প্রতিফলনের নীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। পেরিস্কোপে সাধারণত দুটি আয়না ৪৫ ডিগ্রি কোণে বসানো থাকে, যার মাধ্যমে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছায়।

পেরিস্কোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো সাবমেরিনে। সমুদ্রের নিচে অবস্থান করেও এর মাধ্যমে ওপরে থাকা জাহাজ বা বস্তু দেখা যায়। এছাড়া সামরিক ক্ষেত্রে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে এটি ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞান গবেষণা, শিক্ষা কার্যক্রম এবং পরীক্ষাগারেও পেরিস্কোপ ব্যবহৃত হয়। সবশেষে বলা যায়, পেরিস্কোপ বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার যা আমাদের নিরাপদভাবে দূরের বা আড়ালে থাকা বস্তু দেখতে সাহায্য করে।

– কিন্তু, সেটা তো সমুদ্রের প্যাপার। এখান থেকে নিরালা মোর কিভাবে দেখা যাচ্ছে?

-আমি দুইটা আয়না কিনে এনে এখানে ব্যবহার করেছি। একটা আয়না ৪৫ ডিগ্রি কোণাকুণি করে বসিয়েছি এই বিল্ডিংয়ের ছাদের কিনারে। আরেকটা আয়না বসিয়েছি নিচের বাগানে ৪৫ ডিগ্রি কোনাকোনি করে যাতে উপরেরটার প্রতিবিম্ব নিচের আয়নার উপর এসে পরে। আয়নায় পড়া সেই দৃশ্যই ঘরের ভিতর থেকে ওয়ালের ছিদ্র দিয়ে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন।

– তাজ্জব!

পেরিস্কোপ দেখিয়ে ছাত্র ও শিক্ষকদের আমি বেশ ইম্প্রেসড করেছিলাম। বিচারকরা আমার পারফরম্যান্স দেখে খুবই প্রসংশা করে। আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ পুরস্কার পায়।

আমি যেন এখনো দেখতে পাই পেরিস্কোপ দিয়ে দেখা টাঙ্গাইলের সেই নিরালার মোর। ঐতিহ্য বাহী ঘ্যাগের দালান।

অপ্রয়োজনীয় সার্টিফিকেটের ফাইলে আমার সেই কৃতিত্বের সার্টিফিকেটটি খুজে পেলাম। তাতে লেখা আছে

দ্বিতীয় জাতীয় বিজ্ঞান সপ্তাহ

বিজ্ঞান মেলা ‘৭৮

টাঙ্গাইল

কৃতিত্ব পত্র

টাঙ্গাইলে ২৯ শে সেপ্টেম্বর থেকে ৫ই অক্টোবর ‘৭৮ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিজ্ঞান সপ্তাহ ও বিজ্ঞান মেলায় আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের ছাত্র সাদেকুল ইসলাম বিজ্ঞান মেলায় অংশ গ্রহণ করে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছে।

আশা করবো তার সৃজনশীল প্রতিভা উত্তরোত্তর বিকাশ লাভ করে জাতীয় জীবনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

চেয়ারম্যান ————– সেক্রেটারি

তারিখ ৫ ই অক্টোবর

১৯৭৮

স্মৃতি কথা লিখার তারিখ ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

সার্টিফিকেটের ছবি সংযুক্ত করলাম।

মেলার কাল্পনিক ছবি একেছি ChatGPT AI Tool দিয়ে।

#sadequel #science_exhibition #nirala-mor

smritir-poter-mullo

স্মৃতির পটের মূল্য

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৭৩ সন। তখন আমি কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে ৭ম শ্রেণীতে পড়তাম। শীত কাল ছিলো। ইনসান স্যার স্কুল মাঠে চেয়ারে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে বই পড়ছিলেন। আমি টিপ মেড়ে পেছনে দাড়িয়ে দেখছিলাম কি বই পড়েন। দেখি তিনি শরতচন্দ্র চট্রপাধ্যায় রচিত বই পড়ছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম

– স্যার, আপনি এটা কোন ক্লাসের বই পড়ছেন?

– এটা কোন ক্লাসের বই না। এটা উপন্যাস।

উপন্যাস কী স্যার?

স্যার আমাকে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য বুঝাতে চেষ্টা করলেন। আমি কিছু কিছু বুঝলাম। আমাদের পাঠ্য বই পুস্তকে বিভিন্ন লেখকের লেখা আমাদের পড়তে হতো। লক্ষ্য করলাম শুধু ইনসান স্যার না, মাওলানা সালাউদ্দিন স্যার, হাতেম আলী স্যার, মান্নান স্যার, মোহসীন স্যার, ওনারা সবাই এই সব লেখক, যেমন, পল্লী কবি জসীম উদ্দিন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কথা সাহিত্যিক শরত চন্দ্র চট্টপাধ্যায় ইত্যাদি বড় বড় লেখকের রচনা সমগ্র পড়তেন। ইনসান স্যারের পেছনে দাড়িয়ে কিছু কিছু অংশ পড়ে আমারও পুর্ণ বই পড়তে ইচ্ছে করলো। স্যারকে বললাম

– স্যার, আমি এই বই নিতে পারবো না?

– এই বইগুলো আমাদের অফিসের লাইব্রেরিতে আছে। তোমরা সবাই পড়তে পারো। এজন্য তোমাকে ৪ টাকা দিয়ে লাইব্রেরি কার্ড করতে হবে। এক সাথে দুইটির বই দিবে না। বই পড়ে ফেরত দিলে অন্য বই নিতে পারবে। তোমাদের আব্দুল্লাহ স্যার লাইব্রেরীর দায়িত্বে আছেন। তার কাছে বললেই ব্যাবস্থা হবে।

আমি আমার জমানো টাকা থেকে ৪ টাকা দিয়ে লাইব্রেরি কার্ড করলাম। বই নেয়া শুরু হলো। আমি ছোট বেলা থেকেই প্রকৃতির স্বান্যিদ্ধে থাকতে পছন্দ করতাম। গাছের ডালে, পাহাড়ের ঢালুতে ঘাসের উপর অথবা খরের পালার উপর শুয়ে শুয়ে এসব বই পড়তাম। বড় বড় লেখকদের রচনা সমগ্র পড়ে ফেললাম। কবি জসীম উদ্দিনের স্মৃতির পট বইটি পড়ে আটকে গেলাম।

কবি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থান করে আঞ্চলিক সাহিত্য ও লোকগীতি সংগ্রহ করতেন এবং তা নিয়ে গবেষণা করতেন। গ্রামের কবি, গীতিকার ও গায়কদের বাড়িতে থেকেছেন, খেয়েছেন, সালিশ করেছেন। এসব স্মৃতি কথা তিনি তার স্মৃতির পট হইয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন। এই বইটা আমার খুব বেশী ভালো লাগে। এটা ফেরত দেই না।

আমি ইনসান স্যারকে জিজ্ঞেস করি

– স্যার, কেউ যদি কোন একটা বই হারিয়ে ফেলে, তখন কি হবে?

– অসুবিধা নাই। কার্ড করার সময় যে ৪ টাকা জমা রাখা হয়, সেখান থেকে কেটে নিবে।

বাস, আমি আর বইটি ফেরত দিলাম না কোন দিন। ১৯৭৫ সনে চলে গেলাম বাটাজোর বি এম হাই স্কুলে। সেখানে নিয়ে গেলাম বইটি। মাঝে মাঝে শুয়ে শুয়ে পড়তাম। এস এস সি পাস করে চলে গেলাম আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে। ওখানেও নিয়ে গেলাম স্মৃতির পট বইটি। ১৯৭৯ সনে এইচ এস সি পাস করে চলে গেলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়তে। ওখানেও নিয়ে গেলাম স্মৃতির পট। এর পর চাকরি জীবনে টাঙ্গাইল, বরিশাল, শেরপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, দিনাজপুর, কিশোরগঞ্জ, যেখাই গিয়েছি স্মৃতির পট সাথে রেখেছি।

২০২০ সনে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেলাম। ২০২১ সনে আবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকরিতে যোগ দিলাম। এখনো আছি।

যেখানেই থাকি স্মৃতির পট আমার সাথেই থাকে। মলাট ছিড়ে গিয়েছিল। গাংগীনার পাড় প্রেসক্লাব মোর থেকে বাধাই করে নিয়েছি।

বয়স হয়েছে। ইচ্ছে হতো প্রধান অতিথি হিসাবে যদি কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে কোন বড় অনুষ্ঠানে আমার আমন্ত্রণ আসতো, আমি সহজেই রাজি হয়ে যেতাম। তখন এই বইয়ের কাহিনিটা সবার সামনে খুলে বলে বইটা লাইব্রেরিতে ফেরত দিতাম। কিন্তু তারা আমাকে আমন্ত্রণ জানায় না। তারা আমন্ত্রণ করে প্রভাবশালী নেতাদেরকে।

২০২৪ সনের ৫ আগষ্টের পর সেই সুযোগ আসে। ২০২৫ সনের বার্ষিক পুরুস্কার বিতরনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমাকে প্রধান অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ জানায়। আমার স্ত্রী ফিরোজা আক্তার স্বপ্না আমাকে মনে করিয়ে দেয়, “প্রধান অতিথি হিসাবে যাচ্ছ, ছাত্রদের জন্য উপদেশমূলক বক্তৃতা দিও এবং স্কুলের জন্য কিছু টাকা ডোনেশন হিসাবে দিয়ে এসো।”

আমি খামে ভরে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যাই। সকালে ময়মনসিংহ থেকে প্রাইভেট কার নিয়ে রওনা দেই। রেজাউল মাস্টার কিছুক্ষণ পর পর মোবাইল করে আমার অবস্থান জেনে নেয়। মানে বুঝতে পারলাম পরে। আমাকে বরন করার জন্য ফুলের পাপড়ি নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত রাখতে হবে, তাই।

