smritir-poter-mullo

স্মৃতির পটের মূল্য

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৭৩ সন। তখন আমি কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে ৭ম শ্রেণীতে পড়তাম। শীত কাল ছিলো। ইনসান স্যার স্কুল মাঠে চেয়ারে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে বই পড়ছিলেন। আমি টিপ মেড়ে পেছনে দাড়িয়ে দেখছিলাম কি বই পড়েন। দেখি তিনি শরতচন্দ্র চট্রপাধ্যায় রচিত বই পড়ছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম

– স্যার, আপনি এটা কোন ক্লাসের বই পড়ছেন?

– এটা কোন ক্লাসের বই না। এটা উপন্যাস।

উপন্যাস কী স্যার?

স্যার আমাকে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য বুঝাতে চেষ্টা করলেন। আমি কিছু কিছু বুঝলাম। আমাদের পাঠ্য বই পুস্তকে বিভিন্ন লেখকের লেখা আমাদের পড়তে হতো। লক্ষ্য করলাম শুধু ইনসান স্যার না, মাওলানা সালাউদ্দিন স্যার, হাতেম আলী স্যার, মান্নান স্যার, মোহসীন স্যার, ওনারা সবাই এই সব লেখক, যেমন, পল্লী কবি জসীম উদ্দিন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কথা সাহিত্যিক শরত চন্দ্র চট্টপাধ্যায় ইত্যাদি বড় বড় লেখকের রচনা সমগ্র পড়তেন। ইনসান স্যারের পেছনে দাড়িয়ে কিছু কিছু অংশ পড়ে আমারও পুর্ণ বই পড়তে ইচ্ছে করলো। স্যারকে বললাম

– স্যার, আমি এই বই নিতে পারবো না?

– এই বইগুলো আমাদের অফিসের লাইব্রেরিতে আছে। তোমরা সবাই পড়তে পারো। এজন্য তোমাকে ৪ টাকা দিয়ে লাইব্রেরি কার্ড করতে হবে। এক সাথে দুইটির বই দিবে না। বই পড়ে ফেরত দিলে অন্য বই নিতে পারবে। তোমাদের আব্দুল্লাহ স্যার লাইব্রেরীর দায়িত্বে আছেন। তার কাছে বললেই ব্যাবস্থা হবে।

আমি আমার জমানো টাকা থেকে ৪ টাকা দিয়ে লাইব্রেরি কার্ড করলাম। বই নেয়া শুরু হলো। আমি ছোট বেলা থেকেই প্রকৃতির স্বান্যিদ্ধে থাকতে পছন্দ করতাম। গাছের ডালে, পাহাড়ের ঢালুতে ঘাসের উপর অথবা খরের পালার উপর শুয়ে শুয়ে এসব বই পড়তাম। বড় বড় লেখকদের রচনা সমগ্র পড়ে ফেললাম। কবি জসীম উদ্দিনের স্মৃতির পট বইটি পড়ে আটকে গেলাম।

কবি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থান করে আঞ্চলিক সাহিত্য ও লোকগীতি সংগ্রহ করতেন এবং তা নিয়ে গবেষণা করতেন। গ্রামের কবি, গীতিকার ও গায়কদের বাড়িতে থেকেছেন, খেয়েছেন, সালিশ করেছেন। এসব স্মৃতি কথা তিনি তার স্মৃতির পট হইয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন। এই বইটা আমার খুব বেশী ভালো লাগে। এটা ফেরত দেই না।

আমি ইনসান স্যারকে জিজ্ঞেস করি

– স্যার, কেউ যদি কোন একটা বই হারিয়ে ফেলে, তখন কি হবে?

– অসুবিধা নাই। কার্ড করার সময় যে ৪ টাকা জমা রাখা হয়, সেখান থেকে কেটে নিবে।

বাস, আমি আর বইটি ফেরত দিলাম না কোন দিন। ১৯৭৫ সনে চলে গেলাম বাটাজোর বি এম হাই স্কুলে। সেখানে নিয়ে গেলাম বইটি। মাঝে মাঝে শুয়ে শুয়ে পড়তাম। এস এস সি পাস করে চলে গেলাম আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে। ওখানেও নিয়ে গেলাম স্মৃতির পট বইটি। ১৯৭৯ সনে এইচ এস সি পাস করে চলে গেলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়তে। ওখানেও নিয়ে গেলাম স্মৃতির পট। এর পর চাকরি জীবনে টাঙ্গাইল, বরিশাল, শেরপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, দিনাজপুর, কিশোরগঞ্জ, যেখাই গিয়েছি স্মৃতির পট সাথে রেখেছি।

২০২০ সনে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেলাম। ২০২১ সনে আবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকরিতে যোগ দিলাম। এখনো আছি।

যেখানেই থাকি স্মৃতির পট আমার সাথেই থাকে। মলাট ছিড়ে গিয়েছিল। গাংগীনার পাড় প্রেসক্লাব মোর থেকে বাধাই করে নিয়েছি।

বয়স হয়েছে। ইচ্ছে হতো প্রধান অতিথি হিসাবে যদি কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে কোন বড় অনুষ্ঠানে আমার আমন্ত্রণ আসতো, আমি সহজেই রাজি হয়ে যেতাম। তখন এই বইয়ের কাহিনিটা সবার সামনে খুলে বলে বইটা লাইব্রেরিতে ফেরত দিতাম। কিন্তু তারা আমাকে আমন্ত্রণ জানায় না। তারা আমন্ত্রণ করে প্রভাবশালী নেতাদেরকে।