ঠিকই সড়ক পথ থেকে অফিস কক্ষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে প্রধান অতিথির আগমন শুভেচ্ছা সমাগতম শ্লোগান দিতে দিতে আমার গায়ে গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে দিচ্ছিল। আমার ভালোই লাগলো।

যাহোক মাঝখানে অনেক ঘটনাই ছিলো। আসল কথায় আসি। সভাপতির বক্তব্যের আগে আমার বক্তব্য শুরু করলাম। মোট এক ঘন্টা বিশ মিনিটের মতো সময় বক্তব্য রাখলাম। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে উপদেশ মূলক কথা বলে কিছু স্মৃতি চারণ করলাম। শেষে লাইব্রেরী থেকে বই নেয়ার স্মৃতি কথাগুলো বললাম। শেষ করার আগে বললাম, “আমি এই বই পড়ে প্রভাবিত হয়ে এটার আদলে মোবাইলে টাইপ করে বই লিখি। প্রথম প্রকাশিত বইয়ের নাম দেই স্মৃতির পাতা থেকে। এভাবে প্রায় ১৪ টা বইয়ের কন্টেন্ট লিখে ফেলেছি। মোট ৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এখনো লিখছি। আমার নিজের লেখা বইগুলো গিফট হিসাবে দিয়ে যাচ্ছি। আমার কাছে রাখা স্মৃতির পট বইখানা হেড স্যারের হাতে ফেরত দিতে চাচ্ছি। এতে তোমাদের কোন কিছু বলার আছে?”

এক ছাত্র দাঁড়িয়ে বললো, “স্যার, এই বই আপনাকে লেখক হতে প্রভাবিত করেছে। আপনার জন্য বইটি যেমন দামী, তেমনি আমাদের কাছেও দামী। এই বইটি আপনি ১৯৭৪ সন থেকে এই ২০২৫ সন পর্যন্ত প্রায় ৫০ বছর আটকে রেখেছেন। তখন এই বইটির মূল্য দেড় টাকা হলেও এখন সেই টাকা বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। আজ আমাদেরকে ২০ হাজার টাকা দেবেন।” উপস্তিত সবাই হেসে দিলেন। আমি বললাম,” ঠিকই বলছো, আমি জমা রেখেছি এই লাইব্রেরিতে ৪ টাকা সেটা বেড়ে কত টাকা হয়েছে? যাহোক, তুমি আমার কাছে খুবই টেলেন্ট ছেলে মনে হচ্ছে। এমন একটা দাবীই আশা করছিলাম।” হেড মাস্টার তুলা মিয়া আমার কানের কাছে বললেন, “আসলেই সে মেধাবী, ক্লাসে প্রথম হয়েছে।” বললাম, “তুমি ঠিকই চেয়েছ। কিন্তু আমি যে মাত্র ১৫ হাজার টাকা নিয়ে এসেছি এটার জন্য!” মঞ্চে বসা একজজন স্থানীয় বিশেষ অতিথি বললেন, “ঠিক আছে, ২০ হাজারই দেয়া হবে। ৫ হাজার টাকা আমি দিবো।” সবাই খুশী হলেন। আমি আমার লেখা বই স্মৃতির পাতা থেকে, বর্নিল অতীত, সোনালী শৈশব, শৈশবের একাত্তর এবং জসীম উদ্দিনের সেই স্মৃতির পট বই প্রধান শিক্ষক তুলা মিয়ার হাতে তুলে দিলাম।

সভাপতির সমাপনী ভাসনে প্রধান শিক্ষক তুলা মিয়া বললেন, “৫০ বছর আগের কোন বই আমাদের লাইব্রেরিতে নেই। স্যারে যত্ন করে স্মৃতির পট বইটি রেখেছেন দেখেই ওটা এখনো আছে। এটার মর্যাদা স্যারেই দিতে পারবেন। কাজেই এই বইটা স্কুলের পক্ষ থেকে স্যারকে উপহার দিলাম।” এই বলে আমার হাতে বইটা তুলে দিলেন। সবার হাততালি পড়লো।

২৭ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

#স্মৃতি #গল্প #সাদেকুল #কচুয়া

কাল্পনিক ছবি একেছি chatGPT এ আই টুল দিয়ে।

garu-khoja

গরু খোজা

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি তখন অনেক ছোট ছিলাম। ধরুন, ৬-৭ বছর বয়সের। আমাদের এলাকায় পানির খুব অভাব হতো, বিশেষ করে চৈত্র -বৈশাখ মাসে। প্রতি গ্রামে একটা কি দুইটা নলকূপ ছিলো। তাও অগভীর। এই সময় পানির স্তর অনেক নিচে চলে গিয়ে নলকুপে পানি উঠতো না। বড়বাইদপাড়ার তালুকদার বাড়িতে একটা নলকূপ এবং একটা ইদারা কুয়া ছিল। প্রায় ত্রিশ হাত গভীর ইদারা কুয়া ছিলো। তাও শুকিয়ে যেতো। একমাত্র পানির সোর্স ছিলো মাটির কুয়া বা মাইটা কুয়া। মাইটা কুয়া কাটা হতো চালা ও বাইদের সংযোগস্থলে। খরায় মাঠ ঘাট শুকিয়া চৌচির হয়ে যেতো। গরুর ঘাসের খুব অভাব হতো। তখন চাষের জন্য এক মাত্র লাংগল ছিলো গরুর লাংগল। তাই তখন অনেক গরু পালতো আমাদের এলাকার মানুষ। বলতে পারেন এমন যায়গাটা কোথায়। এটা হচ্ছে টাঙ্গাইল জেলার সখিপুরের বড়বাইদপাড়ায়। খরার সময় গরুগুলো না খেয়ে শুকিয়ে পড়তো। তাই এদেরকে মুক্ত ভাবে ঘুরে ঘুরে খাওয়ার জন্য ছেড়ে দেয়া হতো। মাঠে ঘাস না পেয়ে গরু জংগলে প্রবেশ করে লতা পাতা খেয়ে জীবন বাচাত। তাও আবার পেট পুড়ে খেতে পারতো না সারাদিন ঘুরেও। এমন মুক্ত গরুগুলোকে হলা হতো অরণ্যা গরু। সারাদিন অরণ্যা গরু বনে বনে ঘুরে ঘুরে খেয়ে সন্ধার সময় গোয়াল ঘরে ফিরে আসতো। মাঝে মাঝে দু একটা গরু হারিয়ে যেতো। হারিয়ে যাবার কারণ ছিলো বিবিধ। কোন কোন গরু হাটতে হাটতে দিক ভুলে গিয়ে অন্য গ্রামে চলে যেতো। কোন কোন ষাড় গরু বকনা গরুর সাথে চলে যেতো অন্য গ্রামে। অথবা বকনা গরুই চলে যেতো ষাড় গরুর সাথে। অথবা চোরেরা চুরি করে বেচে দিতো দুরের হাটে। অথবা চুরি করে হাটে নিয়ে জবাই করে মাংস বেচে দিতো।

যেভাবেই হোক, গরু হারিয়ে গেলে গরুর মালিক গরু খোজাখুজি করতো। রাখালরা পরিকল্পনা করে বিভিন্ন দিকে গরু খোজতে বেড়িয়ে পড়তো। যারা গরু পেতো তারা গরুকে প্রকাশ্য স্থানে বেধে রাখতো। যারা খোজতে বের হতো তারা সাথে নিতো শুকনা খাবার, যেমন চিড়া বা মুড়ি। একটা গামছার মাঝখানে চিড়ামুড়ি কোমড়ে বেধে নিতো। সাথে পানি নিতো না। তখন এখনকার মতো প্লাস্টিকের বোতল ছিলো না। গরু খোজতে খোজতে খুধা লাগলে পড়ে গ্রামের বাচ্চাদের কাছে পানি চাইতো। চিড়ামুড়ি খেয়ে রাখাল পানি খেতো। হাতে গরু পিটানোর পাজুন (লাঠি) এবং কোমড়ে চিড়ামুড়ির পোটলা দেখলে আমরা বুঝে নিতাম যে লোকটা গরু খুজতে বেরিয়েছে। গরু খোজা একটা কষ্টকর কাজ। এইজন্য কেউ কাউকে খুজে পেতে দেড়ি হলে বলে, “আরে, আমি তোমাকে কয়দিন ধরে গরু খোজা খুজতেছি। তুমি কোথায়?

২৬ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

#memory #cow #গল্প #স্মৃতি

ar-chhole

আর ছোলে

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমাদের চাচাদের মধ্যে হাছেন কাক্কু আমার কাছে বেশী বেশী স্মৃতি কথা শোনাতেন, কারণ, আমি স্মৃতি কথা শুনতে চাইতাম। তিনি ছোট দাদাকে নিয়ে একটা স্মৃতি কথা বলেছিলেন। সেইটা আপনাদেরকে শেয়ার করবো। মজাও আছে, শিখারও আছে। ছোট দাদা ছোট দাদীকে বিয়ে করার পর কাজ কাম বাদ দিয়ে চেয়ারে বসে বসে সারাক্ষণ গল্প করে কাটাতেন। দাদা ও দাদী দুই জনই চেহারাবান ছিলেন।

একদিন দক্ষিন দরজা ঘরের বারান্দায় পাশাপাশি দুইটি গর্জিয়াস কাঠের চেয়ারে বসে দাদা-দাদি গল্প করছিলেন। এমন সময় দাদার সমবয়সী দাদার ভাতিজা সোলাইমান তালুকদার, আমাদের বড় কাক্কু কোন সময় যে উঠানে এসে দাড়িয়ে আছেন সেটা টের পাননি। দাদা-দাদি দুজনই ধার্মিক ছিলেন। কাক্কুর ডাক নাম ছিলো ছোলে। ছোলে কাক্কু এসে শোনলেন দাদা দাদীকে বলছেন,”গ্রামের মানুষ যেভাবে চলাফেরা করে, তাতে এরা কেউ বেহেস্তে যেতে পাররে না। গ্রামের আমি আর তুমি ছাড়া কেউ বেহেশতে যেতে পারবে না।” এইটুকু বলে মাথা সোজা করে দেখেন সামনে দাড়ানো ছোলে তালুকদার। দাদা দেরি না করে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, “আর ছোলে।”

হাছেন কাক্কুর কাছে শোনা এই গল্পটা আমার খুব পছন্দ হয়। এই গল্পটা আমি অনেকের কাছেই বলেছি।একদিন আমি ডা: মইনুল ভাইর কাছেও বলেছিলাম। তিনি আমাকে একদিন জানালেন আপনার “আর ছোলে” গল্পটা আমি আমাদের সোসাইটির বার্ষিক ন্যাশনাল কনফারেন্স এ বক্তৃতা দিয়ে গিয়ে বলেছি। সবাই খুব মজা পেয়েছে। বলেছি, আমরা মঞ্চে বসা নেতাদেরকে সামনাসামনি কত প্রসংশা করি। আড়ালে গিয়ে বলি কত খারাপ। শোনে ফেললে আপনারাও বলুন, আর ছোলে।

২৫ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

#গল্প #স্মৃতিকথা #সাদেকুল

ছবি জেমিনি এ আই টুল দিয়ে তৈরি

ulu-khamu

উলু খামু না, কী খামু?

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আগের দিনে আমাদের বড়বাইদপাড়া গ্রামের ঝোপ ঝারে খেক শিয়াল দেখা যেতো। এগোলো শিয়ালের মতই, কিন্তু সাইজে ছোট। আমাদের গ্রামটা সখিপুরের গড় অঞ্চলে। এখানে দুই রকম জমি আছে। নিচু জমিকে বলা হয় বাইদ। বাইদের দুপাশ দিয়ে টিলাযুক্ত উচু ভুমিকে বলা হয় চালা। এই চালা জমির ডিবির ভিতর উই পোকা বাসা করত। উই পোকার পাখা গজালে সন্ধার সময় ঝাকে ঝাকে আকাশে উড়ে যেতো। বিভিন্ন রকম পাখি এসে উড়ন্ত উই পোকাকে খেয়ে ফেলতো। আমরা উই পোকাকে বলতাম উলু পোকা। উলু পোকায় ঘরেও বাসা করতো। বই খ্যেয়ে ফেলতো। কাঠের ফার্নিচার খেয়ে ফেলতো। আমরা বলতাম উলুয়ে ধরছে। ঝাকে ঝাকে পাখি যখন উরন্ত উলু পোকা খেতো তখন আমরা পোলাপানরা মজা করেদেখতাম। অনেক সময় কৃষকরা খেতের আবর্জনায় আগুন দিলে সন্ধার সময় সেই আগুনে পড়ে উলু পুড়ে যেতো। এই জন্য বলে পিপিলিকার পাথা গজায় মরিবার তরে। উই পোকা পিপড়া জাতীয় পোকা। তাই পীপিলিকা গ্রুপে পড়ে।

সন্ধার সময় উই পোকা বাসা থেকে বের হলেই ঝোপ ঝার থেকে খেক শিয়াল এসে উই পোকা খেতো মজা করে। উই পোকা খেলে খেক শিয়ালের পায়খানা শক্ত হতো, মানে কোস্ট কাঠিন্য হতো। আমরা বলতাম কষা হতো। এই জন্য দেখা যেতো সকাল বেলা ঝোপের ধারে বসে পায়খানা করার জন্য খেক শিয়াল অনেক্ক্ষণ বসে থাকতো। আমার তিন বছরের বড় চাচাতো ভাই সিদ্দিক ভাই বলতেন, “খেক শিয়াল যখন উলু খায় তখন মজা করে পেট ভইরা খায়। উলু খাওয়ার জন্য সকাল বেলায় পায়খানা খুব কষা হয়। কোত পারে আর বলে, ‘আর উলু খামু না। আর উলু খামু না। অনেক চেষ্টা করার পর যখন পায়খানা করে একটু খালাল হয় তখন বলে, ‘উলু খামু না, কী খামু?’

আবার সে উলু খায়, আবার তার পায়খানা কষা হয়।

২০২৯ সনে সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাস রোগ মহামারী আকারে দেখা দিলে সবাই গৃহে বন্দী জীবন জাপন করে এবং আল্লাহর নাম জপ করে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, আর ঘুষ খামু না। আর ঘুষ খামু না।” এর পর যখন করনার প্রকোপ শেষ হয়ে গেল তখন মানুষ বলতে লাগলো, ঘুষ খামু না। কী খামু?

২৪ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

#গল্প #স্মৃতিকথা #sadequel

mal-nai

মাল নাই

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আজকেরটাও আইপিজিএম আর-এ এম ফিল প্যাথলজি পড়াকালীন স্মৃতি কথা লিখলাম । ১৯৯৩-১৯৯৫ আমি ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত পোস্ট গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউট, বর্তমানে যেটা বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি -তে পড়েছি। আমরা হিস্টোপ্যাথলজি স্লাইড পরীক্ষা করা শিখতাম। আমাদের প্রফেসরগণ স্লাইড দেখার আগে আমরা শিক্ষার্থীর স্লাইড পরীক্ষা করে নিজেদের খাতায় ডায়াগনোসিস লিখে রাখতাম। স্যার যখন মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে স্লাইড দেখতেন আমরা তখন স্যারের পেছনে খাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কে কী ডায়াগনোসিস করেছেন স্যার জিজ্ঞেস করতেন। আমরা যার যার করা ডায়াগনোসিস বলতাম। ফাইনাল ডায়াগনোসিস স্যার বলে দিতেন।

যাহোক, একবার দেখা গেলো টেকনোলজিস্ট স্লাইড তৈরি করে দিচ্ছেন না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “স্লাইড দিচ্ছেন না কেন?”

– মাল নাই, তাই স্লাইড তৈরি করতে পারছি না।

– কবে দিবেন?

– মাল আসলেই দিব।

এভাবে পর পর তিন দিন বললেন যে মাল নেই তাই স্লাইড বানাতে পারছেন না।

আমি বললাম

– কী মাল নাই?

– মাল নাই তা আপনি বুঝতে পারছেন না?

– কী মাল নাই আমাকে বলুন আমি আনার ব্যবস্থা করি।

– মাল এনে দেন আমি কাজ করি।

– যে মাল নেই সেটা আমাকে দেখান।

তিনি এলকোহল লেভেল করা খালি বোতল দেখিয়ে বললেন

– এই যে দেখেন, মাল নাই।

– এটা তো এলকোহলের বোতল। এলকোহল নেই, তাই বলুন। বার বার জিজ্ঞেস করছি কী নাই, আপনি বলছেন, মাল নাই।

– এলকোহল মানেই তো মাল, আর মাল মানেই মদ। আপমাদের এলাকায় মদকে মাল বলে না?

– হ্যা, তাইতো। এলকোহলই হলো মদ। মদকে মালও বলে তিরস্কার করে। বলে, বেটায় মাল খায়।

২২ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

#alcohol#mal#mod#memory#sadequel

ছবি তৈরি করেছি জেমিনি এ আই টুল দিয়ে।

bus-nosto-hole

বাসের ইঞ্জিন নষ্ট হলে

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাসে উঠে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা যাচ্ছিলাম। সিট নিয়েছিলাম সি লাইনের বাম পাশে করিডোরে। অর্থাৎ সি-২। আমি সবসময় সম্ভব হলে এই সিটের টিকিট করি। না পেলে পরের লাইনে। বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে সাধারণত ড্রাইভারের সামনের অংশে লেগে দোতরিইয়ে ড্রাইভার সহ পেছনের দুই তিন সিটের যাত্রী মারা যায়। বাম দিক সাধরনত কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জানালার সাথের সিট নেই না দুই কারনে। একটি কারন হলো বাস ওভারটেক করার সময় লেগে গেলে জানালার সাথের যাত্রী আঘাত প্রাপ্ত হতে পারে। আরেকটি কারণ হলো সামনের যাত্রী বমি করা শুরু করলে জানালা দিয়ে ছিটা ছিটা আসে। তাই করি ডোরের সাথের সিটে বসি।