২০২৪ সনের ৫ আগষ্টের পর সেই সুযোগ আসে। ২০২৫ সনের বার্ষিক পুরুস্কার বিতরনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমাকে প্রধান অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ জানায়। আমার স্ত্রী ফিরোজা আক্তার স্বপ্না আমাকে মনে করিয়ে দেয়, “প্রধান অতিথি হিসাবে যাচ্ছ, ছাত্রদের জন্য উপদেশমূলক বক্তৃতা দিও এবং স্কুলের জন্য কিছু টাকা ডোনেশন হিসাবে দিয়ে এসো।”

আমি খামে ভরে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যাই। সকালে ময়মনসিংহ থেকে প্রাইভেট কার নিয়ে রওনা দেই। রেজাউল মাস্টার কিছুক্ষণ পর পর মোবাইল করে আমার অবস্থান জেনে নেয়। মানে বুঝতে পারলাম পরে। আমাকে বরন করার জন্য ফুলের পাপড়ি নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত রাখতে হবে, তাই।

ঠিকই সড়ক পথ থেকে অফিস কক্ষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে প্রধান অতিথির আগমন শুভেচ্ছা সমাগতম শ্লোগান দিতে দিতে আমার গায়ে গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে দিচ্ছিল। আমার ভালোই লাগলো।

যাহোক মাঝখানে অনেক ঘটনাই ছিলো। আসল কথায় আসি। সভাপতির বক্তব্যের আগে আমার বক্তব্য শুরু করলাম। মোট এক ঘন্টা বিশ মিনিটের মতো সময় বক্তব্য রাখলাম। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে উপদেশ মূলক কথা বলে কিছু স্মৃতি চারণ করলাম। শেষে লাইব্রেরী থেকে বই নেয়ার স্মৃতি কথাগুলো বললাম। শেষ করার আগে বললাম, “আমি এই বই পড়ে প্রভাবিত হয়ে এটার আদলে মোবাইলে টাইপ করে বই লিখি। প্রথম প্রকাশিত বইয়ের নাম দেই স্মৃতির পাতা থেকে। এভাবে প্রায় ১৪ টা বইয়ের কন্টেন্ট লিখে ফেলেছি। মোট ৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এখনো লিখছি। আমার নিজের লেখা বইগুলো গিফট হিসাবে দিয়ে যাচ্ছি। আমার কাছে রাখা স্মৃতির পট বইখানা হেড স্যারের হাতে ফেরত দিতে চাচ্ছি। এতে তোমাদের কোন কিছু বলার আছে?”

এক ছাত্র দাঁড়িয়ে বললো, “স্যার, এই বই আপনাকে লেখক হতে প্রভাবিত করেছে। আপনার জন্য বইটি যেমন দামী, তেমনি আমাদের কাছেও দামী। এই বইটি আপনি ১৯৭৪ সন থেকে এই ২০২৫ সন পর্যন্ত প্রায় ৫০ বছর আটকে রেখেছেন। তখন এই বইটির মূল্য দেড় টাকা হলেও এখন সেই টাকা বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। আজ আমাদেরকে ২০ হাজার টাকা দেবেন।” উপস্তিত সবাই হেসে দিলেন। আমি বললাম,” ঠিকই বলছো, আমি জমা রেখেছি এই লাইব্রেরিতে ৪ টাকা সেটা বেড়ে কত টাকা হয়েছে? যাহোক, তুমি আমার কাছে খুবই টেলেন্ট ছেলে মনে হচ্ছে। এমন একটা দাবীই আশা করছিলাম।” হেড মাস্টার তুলা মিয়া আমার কানের কাছে বললেন, “আসলেই সে মেধাবী, ক্লাসে প্রথম হয়েছে।” বললাম, “তুমি ঠিকই চেয়েছ। কিন্তু আমি যে মাত্র ১৫ হাজার টাকা নিয়ে এসেছি এটার জন্য!” মঞ্চে বসা একজজন স্থানীয় বিশেষ অতিথি বললেন, “ঠিক আছে, ২০ হাজারই দেয়া হবে। ৫ হাজার টাকা আমি দিবো।” সবাই খুশী হলেন। আমি আমার লেখা বই স্মৃতির পাতা থেকে, বর্নিল অতীত, সোনালী শৈশব, শৈশবের একাত্তর এবং জসীম উদ্দিনের সেই স্মৃতির পট বই প্রধান শিক্ষক তুলা মিয়ার হাতে তুলে দিলাম।

সভাপতির সমাপনী ভাসনে প্রধান শিক্ষক তুলা মিয়া বললেন, “৫০ বছর আগের কোন বই আমাদের লাইব্রেরিতে নেই। স্যারে যত্ন করে স্মৃতির পট বইটি রেখেছেন দেখেই ওটা এখনো আছে। এটার মর্যাদা স্যারেই দিতে পারবেন। কাজেই এই বইটা স্কুলের পক্ষ থেকে স্যারকে উপহার দিলাম।” এই বলে আমার হাতে বইটা তুলে দিলেন। সবার হাততালি পড়লো।

২৭ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

#স্মৃতি #গল্প #সাদেকুল #কচুয়া

কাল্পনিক ছবি একেছি chatGPT এ আই টুল দিয়ে।