যে কাজে যাচ্ছিলাম সে কাজের জন্য দুপুর ১২টার আগে অফিসে উপস্থিত হতে হবে। বাস সাভাবিক গতিতেই চলছিলো । তখন বাসে সামনের দিকের টিভি মনিটরে মিউজিক ভিডিও চলতো। যাত্রিরা ভিডিও দেখতে দেখতে ঢাকায় চলে যেতো। ড্রাইভার কুরুচির চরিত্রের হলে কুরুচিপূর্ণ ভিডিও চালাতো। যেসব যাত্রী ধার্মিক ছিলো তারা মাথা নিচু করে তাজবি জপতে জপতে জার্নি করতো। উঠতি বয়সের পোলাপানরা বেশ মজা করে উপভোগ করতো সেই ভিডিও। বাচ্চা পোলাপানরা ভিডিওর সিনগুলোকে মজার খেলা মনে করে দেখতো। মহিলারা লজ্জা পেয়ে মাথা অবনত করে থাকতেন। এমন অস্বস্তিকর ছিল সেই সময়ের জার্নি। আমি মাঝে মাঝে চোখ উচু করে দেখছিলাম কী দেখাচ্ছে। এক মহিলা যাত্রীকে বলতে শুনেছিলাম “দূর, খাইচ্চুইরা ব্যাডায় কি দেহাইতাছে?” আমার কাছেও মনে হলো ড্রাইভার বেটা একটা খাচ্চর। কন্ট্রাক্টরকে হাত ইশারায় ডেকে কাছে এনে শান্ত গলায় বললাম “এই যে টেলিভিশন মনিটরের পর্দায় তোমার ড্রাইভার যে ভিডিওগুলো দেখাচ্ছেন এগুলো কোন সেন্সর করা সিনেমা নাটকের দৃশ্য না। ফাজিল লোকেরা এগুলো বানিয়েছে। এই ড্রাইভারের মতো কুরুচিপূর্ণ মানুষ এগুলো দেখে। এই বাসের ৯০% যাত্রী এগুলো পছন্দ করেন না। হুজুর ও মহিলারা মাথা নিচু করে বসে আসে। বাচ্চারা খেলা মনে করে দেখছে। তোমার ড্রাইভারকে বলো এগুলো পালটিয়ে ভালো কিছু দেখাতে।” হঠাৎ হার্ড ব্রেক করে বাস থেমে গিয়ে বাম দিকে কাত হলো। অল্পতের জন্য খাদের গিয়ে পড়লো না। পাশের যাত্রী বলে উঠলো “লায়লাহা, লায়লাহা।” আমি শুধরিয়ে দিলাম “লায়লাহা না, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” তিনি তখন বললেন “লা ইলাহা, লা ইলাহা।” আমি বললাম “আপনি শুধু লা ইলাহা বলছেন, যার অর্থ হচ্ছে ইলা (আল্লাহ) নাই। তার মানে, আপনি বলছেন আল্লাহ নাই। ইল্লাল্লাহ মানে আল্লাহ ছাড়া। আপনাকে পূর্ণ করে বলতে হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া ইলা (মাবুদ) নাই।” কন্ট্রাক্টর আমার কথাগুলো ড্রাইভারের কাছে গিয়ে বললেন। ড্রাইভার ভিডিও বন্ধ করে ক্যাসেট ট্যাপ বাজানো শুরু করলেন। ফকিরি গান বাজানো শুরু হলো। “এ দেহ পিঞ্জরে বসাইয়া খোদারে, তার তরে করো প্রার্থনা…..।” গানের অর্থ বোধগম্য না হলেও সুরটা আমার ভালো লাগছিলো। এক ইয়াং যাত্রী চিতকার দিয়ে বলে উঠলো “এই ব্যাটা ড্রাইভার, ইগুলা কি হুনাইতাছো? বন্ধ করো।” ড্রাইভার গানের ক্যাসেট বন্ধ করে দিলেন। কিছুক্ষণ পর আবার ছেড়ে দিলেন অন্ধ হুজুরের ওয়াজ। হুজুর কিছুক্ষণ পর পর বাম কান চেপে ধরে চিতকার করে বলে উঠেন “এ্যাই” সেই চিতকারে কোন কোন যাত্রীও কান চেপে ধরে। গাজীপুর গজারি বনে এসে গাড়িটা থেমে গেলো। যাত্রীরা সমস্বরে বলে উঠলো, “কি হলো, ড্রাইভার, থামলা কেন? আমাদের অফিস ধরতে হবে। তাড়াতাড়ি যাও।” ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেন। ইঞ্জিন “থ্যা ক, থেক, থেক থেক” বলে থেমে যায়। কিছুক্ষণ থ্যাক থ্যাক করে পুরা পুরি চুপ করে রইলো। গাড়ির লোকেরা মেশিন টুলস নিয়ে ইঞ্জিন মেরামত শুরু করলো। যাত্রীরা চিল্লাতে লাগলো –

“এই শালারা ছাড়ার সময় চেক করস নাই?”

“অফিস টাইম শেষ হইয়া যাইবো, অহন কিবা অইবো?”

এক মহিলা তার স্বামীকে ভর্তসনা করে “আমি প্রথমেই তোমাকে বলছিলাম এই গাড়ির টিকিট না করতে।” তার স্বামী উত্তর দেন “কেউ কি জানতো গাজীপুর এসে গাড়ি নষ্ট হবে?

এক যাত্রী ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বললেন ” গাড়ি ছাড়ার আগে ইঞ্জিন চেক করেন নাই?” ড্রাইভার বলেন “ইঞ্জিন তো চেক করেছি। ইঞ্জিন ভালোই ছিলো। ইঞ্জিন নষ্ট হলো এখন। কখন ইঞ্জিন নষ্ট হয় বলা যায় না। আপনারা শান্ত হয়ে বসুন। আমরা ঠান্ডা মাথায় কাজ করি।“ যাত্রিরা অস্থির, চেচামেচি করতেই থাকলো। আমি নির্লিপ্ত বসে ছিলাম। কোন টেনশন করলাম না। আমারও কাজের টাইম শেষ হয়ে যাবে। করার কিছু নেই। আমি টেনশন করলেও যা হবে, না করলেও তাই হবে। বরং টেনশন করলে ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাবে। হার্ট ডিজিজ হবে। সর্বদা ঠান্ডা মেজাজে থাকাই ভালো। বরঞ্চ, এই সময়টা এঞ্জয় করা যাক। জানালা দিয়া দেখলাম সুন্দর গজারির বন। বনের পাশেই বাইদের জমিতে ক্ষেত ভর্তি আধাপাকা ধান। আস্তে করে সামনে গিয়ে ড্রাইভারকে বললাম “তাড়াহুড়ো করবেন না। ঠান্ডা মাথায় কাজ করুন। আমি নিচে নামলাম। সি-২ সিটে বসেছি। আমাকে রেখে চলে যাইয়েন না। ইঞ্জিন ঠিক হলে ডাক দিয়েন।”

গজারির বনে কিছুক্ষণ হাটলাম। টেওড়াকাটা গাছে ফুল ফুটেছিল। ভ্রমর বসেছিল তাতে। প্রজাপতিরা নেচে নেচে ফুলে ফুলে উড়াউড়ি করছিলো। নানা জাতের পাখির গানে মুখরিত ছিল সেই বন। বাইদের ধান ক্ষেতের বাতরে এসে দাড়ালাম। ক্ষেতের মাঝখানে একটি কঞ্চি গাড়া ছিলো। সেই কঞ্চিতে বসেছিলো এক ফেইচ্চা (ফিঙ্গে) পাখি। উড়ে গিয়ে ধান ক্ষেত থেকে ফড়িং ধরে এনে কঞ্চিতে বসে খাচ্ছিল। ক্ষেতের বাতরের এক পাশে জোড় কাটা ছিল। সেখানে একটা পানির ঝরা ছিলো। ওখানেও এক কঞ্চি গাড়া ছিলো। সেই কঞ্চিতে বসা ছিলো একটি সুন্দর মাছরাঙা পাখি। নষ্ট গাড়ি থেকে হর্নের আওয়াজ এলো। দ্রুত এসে সিটে বসলাম। যাত্রীরা চিতকার চেচামেচি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সবার অফিস টাইম ওভার হয়ে গেছে। সবাই তা নিয়ে আফসোস করছে। আমি ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়তে পড়তে মহাখালী বাস টার্মিনালে পৌছলাম। অফিসে গিয়ে আমার কাজ হলো না। ফিরে এলাম বাস টার্মিনালে। ফেরিওয়ালা টসটসে পেয়ারা কুঁচি কুঁচি করে কেটে কাসুন্দি ও বিট লবণ মিশিয়ে কৌটার ভেতর ভরে হাতের তালুতে থাপথুপ করে বিক্রি করছিলো। খুব খেতে ইচ্ছে হলো। মেডিকেল কলেজের শিক্ষক হয়ে খোলা খাবার খাওয়া ঠিক না। ছাত্রদেরকে তাই শেখাই। কাজেই না খাওয়াই ভালো। কিন্তু মনে মানছিলো না। কাছে গেলাম। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলাম পরিচিত কেই নেই। অর্ডার দিলাম ১০ টাকার। আমার নির্দেশ মতো বোতলের পানি দিয়ে পেয়ারা ধুইয়ে পরিস্কার ছুড়ি দিয়ে কেটে বানিয়ে দিলো। বেঞ্চে বসে টুথ পিক দিয়ে গেথে গেথে মজা করে খেলাম। ফিরতি টিকিট করে ফিরে এলাম ময়মনসিংহ। ফেরার সময় ইঞ্জিন নষ্ট হয়নি। হলে নেমে এঞ্জয় করতাম।

১৪/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ – ঢাকা জার্নি

#memory #busjourney #smritikotha #sadequel

কাল্পনিক ছবি তৈরি করেছি chatGPT দিয়ে

ghaura

স্যার, আপনে এইরকম ঘাউড়া ক্যান?

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৮ সনের জুলাই মাসের ৩ তারিখে সরকারি মেডিকেল অফিসার হিসাবে প্রথম যোগদান করি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। একা একটা পরিত্যক্ত সরকারি টিনের ঘরে হারিকেন জ্বালিয়ে থাকতাম। কেরোসিনের চুলায় সকালে নিজ হাতে রান্না করে তিন বেলা খেতাম। আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, ডিম ভর্তা, ডিম ভাজি এবং ডাল দিয়ে সাধারণত ভাত খেতাম। মাঝে মাঝে খাসির বা গরুর গোস্তো নিজ হাতে রান্না করে খেতাম। একাকি তাকতাম, তাই নিরবতা কাটানোর জন্য এক ব্যান্ডের ছোট্ট একটা পকেট রেডিও বাজাতাম, বাংলাদেশ বেতার ঢাকা ও আকাশবাণী কলকাতা শুনতাম।

১৯৮৯ সনের মার্চ মাসে ঐ এলাকায় কলেরায় মহামারি আকারে অনেক লোক আক্রান্ত হয়। আমি সকালে হাসপাতালে বসে রোগী দেখছিলাম। হাসপাতালটা ছিল অতি পুরাতন টিনের ঘর। ব্রিটিশ আমলের লোহা কাঠের ভাংগা ভাংগা চেয়ার টেবিল ছিলো। আমার সামনে অন্তত ১০০ জনের মতো রোগী লাইনে দাড়ানো ছিলো। মনোযোগ দিয়ে দ্রুত রোগীর প্রেস্ক্রিপশন লিখে বিদায় দিচ্ছিলাম। একজন ছাত্র লাইনে না দাড়িয়ে খোলা জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে উকি দিয়ে বারবার বলছিলো, ” স্যার আমাকে দুই তিনটা রগে দেয়ার সেলাইন দিন, রোগীর সাংঘাতিক ডাইরিয়া হইছে।” আমি বার বার বলছিলাম লাইনে দাড়াতে। কিন্তু সে লাইনে না এসে জানালা দিয়ে বারবার একই অনুরোধ করছিলো। আমি বিরক্ত হয়ে জানালা দিয়ে তাকে কয়েকটা খাবার সেলাইন সাধলাম। কিন্তু ছেলেটি নাছোড়বান্দা, রগে দেয়ার সেলাইনের ব্যাগই নিবে।আমি বললাম যে রোগী না দেখে রগে দেয়ার সেলাইন দেয়া যাবে না। এভাবে সে প্রায় ঘন্টাখানিক বারবার একই দাবি জানিয়ে আসছিল। আমি সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে অন্য রোগীদের সমস্যা শুনে শুনে ঔষধ দিয়ে আসছিলাম।

এক পর্যায়ে ছেলেটা হঠাৎ বলে উঠলো, “স্যার, আপনে এমন ঘাউড়া ক্যান?” মুরুব্বিরা লাইনে থেকে বলে উঠলেন, “এই বে-আদব ছেলে, কাকে কি বলছো? একজন ফার্স্ট ক্লাস গ্যাজেটেট অফিসারের স্যাথে এভাবে আচরন করে?”

আমি হেসে ফেললাম। জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নাম কী? কোন ক্লাসে পড়ো?”

ছেলেটি বললো যে সে ক্লাস নাইনে পড়ে। আমি বললাম আমি এই রোগীগুলো দেখা শেষ করে তোমার সাথে তোমাদের বাড়ি গিয়ে রোগী দেখে নিজ হাতে সেলাইন পুশ করে আসবো। রোগী না দেখে সেলাইন দিয়ে দেয়ার নিয়ম নাই।” আরও কিছুক্ষণ বাক বিতনণ্ডা করে চুপ রইল। হাস্পাতালের রোগী দেখা শেষ করে তিনটি সেলাইনের ব্যগ সাথে নিয়ে ছালেটির বাড়িতে চলে গেলাম দুই কিলোমিটার হেটে। ঐ বাড়ির বড়রা ছেলের কান্ড দেখে অবাক। বলেন, “আমরা লজ্জিত, আমাদের ছেলেটা আপনার সাথে বেয়াদবি করেছে। আমরা লজ্জিত। আমরা তাকে এভাবে সেলাইন আনতে বলি নাই।” আমি বললাম, “সমস্যা নাই। রোগী দেখান।”

মুরুব্বিরা বললেন, “আপনি বাসায় ফিরেন নাই। দুপুরে খান নাই। একা একা থাকেন। কি খান, না খান আমরা খোজ রাখিনা। আজ আমাদের বাড়িতে খাবেন। পোলাও – মাংস রান্না করা আছে। আপনি আগে খেয়ে লন। তারপর রোগী দেখবেন। আমরা জানি, আপনারা রোগী দেখার পর খান না। কাজেই রোগী দেখার আগেই খেতে হবে।”

আমি অজু করে খেয়ে নিলাম। অনেকদিন পর ভালো খাবার খেলাম। ভালো লাগলো। তারপর রোগী দেখে সেলাইন পুশ করে ফিরে এলাম চরামদ্দি। সাথে ব্যাগ হাতে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলো সেই ছেলেটা। যে আমাকে ঘাউড়া বলেছিলো। আমি একটুও মাইন্ড করিনি। এরপর যদিন চরামদ্দি ছিলাম, ছেলেটা আমার কাছে আসতো ভালোবেসে। আমার ভালো লাগতো। চরামদ্দির ঘাউড়া ডাকা ছেলেটিকে।

৫ জানুয়ারি ২০২৬ খৃ.

#story #Memory

(ছবিটা এ আই দিয়ে তৈরি করিয়েছি)

rajnitir-mor

রাজনীতির মোর

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

অনেক বছর আগের কথা। সনটা ভুলে গেছি। গ্রামের বাড়ি সখিপুর এলাকা থেকে একজন রোগী এলেন আমার ময়মনসিংহ তালুকদার প্যাথলজি ল্যাব এর চেম্বারে। আমি নাম জানার পর জিজ্ঞেস করলাম

– আপনার বাড়ি যেন কোথায়?

– বাড়ি তো আপনাদের বাড়ির কাছেই।

– আপনার বাড়ি কি আমাদের বড়বাইদপাড়ায়?

– না, আমাদের বাড়ি হচ্ছে রাজনীতির মোর।

– এটা আবার কোথায়?

– আপনাদের বাড়ির কাছেই। মনে হচ্ছে, নামই শুনেন নাই?

– আমি এই গ্রামের নাম শুনি নাই। গ্রামটা কোথায় পড়েছে?

রোগী লোকেশনটা সুন্দর করে আমাকে বলে দিলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম

– জায়গাটার নাম রাজনীতির মোর হলো কেমনে?

– কয়েক বছর আগে ঐ রাস্তার মোরটাতে বড় রকম একটা মারামারি হয়েছিলো। তারপর থেকেই ঐ জায়গাটার নাম হয়েছে রাজনীতির মোর।

– তা হলে তো হবে মারামারির মোর, রাজনীতির মোর হলো কেমনে?

লোকটা হেসে দিয়ে বললেন, “রাজনীতি মানেই তো মারামারি।”

২০ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রি.

#villagelife#story#memory

(ছবি: গল্পটা পড়ে এ আই chatGPT এই কাল্পনিক ছবিটি এঁকে দিয়েছে)

chhoto-kakkur-election

Chhoto Kakkur Election

ছোট কাক্কুর ইলেকশন

ডাঃ সাদেকুল ইস্লমা তালুকদার
ছোট কাক্কু, মানে আমার ছোট চাচা, বাবার চাচাতো ভাই, মরহুম আব্দুস সালাম তালুকদার। তিনি কালিয়া ইউনিয়ন কাউন্সিলের সেক্রেটারির চাকরি করতেন। এজন্য সালাম সেক্রেটারি নামে পরিচিত ছিলেন । এটা একটা সরকারি চাকরি। ভালই ছিলো এই চাকরি। বাড়ী থেকেই সাইকেল নিয়ে অফিসে যেতেন। হাটের দিনে কচুয়া ও বড় চওনা হাটে ঔষধ বিক্রি করতেন। যেমন সুন্দর ছিল তার চেহারা তেমনই সুন্দর ছিল তার ব্যবহার। তিনি বেশ ধার্মিক ছিলেন। ঈদের মাঠে ছোট খাটো বয়ান দিতে শুনেছি। তবে খুব ভালো বক্তা ছিলেন না। তাকে আমি রাজনীতি করতে দেখিনি। তবে রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন। ১৯৬৫ সনের পাকিস্তান-ভারতের যুদ্ধের সংবাদ রেডিওতে শুনে আমার বাবা চাচাদের সাথে গল্প করতে শুনেছি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও তিনি রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন বিজয়ের কথা শুনলে চাচাদেরকে নিয়ে উল্লসিত হতেন। স্বাধীন হওয়ার পর বড় চওনা মাঠে যখন কাদের সিদ্দিকীকে গণ সম্বর্ধনা দেয়া হয় সেই সমাবেশে তাকে মোনাজাত পরিচালনা করতে দেখেছি। এলাকার কোন সালিশ বিচারে তাকে দেখিনি। চাকরি করতেন, ব্যবসা করতেন, জমি আবাদ করাতেন, সন্তানদেরকে স্কুল কলেজে পড়াতেন এবং শুখে শান্তিতেই থাকতেন গ্রামে। তিনি আমার একজন ভালো অভিভাবক ছিলেন।

১৯৮৩ সনে আমি যখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস থার্ড ইয়ারে পড়ি তখনকার ঘটনা। রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের শাসন আমলে। কালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন বড় চওনার জামাল হোসেন সাহেব। অর্থাৎ সালাম কাক্কুর অফিসের  চেয়ারম্যান । আমাদের ইউনিয়ন মানে চোট কাক্কুর ইউনিয়ন কাকরাজান। ছোট কাক্কুর মাথায় চাপলো চেয়ারম্যান হবেন। চেয়ারম্যানের অধীন চাকরি করবেন না। তার অধীনেই আরেক সেক্রেটারি সাহেব চাকরি করবেন। কাক্কু কোন দিন ইলেকশন করবেন আমি কল্পনাও করতে পারিনি। কাকরাজান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে লাঙল মার্কায় কাক্কু ইলেকশনে দাঁড়ায়েছেন শুনে আমি স্তম্ভিত হলাম। লাঙল ছিল এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টির মার্কা। মনে হলো কাক্কু এই সরকারকে ভালোবাসেন অথবা পাবলিক ভালো বাসে বলে লাংগলে ভোট দিবে ভেবে কাক্কু এই কাজ করেছেন। শুনলাম সবাই কাক্কুর জন্য মরিয়া হয়ে ইলেকশনের ক্যাম্পেইন করছে। আমি কি কাক্কুর জন্য কিছু না করে থাকতে পারি? মেডিকেলের প্রচুর পড়ার চাপ উপেক্ষা করে বাড়ী চলে গেলাম কাক্কুর জন্য কিছু করতে।

দেখলাম ইলেকশন করার জন্য কাক্কু বেশ সংগঠিত। মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাই নির্বাচন পরিচালনা করছেন। খাওয়া দাওয়ার দায়িত্বে হাফিজ দুলাভাই। মিয়া কাক্কুকে দেয়া হয়েছে রান্না বান্না ও বিড়ি বিতরনের দায়িত্বে। আমাকে একটা দায়িত্ব দিতে অনুরোধ করলাম। সালাউদ্দিন দুলাভাই বললেন “তুমি বাড়ীতেই থাকবে। বসে বসে পড়বে। সকাল ও সন্ধায় মেহমানদের বসতে দিবে।”

ঐবছর আরো যারা ইলেকশনে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম আমার মনে আছে। ইন্দ্রজানীর সামসুল হক পান্না মামা গরুর গাড়ী মার্কা, সরিষা আটার আবুবকর সিদ্দিক খেজুর গাছ মার্কা, ছোট চওনার শওকত ডাক্তার আনারস মার্কা। সকাল বেলা বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন আসতেন ক্যাম্পেইনে যাওয়ার জন্য। আমি বাংলাঘরে পাটি বিছিয়ে বসতে দিতাম। ডিসেম্বর মাস ছিল সেটা। সকাল বেলা গরম ভাতের সাথে মাসের ডাল দিয়ে পেট ভরে ভাত খেতেন কর্মিরা। নয়টা-দশটার দিকে কুয়াশা কেটে মিষ্টি রোদ ওঠে যেতো। কর্মিরা গায়ের চাদর ও সুয়েটার খুলে কোমড়ে বেধে তার নিচে বিড়ির বান্ডিল বেধে চলে যেতো বিভিন্ন গ্রামে। সন্ধার সময় একে একে ফিরে আসতে থাকতো কর্মিরা। আমি পাটি বিছিয়ে বসতে দিতাম কর্মি ভাইদেরকে। একপাশে বোকার মতো বসে কর্মিবাহিনী ভাইদের আলাপ শুনতাম। উপভোগ করার মতো সেই আলাপ। তাদের সংলাপগুলি ছিল এরকমঃ
– আমি গেছিলাম বইলারপুর গ্রামে। সেখানকার সবাই ভোট দিবে লাংগলে। কয়েক বান্ডিল বিড়ি নিয়ে গেছিলাম। মুহুর্তেই শেষ। বিড়ি না দিয়া কি কারো সাথে ভোটের আলাপ করা যায়?
– আমি গেছিলাম গড়বাড়ী। সেখানকার সবাই ভোট দিবে তালুকদার সাবকে। আমারো একই কথা। নিমিষেই বিড়ির সব বান্ডিল শেষ। কি আর করি। নিজের টাকায় আরো ৫ বান্ডিল বিড়ি কিনে ভোটারদের দিয়ে ভোট চেয়েছি। ভোটাররাও খাচ্চর আছে। একটা নিয়ে কানে বাজিয়ে রাখবে আরেকটা ধরিয়ে টানতে টানতে যাবে। তবে তাদের ভাব দেখে মনে হয় সবাই লাংগলেই ভোট দিবে।
– আরে শুনুন, আমি গেছিলাম ভুয়াইদ। সেখানে তো কাক্কুর মামুর বাড়ী। কাক্কুর মামুই ১১ জন। তাদের গুষ্টির সবাই যদি ভোট দেয় কাক্কু তো এমনি উঠে যায়। তবে সেখানে অল্প বিড়ি নিয়ে গিয়ে ভুল করেছি। তারা বলছে যে ভাইগ্নার জন্য আমাদের ভোট চাইতে হয়। আমাদের কাছে কিছু বিড়ি বেশী রাখা দরকার।

কেউ কেউ আমার কানে কানে বলছিলঃ
-যারা এরকম চাপাবাজি করছে তারা আসলে চোর। কাক্কুর বিড়ি নিয়ে গিয়ে অন্য ক্যান্ডিডেটের কর্মীর কাছে সস্তায় বিক্রি করে দিয়ে এসে এখানে গল্প করছে চাচাকে ফুলানোর জন্য।
– ভোট দিবে সবাই ইন্দারজানীর সামসুরে গরুর গাড়ী মার্কায়। তার কথা মুখে কেউ বলে না। কোন রকম মার্কা বা পোষ্টার ছাপায়নি। তার কর্মিও নাই। একাই বিভিন্ন গ্রামে চাদর গায় দিয়ে ঘুরে আর বলে “চাচা, ইলেকশনে খারাইছি। দেশের ভালো চাইলে একটা ভোট দিয়েন। মার্কাটা গরুর গাড়ী। কোছে বিড়ি থাকলে একটা দেন খাই।“

লাংগলসহ অন্যান্য ক্যান্ডিডেট যেখানে বিড়ি ও পোস্টার বিলিয়ে ভোট চাইছে কর্মি বাহিনী দিয়ে সেখানে পান্না মামা খালি হাতে একা ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। নিজে তো বিড়ি দিচ্ছেন না। উলটা তিনি অন্য ক্যান্ডিডেটের দেয়া বিড়ি নিয়ে খাচ্ছেন।

কেউ কেউ আমাকে জানালেন “তালুকদার সাহেব রাজনীতি জানেন না। তার টাকাগুলি খসানোর জন্য তাকে অনেকে কুবুদ্ধি দিয়েছেন। দুনিয়াটা এত সোজা মানুষের জন্য না। চাকরি ত গেলোই টাকা পয়সাগুলিও শেষ করবেন ইলেকশনে খরচ করে। টাউটদের পকেটভারি হচ্ছে।

রাত নয়টার দিকে ঘর ভরে যেতো কর্মি বাহিনীতে। তাদের মন্তব্য শুনতাম বসে বসে। একেকজন একেকভাবে চাপা মারতো। আর আমি একেকবার একেকজনের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে শুনতাম। হাফিজ দুলাভাই নেতার মতো মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুনতেন। তিনি মিটি মিটি হাসতেন সামনের দুই দাতের আগা বের করে গালে টোল ফেলে। কর্মিদের কথা শেষ হলে হাফিজ দুলাভাই বিজ্ঞের মতো আংগুল খারা  করে বলতেন “শুনুন, আপনারা চুপ করুন, আমার কথা শুনুন। তেলধারা গ্রামে এত ভোট। সেখানে পুরুষ ভোট এতো। মহিলাভোট এতো। কাক্কু পাবে এতো ভোট। নাইন্দা ভাংগা গ্রামে এত ভোট। কাক্কু পাবে তার ৯০ ভাগ। অমুক গ্রামে এত ভোটের মধ্যে কাক্কু প্রায় সব ভোট পাবেন। কাজেই সব গ্রামের ভোট হিসাব করে দেখা গেলো যে কাক্কু বিপুল ভোটে বিজয়ী। দেন খাবার।” সবাই সমস্বরে বলে উঠতো “দেন খাবার। দেন খাবার।” আমি প্লেট ভর্তি আমন ধানের ভাত দিতাম। কাপাভর্তি করে মাস কয়ালাইর ডাইল দিতাম। পেট ভর্তি করে খেয়ে ডিগডিগি চলে যেতো কর্মিরা। আবার চলে আসতো সকালে। পেট ভরে খেয়ে বিড়ি নিয়ে চলে যেতো গ্রামে গ্রামে।

তখন ছিল ডিসেম্বর মাস, শীত কাল। আমন ধান কাটা হয়ে গেছে। গ্রামের লোকের কোন কাজ ছিল না তখন। ইলেকশন আসাতে একটা উৎসব উৎসব ভাব সবার মনে। ছাত্রদেরও পরীক্ষা শেষ হয়েছিল। সবাই ইলেকশন নিয়ে মেতে উঠেছিল। একদিন সকালে দেখলাম এক গ্রামের একজন প্রভাবশালী কাক্কুর বাড়ীতে এসেছেন। উঠানে চেয়ার পেতে বসেছিলেন রোদে। দেখলাম ছোট কাক্কু তার হাত ধরে ফুঁফিয়ে কাঁদছেন। আমার কাছে ব্যাপারটা বেখাপ্পা মনে হচ্ছিল। কাকরাজান ইউনিয়নে এমন কোন ব্যাটা নাই যে তার হাতে ধরে তালুকদারদের কাঁদতে হবে। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম “ব্যাপারটা কি?” তিনি আমাকে বুঝালেন “ইনি তার এলাকায় প্রভাবশালী। তার কথায় সবাই ভোট দিবেন। অথচ ছোট কাক্কু ইলেকশনে দাঁড়িয়ে তার সাথে দেখাও করেননি, কথাও বলেননি। তিনি বিদ্রোহী হয়ে অন্যজনের জন্য ভোটের ক্যানভাস করছেন। তাই, তার হাত ধরে কাক্কু কান্নার অভিনয় করছেন। ইলেকশনটা শেষ হোক। তারপর দেখা যাবে কে কার হাত ধরে কাঁদেন।” আরেক রাতে অন্য পাড়ার একজন লিডার এলেন সবাইকে নিয়ে। পাড়ার লিডার তালুকদারদের দেখে রাস্তা চেড়ে দিতেন। তাকে দেখে মনে হলো বেশ প্রভাবশালী। কিছু একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে মনে হলো। আমি আগ্রহ নিয়ে বসলাম। মিয়া কাক্কু, ছোট কাক্কুর বড়জন, আবুল কাশেম তালুকদার, মাদবর শুরু করলেন “আমরা এখন একটা বিরাট কাজ হাতে নিয়েছি। আমাদের এই এলাকা থেকে কোন চেয়ারম্যান নির্বাচন না করাতে এলাকার কোন উন্নয়ন হয় নাই। এবার আব্দুস সালাম ইলেকশনে দাঁড়িয়েছে। সবাই সতস্ফুর্তভাবে তারজন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইনশাল্লাহ, আমাদের বিজয় হবেই। তোমার মতন” বলার সাথে সাথে পাড়ার লিডার ক্ষেপে গিয়ে বললেন “এই মোতনের মধেই দোষ। আপনাদের এই মোতনের মধেই দোষ। আমাদেরকে আপনারা মানুষই মনে করেন না। কিছু হলেই বলেন তোমার মোতন অমুক। আমরাও মানুষ। আমাদের মানুষ বলে মনে করবেন। আমি এইজন্যই আপনাদের বাড়ী আসতে চাইনি। থাকুন আপনাদের তালুকদারি নিয়ে।” সাথে আশা অনেকে তাকে বুঝিয়ে শান্ত করলেন। বুঝালেন “তালুকদার সাব কি বলতে চেয়েছিলেন আমরা শুনি।” মিয়া কাক্কু বললেন “আমি যা বলতে চেয়েছিলাম তা তুমি না শুনেই রাগ করা শুরু করলা। আমি বলতে চেয়েছিলাম তোমার মতোন অমুক আর আমার মতোন কাশেম যদি এক থাকি তাহলে আমাদের সাথে কেউ পারবে না।” সবাই বললেন “তালুকদার সাব ঠিক কথাটাই কইছে। আমাদের কথা অইল তারা আমাদের যত বিড়ি আর টাকা পয়সা দেইক না কেন আমরা ভোট দিব তালুকদার সাবকেই।” আমি কানে কানে জানতে পারলাম অন্য ক্যান্ডিডেটের দেয়া বিড়ি ও টাকা পেয়ে এই মাদবর লাঙল বাদ দিয়ে অন্য ক্যানভাস করছিলেন। তাই, এই ব্যবস্থা। আসলে মিয়া কাক্কু প্রথমে তাকে তিরস্কার করতেই চেয়েছিলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে সুর পালটিয়ে তোমার মোতনের সাথে আমার মোতন লাগিয়ে দিয়েছেন। আমার মোতন সাদেকেরও বুঝতে অসুবিধা হলো না যে ইলেকশনের পর চাচায় যে তারে কি করে!

কাক্কু এবার চেয়ারম্যান হবেন। সবার মধ্যে আনন্দ আনন্দ ভাব ছিল। বাড়িতে অনেক নায়রী এসেছিল। কাক্কুর শশুর বাড়ির সবাই এসেছিল। আসাদুজ্জামান মুকুল তালুকদার ও আনোয়ার হোসেন কায়সার তালুকদার কাক্কুর ছেলে। আরেক ছেলে আক্তার তালুকদার তখন ছোট ছিল। মুকুল ও কায়সার মিছিলে অংশগ্রহণ করতো। আক্তারের খেলার বয়স ছিল । সে ইলেকশন বুঝত না। মুকুলের মামাদের টেলিভিশন এনেছিল এই বাড়ীতে। যাদের কাজ নেই তারা উঠানে পাটিতে বসে টিভি দেখতো সারাক্ষণ । সাদাকালো টিভির যুগ ছিলো তখন। লম্বা বাঁশের আগায় এন্টিনা বেঁধে টিভি দেখা হতো। ঢাকা ও ময়মনসিংহ থেকে টিভি সিগনাল আসতো প্রায় ১০০ কিলো মিটার দূর থেকে। তাই ছবি ঝিরঝির করতো। বাতাসে একটু নড়ে গেলে ছবি চলে যেতো। বাইরে গিয়ে একজনে বাঁশ ঘুরিয়ে বলতো

-ছবি আইছে?
– আইছে। পরিষ্কার না। আরেকটু ঘুরাও। এখন আইছে। এই গেছে গা। এখন আবার আইছে। থাউক। এইভাবেই থাউক। নড়াইও না।

অবশেষে সেই প্রতিক্ষিত ইলেকশনের দিন এলো। সেদিন বাড়ীতে কোন কাজ ছিল না। মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাই সবাইকে ডিউটি দিয়ে পাঠালেন বিভিন্ন কেন্দ্রে। আমাকে পাঠালেন সবচেয়ে দূরের কেন্দ্র চকপাড়ায়। আমাকে কেন এত দূরে পাঠালেন এনিয়ে আমি অনেক চিন্তা করে একটা কারন খুজে পেয়েছি। আমি ছিলাম তেমন কাজের না, তাই। চকপাড়া কেন্দ্রের ভোট পাওয়ার কথা সরিষা আটার ক্যান্ডিডেট আবুবকর সাহেব, খেজুরগাছ মার্কা। এখানে ইম্পোর্টেন্ট লোক পাঠিয়ে লাভ নেই। কিছু বিড়ির বান্ডিল নিয়ে আমি নাস্তা করে চলে গেলাম চকপাড়া কেন্দ্রে। অনেকদিন হয় শহরে থাকি। হাটা হয় না তেমন। বাড়ী থেকে হেটে চকপাড়া কেন্দ্রে যেতে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। দুলাভাইর প্রতি খুব মনোক্ষুণ্ণ হয়েছিলাম। এতো কষ্ট আমায় দিলেন! যাহোক কেন্দ্রে পৌঁছে একটা বেডশীট বিছিয়ে বসে পড়লাম বিড়ির দোকান্দারের মতো। সবার মুখে শুধু খেজুর গাছ। সবার হাতের কাগজে খেজুরগাছের ছবি । আমার দিকে এসে লাঙল মার্কা দেখে ফিরে যায়। কেউ কেউ বলে “লাঙল মার্কা ক্যান্ডিডেটকে তো কোন দিন দেখলামই না। এইটা সালাম সেক্রেটারির মার্কা। ইনি আবার সেক্রেটারিগিরি বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান হতে চায় কেন?”

আমার বিড়ি নিতে কেউ আসে না। নিজেকে অসহায় মনে হলো। অনেকে দূর থেকে তাকায় আমার দিকে। আমি ফিরে যেতে মনস্থির করলাম। কিন্তু এতগুলি বিড়ি কি করবো? এমন সময় জিতেশ্বরির এক কাক্কু এলেন। নাম বললাম না । তিনি কিছুক্ষণ আমার সাথে বসে উঠে গিয়ে একজন উপজাতী ভাইকে নিয়ে এলেন। বললেন “কাক্কু, ওকে কয়েক প্যাকেট বিড়ি দিন। ও লাংগলে ভোট দিবে।” এভাবে একজন একজন করে কয়েকজনকে নিয়ে এসে মাটি হাতে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে বিড়ি দিলেন লাংগল মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য। আমি বললাম “কাক্কু, মাটি হাতে নিয়ে কিরা করার দরকার নাই। এমনি বিশ্বাস করে দেন। ভোট দিলে দিবে না দিলে না দিবে। গরীব মানুষ এমনি দিয়ে দেন।” কিছুক্ষণ পর সব বিড়ি শেষ হয়ে গেলো। আমিও হাল্কা হয়ে বেঁচে গেলাম। বাড়ীর দিকে পথ ধরলাম। রাস্তা দিয়ে যাই লোকে বলাবলি করে যে যাই বলুক পাশ করবে গরুর গাড়ী। সবারটা খেয়ে ভোট দিবে সামসুরে। আমি উচ্চস্বরে বলি “লাঙল, লাঙল, যাবেই যাবে, লাংগল।” ছোট চওনা কেন্দ্রে গিয়ে দেখি আমাদের বাড়ীর সবাই উৎসবে মেতেছে। অযথা আমাকে পাঠিয়েছেন চকপাড়ায়। দুলাভাইর প্রতি আরেকবার রাগ হলো। মুকুল ও কায়সার এখানেই ছিল। চাচার নির্ঘাত পরাজয় ভেবে কেন্দ্র ত্যাগ করলাম। কিছুক্ষণ পর মুকুলও কেন্দ্র ত্যাগ করলো। ভোট গণনা অর্ধেক হলে কায়সারও কেন্দ্র ত্যাগ করে চলে এলো। জিতেশ্বরি পর্যন্ত এলে একদল কিশোর জিজ্ঞেস করলো “কায়সার ভাই, খবর কি?” কায়সার ফাল দিয়ে বলে উঠলো “উইঠা গেছি।” কিশোরের দল খুশীতে আত্বহারা হয়ে কায়সারকে কাঁধে নিয়ে নাচতে লাগলো আর স্লোগান দিল “উইঠা গেছে, লাংগল। উইঠা গেছে, লাংগল।” অবস্থা বেগতিক দেখে কায়সার বলে দিলো “এই পোলাপান উঠি নাই। মিছা কথা।” শুনে কিশোরের দল থেকনা দিয়ে কায়সারকে কাঁধ থেকে ছেড়ে দিলো।” এই ঘটনাটুকু আমি স্বচক্ষে দেখেনি । কায়সার পরে আমাদেরকে বঘটনার বর্ণনা করেছে । তবে কত জোড়ে থেকনা দিয়েছে তা আমি কল্পনা করতে পারি।

ইলেকশনের পরেরদিন শুনলাম গরুর গাড়ী মার্কা সামসুল হক পান্না মামা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। ইলেকশনে কোনরূপ কারচুপি হয়নি। জনগণ স্বাধীনভাবে বিড়ি খেয়েছে, স্বাধীনভাবে টাকা খেয়েছে, স্বাধীনভাবে ক্যানভাস করেছে আর স্বাধীনভাবে চুপি চুপি কর্মীবিহীন ও পোস্টারবিহীন সামসুল হক পান্নাকে ভোট দিয়েছে। একেই বলা হয় ফেয়ার ইলেকশন। ছোট কাক্কু যতই ভালো মানুষ হউন না কেনো তাকে চেয়ারম্যান হিসাবে ভোটাররা পছন্দ করেননি। নয়-মামাদের গ্রাম থেকে নয়টি ভোটও পাননি। আমার চকপাড়ার কেন্দ্রে যারা মাটি হাতে কিরা খেয়ে বিড়ি নিয়েছিল তারাও ভোট দেয়নি হিসাব করে দেখেছি। আচ্ছা, আপনিই বলুন, আমি যে এতো ভালো এবং আপনাদের প্রিয় মানুষ, গ্রামের মেম্বার পদে ইলেকশন করলে কি আমাকে কেউ আপনারা ভোট দেবেন? কাজেই, যার জন্য যে কাজ মানায়। ছোট কাক্কুর চেয়ারম্যানে ইলেকশন করা ঠিক হয়নি। তিনি সেক্রেটারি হিসাবেই ভালো ছিলেন। শুধু শুধু সরকারি চাকরিটি হারালেন। এই ইলেকশনে তিনি হারিয়েছিলেন বানিয়াসিটের জমিটি, জিতাশ্বরি বাইদের জমিটি, কয়েকশ মন আমন ধান ও মাস কালাইর ডাইল।

ইলেকশনের পরদিন আমি সকাল ৯টার দিকে ছোট কাক্কুর বাড়ীতে গেলাম। মিয়া কাক্কু বিছানা থেকে ওঠেননি। ছোট কাক্কু উঠানে রান্না ঘরের দিকে মুখ করে মাথায় আলখেল্লা রেখে রোদ পোহাচ্ছিলেন। সাথে কেউ নেই। বিড়ি ও ডাইল খেকোরা কেউ নেই। শিশু কিশোর ও মহিলারা টেলিভিশন দেখার চেষ্টা করছে। ছোট কাক্কুর যে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়ে গেছে টেলিভিশন দর্শনার্থীদের বুঝার কথা না। আমি কাক্কুর কাছে গিয়ে শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করলাম “কাক্কু, আপনি মন খারাপ করুন না যে, সব ঠিক হয়ে যাবে।” কাক্কু বললেন “আমরাই জিতেছি। আমি মন খারাপ করি নাই। আমাগো নাতী সামসু চেয়ারম্যান হওয়া মানে আমরাই চেয়ারম্যান হওয়া। আমি আমাদের গ্রামের জন্য যা করতে চেয়েছিলাম সামসুকে বললে তা করবে। তাই, বলি, আমরাই জিতেছি।” এদিকে টেলিভিশনে সিগনাল আসছিল না। কায়সার শত চেষ্টা করে এন্টিনা ঘুরিয়েও সিগনাল আনতে পারলো না। আমি বললাম “পিছনের জ্যাকটা চেক করো। জ্যাক লুজ হয়ে যেতে পারে।” কায়সার একবার জ্যাক লাগায়, একবার খুলে। টেলিভিশনে ছেৎ  ছেৎ  শব্দ করে। ঝিরঝির করে। ছবি আসে না। ছোট কাক্কু বিরক্ত হয়ে বললেন “থো রে। বাদ দে তরা টেলিভিশন দেখা। তোর মামুর টেলিভিশন, আর আমার ইলেকশন, একই রকম।” আমি হাসি চেপে রাখতে না পেরে বাব্বুর কাঠাল গাছের পিছনে গিয়ে দাড়ালাম। গাছে কটা (কাঠ বিড়ালী) লাফালাফি করছিল। দেখতে ভালোই লাগছিল। কিছুক্ষণ একা একা হেসে নিলাম কাঠাল কাছটার পিছনে দাঁড়িয়ে ।

আমি চলে এলাম ময়মনসিংহ। এদিকে ছোট কাক্কু চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন। যোগ দেন শিক্ষকতায়। তিনি নিজগ্রাম জিতেশ্বরী পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত রশিদিয়া দাখিল মাদ্রাসায় আজীবন শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৩ সনের সেই ইলেকশন থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৬ টি বছর কেটে গেছে। কতরকম ইলেকশন আসে যায়। ইলেকশন আসলে কাক্কুর ইলেকশনের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে কাক্কুর কালজয়ী উক্তি “থোরে, তর মামুর টেলিভিশন, আর আমার ইলেকশন, একই রকম।” সেই সামসুল হক পান্না মামা এরপর ৪ বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ১৯৮৩, ১৯৮৮, ১৯৯৫ ও ২০১১ সনের নির্বাচনে। ২ বার ফেল করলেও সেকেন্ড হন। কোন রকম পোষ্টার, লিফলেট ও মিছিল ছাড়াই। যে সময় তিনি চেয়ারম্যান থাকতেন না সেসময় তিনি ময়মনসিংহে মাঝে মাঝে রোগী নিয়ে আসতেন আমার চেম্বারে। না আসতে পারলে চিঠি লিখে রোগী পাঠাতেন আমার কাছে। এলাকায় হেলথ ক্যাম্প করে রোগী সেবা করতেন। শুনেছি তার এলাকায় বেপক উন্নয়ন করেছেন। ওদিকে আমার তেমন যাওয়া হয় না। তিনি আমাদের গ্রামের মাদ্রাসা, ব্রিজ ও কালভার্ট করে দিয়েছেন সরকারি অনুদানে।

সামসু চেয়ারম্যান মামা বেশ সাহসী মানুষ। তিনি একবার রাত ১২ টার পর আমাদের ময়মনসিংহের বাসায় এলেন। সাথে ছিল তার মোটর বাইক চালক। তিনি এসেছিলেন আমার কাছে পরামর্শ নিতে গড়বাড়িতে একটা হেলথ ক্যাম্প করার ব্যাপারে। রাত একটার সময় চলে যেতে চাইলে আমি বাসায় থাকতে বললাম। তিনি রাজী হলেন না। আমি বললাম “এতো রাতে রাস্তায় বেরোনো রিস্ক আছে। আমার জানামতে আপনার অনেক শত্রু আছে।” তিনি বললেন “আমি এখন ময়মনসিংহ থেকে ইন্দ্রজানী যাবো। এমন কোন বাপের ব্যাটা নাই যে আমার সামনে খারাবে।” মামা চলেই গেলেন।

আরেকদিন মামাকে চোখ অপারেশন করানোর জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পেইং বেড ওয়ার্ডে ভর্তি করালাম। কোন কিছু লাগলে বা কোন কিছুর অসুবিধা হলে সিস্টারকে জানানোর জন্য বলে দিলাম। তিনি এক কান্ড করে বসলেন। তার বেডে  উপরের ফ্যানটা ধীরে ধীরে ঘুরতো। তিনি সিস্টারের রুমে গিয়ে বললেন “সিস্টার, আমার বেডের ফ্যানটা এখনি ঠিক করে দেন।” সিস্টার কর্ণপাত না করায় তিনি বললেন “সিস্টার, আমার  ফ্যানটা খুলে এনে আপনার রুমে লাগান। আর আপনারটা খুলে এনে আমার বেডের উপর লাগান।” সিস্টার কর্নপাত না করাতে তিনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন “যদি না পারেন, তবে যে পারেন তাকে পাঠান আমার কাছে।” সিস্টার নার্সদের সেক্রেটারিকে ডেকে আনেন বিচার দিতে। সেক্রেটারি এসে বললেন “কি হয়েছে? আপনি আমাদের সিস্টারকে কি বলেছেন?” মামা বললেন

-আপনি কে?
– আমি নার্সেস এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি।
– ভালোই হলো। সেক্রেটারি সাহেব, দয়া করে আমার ফ্যানটি খুলে নিয়ে আপনার নার্সের রুমে লাগান আর নার্সেরটা আমার উপর লাগান।
– আপনি কে?
– আমি রোগী।
– আপনার পরিচয়?
– পরিচয় পরে হবে। আগে ফ্যান লাগান। গরমে আমার মাথা গরম এখন।

নার্সারা কথা না বাড়িয়ে ইলেক্ট্রিশিয়ান ডেকে ফ্যান বদলিয়ে দিলেন। কেউ আর মামার পরিচয় জানার সাহস পেলো না।
আমাদের তালুকদার বাড়ীর অনেকেই এখন শহরে থাকি। নাড়ির টানে বাড়ী যেতে হয়। আমাদের অনেকেরই প্রাইভেট কার আছে। আমাদের গ্রামের রাস্তাঘাট একদম খারাপ। তাই কার নিয়ে যাওয়া খুবই বিপদের। কাক্কুর ইলেকশনের পর আর কেউ আমাদের গ্রাম থেকে ইলেকশন করেনি। আমাদের একজন চেয়ারম্যান থাকলে হয়তো এতো দুর্গতি হতো না। ছোট চওনার হাজী বাড়ীর রফিক ঘন ঘন রোগী নিয়ে আমার চেম্বারে আসতো। আমি বুঝতে পারলাম এটাও নেতা হওয়ার চেষ্টায় আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– হাজী বাড়ীর সমসের হাজী ১৫ বছর চেয়ারম্যানি করেছিলেন। তার ছেলে শওকত ডাক্তারও ৫ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন। এখন ঐ বাড়ীর নেতা কে?
– ধরতে পারেন, আমিই। আমিই কিছু কিছু জনসেবা করে থাকি।
– খুব ভালো। চেয়ারম্যান হয়ে আমাদের গ্রামের রাস্তাঘাট গুলা পাকা করবা।

খোদার কি কাম। সেই হবু চেয়ারম্যান স্ট্রোক করে প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। হুস জ্ঞান তেমন নাই। তালুকদার বাড়ীতে এই লাইনে আর কেউ আসেনি। চাচাতো ভাইয়ের এক ছেলে বিরোধী দল করে বার বার জেলে যাচ্ছে। আরেক চাচাতো ভাইয়ের ছেলে মামুন তালুকদার এখন রাজধানীতে থেকে পড়াশুনা করে ছাত্রনেতা হয়েছে সরকারি দলের। বড় বড় নেতাদের সাথে ঘুরাফিরা করছে। ভবিষ্যৎ ভালো বলে মনে হচ্ছে। দোয়া করি চেয়ারম্যান না, এম পি মন্ত্রী যেনো হয়। বাড়ীতে যেনো ভালো ভাবে যেতে পারি। ছোট কাক্কুর ইচ্ছা পুরন হউক।

১৮/১/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ -ঢাকা -ময়মনসিংহ জার্নি

(এ আই নির্মিত কাল্পনিক ছবি । সহায়তায়ঃ chatGPT)